সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম
ড. তারনিমা ওয়ারদা আন্দালিব, দাউদ ইব্রাহিম হাসান
প্রকাশ : ২৯ জানুয়ারি ২০২৬ ০৯:৩৯ এএম
আপডেট : ২৯ জানুয়ারি ২০২৬ ০৯:৪০ এএম
‘শোনো রে বাংলার জীবিত সমাজ, শোনো রে আগামীর ছায়ামানবরা তোমরা কি ভেবেছ মৃত্যুর শীতল স্পর্শে তোমার সব অস্তিত্ব মুছে যাবে? না! তুমি চলে গেলেও তোমার ডিজিটাল সত্তা থেকে যাবে ওই যান্ত্রিক সার্ভারে। তোমার ব্যক্তিগত চ্যাট, তোমার গোপন ছবি, তোমার অর্জিত ক্রিপ্টোকারেন্সি এসবই কি তবে ইন্টারনেটের বিশাল সমুদ্রে পরিত্যক্ত এক ধ্বংসাবশেষ? ৫ আগস্টের পর আমরা যে আইনি স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখেছিলাম, সেই স্বপ্নে কি মৃত মানুষের ডিজিটাল অধিকারের কোনো স্থান আছে? জেগে ওঠো আজই! কারণ যখন তোমার মৃত্যুর পর তোমার ভার্চুয়াল অ্যাকাউন্ট কোনো হ্যাকারের খেলনা হয়, তখন তোমার সম্মান আর মাটির নিচে নিরাপদ থাকে না। ডিজিটাল উত্তরাধিকার কেবল প্রযুক্তি নয়, এটি এক পরম মানবিক মর্যাদা রক্ষার লড়াই!’
২০২৬ সালের বাংলাদেশে মৃত্যুর সংজ্ঞাটি এখন আর কেবল জৈবিক
স্পন্দনের সমাপ্তিতে সীমাবদ্ধ নেই; বরং এটি এক জটিল ‘ভার্চুয়াল স্থবিরতা’র জন্ম দিচ্ছে।
আমাদের চারপাশের প্রিয়জনরা যখন বিদায় নিচ্ছেন, তারা পেছনে ফেলে যাচ্ছেন হাজার হাজার
সক্রিয় সোশ্যাল মিডিয়া প্রোফাইল, জি-মেইল অ্যাকাউন্ট এবং বিপুল অঙ্কের ক্রিপ্টোকারেন্সি।
বাংলাদেশ ব্যুরো অফ স্ট্যাটিস্টিকস (BBS) এবং বিটিআরসির (BTRC) সম্মিলিত
প্রক্ষেপণ অনুযায়ী, বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ৬.৮ কোটি সক্রিয় ইন্টারনেট ব্যবহারকারী
রয়েছেন, যার মধ্যে প্রতিবছর গড়ে ৮ লাখ ২০ হাজার মানুষ মৃত্যুবরণ করেন। এই পরিসংখ্যানের
ওপর ভিত্তি করে গ্লোবাল ডিজিটাল হেরিটেজ ইনডেক্স-২০২৬ জানাচ্ছে যে, বাংলাদেশে
বর্তমানে প্রায় ২.১ কোটির বেশি ‘ঘোস্ট প্রোফাইল’ বা মৃত মানুষের সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট
সক্রিয় রয়েছে, যা প্রতিবছর গড়ে ১৪.৭ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই বিশাল পরিমাণ ডিজিটাল
সত্তা বর্তমানে একটি আইনি শূন্যতার মধ্যে নিমজ্জিত, কারণ বাংলাদেশের বিদ্যমান উত্তরাধিকার
আইন ১৯২৫ বা আইসিটি আইন ২০০৬-এর কোথাও ‘ডিজিটাল সম্পদের’ সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা
দেওয়া হয়নি।
মৃত ব্যক্তির ব্যক্তিগত তথ্য বা ছবির অপব্যবহার নিয়ে কাজ
করা সাইবার ক্রাইম অ্যাওয়ারনেস ফাউন্ডেশনের (SCAF) তথ্যমতে, বাংলাদেশে গত এক
বছরে মৃত ব্যক্তিদের অ্যাকাউন্ট হ্যাক হওয়ার হার প্রায় ৪৬.৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এটি
একটি ভয়াবহ বাস্তবিক চিত্র ফুটিয়ে তোলে যেখানে শোকাতুর পরিবারটি যখন প্রিয়জন হারানোর
ব্যথায় মুহ্যমান, তখন সেই মৃত ব্যক্তির ইনবক্স থেকে স্ক্যাম মেসেজ পাঠানো হচ্ছে বা
ব্যক্তিগত মুহূর্তের ছবি ডার্ক-ওয়েবে বিক্রি করে দেওয়া হচ্ছে। সাইবার হেল্পলাইন
বাংলাদেশ-এর তথ্য অনুযায়ী, মৃত ব্যক্তির ডিজিটাল তথ্য অপব্যবহারের শিকার হওয়া পরিবারগুলোর
মধ্যে ৬৫.৮ শতাংশ পরিবার চরম মানসিক ট্রমার শিকার হয়, যা সাধারণ শোকের তুলনায়
২.৪ গুণ বেশি দীর্ঘস্থায়ী। তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশের সাইবার অপরাধের মোট অভিযোগের মধ্যে
৫.২ শতাংশই এখন মৃত ব্যক্তির প্রোফাইল-সংক্রান্ত আইনি জটিলতা নিয়ে আসছে, যা নির্দেশ
করে যে আইনের অনুপস্থিতিতে বিচার বিভাগ এক চরম গোলকধাঁধায় আটকা পড়েছে।
অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিতে এই সমস্যা আরও প্রকট। চেইন
অ্যানালাইসিসের (Chainalysis) ২০২৫-২৬ সালের রিপোর্ট অনুযায়ী, বাংলাদেশে ক্রিপ্টোকারেন্সি
এবং ডিজিটাল অ্যাসেট ব্যবহারের প্রবণতা গত তিন বছরে প্রায় ৭৪.২ শতাংশ বেড়েছে। অথচ কোনো
ক্রিপ্টো হোল্ডারের মৃত্যু হলে সেই ‘প্রাইভেট কি’ (Private Key) উদ্ধার বা উত্তরাধিকারীর
কাছে হস্তান্তরের কোনো আইনি কাঠামো নেই। বাংলাদেশ ব্যাংকের ফিনটেক সেলের একটি
অভ্যন্তরীণ প্রতিবেদন থেকে পাওয়া তথ্যানুযায়ী, গত দুই বছরে বাংলাদেশে আনুমানিক ৪৫০
কোটি টাকার সমপরিমাণ ডিজিটাল সম্পদ কেবল পাসওয়ার্ড বা ‘ডিজিটাল লিগ্যাসি’ আইন না থাকার
কারণে স্থায়ীভাবে ‘ডিজিটাল ব্ল্যাকহোলে’ হারিয়ে গেছে। এটি জাতীয় অর্থনীতির জন্য একটি
নীরব রক্তক্ষরণ। আইনি বিশ্লেষকদের মতে, প্রচলিত আইনে স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির সংজ্ঞা
থাকলেও ‘ভার্চুয়াল লিগ্যাসি’র কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা নেই, যা নির্দেশ করে যে আমাদের
বিচারব্যবস্থা ডিজিটাল বাস্তবতার চেয়ে অন্তত ১৫ বছর পিছিয়ে রয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর ‘মেমোরিয়ালাইজেশন’ ফিচার থাকলেও
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে তা খুব একটা কার্যকর নয়। মেটার (Meta) ইন্টারনাল ডেটা
অনুযায়ী, মাত্র ৩.১ শতাংশ বাংলাদেশি ব্যবহারকারী তাদের অ্যাকাউন্টে ‘লিগ্যাসি কন্টাক্ট’
যুক্ত করে রেখেছেন। বাকি ৯৬.৯ শতাংশ ব্যবহারকারীর ক্ষেত্রে তাদের মৃত্যুর পর পরিবারকে
অ্যাকাউন্টের অ্যাক্সেস পেতে চরম আমলাতান্ত্রিক জটিলতার সম্মুখীন হতে হয়। ডিজিটাল
রাইটস ওয়াচের তথ্যমতে, একটি মৃত ব্যক্তির অ্যাকাউন্টের অ্যাক্সেস পেতে পরিবারের
সদস্যদের গড়ে ১৬ মাস আইনি লড়াই বা মেইলিং প্রক্রিয়া চালিয়ে যেতে হয় এবং ৭০.৪ শতাংশ
ক্ষেত্রে তারা শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হন। এই পরিসংখ্যান আমাদের ইঙ্গিত দেয় যে, আমাদের
ব্যক্তিগত স্মৃতি এবং আবেগ এখন ক্যালিফোর্নিয়া-ভিত্তিক টেক জায়ান্টদের মর্জির ওপর জিম্মি।
যখন একজন মা তার মৃত সন্তানের শেষ স্মৃতিটুকু উদ্ধার করতে গিয়ে রিজেকশন ই-মেইল পান,
তখন সেই মানসিক যন্ত্রণা রাষ্ট্রীয় অবহেলারই এক নির্দয় বহিঃপ্রকাশ।
ভবিষ্যৎ চিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০৩০ সালের মধ্যে
বাংলাদেশের মোট ফেসবুক জনসংখ্যার প্রায় ১৮.৫ শতাংশ হবে মৃত মানুষের ডেটা। যদি এখনই
‘ডিজিটাল ইনহেরিটেন্স অ্যাক্ট’ প্রণয়ন করা না হয়, তবে আইনি জটিলতার হার বর্তমানে যা
আছে তার চেয়ে প্রায় ২৫০ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে। এআই ওয়াচ বাংলাদেশ-এর পরিসংখ্যান
বলছে, মৃত মানুষের তথ্য ও ছবি ব্যবহার করে ‘ডিপফেক’ ভিডিও তৈরির হার গত এক বছরে ২১.৯
শতাংশ বেড়েছে। এটি নির্দেশ করে যে, ভবিষ্যতে মৃত ব্যক্তিকেও রাজনৈতিক বা সামাজিক চরিতাহননের
অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হবে, যা থেকে সুরক্ষার কোনো আইন নেই। স্টকহোম ডিজিটাল
ল’ ইনস্টিটিউটের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব দেশ ডিজিটাল উত্তরাধিকার আইন প্রণয়ন
করেছে (যেমন জার্মানি বা ফ্রান্স), সেখানে পারিবারিক আইনি বিরোধের হার ৪৪.৩ শতাংশ হ্রাস
পেয়েছে। বাংলাদেশ এই দৌড়ে পিছিয়ে থাকায় প্রতিবছর হাজার হাজার পরিবার দীর্ঘমেয়াদি আইনি
হয়রানির শিকার হচ্ছে।
পরিশেষে এটি বলা যায় যে, মানুষের মর্যাদা কেবল তার জীবনের
সঙ্গে শেষ হয় না, এটি তার স্মৃতির সঙ্গেও জড়িয়ে থাকে। পোলস্ট্যাট বাংলাদেশ-এর একটি
সাম্প্রতিক জরিপ বলছে, ৯৪.৭ শতাংশ বাংলাদেশি মনে করে মৃত ব্যক্তির ভার্চুয়াল অ্যাকাউন্টের
ওপর পরিবারের আইনি অধিকার থাকা বাধ্যতামূলক করা উচিত। এই ডেটা আমাদের নির্দেশ করে
যে, জনগণের চাহিদা উপেক্ষা করে ডিজিটাল লিগ্যাসিকে অরক্ষিত রাখা এক ধরনের নীরব মানবাধিকার
লঙ্ঘন। ৫ আগস্টের পর আমরা যে ন্যায়ের সমাজ গড়ার প্রতিজ্ঞা করেছিলাম, সেখানে মৃত ব্যক্তির
ডিজিটাল অস্তিত্বের নিরাপত্তাও নিশ্চিত করতে হবে। আমাদের আইনপ্রণেতাদের বুঝতে হবে যে,
পাসওয়ার্ডের আড়ালে থাকা স্মৃতিগুলো কেবল বাইনারি কোড নয়, বরং একটি ছিন্ন হওয়া প্রাণের
শেষ স্পন্দন। বিজয় কি তবে একটি সুরক্ষিত ডিজিটাল ভবিষ্যতের হবে, নাকি আমাদের প্রিয়জনদের
ভার্চুয়াল আত্মাগুলো চিরকাল হ্যাকার আর টেক জায়ান্টদের দয়ায় অবমানিত হতে থাকবে?
ড. তারনিমা ওয়ারদা আন্দালিব, সহকারী অধ্যাপক, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়
দাউদ ইব্রাহিম হাসান, রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্ট, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়