পর্যবেক্ষণ
নিরঞ্জন রায়
প্রকাশ : ২৩ জানুয়ারি ২০২৬ ১১:০৬ এএম
নিরঞ্জন রায়
আমার বিশেষ পরিচিত এক ব্যক্তি একটি আইটি (ইনফরমেশন টেকনোলজি) প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন। তার সঙ্গে বিভিন্ন সময় আলোচনা করে যতটুকু জেনেছি, তাতে সেটি একটি উন্নতমানের আইটি প্রতিষ্ঠান, যেখান থেকে মানসম্পন্ন প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়। আমার সেই পরিচিত ব্যক্তি সেখানে প্রশিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেন। বেশ কয়েক মাস ধরেই সেই প্রতিষ্ঠান আর্থিক সংকটের মধ্য দিয়ে চলতে শুরু করে। কেননা আইটির ওপর প্রশিক্ষণ নেওয়ার জন্য ছাত্রছাত্রী ভর্তির সংখ্যা কমে যায়। ফলে তাদের রেভিনিউ হ্রাস পায়। এরকম অবস্থায় একটি বেসরকারি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের যা করার কথা তাই এই আইটি প্রতিষ্ঠান করেছে। অর্থাৎ বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা এবং প্রশিক্ষকদের চাকরি থেকে বিদায় করতে হয়েছে। এখানে যারা চাকরি করছিলেন, তারা সবাই মধ্যবিত্ত-শ্রেণির সদস্য। এভাবে চাকরি হারানোর ঘটনা যে একটি আইটি প্রতিষ্ঠানে ঘটছে, তেমন নয়, বরং অনেক প্রতিষ্ঠানেই এরকম ঘটনা ঘটছে, যা খুবই স্বাভাবিক। কেননা যখন অর্থনীতিতে খারাপ অবস্থা বিরাজ করে, তখন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো প্রথমেই পরিচালনা ব্যয় হ্রাসের কৌশল গ্রহণ করে শুধু প্রতিষ্ঠান টিকিয়ে রাখার উদ্দেশ্যে, যার প্রথম শিকার হয় সেই প্রতিষ্ঠানের চাকরিজীবীরা।
সেই আইটি প্রতিষ্ঠানে যারা চাকরি হারিয়েছেন, তারা অনেকেই এখন এক অসহায় অবস্থার মধ্যে পড়েছেন। তারা চাইলেও সমমানের একটা চাকরি খুব সহজে জোগাড় করে নিতে পারছেন না। আবার তাদের এই কষ্টের কথা লজ্জায় কারও সঙ্গে আলোচনাও করতে পারছেন না। এটাই হচ্ছে মধ্যবিত্তদের সবচেয়ে বড় সমস্যা। মধ্যবিত্ত-শ্রেণির প্রধান পেশাই হচ্ছে একটি সাধারণ মানের অফিসিয়াল চাকরি, যাকে উন্নত বিশ্বের পরিভাষায় হোয়াইট কালার জব বলা হয়ে থাকে। মধ্যবিত্ত-শ্রেণিতে যারা বেড়ে ওঠেন, তাদের স্বপ্নই থাকে একটা অফিসিয়াল চাকরি। মধ্যবিত্তদের জীবনটাই এমন যে কোনোমতে একটা চাকরি জোগাড় করে অনেক হিসাবনিকাশের মধ্য দিয়ে জীবনযাপন করে ছেলেমেয়েদেরকেও কোনোভাবে লেখাপড়া শিখিয়ে একটা চাকরিতে দিতে পারলেই জীবনের সব চাওয়াপাওয়ার হিসাব মিলে যায়। সেই ছেলেমেয়েদের চাহিদাও থাকে একই ছকে বাঁধা। এ কারণেই দেখা যায় যে, একজন চাকরিজীবীর ছেলেমেয়ে চাকরিজীবী হয়ে থাকে। এ যেন মধ্যবিত্ত-শ্রেণির চাকরির দুষ্টচক্রে আটকে থাকার মতো অবস্থা।
সম্প্রতি কিছু ব্যতিক্রম অবশ্য লক্ষ করা যায়। মধ্যবিত্ত-শ্রেণির অনেকেই এখন এই চাকরির দুষ্টচক্র ছিন্ন করে আত্মকর্মসংস্থান বা ব্যবসাবাণিজ্যের দিকে ঝুঁকছে এবং অনেকে বেশ সফল হচ্ছে। তবে এই সংখ্যা একেবারেই সীমিত এবং এরকমটা শুরু হয়েছে মাত্র। হয়তো সময়ের আবর্তে একসময় মধ্যবিত্ত-শ্রেণির বড় অংশই হয় আত্মকর্মসংস্থান বা ব্যবসাবাণিজ্যের সঙ্গে সম্পৃক্ত হবে। তবে এজন্য সময় লাগবে এবং সরকারি সহযোগিতার প্রয়োজন আছে। এর আগ পর্যন্ত মধ্যবিত্ত-শ্রেণিকে এই চাকরির দুষ্টচক্রে আটকে থাকতে হবে। এই চাকরির ক্ষেত্রেও মধ্যবিত্তদের আছে আরেক সমস্যা। তারা চাইলেই যেকোনো ধরনের চাকরি করতে পারে না। বেতন-ভাতা যাই হোক না কেন, একটি মানসম্পন্ন অফিসিয়াল চাকরিই মধ্যবিত্তদের পছন্দ। একসময় সরকারি চাকরি ছিল সবচেয়ে পছন্দের তালিকায়। এখনও সরকারি চাকরির মোহ মধ্যবিত্ত-শ্রেণি ছাড়তে পারেনি, তবে করপোরেট সংস্কৃতি বেড়ে ওঠায় মধ্যবিত্ত-শ্রেণির অনেকেই এখন বেসরকারি চাকরি বেশ স্বাচ্ছন্দ্যেই গ্রহণ করছে।
মধ্যবিত্ত-শ্রেণি সম্পর্কে একটা কথা প্রচলিত আছে যে, তারা ডাল-ভাত খেলেও শান্তিতে থাকতে চেষ্টা করে। যথেষ্ট হিসাব করে জীবনযাত্রা নির্বাহ করতে হয় এবং সেটা যথেষ্ট দক্ষতার সঙ্গেই করতে হয়। এককথায় আয় বুঝে ব্যয় করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি পারদর্শী হতে হয় মধ্যবিত্ত-শ্রেণিকে। উপার্জনের পরিমাণ যেমনই হোক না কেন, তার মধ্য থেকে সাংসারিক খরচ চালানোর পাশাপাশি ভবিষ্যতের জন্য কিছু সঞ্চয়ও করে রাখতে পারে মধ্যবিত্ত-শ্রেণি। সমাজের এই শ্রেণির মানুষের কোনোরকম ঋণ থাকে না, বরং কিছু সঞ্চয় থাকে। মধ্যবিত্ত-শ্রেণির অর্থই হচ্ছে তাদের কোনো ব্যক্তিগত ঋণ নেই, বরং সঞ্চয় আছে। কিন্তু করপোরেট সংস্কৃতির বিস্তার লাভ করায় এবং সেই সঙ্গে ভোগবাদী জাতি হিসেবে আবির্ভাব হওয়ায়, এখন মধ্যবিত্ত-শ্রেণির অনেকেই ঋণ করে ভোগ করতে শুরু করেছে। ব্যাংক প্রদত্ত ভোগ্য ঋণের সহজলভ্যতা মধ্যবিত্ত-শ্রেণির নতুন পরজন্মকে একটি ভোগবাদী জাতিতে পরিণত করতে বসেছে।
মধ্যবিত্ত-শ্রেণির এই পরিবর্তন মোটেই দোষের কিছু নয়। বরং মধ্যবিত্ত-শ্রেণির এই ভোগবাদী আচরণ অর্থনীতির জন্য বেশ সহায়ক হতে পারে, যদি সঠিকভাবে কাজে লাগানো যায়, যেমনটা উন্নত বিশ্ব করতে সক্ষম হয়েছে। আমেরিকা, কানাডাসহ উন্নত বিশ্বের মানুষের মানসম্পন্ন জীবনযাপন দাঁড়িয়ে আছে ব্যাংকঋণের ওপর। এখানে মানুষের আয়-উপার্জন যেমনই হোক না কেন, প্রত্যেকের আছে বিশাল অঙ্কের ক্রেডিট কার্ড ঋণ এবং ব্যাংক প্রদত্ত ব্যক্তিগত ঋণ বা লাইন অব ক্রেডিট। এসব দেশে মানুষ যে বিলাসবহুল জীবনযাপন করছে, তা মূলত এই ক্রেডিট কার্ড এবং ব্যক্তিগত ব্যাংকঋণ দিয়ে। কেননা উন্নত বিশ্ব মানুষের এই ভোগবাদী আচরণ খুব সুন্দরভাবে কাজে লাগাতে পেরেছে তাদের হাতে খরচযোগ্য অর্থের সরবরাহ অবারিত করে। আর এই কাজ করার আগে এর কঠোর নিয়ন্ত্রণ শতভাগ নিশ্চিত করেছে। এর ফলে দুটো উদ্দেশ্য যুগপৎ সাধিত হয়েছে। প্রথমত, মানুষ আগে ভোগ করে পরে পরিশোধ করতে শিখে গেছে। ফলে প্রয়োজনীয় উপার্জন না থাকলেও মানসম্পন্ন জীবনযাপনের সবকিছুই করা সম্ভব হচ্ছে। দ্বিতীয়ত, এই ধরনের জীবনযাপনের কারণে অর্থনীতিতে সামস্টিক চাহিদা বৃদ্ধি পায়, যা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে সহায়তা করে। উন্নয়নশীল বিশ্ব যেহেতু এই ধরনের সামাজিক ও আর্থিক ব্যবস্থা সঠিকভাবে পরিচালনার জন্য কঠোর নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করতে পারেনি, তাই তারা অর্থনীতির জন্য সহায়ক হওয়া সত্ত্বেও এই ব্যবস্থা অনুসরণ করতে পারছে না।
কিছুটা পরিবর্তন শুরু হলেও মধ্যবিত্ত-শ্রেণির অধিকাংশ এখনও চাকরিজীবী এবং হিসাবনিকাশের মধ্য দিয়ে চলতেই অভ্যস্ত। এরকম হিসাব করে একটি ছকে বাঁধা জীবন চালাতে কোনো সমস্যা হয় না এবং মধ্যবিত্ত জীবনের সবকিছু বেশ ছন্দেই চলে। কিন্তু সমস্যা দেখা দেয় তখনই, যখন অর্থনীতি এবং আর্থ-সামাজিক অবস্থায় ছন্দপতন ঘটে। অর্থনীতিতে সংকট দেখা দিলে প্রথমেই ক্ষতিগ্রস্ত হয় মধ্যবিত্ত-শ্রেণি। যেমনটা এখন বাংলাদেশের সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে যে সংকট চলছে তার অন্যতম ভুক্তভোগী হচ্ছে এই মধ্যবিত্ত-শ্রেণি। বাংলাদেশে মধ্যবিত্তরা সব সময়ই একটা আর্থিক চাপের মধ্যে থাকে। কিন্তু এখন মনে হয় তারা সংকটে পড়ে গেছে এবং এই সংকট দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হতে চলেছে বলেই প্রতীয়মান হয়। আর এই সংকটের কারণ হচ্ছে মধ্যবিত্ত-শ্রেণির ছেলেমেয়েরা লেখাপড়া শেষে চাকরি জোগাড় করতে পারছে না। আবার অনেকে চাকরি হারিয়ে দিশাহার অবস্থায়। ক্রমবর্ধমান দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি মানুষের জীবনকে অসহনীয় করে তুলেছে।
অবস্থা এতটাই খারাপ যে মধ্যবিত্ত-শ্রেণির অনেকেই তাদের কষ্টার্জিত সঞ্চয় ভেঙে জীবনযাত্রার ব্যয় নির্বাহ করতে শুরু করেছে। অনেকে ব্যাংকঋণ নিয়ে অথবা ব্যক্তিগত ঋণ নিয়ে অত্যাবশ্যিক খরচ মেটানোর চেষ্টা করছে। এমনকি অনেকে পূর্বপুরুষের রেখে যাওয়া জমিজমা বিক্রি করে নিঃস্ব হচ্ছেন। এতসব করেও অনেকে ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার খরচ জোগাড় করতে পারছেন না। ফলে মধ্যবিত্ত-শ্রেণির যে মূল লক্ষ্য ছেলেমেয়েদের শিক্ষিত করে চাকরিতে নিয়োজিত করা, সেটি মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে। ছেলেমেয়েরা মানুষ হবে না, কিছু করে খেতে পারবে কি নাÑ এমন ধারণা মধ্যবিত্ত-শ্রেণির বাস্তবতায় পরিণত হতে শুরু করেছে। ফলে মধ্যবিত্ত-শ্রেণির যে কয়েকটি মৌলিক উপাদান, যেমনÑ চাকরি, হিসাব করে জীবনযাত্রা নির্বাহ করা, ঋণ থেকে বিরত থাকা, সঞ্চয় এবং ছেলেমেয়েদের শিক্ষিত করে চাকরিতে নিয়োজিত করা, এর সবকিছুই এখন বিঘ্নিত হচ্ছে চরমভাবে। ফলশ্রুতিতে মধ্যবিত্ত সমাজ ব্যবস্থাই ভেঙে যাওয়ার উপক্রম।
মধ্যবিত্ত-শ্রেণির এই সংকট অনেক আগে থেকেই শুরু হয়েছে। তবে বিগত পাঁচ বছরে তাদের অবস্থার চরম অবনতি হতে শুরু করে। এই কঠিন অবস্থাটা শুরু হয় মূলত পাঁচ বছর আগে থেকেই। সেই ২০২০ সালে করোনা মহামারির কারণে বিশ্ব-অর্থনীতি মন্দার মধ্যে পড়লে, আমাদের দেশের অর্থনীতিও সংকটে পড়ে, যার প্রভাবে মধ্যবিত্ত-শ্রেণি ক্ষতিগ্রস্ত হতে শুরু করে ব্যাপকভাবে। সেই ধাক্কা ভালোভাবে কাটিয়ে ওঠার আগেই শুরু হয় রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, যার প্রভাবে দেখা দেয়, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং চরম ডলার সংকট। আর এর প্রভাবও পড়ে মধ্যবিত্ত-শ্রেণির ওপর। আর এই সংকট কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই দেশে দেখা দেয় রাজনৈতিক অস্থিরতা, যার প্রভাবে চাকরি না পাওয়া, চাকরি হারানো, সঞ্চয় ভেঙে খাবার মতো চরম সংকট দেখা দেয় মধ্যবিত্তদের জীবনে।
সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে মধ্যবিত্ত-শ্রেণির এই সংকট যে খুব সহসা কেটে যাবে, তেমন সম্ভাবনা একেবারেই দৃশ্যমান নয়। আদৌ এই সংকট কাটবে কি না, নাকি আরও খারাপ হবে, সেই আলোচনাও যথেষ্ট আছে। তার চেয়েও বড় কথা হচ্ছে, মধ্যবিত্তদের এই সমস্যা বলার যেমন কোনো স্থান নেই, তেমনি তাদের এই সংকট দেখারও কেউ নেই। মধ্যবিত্ত-শ্রেণির এই সংকট কাটানোর জন্য সঠিক পদক্ষেপ আদৌ আছে কি না এবং থাকলে কীভাবে সেটা হতে পারে, সেই আলোচনা কোথাও নেই। সমাজের এই শ্রেণির মানুষের জীবন চলে নীরবে-নিভৃতে, তেমনি তাদের সমস্যাগুলোও থেকে যায় সকলের অগোচরে, অথচ এর কষ্ট এবং প্রভাবটা হয় মারাত্মক। সবকিছু মিলিয়ে অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যেÑ দেশের মধ্যবিত্ত-শ্রেণি এখন সবচেয়ে কঠিন সময় পার করছে।
লেখক: সার্টিফাইড অ্যান্টি-মানি লন্ডারিং স্পেশালিস্ট ও ব্যাংকার, টরন্টো, কানাডা