বন্ধ হোক শিশুশ্রম
মতিলাল দেব রায়
প্রকাশ : ২৯ জানুয়ারি ২০২৬ ০৯:২৬ এএম
শৈশব মানে আনন্দ, স্বপ্ন আর সম্ভাবনার এক দিগন্ত। কিন্তু সেই শৈশব যখন ভেঙে যায় ইটভাটা, কারখানা কিংবা ক্ষতিকর পরিবেশে ঝুঁকিপূর্ণ কাজে, তখন এটি শুধু লজ্জাই নয়, ভবিষ্যতের জন্য বড় হুমকিও। বাংলাদেশসহ বিশ্বের বহু দেশে শিশুশ্রম একটি গভীর সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। দারিদ্র্য, অশিক্ষা ও সামাজিক অসচেতনতার চক্রে আটকেপড়া শিশুরা তাদের শৈশব হারিয়ে ফেলে। জাতীয় উন্নয়নের ভিত্তি শিশুদের সুরক্ষা হলেও তাদের অধিকারের প্রতি এই চরম অবহেলা আজ বড় প্রশ্ন তোলে। বাংলাদেশে লাখ লাখ শিশু তাদের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময় কাটাচ্ছে কঠিন শ্রমে।
আজকের শিশু আগামী
দিনের ভবিষ্যৎ। এটা চিরন্তন সত্য উচ্চারণ, কিন্তু বাস্তবতায় আমাদের চারপাশেই হাজারো
শিশু সেই ভবিষ্যৎ হারিয়ে ফেলছে জীবিকার কঠিন সংগ্রামে। কলকারখানা, ইটভাটা, হোটেল-রেস্তোরাঁ,
গ্যারেজ, কৃষিক্ষেত কিংবা গৃহকর্মÑ সবখানেই শিশুশ্রমিকের উপস্থিতি এখন আর অস্বাভাবিক
নয়। সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো, এই শিশুরা শুধু শ্রমই দিচ্ছে না, তারা পাচ্ছে না ন্যায্য
মজুরি, পাচ্ছে না নিরাপত্তা, শিক্ষা কিংবা মানবিক আচরণ। উপেক্ষিত এই শিশুশ্রমিকের ন্যায্য
মজুরি নিশ্চিত করা আজ রাষ্ট্র ও সমাজের এক অনিবার্য দায়িত্ব। পরিবারের দারিদ্র্য, শিক্ষার
সুযোগের অভাব এবং অস্থির অর্থনৈতিক পরিস্থিতি শিশুদের শ্রমে ঠেলে দেয়। আমরা শিশুশ্রম
বলতে শিশুদের দ্বারা করা সেইসব কাজকে বোঝানো হয়, যা তাদের শৈশব কেড়ে নেয়, শিক্ষা,
স্বাস্থ্য ও বিকাশে বাধা দেয় এবং প্রায়শই বিপজ্জনক ও শোষণমূলক হয়। আইএলও তথ্য অনুযায়ী ১৪ বছরের
কম বয়সীদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ কাজ নিষিদ্ধ। এটি বাংলাদেশসহ বিশ্বজুড়ে একটি গভীর সমস্যা,
যার বিরুদ্ধে সচেতনতা ও আইন প্রয়োগ জরুরি।
জাতীয় শিশুশ্রম
সর্বশেষ জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশে
প্রায় ৩৫.৪ লাখ শিশুশ্রমে যুক্ত। যার মধ্যে প্রায় ১১ লাখ শিশু ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত।
২০.৯ লাখ শিশু গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করে। কয়েক লাখ শিশু শ্রমিকের কাজ করছেÑ এটি
শুধু সংখ্যা নয়, একটি সামাজিক বাস্তবতা যেখানে শিশুদের অধিকাংশই জরুরি নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা
বা শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত। এদের এক বড় অংশ অনানুষ্ঠানিক খাতগুলোতে কাজ করছে, যেখানে
শ্রমিক হিসেবে শিল্প বা সেবা খাতে কাজ করলেও সাধারণত কোনো আইনি সুরক্ষা বা বেতন-কাঠামো
নেই, যা তাদের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক। ঝুঁকিপূর্ণ কাজের সংখ্যা
লক্ষ করে দেখা যায়, শিশুদের মধ্যে প্রায় ৬০% এমন খাতে যুক্ত, যারা তাদের শারীরিক ও
মানসিক বিকাশে মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে। গড়ে ৬, ৬০০ টাকার মাসিক আয় দিয়ে কোনো শিশুই
নিরাপদ, স্বাস্থ্যসম্মত জীবন নিশ্চিত করতে পারে না। এটি সুস্পষ্টভাবে ন্যায্য মজুরি
ব্যবস্থার অভাব প্রকাশ করে। একজন শিশু কাজ করছে মানে সে একই সময়ে তার শিক্ষা ও স্বাভাবিক
শিশুকালের আনন্দ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
এ কথা সত্য যে,
বাংলাদেশের অর্থনীতির মানদণ্ডে দারিদ্র্য, বেকারত্ব, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, অভিভাবকের
অসুস্থতা কিংবা পরিবার ভাঙনের কারণে শিশুরা খুব অল্প বয়সেই শ্রমে যুক্ত হতে বাধ্য হয়।
অনেক ক্ষেত্রে এটি কোনো পছন্দ নয়, বরং বেঁচে থাকার তাগিদ। অথচ এই বাধ্যতামূলক শ্রমের
বিনিময়ে তারা যে মজুরি পায়, তা প্রাপ্তবয়স্ক শ্রমিকের তুলনায় অনেক কম, কখনও কখনও নামমাত্র।
মাসের পর মাস কাজ করেও যে অর্থ তারা আয় করে, তা দিয়ে ন্যূনতম জীবনযাপনও সম্ভব হয় না।
শিশুশ্রম আইনত
নিষিদ্ধ। বাংলাদেশে শ্রম আইন ও আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) সনদ অনুযায়ী ঝুঁকিপূর্ণ
কাজে শিশুশ্রম সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। কিন্তু বাস্তবতা হলো, আইন কাগজে-কলমে থাকলেও তার প্রয়োগ
কোথাও দেখা যায় না। যেসব খাতে শিশুশ্রম বেশি, সেগুলোর বড় অংশই অনানুষ্ঠানিক। ফলে সেখানে
নজরদারি কম, শ্রম পরিদর্শন নেই বললেই চলে। এই সুযোগেই মালিকপক্ষ শিশুশ্রমিককে কম মজুরি
দিয়ে বেশি সময় কাজ করিয়ে নেয়।
ন্যায্য মজুরি
না পাওয়ার ফলে শিশুশ্রমিকরা এক ধরনের চক্রবন্দি দারিদ্র্যের মধ্যে আটকে পড়ে। কম মজুরি
মানে অপুষ্টি, অসুস্থতা, শিক্ষা থেকে ঝরে পড়া এবং পরিণত বয়সেও দক্ষতা অর্জনের ব্যর্থতা।
এর ফলে তারা বড় হয়ে আবার স্বল্প মজুরির শ্রমিকেই পরিণত হয়। অর্থাৎ শিশুশ্রম ও ন্যায্য
মজুরি না পাওয়ার সমস্যা শুধু একটি বয়সের নয়, এটি প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলা বৈষম্যের
জন্ম দেয়।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ
প্রশ্ন শিশুশ্রম বন্ধের দাবির সঙ্গে, ন্যায্য মজুরির প্রশ্ন কেন? বাস্তবতা হলো, আদর্শ
পরিস্থিতিতে শিশুশ্রম বন্ধ হওয়াই কাম্য। কিন্তু যতদিন সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতায়
শিশুশ্রম পুরোপুরি নির্মূল করা সম্ভব না হচ্ছে, ততদিন অন্তত তাদের মানবিক মর্যাদা ও
ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করা জরুরি। ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করা মানে শিশুশ্রমকে বৈধতা
দেওয়া নয়; বরং শোষণ কমিয়ে এনে শিশুদের জীবনকে কিছুটা নিরাপদ করা।
ন্যায্য মজুরি
নিশ্চিত করতে হলে প্রথমত, প্রয়োজন কার্যকর রাষ্ট্রীয় নজরদারি। শ্রম পরিদর্শন ব্যবস্থাকে
শক্তিশালী করতে হবে, বিশেষ করে অনানুষ্ঠানিক খাতে। শিশু শ্রমিক নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান
ও ব্যক্তিদের তালিকা তৈরি করে নিয়মিত তদারকি জরুরি। মজুরি নির্ধারণে বয়সভিত্তিক বৈষম্য
কমাতে হবে। কাজ যদি একই হয়, তবে মজুরিও ন্যায্য হতে হবেÑ এটাই ন্যায়বিচারের মৌলিক নীতি।
শিশুশ্রমিকের
জন্য সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি জরুরি। শর্তসাপেক্ষ নগদ সহায়তা, বিনামূল্যে শিক্ষা,
স্বাস্থ্যসেবা ও পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত করা গেলে পরিবারগুলো শিশুশ্রমের ওপর নির্ভরতা
কমাতে পারবে। পাশাপাশি সন্ধ্যা বা আংশিক সময়ের শিক্ষাকার্যক্রম চালু করে শ্রমের পাশাপাশি
শিক্ষার সুযোগ তৈরি করা যেতে পারে।
আমরা মনে করি,
এই ধরনের পদক্ষেপে শুধু সরকার নয়, সমাজ ও ভোক্তাদেরও বড় ভূমিকা রয়েছে। আমরা যখন কম
দামে পণ্য বা সেবা চাই, তখন অজান্তেই শিশুশ্রম ও কম মজুরির সংস্কৃতিকে উৎসাহ দেই। নৈতিক
ভোক্তা আচরণ গড়ে তুলতে পারলে মালিকপক্ষও বাধ্য হবে মানবিক মানদণ্ড মানতে। গণমাধ্যম
ও নাগরিক সমাজকে আরও সোচ্চার হতে হবে, শিশুশ্রমিকের কণ্ঠস্বর তুলে ধরতে হবে। উন্নয়নের
মহাসড়কে হাঁটতে চাইলে আমাদের নিশ্চিত করতে হবেÑ কোনো শিশুর শৈশব যেন আর মজুরির বিনিময়ে
বিক্রি না হয়, আর যতদিন তারা শ্রমে বাধ্য থাকবে, ততদিন তাদের প্রাপ্য ন্যায্য মজুরি
ও মর্যাদা যেন নিশ্চিত হয়।
শিশুর প্রতি আমাদের
দায় শুধু সহানুভূতিতে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। নীতিনির্ধারণ, আইনের প্রয়োগ এবং সামাজিক
আচরণÑ সবখানেই পরিবর্তন আনতে হবে। উপেক্ষিত শিশুশ্রমিকের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করাই
হবে একটি মানবিক, ন্যায়ভিত্তিক ও দায়িত্বশীল রাষ্ট্র গঠনের প্রথম এবং অপরিহার্য পদক্ষেপ।
আমি মনে করি, শ্রমের সঠিক মূল্যের চেয়ে জরুরিÑ শিশুদের শ্রম থেকে মুক্তি। তাদের
ফিরিয়ে দিতে হবে দুরন্ত শৈশব, করে তুলতে হবে শিক্ষার আলোয়
আলোকিত। তাই বলবো, বন্ধ হোক শিশুশ্রম, ফিরে পাক দুরন্ত শৈশব।
মতিলাল দেব রায়
কলাম লেখক ও সমাজ সংগঠক