× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

চট্টগ্রাম বন্দরে ধর্মঘট

আত্মবিনাশী এই হঠকারিতা বন্ধ হোক

সম্পাদকীয়

প্রকাশ : ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১২:৩৯ পিএম

আত্মবিনাশী এই হঠকারিতা বন্ধ হোক

লাগাতার ধর্মঘটে পুরোপুরি অচল হয়ে পড়েছে অর্থনীতির লাইফলাইন খ্যাত চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর। ধর্মঘটের কারণে জেটিতে অলস বসে আছে বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি পণ্য নিয়ে আসা বহু জাহাজ। ক্রেনের নড়াচড়া নেই। পণ্য ওঠানো-নামানো বন্ধ। খালাস পণ্য বন্দর থেকে বাইরে ডেলিভারি হচ্ছে না। পাঠানো যাচ্ছে না রপ্তানি পণ্য। নেই চিরচেনা কোলাহল, হাঁকডাক। সুনসান নীরবতা চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কন্টেইনার টার্মিনাল (এনসিটি), জেনারেল কার্গো বার্থ (জিসিবি) ও চিটাগং কন্টেইনার টার্মিনালের (সিসিটি) অপারেশনাল কার্যক্রমে। দিন দিন বাড়ছে আন্দোলনের তীব্রতা। তৈরি হচ্ছে দীর্ঘমেয়াদি অচলাবস্থা। এ নিয়ে উদ্বিগ্ন আমদানি-রপ্তানিকারকরা। কারণ, বন্দর থেকে কাঁচামাল শিল্পকারখানায় নিতে না পারলে উৎপাদন ব্যাহত হবে।

বলে রাখা ভালো, দেশের সমুদ্রকেন্দ্রিক আমদানি-রপ্তানির সিংহভাগই হয়ে থাকে এ বন্দরের মাধ্যমে। তাই বন্দর এক দিন বন্ধ থাকলে তার প্রভাব পড়ে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে। বন্দর কর্তৃপক্ষ বলছে, এতে বহির্নোঙরে বাড়ছে জাহাজের গড় অবস্থান। কিছুদিন আগেই যেখানে বন্দরে জাহাজের গড় অবস্থান শূন্যের কোটায় চলে এসেছিল, কর্মবিরতির কারণে সেটি এখন বাড়ছে। 

উল্লেখ্য, নিউমুরিং কন্টেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) বিদেশি প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডকে ইজারা দেওয়ার সরকারি সিদ্ধান্ত বাতিলের দাবিতে গত ৩১ জানুয়ারি আট ঘণ্টার কর্মবিরতি শুরু করেন শ্রমিক কর্মচারীরা। গত মঙ্গলবার সকাল ৮টা থেকে ২৮ ঘণ্টার কর্মবিরতি কর্মসূচি ঘোষণা করে শ্রমিকদের সংগঠন বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ। সেদিন ২৪ ঘণ্টা কর্মবিরতি কর্মসূচি পালনের সময়েই একই দাবিতে অনির্দিষ্টকালের জন্য কর্মবিরতি কর্মসূচি ঘোষণা করে সংগঠনটি। এই কর্মবিরতি এখনও অব্যাহত রয়েছে। আমরা মনে করি, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট সামনে রেখে চট্টগ্রাম বন্দরে হঠাৎ ধর্মঘট দেশ ও জনগণের জন্য উদ্বেগজনক। নির্বাচনকালীন সময়ে এমন কর্মসূচি রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়াতে পারে।

অর্থনীতির ভাষায় চট্টগ্রাম বন্দরকে বলা হয় বাংলাদেশের হৃদপিণ্ড। কেননা দেশের মোট আমদানি-রপ্তানির প্রায় ৯০ শতাংশ এই বন্দরের ওপর নির্ভরশীল। এমন একটি কৌশলগত ও স্পর্শকাতর স্থানে বারবার ধর্মঘট ডাকা কেবল প্রশাসনিক অচলাবস্থা নয়, এটি জাতীয় অর্থনীতির ওপর সরাসরি আঘাত। চট্টগ্রাম বন্দরে সাম্প্রতিক ধর্মঘট কার্যত কোনো ন্যায্য দাবি আদায়ের গণতান্ত্রিক কর্মসূচি নয়; বরং এটি এক ধরনের আত্মবিনাশী হঠকারিতা, যার খেসারত দিতে হবে পুরো দেশকে। ধর্মঘটের ফলে প্রতিদিন কোটি কোটি টাকার পণ্য খালাস বন্ধ থাকে। জাহাজ মালিকদের বাড়তি ডেমারেজ গুনতে হয়। শেষপর্যন্ত সেই বাড়তি খরচ এসে পড়ে আমদানিকারক, রপ্তানিকারক ও সাধারণ ভোক্তার কাঁধে। পোশাক খাতের মতো সময়নির্ভর রপ্তানি শিল্প সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সময়মতো পণ্য পাঠাতে না পারলে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আস্থা নষ্ট হয়, অর্ডার অন্য দেশে চলে যায়। একটি ধর্মঘটের সিদ্ধান্ত বহু শ্রমিকের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত করে তোলেÑ এ সত্য কি আমরা ভুলে যাচ্ছি?

মনে রাখা দরকার, চট্টগ্রাম বন্দর শুধু একটি কর্মস্থল নয়; এটি জাতীয় নিরাপত্তা, খাদ্য সরবরাহ, জ্বালানি আমদানি ও শিল্প উৎপাদনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। বন্দরে অচলাবস্থা মানে সারা দেশে কাঁচামালের সংকট, কারখানা বন্ধ, বাজারে মূল্যস্ফীতি বাড়ার নতুন চাপ। এমন বাস্তবতায় ধর্মঘট ডেকে নিজের দাবিকেই দুর্বল করা হয়। জনমত শ্রমিকদের পক্ষে থাকার বদলে তাদের বিরুদ্ধে চলে যায়। এটিই হঠকারিতার সবচেয়ে বড় পরিণতি।

এ কথা সত্য যে, শ্রমিকের অধিকার, মর্যাদা ও ন্যায্য সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা রাষ্ট্র ও কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব। আবার জনগণের স্বার্থ ও দেশের উন্নয়নের লক্ষ্যে যেকোনো নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার রাষ্ট্র এবং সরকারের রয়েছে। যেকোনো ভালো-মন্দ নির্ধারণের জন্য পক্ষ-বিপক্ষ থাকে। সঠিক লক্ষ্যে পৌঁছতে হয় উভয় পক্ষের মধ্যে আলাপ-আলোচনা ও যৌক্তিক বিবেচনার ভিত্তিতে। আমরা মনে করি, সময়মতো সংলাপ, স্বচ্ছ প্রশাসন ও আস্থার পরিবেশ তৈরি করা গেলে ধর্মঘটের প্রয়োজনই পড়ত না। আরও মনে করি, আলোচনার টেবিল ফাঁকা রেখে সরাসরি বন্দর অচল করে দেওয়া কি দায়িত্বশীল শ্রম আন্দোলনের উদাহরণ হতে পারে? পৃথিবীর কোনো দায়িত্বশীল রাষ্ট্রেই কৌশলগত স্থাপনায় এভাবে হঠাৎ কর্মবিরতি গ্রহণকে উৎসাহিত করা হয় না। কর্তৃপক্ষের অনমনীয়তা যেমন সমস্যার জন্ম দেয়, তেমনি দায়িত্বজ্ঞানহীন কর্মসূচিও সংকটকে বহুগুণ বাড়িয়ে তোলে।

চট্টগ্রাম বন্দরের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় সংকট সমাধানের একমাত্র পথ হলো আলোচনার টেবিল। শ্রমিক, কর্তৃপক্ষ ও সরকারের মধ্যে নিয়মিত, প্রাতিষ্ঠানিক সংলাপ হওয়া উচিত। দাবি আদায়ের নামে অর্থনীতির শিরায় ছুরি চালানো কোনো পক্ষের জন্যই মঙ্গলকর নয়। তাই, চট্টগ্রাম বন্দরে ধর্মঘটের হঠকারিতা থেকে সরে আসতে হবে। শ্রমিকদের যে কোন দাবি নিয়ে আলোচনা হতে পারে, তবে তা হতে হবে দায়িত্বশীল ও গঠনমূলক পথে। আর সরকারকে বুঝতে হবেÑ বন্দর অচল হলে ক্ষতিটা কোনো এক পক্ষের নয়, ক্ষতিটা বাংলাদেশের। এই আত্মবিনাশী হঠকারিতা বন্ধ না হলে এর মূল্য আমাদের সবাইকে চুকাতে হবে, আজ নয় তো কাল। আমরা চাই, জাতীয় স্বার্থ, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও গণতান্ত্রিক পরিবেশ রক্ষায় সংলাপ ও আলোচনার মাধ্যমেই এই সংকটের সমাধানের পথ খোঁজা হোক।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা