× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

আমলাতন্ত্র

জগদ্দল পাথর ও অসহায় নাগরিক

ফসিহ উদ্দীন মাহতাব

প্রকাশ : ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১৩:২১ পিএম

জগদ্দল পাথর ও অসহায় নাগরিক

রাষ্ট্রযন্ত্রের ভেতরের সংকট সাধারণত মন্ত্রিসভার বৈঠক, নীতিপত্র কিংবা প্রশাসনিক ভাষার জটিলতায় ঢাকা পড়ে থাকে। কিন্তু কখনও কখনও ক্ষমতার ভেতর থেকেই এমন কিছু কথা উচ্চারিত হয়, যা নাগরিক ক্ষোভের নগ্ন বাস্তবতাকে হুবহু তুলে ধরে। সম্প্রতি সড়ক পরিবহন ও সেতু উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খানের বক্তব্য তেমনই এক অনুচ্চারিত সত্যের প্রকাশ। তিনি যখন বলেন, ‘আমলাতন্ত্র একটি জগদ্দল পাথরের মতো হয়ে দাঁড়িয়েছে, এটা জনগণের বুকে চেপে বসে আছে’Ñ তখন সেটি কেবল ব্যক্তিগত হতাশা নয়, বরং রাষ্ট্রের সঙ্গে সাধারণ মানুষের দীর্ঘদিনের দূরত্বেরই প্রতিধ্বনি। এই বক্তব্যে শাসক ও শাসিতের মধ্যকার সম্পর্কের এক নির্মম বাস্তবতা উঠে এসেছে, যেখানে নাগরিক সেবা নয়, বরং নাগরিকের ভোগান্তিই যেন প্রশাসনিক ব্যবস্থার স্বাভাবিক ফলাফল।

বাংলাদেশের আমলাতন্ত্র ঐতিহাসিকভাবে ঔপনিবেশিক কাঠামো থেকে উৎসারিত। ব্রিটিশ শাসনামলে এই প্রশাসনিক কাঠামোর লক্ষ্য ছিল জনগণকে শাসন করা, সেবা দেওয়া নয়। স্বাধীনতার অর্ধশতক পরেও সেই মানসিকতার মৌলিক পরিবর্তন ঘটেনিÑ এটাই ফাওজুল কবির খানের বক্তব্যে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ইঙ্গিত। তিনি নিজেও একজন সাবেক সচিব হওয়ায়, এই সমালোচনা আরও বেশি গুরুত্ব বহন করে। উপদেষ্টার বক্তব্যে যে ক্ষোভটি সবচেয়ে বেশি আলোড়ন তুলেছে, তা হলো সচিবালয়কেন্দ্রিক জনরোষের প্রসঙ্গ। মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে বিমান দুর্ঘটনার মতো মর্মান্তিক ঘটনার প্রেক্ষাপটে একজন উপদেষ্টার মন্তব্যÑ ‘বিমানটি সচিবালয়ের ওপর পড়া উচিত ছিল’ (২৮ জানুয়ারি, প্রতিদিনের বাংলাদেশ) রাষ্ট্রের জন্য ভয়াবহ সতর্কবার্তা। এটি কোনো বিচ্ছিন্ন উক্তি নয়; বরং দীর্ঘদিনের বঞ্চনা, অব্যবস্থা ও অবহেলার জমে ওঠা ক্ষোভের বিস্ফোরণ।

প্রশ্ন জাগতে পারে, এই ক্ষোভের উৎস কোথায়? উপদেষ্টার বক্তব্যেই এর উত্তর মেলে, ‘আমলারা অফিসে আসেন, গাড়িতে ওঠেন, সভা করেন, চিঠি চালাচালি করেন কিন্তু মানুষের জীবনের বাস্তব সমস্যার সঙ্গে তাদের কোনো সংযোগ নেই।’ এই বর্ণনা শুনতে কঠোর মনে হলেও নাগরিক অভিজ্ঞতার সঙ্গে আশ্চর্যজনকভাবে মিলে যায়। ভূমি অফিস, বিআরটিএ, বিদ্যুৎ, গ্যাস, সিটি করপোরেশনÑ প্রায় সব সেবাদানকারী দপ্তরেই সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতা প্রায় একই : ফাইল আটকে থাকে, সিদ্ধান্ত ঝুলে থাকে, আর শেষ পর্যন্ত ‘তদবির’ কিংবা ‘অতিরিক্ত খরচ’ ছাড়া কাজ এগোয় না।

ফাওজুল কবির খানের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগ হলো নীতিনির্ধারণে আমলাতন্ত্রের অনীহা। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, ‘সড়ক নীতিমালা প্রণয়নের দিকনির্দেশনা নিজে বোর্ডে বসে বুঝিয়ে দেওয়ার পরও তা বাস্তবায়ন হয়নি। কারণ পরিবর্তন হলে সুবিধা কমবে এই ভয়।’ এখানেই আমলাতন্ত্রের কাঠামোগত সংকটটি প্রকট হয়ে ওঠে। একটি প্রশাসনিক ব্যবস্থা যদি সংস্কারের বদলে নিজের সুযোগ-সুবিধা রক্ষাকেই প্রধান লক্ষ্য বানায়, তবে সেই ব্যবস্থা জনগণের উন্নয়নের অন্তরায় হয়ে দাঁড়ানো অনিবার্য।

উপদেষ্টা দুর্নীতির সুযোগ বৃদ্ধির অভিযোগও তুলেছেন, যা সাধারণত সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা প্রকাশ্যে বলেন না। এই বক্তব্য রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল হলেও বাস্তবতাকে অস্বীকার করার সুযোগ নেই। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের প্রতিবেদনগুলো বারবার দেখিয়েছে, প্রশাসনিক দুর্নীতিই দেশের উন্নয়নের অন্যতম বড় বাধা।

তবে এই বক্তব্যের আরেকটি দিকও গুরুত্বপূর্ণ। উপদেষ্টা নিজেই স্বীকার করেছেনÑ এই সরকারের মেয়াদ আর মাত্র ১৫ দিন। অর্থাৎ তিনি এমন এক সময়ে এসব কথা বলছেন, যখন ক্ষমতার দায় কমে আসছে। প্রশ্ন হলো, এই সত্যগুলো এতদিন কেন চাপা ছিল? আমলাতন্ত্রের এই চরিত্র কি হঠাৎ তৈরি হয়েছে, নাকি দীর্ঘদিনের প্রশ্রয়ে শক্তিশালী হয়েছে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে রাজনৈতিক নেতৃত্বের ভূমিকাও আলোচনায় আসবে।

কারণ আমলাতন্ত্র কখনও একা ক্ষমতাবান হয় না। রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া তারা এতটা প্রভাবশালী হয়ে উঠতে পারে না। বহু সময় রাজনীতিকরাই প্রশাসনিক জটিলতাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেন নিজেদের ব্যর্থতা আড়াল করতে। ফলে আমলাতন্ত্র ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের মধ্যে একধরনের পারস্পরিক নির্ভরতার সম্পর্ক গড়ে ওঠে, যার মূল্য দিতে হয় সাধারণ মানুষকে।

চালকদের প্রশিক্ষণ ও শাস্তির প্রসঙ্গে উপদেষ্টার বক্তব্যও একই বাস্তবতার দিকে ইঙ্গিত করে। আইন আছে, শাস্তির বিধান আছে কিন্তু শিক্ষা ও সচেতনতা ছাড়া আইন প্রয়োগ ন্যায়সংগত হতে পারে না। এই যুক্তি শুধু পরিবহন খাতেই নয়, পুরো রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। নিয়ম চাপিয়ে দেওয়া যায়, কিন্তু আস্থা তৈরি না হলে শৃঙ্খলা আসে না। ফাওজুল কবির খানের বক্তব্য তাই শুধু আমলাতন্ত্রের সমালোচনা নয়; এটি রাষ্ট্রের কাঠামোগত সংকটের একটি খোলা স্বীকারোক্তি। প্রশ্ন হলো, এই স্বীকারোক্তি কি কোনো পরিবর্তনের সূচনা করবে, নাকি আরেকটি সংবাদ হয়ে ফাইলের স্তূপে হারিয়ে যাবে?

বাংলাদেশের নাগরিকরা আর বক্তৃতা কিংবা দোষারোপের রাজনীতি দেখতে চায় না। তারা চায় কার্যকর সেবা, জবাবদিহি এবং মানবিক প্রশাসন। আমলাতন্ত্র যদি সত্যিই জনগণের বুকে চেপে বসে থাকে, তবে সেই জগদ্দল পাথর সরানোর দায় শুধু আমলাদের নয়, রাষ্ট্রের পুরো রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার। এই দায় স্বীকার না করলে ক্ষোভ আরও গভীর হবে। আর সেই ক্ষোভ এক দিন ভাষার সীমা পেরিয়ে রাষ্ট্রের জন্য বড় সংকট হয়ে দাঁড়াতে পারে, যার দায় তখন কেউই এড়াতে পারবে না।


ফসিহ উদ্দীন মাহতাব 

সাংবাদিক

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা