গণভোট
তাহাজীব হাসান
প্রকাশ : ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৯:৪৬ এএম
আপডেট : ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১০:১৯ এএম
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন এবং সংবিধান সংস্কার বাস্তবায়নের লক্ষ্যে বহুল আলোচিত ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ সংক্রান্ত গণভোট বৃহস্পতিবার একই দিনে অনুষ্ঠিত হতে হচ্ছে।
আজ ১২ ফেব্রুয়ারি একই দিনে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং সংবিধান সংস্কার বাস্তবায়নের লক্ষ্যে বহুল আলোচিত ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ সংক্রান্ত গণভোট। একই দিনে দুটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যালটে ভোট দেওয়ার অভিজ্ঞতা আমাদের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায় যোগ করতে যাচ্ছে।
কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলোÑ এই ঐতিহাসিক সুযোগ ঘিরে পরিকল্পিতভাবে ছড়ানো হয়েছে, এখনও হচ্ছে গুজব, বিভ্রান্তি ও ভয়ভীতি। এসব অপপ্রচারের মুখোশ উন্মোচনে আমার কিছু কথা।
গুজব ১ : গণভোটে ‘হ্যাঁ’ মানেই সরকারের মেয়াদ বাড়বে?
সবচেয়ে বড় এবং বিপজ্জনক গুজবটি হলোÑ গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলে বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মেয়াদ বৃদ্ধি পাবে। এটি সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন।
সরকার ও নির্বাচন কমিশন একাধিকবার স্পষ্ট করে জানিয়েছে, ১৮০ দিনের সময়সীমা অন্তর্বর্তী সরকারের জন্য নয়; বরং নতুন নির্বাচিত সংসদের জন্য। জনগণ যদি গণভোটে ‘হ্যাঁ’ বলেন, তাহলে নতুন সংসদ সংবিধান সংস্কার বাস্তবায়নের জন্য সর্বোচ্চ ৬ মাস সময় পাবে। ১২ ফেব্রুয়ারির ভোটের পরপরই নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতেই ক্ষমতা হস্তান্তর হবেÑ এ নিয়ে কোনো দ্বিধা বা গোপনীয়তা নেই।
গুজব ২ : গণভোট মানেই সংসদ নির্বাচন বাতিল?
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়ানো আরেকটি ভয়ংকর অপপ্রচার হলোÑ গণভোটে অংশ নিলে বা ‘হ্যাঁ’ ভোট দিলে নাকি সংসদ নির্বাচন বাতিল হয়ে যাবে। এটি নিছক অপপ্রচার।
বাস্তবতা হলো, ভোটাররা সেদিন দুটি আলাদা রঙের ব্যালট পাবেন। একটিতে তিনি তার পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দেবেন, অন্যটিতে সংবিধান সংস্কারের পক্ষে বা বিপক্ষে মত দেবেন। দুটি ভোট বৈধ, কার্যকর ও গুরুত্বপূর্ণ।
গুজব ৩ : রাজনৈতিক দলগুলো সংস্কারের বিরোধী?
আরেকটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত গুজব হলো রাজনৈতিক দলগুলো নাকি এই সংস্কারের বিরোধিতা করছে। বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। দেশের প্রধান দলগুলোর পাশাপাশি প্রায় ২৫টি রাজনৈতিক দল ‘জুলাই জাতীয় সনদ’-এর প্রতি সমর্থন জানিয়েছে। কৌশলগত মতভিন্নতা গণতন্ত্রের অংশ হলেও সংস্কারের প্রশ্নে একটি জাতীয় ঐকমত্য স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য যে, ধর্মীয় ও সংখ্যালঘু ভোটারদের ভয় দেখাতে ছড়ানো ভিডিও ও বার্তাগুলো মূলত এআই-নির্ভর ভুয়া কনটেন্ট, যার উদ্দেশ্য নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ করা।
বিএনপির অবস্থান : স্পষ্ট, প্রকাশ্য ও ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে
গুজবের বিপরীতে বাস্তবতার সবচেয়ে শক্ত প্রমাণ হলো বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের সুস্পষ্ট অবস্থান। বিএনপি শুরু থেকেই বলে আসছে, সংস্কারের দায়িত্ব থাকতে হবে নির্বাচিত সংসদের ওপর এবং গণভোট হলে তা জাতীয় নির্বাচনের দিনেই হওয়া উচিত।
৬ নভেম্বর, যশোরে এক সভায় বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘সংসদ নির্বাচনের দিনেই গণভোট হতে হবে, এর আগে নয়।’ বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী একাধিক সংবাদ সম্মেলনে স্পষ্ট করে জানান, ‘গণভোট বিষয়ে বিএনপির অবস্থান পরিষ্কার জাতীয় নির্বাচনের দিনেই গণভোট।’
২৪ জানুয়ারি, ঠাকুরগাঁওয়ে নির্বাচনি পথসভায় মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সরাসরি ঘোষণা করেন “বিএনপি গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে।” তিনি বলেন, এই গণভোটের মাধ্যমেই বিএনপির দীর্ঘদিনের ৩১ দফা সংস্কার প্রস্তাবের প্রতিফলন ঘটবে।
১৩ জানুয়ারি ২০২৬, নির্বাচন ভবনে বৈঠক শেষে তিনি আরও বলেন, ‘আমরা সংস্কারের পক্ষে। বিএনপিই সবার আগে রাষ্ট্র সংস্কারের দাবি তুলেছিল।’
২১ জানুয়ারি, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা মাহদী আমিন জানান, বিএনপি তাদের প্রার্থীদের স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছে, ভোটারদের ‘হ্যাঁ’ ভোটে উৎসাহিত করতে।
স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন সতর্ক করে বলেন, ‘ষড়যন্ত্র মোকাবিলার প্রধান হাতিয়ার হলো ১২ ফেব্রুয়ারি ব্যালট পেপারে হ্যাঁ ভোট।’ বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানও একাধিকবার হ্যাঁ ভোটের পক্ষে কথা বলেছেন।
অন্যদিকে জামায়াত ও এনসিপি প্রকাশ্যে সব সময় গণভোটে হ্যাঁ -এর পক্ষে নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করেছে। গণভোট হলো জনগণের সরাসরি মতপ্রকাশের সর্বোচ্চ মাধ্যম। গুজব, ভয় বা অপপ্রচারে বিভ্রান্ত হয়ে এই সুযোগ নষ্ট করা হবে আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। এবারের ভোট কেবল সরকার পরিবর্তনের নয়, এটি রাষ্ট্র কাঠামো পুনর্গঠনের ভোট।
প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদসীমা, দ্বিকক্ষ সংসদ, শক্তিশালী ও নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশনের স্বপ্ন বাস্তবায়নের চাবিকাঠি এখন জনগণের হাতেই। তাই অশুভ অপপ্রচারে কান না দিয়ে, সশরীরে কিংবা পোস্টাল ব্যালটে ভোট প্রদানই হবে একজন সচেতন নাগরিকের দায়িত্ব।
তাহাজীব হাসান
সাংবাদিক ও কলাম লেখক