নির্বাচনি সহিংসতা
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১৩:৩০ পিএম
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগে ও পরে দেশের বিভিন্ন স্থানে সহিংসতার ঘটনা ঘটছে। খুন, ধর্ষণ, হত্যাচেষ্টাসহ নানান অপরাধের খবর আসছে সংবাদ মাধ্যমে। এর সঙ্গে নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণাকে কেন্দ্র করে সন্ত্রাসীদের পেশি আস্ফালন, দুর্বৃত্তদের দুর্বৃত্তপনা, গুপ্তহত্যার ছক, মাদক কারবারিদের সক্রিয়তা, কিশোর গ্যাংয়ের উত্থানের খবরও আমরা লক্ষ করছি। এসব খবর রীতিমতো উদ্বেগের। সেই সঙ্গে সাধারণ ভোটারদের জন্য শঙ্কার। গত এক সপ্তাহে দেশের বিভিন্ন স্থানে যেভাবে সংঘাত-সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে তা নির্বাচনী পরিবেশের স্বাভাবিকতাও নষ্ট করছে। কারণ এসব সংঘর্ষে প্রাণহানির মতো উদ্বেগজনক ঘটনাও ঘটেছে। আশঙ্কার কথা, এসব সংঘর্ষ-সহিংসতা ঠেকাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনীর সদস্যদের দায়িত্বশীল ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। একইভাবে রাজনৈতিক দলগুলো যে ভাষা ও ভঙ্গি প্রতিদ্বন্দ্বীদের প্রতি ব্যবহার করছে তাও উত্তেজনা ছড়াচ্ছে।
মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের (এমএসএফ) জানুয়ারি মাসের মানবাধিকার বিষয়ক প্রতিবেদনেও বাংলাদেশের নির্বাচনী প্রক্রিয়া ঘিরে সহিংসতা ও প্রাণহানির ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। সংগঠনটির তথ্য বিশ্লেষণ করে প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ ‘নির্বাচনী সহিংসতা ক্রমেই প্রাণঘাতী রূপ নিচ্ছে’ শিরোনামের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘ডিসেম্বরের তুলনায় জানুয়ারি মাসে রাজনৈতিক সহিংসতায় আহতের সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।’ যেখানে ডিসেম্বর মাসে নিহত হয়েছিলেন ১ জন, সেখানে জানুয়ারিতে সহিংসতায় নিহতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪ জনে। এমএসএফের তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারিতে গণপিটুনির ২৮টি ঘটনায় নিহত হয়েছেন ২১ জন, যেখানে ডিসেম্বরে ২৪টি ঘটনায় নিহতের সংখ্যা ছিল ১০ জন, অর্থাৎ এক মাসের ব্যবধানে নিহতের সংখ্যা বেড়েছে দ্বিগুণেরও বেশি। জানুয়ারিতে ৫৭টি অজ্ঞাতনামা লাশ উদ্ধার করা হয়েছে, অন্যদিকে ডিসেম্বরে এ সংখ্যা ছিল ৪৮। এ ছাড়া ডিসেম্বরে কারা হেফাজতে ৯ জনের মৃত্যু হলেও জানুয়ারিতে তা বেড়ে ১৫ জনে দাঁড়িয়েছে। সেই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হেফাজতে ২ জনের মৃত্যু ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে গোলাগুলিতে ১ জন নিহত হয়েছেন।
শুধু এমএসএফের তথ্যই নয়, মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) গত মাসে প্রকাশিত প্রতিবেদনেও একই ধরনের চিত্র উঠে এসেছে। সংগঠনটির তথ্যে জানা যায়, ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নির্বাচনী সহিংসতার ৫৪টি ঘটনায় ৩ জন নিহত এবং ৪৯৪ জন আহত হয়েছেন।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনী সমন্বিত সেল গঠন করলেও সহিংসতামুক্ত ভোটের জন্য রাজনৈতিক দলগুলোর সদিচ্ছা ও সহনশীল আচরণ অপরিহার্য। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের সময় এগিয়ে আসছে। হাতে দুই সপ্তাহেরও কম সময়। এ সময়ের মধ্যে যদি নির্বাচনী পরিবেশ স্বাভাবিক না থাকে, তাহলে মানুষের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করবেÑ যা স্বাভাবিক নির্বাচন অনুষ্ঠানের পথে প্রতিবন্ধক হয়ে উঠতে পারে। এজন্য সহিংসতা রোধে সরকারের আরও বেশি উদ্যোগ জরুরি। নির্বাচনী পরিবেশ যদি সুষ্ঠু না থাকে, ভোটারদের মনে যদি শঙ্কা থাকে, সে দায় এড়ানোর সুযোগ কারও নেই। এক্ষেত্রে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে লেভেল প্লেয়িং মাঠ তৈরিতে নির্বাচন কমিশনকেই প্রধান ভূমিকা পালন করতে হবে। তাদের দায়িত্ব শুধু রেফারির নয়, কমিশনকে প্রশাসকের ভূমিকাও পালন করতে হবে। অন্যথায় সহিংসতামুক্ত গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের আশা দুরাশায় পরিণত হতে পারে। আমরা মনে করি, একই সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রার্থীদেরও সচেতনতা ও আন্তরিকতা জরুরি। কারও দ্বারা যেন নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘিত না হয়, তা যেমন রাজনৈতিক দল এবং প্রার্থীদের নিশ্চিত করতে হবে, তেমনি কারও দ্বারা নির্বাচনী আচরণবিধির বাইরে যেকোনো ধরনের কর্মকাণ্ড সংঘটিত হলে, নির্বাচন কমিশনকে তাৎক্ষণিক ও কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। যদি নির্বাচন ঘিরে সংঘাত-সহিংসতার মাত্রা কমিয়ে আনা না যায়, মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্যানুযায়ী আমরা জানুয়ারি মাসের যে চিত্র দেখেছি, সেখানে যদি রাশ টানা না যায়, তবে তা শুধু রাজনৈতিক ও নির্বাচনী সহিংসতা বাড়াবেই না, বরং ক্রমেই প্রাণঘাতী রূপও নিতে পারেÑ যা দেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলবে।
দীর্ঘ সময় দেশের মানুষ গণতান্ত্রিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছে। তাদের কাছ থেকে ভোটের অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। জুলাই অভ্যুত্থানের মাধ্যমে মানুষ সেই অবরুদ্ধ-অন্ধকারের জাল কেটে বেরিয়ে এসেছে। একটি উৎসবমুখর, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে সাধারণ মানুষ ভোট দেওয়ার জন্য উন্মুখ। তাদের সেই আকাঙ্ক্ষার পূর্ণতা দিতে নির্বাচন কমিশন, রাজনৈতিক দল এবং প্রার্থীদের আন্তরিকতাও জরুরি। আমরা মনে করি, সকলের সম্মিলিত প্রয়াসেই নিশ্চিত হবে পরিচ্ছন্ন ও স্বচ্ছ নির্বাচনী পরিবেশ। যেখানে ভোটাধিকার প্রয়োগের মাধ্যমে সম্ভব হবে প্রত্যাশিত স্থিতিশীল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা।