বাংলাদেশ-মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১২:৪৯ পিএম
বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে।
বাংলাদেশ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। দীর্ঘ প্রতীক্ষিত ও বহুল আলোচিত পাল্টা শুল্কহার ২০ থেকে ১ শতাংশ কমিয়ে ১৯ শতাংশে নামিয়ে আনতে একটি ঐতিহাসিক চুক্তি সই করেছে দুই দেশ। বর্তমানে বাংলাদেশি পণ্যে মার্কিন শুল্ক আরোপ রয়েছে মোট ৩৫ শতাংশ। এখন ১ শতাংশ কমে হলো ৩৪ শতাংশ। এতে উভয় দেশের রপ্তানিকারকরা অভূতপূর্ব সুবিধা পাবেন। এই চুক্তিতে শুল্কহার কমার খবরটি বাংলাদেশের জন্য নিঃসন্দেহে এক ইতিবাচক বার্তা। দীর্ঘদিন ধরে উচ্চশুল্ক, অশুল্ক বাধা ও বাজারে প্রবেশের নানা জটিলতায় বাংলাদেশি পণ্যের প্রতিযোগিতা সীমিত ছিল। নতুন এই সমঝোতা সে বাস্তবতায় একটি সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিলÑ বিশেষ করে, রপ্তানি বৈচিত্র্য ও বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের প্রশ্নে। ৯ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের পক্ষে বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন ঢাকা থেকে অনলাইনে যুক্ত হয়ে চুক্তিতে সই করেন। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে সই করেন দেশটির বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিয়েসন গ্রিয়ার। চুক্তি অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের শিল্প ও কৃষিপণ্যের জন্য উল্লেখযোগ্য অগ্রাধিকারমূলক বাজারসুবিধা দেবে বাংলাদেশ। যুক্তরাষ্ট্রের এসব পণ্যের মধ্যে আছে রাসায়নিক দ্রব্য, চিকিৎসা যন্ত্রপাতি, যন্ত্র, মোটরযান ও যন্ত্রাংশ, তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি সরঞ্জাম, জ্বালানি, সয়াজাত ও দুগ্ধজাত পণ্য, গরুর মাংস, হাঁস-মুরগি, বাদাম ও বিভিন্ন ফল। চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশে উৎপন্ন পণ্যের ওপর পারস্পরিক শুল্কহার কমিয়ে ১৯ শতাংশ নির্ধারণ করেছে। একইভাবে যুক্তরাষ্ট্র থেকে তুলা ও কৃত্রিম তন্তু আমদানি করে তৈরি করা পোশাক দেশটিতে রপ্তানি করা হলে তাতে পাল্টা শুল্ক আরোপ হবে নাÑ এমন ব্যবস্থা নেওয়ার অঙ্গীকার করেছে দেশটি। তবে পরিমাণ নির্ভর করবে যুক্তরাষ্ট্র থেকে কতটা সুতা ও কৃত্রিম তন্তু আমদানি করা হচ্ছে তার ওপর। দুই দেশের যৌথ বিবৃতিতে এসব তথ্য উল্লেখ রয়েছে।
উল্লেখ করা প্রয়োজন, গত কয়েক বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশি তৈরি পোশাক রপ্তানির ক্ষেত্রে উচ্চশুল্ক হার একটি বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানিকৃত তুলা ও তন্তুর ওপর বাংলাদেশের শুল্ক কাঠামো নিয়েও ওয়াশিংটনের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল। নতুন এই চুক্তির ফলে বাংলাদেশ এখন মার্কিন তুলা ও কৃত্রিম তন্তু ব্যবহার করে পোশাক তৈরি করলে তা শুল্কমুক্ত সুবিধায় আমেরিকার বাজারে রপ্তানি করতে পারবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এইা শুল্কসুবিধা পাওয়ায় বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের পোশাক খাতের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বহুগুণ বাড়বে। এটি কেবল রপ্তানি আয় বাড়াবে না, দুই দেশের মধ্যে একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্যিক অংশীদারত্ব তৈরি করবে। এই চুক্তিকে দেশের অর্থনীতির জন্য একটি ‘মাইলফলক’ হিসেবে অভিহিত করেছেন অনেকে।
এ কথা সত্য যে, বাংলাদেশের রপ্তানি খাত মূলত পোশাক-নির্ভর। যুক্তরাষ্ট্র এই খাতের অন্যতম বড় বাজার হলেও বিগত সময়ে তুলনামূলক বেশি শুল্কের কারণে ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া বা মধ্য আমেরিকার দেশগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশ অনেক সময় পিছিয়ে ছিল। এখন শুল্কহার কমায় বাংলাদেশের পোশাক, হোম টেক্সটাইল, চামড়াজাত পণ্য, হালকা প্রকৌশল সামগ্রী এমনকি কৃষিপণ্যেরও দাম কমবে, যা মার্কিন ক্রেতাদের কাছে আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠবে। আর সরাসরি এর সুফল যাবে উৎপাদক, শ্রমিক ও রপ্তানিকারকদের ঘরে।
আমরা মনে করি, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি মানে শুধু বাজার সুবিধা নয়, বরং মান, শ্রম অধিকার, পরিবেশ সুরক্ষা ও স্বচ্ছতার মতো বিষয়েও কঠোর প্রত্যাশা। তবে শুল্কহার কমার সঙ্গে সঙ্গে এসব ক্ষেত্রে দায়িত্বশীল আচরণ নিশ্চিত করতে না পারলে অর্জিত সুবিধা টেকসই হবে না। অতীতে শ্রম নিরাপত্তা ও কারখানা ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা বাংলাদেশের ভাবমূর্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে, সে অভিজ্ঞতা ভুলে যাওয়ার সুযোগ নেই।
আমরা আরও মনে করি, এই চুক্তি বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদের জন্যও একটি বার্তা বহন করে। রপ্তানি সক্ষমতা বাড়াতে অবকাঠামো, বন্দর দক্ষতা, কাস্টমস আধুনিকায়ন এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমানো এখন সময়ের দাবি। শুল্ক কমলেও যদি বন্দরে জাহাজ জট, কাগজপত্রে দেরি বা নীতির অনিশ্চয়তা থাকে, তাহলে প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা অনেকটাই নষ্ট হয়ে যাবে। একই সঙ্গে ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের যুক্তরাষ্ট্রের বাজার সম্পর্কে প্রশিক্ষণ ও তথ্য সহায়তা দেওয়া জরুরি।
বলা বাহুল্য, ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতাতেও এই চুক্তির গুরুত্ব আছে। বৈশ্বিক বাণিজ্য যখন অনিশ্চয়তা, শুল্কযুদ্ধ ও সুরক্ষাবাদের চাপে, তখন যুক্তরাষ্ট্রের মতো বড় অর্থনীতির সঙ্গে সহযোগিতা বাংলাদেশের জন্য কৌশলগত ভারসাম্য তৈরি করে। এটি বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছেও একটি আস্থার সংকেত।
অবশ্য এই বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে কেউ কেউ শঙ্কার কথা বলছেন। তারা বলছেন, এতে জাতীয় স্বার্থ ক্ষুণ্ন হবে কি না? শ্রম ও পরিবেশ শর্তে অতিরিক্ত চাপ আসবে কি না? কিংবা দেশীয় শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হবে কি না। আমরা মনে করি, এসব শঙ্কা অমূলক নয়, আবার অতিরঞ্জিতও নয়। তাই স্বচ্ছ আলোচনার মাধ্যমে চুক্তির শর্তগুলো জনসমক্ষে আনা, জাতীয় সক্ষমতা অনুযায়ী প্রতিশ্রুতি নির্ধারণ এবং নিয়মিত পর্যালোচনার ব্যবস্থা থাকলে ঝুঁকি কমবে। আমরা বিশ্বাস করি, সঠিক প্রস্তুতি ও দায়িত্বশীল পরিচালনার মধ্য দিয়ে সব ধরনের শঙ্কা দূর করা সম্ভব।
শুল্কহার কমা নিঃসন্দেহে সুখবর, তবে মনে রাখতে হবেÑ সাফল্য এমনি এমনি আসে না। সুশাসন, মানোন্নয়ন ও নীতিগত ধারাবাহিকতার মাধ্যমে এই সুযোগ কাজে লাগাতে পারলেই বাংলাদেশের রপ্তানি খাত নতুন গতি পাবে। নইলে সম্ভাবনার এই জানালাও অতীতের মতো বন্ধ হতে পারে।