× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

পর্যবেক্ষণ

কানাডায় অভিবাসী প্রত্যাশীদের ভবিষ্যৎ

নিরঞ্জন রায়

প্রকাশ : ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১২:৩৮ পিএম

কানাডায় অভিবাসী প্রত্যাশীদের ভবিষ্যৎ

আমার পরিচিত এক পরিবার কানাডায় অভিবাসী লাভ করে স্থায়ীভাবে বসবাসের উদ্যোগ নিয়েছেন আজ থেকে প্রায় তিন বছর আগে। কিন্তু এখনও মাঝপথে আটকে আছেন। এই পরিবারের স্বামী-স্ত্রী দুজনেই বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠিত কোম্পানিতে চাকরি করে ভালো উপার্জন করতেন। তারপরও উন্নত জীবনের আশায় কানাডার পথে পা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু তাদেরকে যারা এ ব্যাপারে পরামর্শ দিয়েছেন, তারা সরাসরি পথের পরিবর্তে জটিল এক পথ বাতলে দিয়েছেন। ফলে স্ত্রী-সন্তানদের দেশে রেখে সেই ব্যক্তি নিজে একা এসে এক জটিল অভিবাসন পদ্ধতির পথ ধরে আবেদন করেন। উদ্দেশ্য ছিল তার নিজের অভিবাসন লাভের পর পরিবারের অন্য সদস্যদের অভিবাসনের জন্য আবেদন করবেন। হয়েছেও তাই। দুই বছরের অধিক সময় অপেক্ষার পর সেই ব্যক্তি অভিবাসন লাভের অনুমতি পান এবং তার স্ত্রী-সন্তানসহ একসঙ্গে আবেদন করেন। সেই আবেদনের পর এক বছরের অধিক সময় পার হয়ে গেছে, কিন্তু তাদের আবেদনের কী অবস্থা তা কেউ জানে না। কবে নাগাদ অভিবাসন পেতে পারে, সেটাও জানার কোনো সুযোগ নেই। এই অবস্থায় সেই ভদ্রলোক এখানে উদ্বেগ, উৎকণ্ঠার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন, অন্যদিকে তার স্ত্রী ও দুই সন্তান নিয়ে বাংলাদেশে এক অনিশ্চিত অপেক্ষায় সময় পার করছেন। 

একই রকম কিন্তু ভিন্ন ধরনের সমস্যা নিয়ে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন অভিবাসনের উদ্দেশ্যে কানাডায় আগত এক ভদ্রলোক এবং উদ্দেশ্য ছিল তার স্ত্রীর ব্যাংকে একটা চাকরির ব্যাপারে খোঁজখবর নেওয়া। সেই ভদ্রমহিলা বাংলাদেশে ব্যাংকে চাকরি করেছেন, তাই জানার চেষ্টা করছিলেন যে কীভাবে এখানে একটি ব্যাংকে চাকরি পাওয়া যায়। সেই ব্যক্তি বিনিয়োগ ক্যাটাগরি বা স্টার্ট-আপ ভিসায় অভিবাসন লাভের উদ্দেশ্যে কানাডা এসেছেন। এই পদ্ধতিতে সঠিকভাবে কানাডা আসতে হলে তিন/চার বছর অপেক্ষা করে পার্মানেন্ট রেসিডেন্ট স্ট্যাটাস নিয়ে আসতে হবে। কিন্তু এতদিন অপেক্ষা করা তাদের পক্ষে কঠিন, তাই তারা স্টার্ট-আপ আবেদন মঞ্জুর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ওয়ার্ক পারমিট ভিসা নিয়ে চলে এসেছেন এবং এখানে থাকতে থাকতে পার্মানেন্ট রেসিডেন্ট লাভ করবেন। উদ্যোগটা মন্দ নয়। কিন্তু সমস্যা দেখা দিয়েছে ব্যাংক বা প্রতিষ্ঠিত কোনো কোম্পানিতে চাকরি জোগাড় করার ক্ষেত্রে। কেননা ব্যাংকে চাকরি করার জন্য কানাডার নাগরিক বা পার্মানেন্ট রেসিডেন্টদের অভাব নেই। তাই তাদের রেখে ব্যাংক খুব সহজে ওয়ার্ক পারমিট পাওয়া কোনো ব্যক্তিকে নিয়োগ দিতে চাইবে না। ব্যাংক ভালো করেই জানে যে, একজন নতুন নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তিকে প্রশিক্ষণ দিয়ে তৈরি করতেই ছয় মাস লেগে যায়। সুতরাং ব্যাংক জেনেশুনে ওয়ার্ক পারমিট পাওয়া অস্থায়ী কারও পিছনে এত পয়সা খরচ করতে চাইবে না। অবশ্য যাদের সেই মাপের উচ্চপদস্থ কারও শক্ত সুপারিশ আছে, তাদের কথা ভিন্ন। এই ব্যক্তি যদি একটু অপেক্ষা করে পার্মানেন্ট রেসিডেন্ট স্ট্যাটাস নিয়ে কানাডা আসতেন, তাহলে তিনি শুরু থেকেই একটা ভালো চাকরি  জোগাড় করে কানাডার জীবন শুরু করতে পারতেন।

সম্প্রতি কানাডায় উচ্চশিক্ষা নিতে আসা দুজন ছাত্র আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন। তাদের সমস্যা আরও কঠিন। তারা উচ্চ মাধ্যমিক পাস করে এসেছেন এখান থেকে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে কানাডা অভিবাসন নিয়ে থেকে যাবেন। এজন্য তাদের পরিবারকে বিশাল অঙ্কের অর্থ ব্যয় করতে হয়েছে। কানাডায় যারা অধ্যয়ন করতে আসে, তারা মূলত আন্তর্জাতিক ছাত্রছাত্রী, যাদের টিউশন ফি মাত্রাতিরিক্ত। এর ওপর আছে থাকা-খাওয়ার খরচ। সব মিলিয়ে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করে আসা ছাত্রছাত্রীদের গ্রাজুয়েশন সম্পন্ন করতে প্রায় দেড় থেকে দুই কোটি টাকা লেগে যায়। 

উল্লেখ্য, কানাডায় কাজ করে শিক্ষা ব্যয় মেটানোর সুযোগ খুবই সীমিত। ফলে পরিবারকেই পুরো খরচটা বহন করতে হয়। এ কারণেই কানাডায় উচ্চ মাধ্যমিক পাস করে গ্রাজুয়েশন প্রোগ্রামের জন্য অধ্যয়ন অত্যধিক ব্যয়বহুল। পক্ষান্তরে দেশ থেকে গ্রাজুয়েশন সম্পন্ন করে মাস্টার্স প্রোগ্রামের জন্য কানাডায় আসলে খরচ এবং সময় উভয় দিক থেকেই যথেষ্ট সাশ্রয়ী হয়। এসব নিয়ে আমি বাংলাদেশের একাধিক পত্রিকায় অনেক লিখেছি। কিন্তু কে শোনে কার কথা। 

আমাদের দেশে একশ্রেণির ছাত্রছাত্রী আছে, যারা মনে করে যেকোনোভাবে দ্রুত বিদেশে যেতে পারলেই হয়ে গেল। আবার একশ্রেণির অভিভাবকও আছেন, যারা মনে করেন যেনতেনভাবে দ্রুত ছেলেমেয়েদের বিদেশে পাঠায়ে দিতে পারলেই তারা বেঁচে যায়। কিন্তু ভালোভাবে না জেনে এবং পরিকল্পনা না করে তড়িঘড়ি চলে আসার কারণে যে ভালোর থেকে খারাপ হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি থাকে, সে বিষয়টিকেও বিবেচনায় নিতে চায় না। ঠিক এরকম অবস্থার শিকার হতে চলেছে কানাডায় উচ্চশিক্ষা নিতে আসা অধিকাংশ ছাত্রছাত্রীর।

আমি ওপরে যে কয়েকজন অভিবাসী প্রত্যাশীর অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করলাম, সেগুলো নিছক বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। বরং বিগত কয়েক বছরে বাংলাদেশ থেকে যেসব ব্যক্তি কানাডা এসে অভিবাসন লাভের চেষ্টা করছেন, তাদের অধিকাংশের অবস্থা কমবেশি একই রকম। কানাডার অভিবাসনপ্রার্থীদের মধ্যে যারা বিনিয়োগ ক্যাটাগরি বা স্টার্ট-আপ ভিসায় এসেছেন, তারা বলা যেতে পেরে একেবারেই কম সমস্যার মধ্যে আছেন। তাদের পার্মানেন্ট রেসিডেন্ট পাওয়া সময়ের ব্যাপার মাত্র। সময়টা একটু লম্বা হতে পারেÑ এই যা। তাদেরকে সেই সময় পর্যন্ত ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করতে হবে। বড় জোর ভালো চাকরি জোগাড় করা বা সুপ্রতিষ্ঠিত হওয়ার বিষয়টি একটু বিলম্বিত হতে পারে। যারা উচ্চশিক্ষা লাভ করে কানাডা থেকে যাওয়ার উদ্দেশ্যে এসেছেন, তাদের বিষয়টা আসলেই বেশ জটিল হয়ে গেছে। এটা তাদের জন্য দুর্ভাগ্য ছাড়া আর কিছুই নয়। কেননা আজ থেকে দুই বছর আগেও এই পথই সবচেয়ে সহজ অভিবাসন লাভের পদ্ধতি ছিল। তখন এখানকার অভিবাসন আইন এতটাই সহজ ছিল যে একজন ছাত্র গ্র্যাজুয়েশন শেষ করে মাত্র এক বছর চাকরির অভিজ্ঞতা নিয়ে অভিবাসনের জন্য আবেদন করলেই ৯ থেকে বারো মাসের মধ্যে পার্মানেন্ট রেসিডেন্ট হয়ে যেতে পারত। এই চাকরির আবার কোনো বিধিনিষেধ ছিল না। মোটামুটি একটা চাকরি হলেও চলত। এজন্য সরকার এক্সপ্রেস এন্ট্রি নামে একটি বিশেষ ব্যাবস্থাও চালু করেছিল। 

এই সহজ সুযোগ কাজে লাগানোর উদ্দেশ্যে বিগত কয়েক বছরে এত অধিক সংখ্যক বিদেশি ছাত্রছাত্রী কানাডা এসেছে যে বিষয়টি নিয়ে বিরূপ সমালোচনা হওয়ায় সরকার এই আইন যথেষ্ট কঠোর করেছে। ফলে গ্র্যাজুয়েশন শেষ করে অভিবাসন লাভ করা এখন প্রায় অসম্ভব হয়ে গেছে। নতুন অভিবাসন আইন অনুযায়ী যেনতেন চাকরি পেলে চলবে না, নির্দিষ্ট মানের চাকরি, বিশেষ করে ম্যানেজার বা তার ওপরের পদের চাকরি অভিজ্ঞতা ছাড়া অভিবাসন আবেদনের জন্য যোগ্যই হবে না। আর কানাডায় প্রথমেই এই মানের চাকরি জোগাড় করা প্রায় অসম্ভব। ফলে যেসব বিদেশি ছাত্রছাত্রী গ্র্যাজুয়েশন সম্পন্ন করেছে বা শেষ করার পথে আছে, তারা পড়েছে মারাত্মক সমস্যায়। তারা না পারছে অভিবাসনের জন্য আবেদন করে বৈধভাবে থাকতে, না পারছে বাবা-মায়ের বিশাল অঙ্কের অর্থ ব্যয় করে লেখাপড়া শিখে দেশে ফিরে যেতে। 

অনেকে আবার অন্য কোনো কোর্সে ভর্তি হয়ে লেখাপড়ার মাধ্যমে থেকে যাওয়ার কথা ভাবছেন। সেখানেও সমস্যা হচ্ছে। কেননা এজন্য অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় হবে, কিন্তু তারপরও যে অভিবাসন লাভ করা যাবে, সেই নিশ্চয়তা একেবারেই নেই। খুব সহসা অভিবাসন আইন শিথিল হওয়ার সম্ভাবনা আছে বলে মনে হয় না। এসব ছাত্রছাত্রীর উচিত হবে কোনোরকম জটিল পথের দিকে না হেঁটে দেশে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া। যেহেতু কানাডা এসে উচ্চশিক্ষা অর্জন করেছে, তাই কয়েক বছর পর অভিবাসন আইন শিথিল হলে অন্য কোনো কোর্সে অধ্যয়ন করে অভিবাসন লাভের চেষ্টা করা সম্ভব হবে। এখনকার কঠিন অবস্থা নিশ্চয়ই খুব বেশি দিন থাকবে না। কানাডার স্বার্থেই এই আইন শিথিল করতে হবে। আর এসব ছাত্রছাত্রীর অভিভাবকের উচিত হবে তাদের ছেলেমেয়েদের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করা এবং তাদের সন্তানদের কানাডা থেকে যাওয়ার জন্য কোনোরকম চাপ সৃষ্টি না করে সাদরে ফিরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা করা। ভুলে গেলে চলবে না যে চারদিকে অনেক অপ্রীতিকর ঘটনার খবরই কিন্তু কানে আসছে। অতএব সময় থাকতে সাবধান হতে হবে।

যারা রিফিউজি হিসেবে আবেদন করে অভিবাসন লাভের পথে হেঁটেছেন তাদের মধ্যে দুই ধরনের মানুষ আছেন। একদল আছেন যাদের রিফিউজি আবেদন মঞ্জুর হয়েছে এবং অভিবাসন লাভের জন্য আবেদন করেছেন। এদের সংখ্যা খুবই কম এবং এরা বেশ সৌভাগ্যবান। তাদের অভিবাসন বলা চলে নিশ্চিত। তবে অপেক্ষার প্রহর কত লম্বা হবে, তা কেউ বলতে পারবে না। হয়তো এক বছরেও হতে পারে, আবার পাঁচ বছর পর্যন্ত অপেক্ষা করা লাগতে পারে। যে পরিমাণ রিফিউজি আবেদন মঞ্জুর হয়েছে তাতে সরকার যদি এদেরকে একত্রে নিয়ে এসে দেশের চাকরির বাজারের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করার পরিবর্তে আগামী কয়েক বছর ধরে নিয়ে আসার সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে তো এরকম লম্বা সময় অপেক্ষা করা ছাড়া কোনো গত্যন্তর নেই। এই গ্রুপের সদস্যদের উচিত হবে অহেতুক উদ্বিগ্ন না হয়ে এই দীর্ঘ বিলম্বের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে নিজেদের পরিকল্পনা করা। অভিবাসন লাভের জন্য এই পথে হাঁটার অন্য যে গ্রুপ আছে, যাদের রিফিউজি আবেদন প্রত্যাখ্যান হয়েছে, তাদের পরবর্তী করণীয় কী হবে, তার সন্তোষজনক উত্তর আমার কাছে নেই। অন্য কারও কাছে আছে বলে মনে হয় না। তাদের প্রতি একটাই অনুরোধ থাকবে, তা হচ্ছে তারা যে পদক্ষেপই নেন না কেন, আইনের মধ্যে থেকে নিতে হবে। নিয়মের বাইরে যেয়ে কোনো পদক্ষেপ নেওয়াই হবে বড় ধরনের বিপদ ডেকে আনার শামিল।


নিরঞ্জন রায়

সার্টিফাইড অ্যান্টি-মানি লন্ডারিং স্পেশালিস্ট ও ব্যাংকার, টরন্টো, কানাডা  

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা