× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

হারিয়ে যাচ্ছে চাষের জমি

মো. অহিদুর রহমান

প্রকাশ : ২২ জানুয়ারি ২০২৬ ১০:১৩ এএম

আপডেট : ২২ জানুয়ারি ২০২৬ ১০:৩০ এএম

 ফসলি জমির উর্বর মাটি নির্দয়ভাবে চলে যাচ্ছে ইটখোলায়, বসতভিটা তৈরিতে। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

ফসলি জমির উর্বর মাটি নির্দয়ভাবে চলে যাচ্ছে ইটখোলায়, বসতভিটা তৈরিতে। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

প্রতিদিন ফসলি জমির উর্বর মাটি নির্দয়ভাবে চলে যাচ্ছে ইটখোলায়, বসতভিটা তৈরি, পুকুর ভরাট, রাস্তা তৈরি ও নগরায়ণের জন্য। কৃষি মানুষের আদি পেশা। কৃষিকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে সভ্যতা, সংস্কৃতি। সময়ের সঙ্গে মানুষ যেমন বাড়ছে, তেমনি বাড়িঘরও বাড়ছে, বাড়ছে কলকারখানা বা অন্যান্য অনুষঙ্গও। কিন্তু সেই বাড়তি মানুষের খাদ্য চাহিদা মেটাতে নির্ভর করতে হচ্ছে আবাদযোগ্য জমির ওপর। পদ্মা-মেঘনা-যমুনা-ব্রহ্মপুত্র বিধৌত ভাটির পলল ভূমি হিসেবে ধান-সবজিসহ বিভিন্ন ফসল উপযোগী উর্বর মাটির দেশ এই বাংলাদেশ। এ দেশে গড়ে সাড়ে ৪ কোটি টনের বেশি খাদ্যশস্য উৎপাদন হয়। কৃষি উৎপাদনের ওপর দেশের অর্থনীতির ভালো-মন্দ নির্ধারিত হয়ে থাকে। অথচ জলবায়ুর প্রভাবে নদীভাঙন, লবণাক্ততা, নগরায়ণ, ইটভাটা, শিল্পকারখানা, বসতভিটা, রাস্তাঘাট, অবকাঠামো নির্মাণ ও যত্রতত্র বসতি প্রতিষ্ঠার কারণে সারা দেশে প্রতিবছর প্রায় ৭০ হাজার হেক্টর আবাদি জমি অকৃষি খাতে চলে যাচ্ছে ।

কৃষিজমির ওপর এভাবে অত্যাচার চলতে থাকলে চললে একদিন হয়তো চাষাবাদের জন্য জমি ফুরিয়ে যাবে। পৃথিবীর সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ দেশগুলোর অন্যতম বাংলাদেশ এখনও কৃষিনির্ভর বাংলাদেশের অর্থনীতি। বাংলাদেশের অর্থনীতি নির্ধারিত হয়ে থাকে কৃষির উৎপাদনের হ্রাস-বৃদ্ধির ওপর। নতুন বসতভিটা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, রাস্তাঘাট-অবকাঠামো নির্মাণ, ইটভাটা, কলকারখানা, নগরায়ণের জন্য কৃষিজমি অধিগ্রহণ, ইটভাটার জন্য টপসয়েল ব্যবহার, ভূমির অবক্ষয় হচ্ছে বেশি। বর্তমান হারে ভূমি অবক্ষয় চলতে থাকলে ২০৫০ সাল নাগাদ বাংলাদেশে কোনো কৃষিজমি থাকবে না বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে খোদ সরকারি সংস্থা পরিবেশ অধিদপ্তর। সংস্থাটির বরাতে প্রকাশ, প্রতিবছর বাংলাদেশে ১ শতাংশ হারে কৃষিজমি নষ্ট হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে ২০৫০ সাল নাগাদ বাংলাদেশে কোনো কৃষিজমি থাকবে না।

কৃষিজমির অন্যত্র ব্যবহারে তথা অকৃষি ব্যবহারের নানাবিধ কারণ লক্ষ করা যায়। বিশেষজ্ঞ এবং গবেষকগণের অধিকাংশের মতে অপরিকল্পিত শিল্পায়ন এবং নগরায়ণকে দায়ী করা হয়। অনেকে আবার জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবকেও দায়ী করে থাকেন। ‘জমিতে উর্বরতা কমে যাওয়া, খাদ্য উৎপাদন হ্রাস, খাদ্যের মূল্যবৃদ্ধি এবং ক্রমবর্ধমান অন্যান্য নাগরিক চাহিদার বিরূপ ফলাফল হচ্ছে এইসব কৃষিজমি হ্রাস হওয়া। লোকালয়, কৃষিজমি, পাহাড়ের ঢালে এবং বনাঞ্চলের আশপাশে, লোকালয়ে অথবা আবার কোথাও অবৈধভাবে স্থাপন করা হয়েছে ইটভাটা। দেশে চাহিদানুযায়ী ইট প্রস্তুত করতে ১২৭ কোটি সিএফটি মাটির দরকার হয়। যার বেশিরভাগই কৃষিজমির উপরিভাগ থেকে সংগৃহীত। পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্যমতে ইটভাটার সংখ্যা ৪৫১০টি, যার দখলে আছে ৫০ হাজার একর আবাদি জমি/ স্বল্প পরিমাণের আর্থিক সুবিধার লোভে বা অন্য কোনোভাবে প্ররোচিত হয়ে মাটির উপরিভাগ বিক্রি করে দেওয়া হচ্ছে ভাটা মালিকদের কাছে। অথচ জমির উপরিভাগের ১০ থেকে ১৫ ইঞ্চির মধ্যে থাকে পলিমাটি, যাকে বলা হয় মাটির প্রাণ। এই মাটি কাটার ফলে কমে যায় জমির উর্বরা শক্তি যা পঞ্চাশ বছরেও পূরণ করা সম্ভব নয়।

পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যমতে যেখানে ১৯৭১ সালে সাড়ে ৭ কোটি জনসংখ্যা ছিল, বর্তমানে সেখানে ২০ কোটি এসে দাঁড়িয়েছে। বর্ধিত লোকের মৌলিক চাহিদা বিশেষ করে খাদ্য চাহিদা পূরণে একদিকে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির চাপ বাড়ছে একই সঙ্গে অতিরিক্ত আবাসন সুবিধা নিশ্চিতকরণসহ অন্যান্য সম্পূরক চাহিদাও বাড়ছে। ১৯৯৬ সাল হতে ২০১১ সাল পর্যন্ত বিবিএসর তথ্যমতে বসতবাড়ির জমির পরিমাণ ৩.৫ লাখ একর হতে ৬.৭৭ লাখ একরে এসেছে। ফলে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ, যাটাই হোক, চাপ বাড়ছে কৃষি জমির ওপর। বাড়ছে কৃষিজমির অকৃষি ব্যবহার।

২১ জানুয়ারি ২০২২ সালে বার্লিন কৃষিমন্ত্রীদের সম্মেলন-২০২২ এ বাংলাদেশের যে নগরায়ণ এবং শিল্পায়নের ফলে দেশে বছরে ০.৪৩ শতাংশ কৃষিজমি কমছে। বিশ্বব্যাংকের উন্নয়ন সূচক, ২০০৯ অনুসারে ১৯৯০ সালে শহরে বসবাসের হার ছিল ২০% আর ২০১০ সালে এসে দাঁড়ায় ২৭%। বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ আবুল বারকাতের গবেষণা প্রতিবেদনমতে ১৯৭২ হলে ২০০৯ সাল পর্যন্ত ৬৬ লাখ ৬৬ হাজার ৮৫৬ একর ভূমি নগরায়ণ এবং শিল্পায়নে চলে গেছে। যেসব আবাদি জমি কৃষি হতে অকৃষি নগরায়ণ ও শিল্পায়নে গেছে তার মধ্যে আবাসন, কলকারখানা, বিদ্যালয়, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান অন্যতম।

মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের ‘বাংলাদেশের কৃষিজমি বিলুপ্তির অন্যতম কারণ হলো জমির উদপাদনশীলতা হ্রাস। ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে জমির অতিরিক্ত ব্যবহার, মাটির দূষণ, লবণাক্ততা, পুষ্টি উপাদানের অবক্ষয় ইত্যাদি কারণসমূহ চিহ্নিত করা হয়েছে।

জাতীয় ভূমি ব্যবহার নীতি ২০১০ এবং ‘কৃষিজমি সুরক্ষা ও ভূমি জোনিং আইন ২০১০’ অনুসারে কৃষিজমি কৃষিকাজ ব্যতীত অন্য কোনো কাজে ব্যবহার করা যাবে না। কোনো কৃষিজমি ভরাট করে বাড়িঘর, শিল্প-কারখানা, ইটভাটা বা অন্য কোনো অকৃষি স্থাপনা কোনোভাবেই নির্মাণ করা যাবে না উল্লেখ করে একটি আইন আছে। অথচ সরকারের গবেষণা প্রতিষ্ঠান মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের (এসআরডিআই)প্রকাশিত ‘বাংলাদেশের কৃষিজমি বিলুপ্তির প্রবণতা’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০০০ সাল-পরবর্তী ১২ বছরে দেশে প্রতিবছর ৬৮ হাজার ৭৬০ হেক্টর আবাদি জমি অকৃষি খাতে চলে যাচ্ছে। শুধু অবকাঠামো নির্মাণকাজের কারণে প্রতিবছর ৩ হাজার হেক্টর জমি বিলীন হচ্ছে। পাশাপাশি উচ্চহারে জনসংখ্যা ও তাদের চাহিদা বৃদ্ধির কারণে মাথাপিছু জমির পরিমাণ হ্রাসের জন্য কৃষি, বন ও জলাভূমির পরিমাণ হ্রাস পাচ্ছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর অফিসের তথ্য থেকে জানা যায়, দেশের মোট ভূমির মধ্যে আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ এখন ৭৯ দশমিক ৪৬ লাখ হেক্টর। আর এর ৫৩ শতাংশই দুই বা তিন ফসলি জমি। তবে অবকাঠামো নির্মাণ, ইটভাটা, কলকারখানার জন্য ভূমি অধিগ্রহণ এবং নতুন নতুন বসতভিটা বাড়ার কারণে প্রথমেই অধিগ্রহণ হচ্ছে কৃষিজমি।

আমাদের ভূমি ব্যবস্থাপনায় কোনো সুশৃঙ্খলা ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে নেই। জমি আছে বলেই স্বাধীনতার ৫৩ বছরে খাদ্য উৎপাদন বাড়িয়ে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়া সম্ভব হয়েছে। কৃষি এ শক্ত ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে অন্যসব উন্নয়ন কর্মকান্ড বাস্তবায়ন সহজতর হচ্ছে। বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দা আর অস্থিরতার মধ্যেও দেশকে অনেকটা স্বাভাবিক রাখছে কৃষি। তাই জমির যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে জাতীয় ভূমি ব্যবহার পরিকল্পনা ও নীতিমালা জরুরি। কৃষিজমি অকৃষি কাজে ব্যবহারের প্রবণতা কঠোরভাবে রুখতে হবে। কৃষিনির্ভর বাংলাদেশে কৃষিজমির সুরক্ষা ব্যর্থ হলে টিকে থাকা কঠিন হবে।

কৃষি জমির কমে আসার তথ্যটা এখন বেশ ভয়ংকর, অশনি সংকেতও বলা যায়। পরিবেশবিদরা অনেক আগে থেকেই বিষয়টি নিয়ে সোচ্চার। নীতিনির্ধারকরাও এখন উচ্চস্বরে কথাবার্তা বলছেন। কিন্তু কাজের কাজ তেমন একটা হচ্ছে না। বরং প্রতিদিনই কমছে কৃষিজমি। কৃষিজমি রক্ষায় ‘কৃষিজমি (যথাযথ ব্যবহার ও সংরক্ষণ) আইন ২০২২’ নামে একটি বেসরকারি বিল গ্রহণ করা হলেও তা এখনও আইনে পরিণত হয়নি। ফলে কৃষিজমি রক্ষায় এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো আইন বা নীতি প্রণীত হয়নি।

কৃষিজমি রক্ষায় প্রস্তাবিত আইন ও নীতিমালা দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে। কৃষিজমি নষ্ট করে অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণ বন্ধ করতে হবে। কৃষিজমির প্র্রাণরক্ষায় গতিহীন মরে যাওয়া এবং হাজামজা সকল ছোট নদ-নদী, খাল পুনর্খননের ব্যবস্থা করতে হবে। কৃষি খাসজমি, জলমহাল বন্দোবস্তে প্রকৃত ভূমিহীনদের অগ্রাধিকার দিতে হবে। সরকারি কৃষি খাসজমি কোনোভাবেই বিক্রি করা চলবে না। পতিত জমি কৃষিজমিতে পরিণত করতে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।


মো. অহিদুর রহমান

পরিবেশ কর্মী

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা