আমার কর্মস্থল রাঙ্গামাটি জেলার বেতবুনিয়ায়। তো প্রতিষ্ঠানটি পাহাড় ঘেরা ও সবুজ গাছ-গাছালিতে পূর্ণ। এখানে সেগুন, মেহগনি, রেনট্রি, দেবদারু, আম, কাঠাল, লিচু, ইউক্যালিপটাস, অ্যাকশিয়া আর স্বল্প সংখ্যক অন্যান্য বৃক্ষ ও ফলের গাছ রয়েছে। ভিতরের রাস্তার দু’ধারে সারি সারি দেবদারু গাছ রয়েছে। একটি দেবদারু গাছে আবার কিছু দিনের জন্য একটি মৌচাকও ছিলো এবং কিন্ডার গার্টেনের পাশে একটি ভিমরুলের চাক আছে। আমাদের কয়েকজন সদস্য ভিমরুলের চাকটিকে আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেয়ার জন্য মনস্থির করেছিলো। আমি জানার পর সে মহাপরিকল্পনা বন্ধ হয়। তো একদিন দেখলাম মৌচাক থেকে মৌমাছিরা চলে যাচ্ছে। মনে হয়েছিলো তারা যেন অভিমান করে আমাদের প্রতিষ্ঠান ছেড়ে চলে যাচ্ছে। যাহোক তাদের চলে যাওয়াতে আমি খুবই ব্যথিত হয়েছিলাম এবং দুঃখ পেয়েছিলাম। মৌচাকটি ধরে রাখার ঐকান্তিক ইচ্ছা ছিলো। কিন্ত হলো না, তাদেরকে রাখা গেল না। পরে চিন্তা আসলো মৌমাছিগুলো এখান থেকে কেন চলে গেল? তাদেরতো কেহ তো জ্বালাতন করছিলো না। অনেকদিন পরে আমার মাথায় সে উত্তরটি আসলো। বস্তুত: মৌমাছির খাদ্য মধু অর্থাৎ ফুলের মধু বা ফুল তৈরি হয় এমন গাছতো এখানে খুবই কম। বলতে গেলে এখানে পরিবেশ বান্ধব বৃক্ষের তুলনায় পরিবেশ অবান্ধব বৃক্ষের সংখ্যা বেশি। এখানে বর্তমানে থাকা বৃক্ষে তেমন কোন ফুল ও ফল হয় না, গাছগুলিতে ছড়ানো কোন শাখা-প্রশাখা হয় না এবং পাখিরা বাসা তৈরি করতে পারে না। তাহলে কেন মৌমাছি, পাখি, প্রজাপতি বা অন্যান্য কীটপতংগ এ পরিবেশে থাকবে, বাসা বাধবে এবং কিভাবে তারা বেঁচে থাকবে।
এখন আসা যাক হাইব্রিড ফুলের বিষয়ে: বাংলাদেশের ফুল, ফুলের চাষ ও ফুলের ব্যবসা আস্তে আস্তে বিদেশী ও হাইব্রিড ফুল দ্বারা প্রতিস্থাপিত হয়ে যাচ্ছে। এ সকল ফুলের চারি সীমানায় মৌঁমাছি, কোন পোকা-মাকড় বা প্রজাপতিকে দেখা যায় না। বড় সমস্যা হলো হাইব্রিড ফুলের বীজ সাধারণত: আমরা নিজেরা তৈরি করতে পারি না। এ বিষয়ে আমরা পুরাপুরি বিদেশীদের উপর নির্ভরশীল এবং এ ফুলের বীজের অধিকাংশই বিদেশ থেকে আমদানী করতে হয়। পাঠক আমি কিন্তু বিদেশী বা হাইব্রিড ফুল, ফল, ফসল, বৃক্ষ প্রভৃতির একেবারে বিরুদ্ধাচারণ করছি এমনটি নয়; আমার বক্তব্য বিদেশী ফুল, ফল, ফসল, বৃক্ষ এ দেশে চাষ করার পূর্বে সেগুলো এদেশের আবহাওয়া, জলবায়ু, মৃত্তিকা ও পরিবেশের সংগে খাপ খাওয়াতে পারবে কিনা? অথবা সেগুলো আমাদের পরিবেশ ও প্রতিবেশের উপর কোন প্রভাব ফেলবে কিনা এবং ক্ষতির কারণ কিনা, তা যাচাই-বাছাই এবং গবেষণা করে বের করতে হবে ও সে মোতাবেক সিদ্ধান্ত নিতে হবে; সেগুলো আমরা আমাদের দেশে চাষ করতে বা চালাতে পারি কিনা?
পরিবেশের উপর হাইব্রিড ফুলের ক্ষতিকর প্রভাব
সূত্র থেকে জানা যায়, অনেক জনপ্রিয় হাইব্রিড ফুল যেমন হাইব্রিড গোলাপ, গ্ল্যাডিওলাস প্রভূতি বাংলাদেশের জলবায়ুর উপযোগী নয়। বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুমে তাদের বৃদ্ধির জন্য ব্যাপক ও নিদৃষ্ঠ পরিমাণ পানির প্রয়োজন হয়। যার ফলে আমাদের চাষাবাদের পানীয় জলের এবং আমাদের ভূ-গর্ভস্থ জলের উপর তারা চাপ সৃষ্ঠি করে থাকে।
কেহ কেহ আবার বলছেন, হাইব্রিড ফুল দ্বারা আমাদের ব্যবসা জমজমাট হচ্ছে। কিন্তু আমরা এ জাতীয় ফুল চাষের মাধ্যমে আমাদের দেশীয় সংস্কৃতির ক্ষতি করছি; অপরের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছি এবং পরিবেশ ও প্রতিবেশের বড় ক্ষতি করে চলেছি। হাইব্রিড ফুলগুলি রঙ্গ, আকার এবং কোন অনুষ্ঠানকে উপলক্ষ্য করে চাষ করা হয়। আবার কখনও কখনও ফুলদানী সাজাতে ও শোভা বর্ধনের জন্যেও হাইব্রিড ফুল ব্যবহৃত হয়। এক্ষেত্রে মৌঁমাছি, প্রজাপতি, স্থানীয় পোকা-মাকড়, কীটপতংগ, উপকারী ব্যাকটেরিয়া ও ছত্রাকের কথা চিন্তা করা হয় না। এ ফুলগুলোতে অতিরিক্ত মাত্রায় কীটনাশক ও ছত্রাকনাশক স্প্রে করা হয়। যে কীটনাশক ও ছত্রাকনাশক ফুলের পাপড়ীতে বা পাতার উপর থাকে না। এগুলো মৃত্তিকার উপর পতিত হয় এবং পানির সাথে মিশে ভূ-গর্ভস্থ পানি ও জলাশয়ের পানিতে মিশে। ফলশ্রুতিতে মৃত্তিকার উপকারী অনুজীব, পোকা-মাকড় এবং জলজ প্রাণীর প্রভূত ক্ষতি হয়ে থাকে। তাছাড়া এ কীটনাশক ও ছত্রাকনাশক কৃষকদের জন্য স্বাস্থ্য ঝুঁকিও তৈরি করতে পারে। খান ও অন্যান্য গবেষকবৃন্দ (২০১৮) ঢাকা জেলার সাভার থানায় ফুলের বাগানে কীটনাশকের প্রভাব নিয়ে একটি গবেষণা করেন এবং তা থেকে তারা জানান। হাইব্রিড ফুলগুলোতে উজ্জ্বল রঙ এবং বড় বড় ফুল ফোঁটানোর জন্য উচ্চ মাত্রার জৈব ও রাসায়নিক সার ব্যবহার করা হয়। যেগুলি আবার বৃষ্টি ও সেচের পানি দ্বারা ধৌত হয়ে পার্শ্ববর্তী পুকুর, খাল এবং অন্যান্য জলাশয়ে ও জলবিভাজিকায় পড়ে, সেখানে ইউট্রোফিকেশন ঘটায় ও অক্সিজেনের ঘাটতি হয়। ফলশ্রুতিতে মাছ ও অন্যান্য জলজপ্রাণী মারা যায়।
আমাদেরকে উপকারী অনুজীবের ক্ষতি ও হাইব্রিড ফুল থেকে আপাত: দৃষ্টিতে লাভবান হওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। কেননা হাইব্রিড ফুল চাষের কারণে আমাদের চাষের জমিগুলো একমূখী চাষ বা মনোকালচারে পরিণত হচ্ছে। স্থানীয় ফুল ও উদ্ভিদগুলি বিভিন্ন পাখি, ছোট ছোট প্রাণী, বন্য প্রাণী, মৌমাছি ও কীটপতংগের জন্য খাদ্য ও আশ্রয় সহায়তা দিয়ে থাকে। পক্ষান্তরে হাইব্রীড ফুল ঐ সকল প্রাণী, কীটপতংগ, পাখি, ফোনা ও ফ্লোরার জন্য উষর মরুভূমি তৈরি করে। অপরদিকে দেশীয় শাপলা, অর্কিড এবং অন্যান্য বনফুল পরিবেশগতভাবে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। স্থানীয় এ সকল উদ্ভিদকে বাদ দিয়ে কতিপয় বাণিজ্যিক হাইব্রিড জাতের উপর জোর দেওয়ার ফলে ক্রমশ: বাংলাদেশের উদ্ভিদ-বৈচিত্র্য নষ্ট হচ্ছে (IUCN-2015)। একই জাতের হাইব্রিড ফুলের ক্রমাগত চাষের ফলে মৃত্তিকায় প্রয়োজনীয় পুষ্ঠি উপাদানের ঘাটতি হয়। হাইব্রিড ফুল দেখতে আকষর্ণীয় হলেও এগুলোতে পরাগায়ণের উপযোগী পরাগ, ফ্লুইড ও ফুলের সঠিক স্ট্রাকচার গঠনের অভাব রয়েছে বিধায় মৌমাছি, প্রজাপতি ও অন্যান্য কীটপতংগ পরাগায়ণ করতে পারে না। ফলে পরাগায়ণকারী কীটপতংগ ও মৌমাছি নিকটবর্তী দেশীয় ফুল ও ফলের পরাগায়ণের ক্ষেত্রে সাফল্য দেখাতে পারে না (বাংলাদেশ ন্যাশনাল হার্বেরিয়াম; ফুড এন্ড এগ্রিকালচারাল অর্গানাইজেশন)।
হাইব্রিড ফল চাষ এবং পরিবেশ ও প্রতিবেশের উপর তার প্রভাব
হাইব্রিড ফল চাষের কারণে অন্যের উপর নির্ভরশীলতা, কৃষি জৈব-বৈচিত্রের ক্ষতি, মৃত্তিকার অবক্ষয় এবং রাসায়নিক সার ও কীটনাশকজনিত দূষণের মাধ্যমে আমাদের দেশের পরিবেশগত বিপর্যয় ঘটাচ্ছে। বাংলাদেশ একসময় দেশীয় ফলের জাতের ভান্ডার হিসাবে পরিগণিত ছিলো। কিন্তু বর্তমানে হাইব্রিড আম, পেয়ারা, পেঁপে ব্যাপকভাবে প্রচারের ও প্রসারের ফলে অনেকটা বাধ্য হয়ে কৃষক স্থানীয় জাতের ফল চাষ পরিত্যাগ করছে। ফলে জীনগত বৈচিত্রের ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে (FAO)। হাইব্রিড ফুলের মতো হাইব্রিড ফল চাষের নিমিত্তে অধিক পরিমাণে রাসায়নিক সার ব্যবহার করা হয়। ফলে মৃত্তিকায় জৈব পদার্থ কমে যায় এবং সেই সাথে গৌন উপাদান বা মাইক্রোনিউট্রিয়েন্টের ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়। প্রকারন্তরে মৃত্তিকার দৈহিক গঠন (ফিজিক্যাল স্ট্র্যাকচার) ও স্বাস্থ্যের ক্ষতিগ্রস্থ হয়। অনেক হাইব্রিড ফলের জাত চাষাবাদে আবার প্রচুর পানির প্রয়োজন হয়। সে কারণে ভূ-গর্ভস্থ ও ভূ-উপরিস্থিত পানির উপর চাপ পড়ে (BARI)। দেশীয় ফল গাছগুলি সময়ের সাথে সাথে স্থানীয় পোকা-মাকড়ের সংগে অভিযোজিত হয়ে গেছে। অপরদিকে হাইব্রিড ফলগাছগুলি খুবই সংবেদনশীল। সেজন্য তাদের চাষে ঘন ঘন রাসায়নিক সার, কীটনাশক ও ছত্রাক নাশক স্প্রে করা হয়। যেগুলি মৃত্তিকা, পানি, উপকারী অনুজীব, পোকামাকড়, কেঁচো, পাখি, সাপ, ব্যাঙ সহ প্রতিবেশের ক্ষতি করে। আবার এগুলি কৃষকদের জন্য স্বাস্থ্য ঝুঁকিও তৈরি করছে (হাসান প্রমূখ, ২০২০)। দেশীয় ফল ও ফল বাগানের ফুল, মধু ও পরাগায়ন প্রক্রিয়া বন্যপ্রাণীর এক বৈচিত্রময় ও অন্যতম উৎস। যা হাইব্রিড ফল বাগান থেকে পাওয়া যায় না (IPBIS)।
হাইব্রিড শস্য
ব্যাপকভাবে হাইব্রিড ফুল ও ফলের মতো হাইব্রিড ফসল চাষাবাদের কারণে মারাত্মক জীনগত অবক্ষয়, মৃত্তিকার স্বাস্থ্যের অবনতি, অতিরিক্ত ভূ-উপরিস্থিত পানি ও ভূ-গর্ভস্থ পানি উত্তোলন, কীটনাশক ও রাসায়নিক সার কর্তৃক দূষণ দেখা দিচ্ছে। ফলশ্রুতিতে আমাদের বিদেশের উপর নির্ভরশীলতা বাড়ছে। ফলে জীব-বৈচিত্র্য ও কৃষি-বৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে । যা আমাদের প্রকৃতি, পরিবেশ এবং প্রতিবেশের ভারসাম্য নষ্ঠ করছে ও মারাত্মক হুমকী সৃষ্ঠি করছে।
পরিবেশ অবান্ধব বৃক্ষ থেকে ক্ষতি
বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে অর্থাৎ জ্বালানী কাঠ এবং কাগজের মন্ড তৈরির নিমিত্তে দ্রুত বর্ধনশীল বিদেশী বৃক্ষের জাতের চাষ এবং প্রচার ও প্রসারের ফলে বাংলাদেশ মারাত্মক পরিবেশগত ক্ষতির দিকে যাচ্ছে মর্মে বিশেষজ্ঞরা অভিমত ব্যক্ত করছেন। আমাদের দেশে পরিবেশের ক্ষতিকারক বৃক্ষের মধ্যে আকাশমনি ইউক্যালিপটাস, কৃষ্ণচুড়া, দেবদারু, মেহগনি, রেনট্রি সেগুন ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। এগুলো পরিবেশের কমপোনেন্ট সমূহের মধ্যে মৃত্তিকা, পানি, প্রাণী, বাতাস সহ সকলের ক্ষতি করে চলেছে।
আকাশমনি ব্যা অ্যাকাশিয়া
হোসেন প্রমূখ (২০১৫) এক গবেষণা থেকে জানান যে, আকাশমনি বৃক্ষের পাতা এমন এক রাসায়নিক পদার্থ নির্গত করে যে, যা ঐ পাতার নীচের অন্যান্য উদ্ভিদের অঙ্কুরোদগম এবং বৃদ্ধিকে বাধা দেয় ও জীব-বৈচিত্রের ক্ষতি করে। তাছাড়া আকাশমনি বৃক্ষের মূল মৃত্তিকার অনেক গভীরে যায় এবং প্রচুর পরিমাণ ভূ-গর্ভস্থ পানি শোষণ করে ও শুষ্ক মওশুমে পানির স্তর নিম্নে নামাইয়া দেয়। উপরুন্ত, আকাশমনি, বন্যপ্রাণী, পাখি, পোকামাকড়, স্তন্যপায়ী ও অনুজীবদের জন্য কোন আশ্রয়স্থল ও খাবার সরবরাহ করতে পারে না।
ইউক্যালিপটাস বৃক্ষ
ইউক্যালিপটাস বৃক্ষের “পানির পাম্প” নামে কুখ্যাতি রয়েছে। এ বৃক্ষের মূল মাটির গভীরে যায় এবং এর বাষ্পীভবনের হার বেশি। তাই শুষ্ক অঞ্চলের জন্য এ বৃক্ষ খুবই ক্ষতির কারণ। এ বৃক্ষটি মাটির নাইট্রোজেন ও ফসফরাস হ্রাস করে থাকে এবং জমিকে অনুর্বর করে তোলে (FAO)।
স্বল্পমেয়াদে অর্থনৈতিক লাভের আশায় হাইব্রিড, বিদেশী ও পরিবেশ অবান্ধব ফুল, ফল, ফসল ও বৃক্ষ আমাদের প্রকৃতি, পরিবেশ ও প্রতিবেশের স্থায়ী ও অপূরণীয় ক্ষতি করে চলেছে। সেজন্য আমাদেরকে ঋতুভিত্তিক দেশীয় ও স্থানীয় পরিবেশ বান্ধব ফুল, ফল, ফসল ও বৃক্ষ চাষাবাদ করতে হবে। তাহলেই বাংলাদেশ তথা বিশ্বের মানুষ, প্রাণী এবং উদ্ভিদসহ সকলেই উপকৃত হবে ও এ পৃথিবীর জীব-বৈচিত্রের নিরাপত্তা সংরক্ষিত হবে।
লেখক: ডিআইজি, পুলিশ স্টাফ কলেজ বাংলাদেশ এবং সাবেক কমান্ড্যান্ট, পুলিশ স্পেশাল ট্রেনিং স্কুল (পিএসটিএস), বেতবুনিয়া, রাঙ্গামাটি।