সংসদ আর গণতন্ত্র
হাবীব ইমন
প্রকাশ : ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১২:৩৩ পিএম
তরুণদের ব্যাপারে আমার ভালো লাগার জায়গাটা সব সময়ই স্পষ্ট ছিল। সেই ভালো লাগার সঙ্গে গর্বও জড়িয়ে। তাদের সৃজনশীলতা, প্রগতিশীল চেতনা ও উদ্ভাবনী শক্তি আমাকে বিশ্বাস জুগিয়েছেÑ সমাজ বদলাবে, রাজনীতির ভাষাও বদলাবে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সেই বিশ্বাসে চিড় ধরেছে। আজকাল তরুণদের কাজে যে শক্তি দেখার কথা, তা আগের মতো পাই না। কেন পাই নাÑ এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়েই এক অস্বস্তিকর সত্য সামনে আসেÑ গর্বের জায়গা দখল করছে অহংকার।
গর্ব ও অহংকারের পার্থক্য কেবল নৈতিক নয়, রাজনৈতিকও। গর্ব মানুষকে দায়বদ্ধ করে, অহংকার মানুষকে কর্তৃত্বপরায়ণ করে তোলে। আন্তনিও গ্রামশি বলেছিলেন, আধিপত্য কেবল রাষ্ট্রীয় বলপ্রয়োগের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয় না; তা প্রতিষ্ঠিত হয় সম্মতি তৈরির মধ্য দিয়েÑ ভাষা, সংস্কৃতি ও বোধের ভেতর দিয়ে। আজকের তরুণ রাজনীতিতে যে ভাষার ব্যবহার আমরা দেখছি, সেখানে সম্মতি নয়, ভয় ও দম্ভই প্রধান হাতিয়ার হয়ে উঠছে। এটা আধিপত্যের এক বিপজ্জনক রূপ।
তরুণদের রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হওয়া নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। কিন্তু রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা আর রাজনৈতিক সচেতনতা এক বিষয় নয়। সচেতনতা তৈরি হয় যুক্তির মাধ্যমে, ইতিহাসের বোধের মাধ্যমে, ভাষার সংযমের মাধ্যমে। রাজনীতির একটি নিজস্ব ভাষা আছেÑ যে ভাষা মানুষে মানুষে সংযোগ তৈরি করে, মতভেদকে সভ্যতার কাঠামোর মধ্যে রাখে। আজ সেই ভাষা দ্রুত বদলে যাচ্ছে। এই পরিবর্তন মুক্তির দিকে নয়, বরং আগ্রাসনের দিকে।
মিশেল ফুকো আমাদের শিখিয়েছেনÑ ভাষা নিরপেক্ষ নয়। ভাষা নিজেই ক্ষমতা উৎপাদন করে। কোন শব্দ ব্যবহার করা হচ্ছে, কীভাবে বলা হচ্ছেÑ এই সবকিছুই নির্ধারণ করে কে কথা বলার অধিকার পাবে, আর কে নীরব থাকবে। আজকের তরুণ রাজনৈতিক ভাষায় ‘খেয়ে ফেলব’, ‘মেরে ফেলব’, ‘কবর রচনা হবে’Ñ এই ধরনের শব্দ কেবল উত্তেজনার প্রকাশ নয়; এগুলো ভয় তৈরি করে, ক্ষমতার প্রদর্শনী করে। এই ভাষা যুক্তিকে সরিয়ে দিয়ে শরীরী হুমকিকে সামনে আনে।
এর ফলে রাজনীতি ‘নীতি ও কর্মসূচি’ থেকে সরে গিয়ে ‘ব্যক্তি ও পরিচয়’-কেন্দ্রিক হয়ে পড়ে। প্রতিপক্ষ আর রাজনৈতিক বিরোধী থাকে নাÑ সে হয়ে ওঠে শত্রু। ফুকো যাকে বলেছিলেন exclusionary discourseÑ যেখানে ভিন্নমতকে আলোচনার বাইরে ঠেলে দেওয়া হয়। এর সরাসরি ফল হলোÑ সাধারণ মানুষের ভয়। মানুষ ভাবতে শুরু করে, ‘আমি যদি প্রশ্ন করি, আমি কি বিপদে পড়ব?’ এই ভয় গণতন্ত্রের সবচেয়ে নীরব হত্যাকারী।
এই ভাষাগত আগ্রাসনের ছায়া আমরা সংস্কৃতিতেও দেখছি। একসময় নাটকের ভাষায় ছিল সংযম, ইঙ্গিত, সূক্ষ্ম আবেগ। এখন সেখানে জায়গা নিচ্ছে অশ্লীলতা ও চিৎকার। অথচ পুরনো নাটকের সংলাপ এখনও মানুষের মনে দাগ কাটেÑ কারণ সেখানে ভাষা ছিল মানবিক। রাজনীতির ভাষার ক্ষেত্রেও একই সত্য প্রযোজ্য। হান্না আরেন্ট বলেছিলেন, রাজনীতির আসল শক্তি সহিংসতায় নয়, বরং action and speech-এ-মানুষের একসঙ্গে কথা বলা ও কাজ করার ক্ষমতায়। যখন ভাষা হিংস্র হয়ে ওঠে, তখন রাজনীতি তার মানবিক চরিত্র হারায়। তখন রাজনীতি আর সমবেত কর্মের জায়গা থাকে না, তা হয়ে ওঠে ভয়ের মঞ্চ। আজকের তরুণ রাজনীতিতে এই ঝুঁকিটাই সবচেয়ে বড়।
এই বাঙালি একসময় নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসু, সূর্যসেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, মওলানা ভাসানী, তাজউদ্দীন আহমদ, মণি সিংহ, মোহাম্মদ ফরহাদের ভাষণে উজ্জীবিত হয়েছে। তাদের ভাষায় ছিল দৃঢ়তা, কিন্তু ছিল না উন্মত্ততা; ছিল প্রতিবাদ, কিন্তু ছিল না ভাষাগত নৈরাজ্য। সেই ঐতিহ্যের সঙ্গে আজকের ভাষার তুলনা করলে প্রশ্ন উঠতেই পারেÑ আমরা কোন উত্তরাধিকার বেছে নিচ্ছি?
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলোÑ এই তরুণরাই একদিন সংসদে জনগণের প্রতিনিধিত্ব করবে। সংসদ কেবল আইন প্রণয়নের জায়গা নয়; এটি রাজনৈতিক ভাষার সর্বোচ্চ মঞ্চ। যদি সেখানে হুমকি, গালাগালি ও অশালীনতার চর্চা প্রবেশ করে, তবে সংসদের মর্যাদা নয়, পুরো রাজনৈতিক সংস্কৃতিই ভেঙে পড়বে। তখন সংসদ আর গণতন্ত্রের প্রতীক থাকবে না, হয়ে উঠবে ক্ষমতার প্রদর্শনীর মঞ্চ।
এই পরিস্থিতিতে বাংলা একাডেমির ভাষাচর্চা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাঠক্রম, রাজনৈতিক দলের প্রশিক্ষণÑ সবকিছু নিয়েই নতুন করে ভাবতে হয়। আমরা কী ভাষা তৈরি করছি? কী ধরনের রাজনৈতিক মানুষ গড়ে তুলছি? ভাষা যদি আগ্রাসনের হাতিয়ার হয়, তবে রাজনীতি অবধারিতভাবেই ফ্যাসিবাদের দিকে এগোয়। এটাই ইতিহাসের নির্মম শিক্ষা।
সবশেষে একটি কথাই মনে করিয়ে দিতে চাইÑ বাঘের পিঠে চড়ে কুমির শিকার করাকে রাজনৈতিক প্রজ্ঞা বলা যায় না। ভাষা যখন সংযম হারায়, তখন শক্তি নিজের দিকেই ফিরে আসে। আর রাজনীতি তখন আর মুক্তির পথ থাকে নাÑ তা হয়ে ওঠে ভয় ও আধিপত্যের কারাগার।
হাবীব ইমন
কলাম লেখক ও সংগঠক