গুম-খুন
প্রবা প্রতিবেদন
প্রকাশ : ১৯ জানুয়ারি ২০২৬ ১৬:৪০ পিএম
‘কান্নাভরা জীবন, বেদনাভরা দিন’ শিরোনামে প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ উঠে এসেছে গত ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদী হাসিনা রেজিমে গুম-খুনের শিকার পরিবারের কথা। রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে গুম-খুন ও নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারের মতবিনিময় সভায় কেউ এসেছিলেন গুমের শিকার বাবাকে হারিয়ে একাকী বেড়ে ওঠার গল্প শোনাতে। কেউ বলেছেন স্বামী হারিয়ে বছরের পর বছর কীভাবে অবহেলিত জীবন পার করছেন সেই কথা। আবার কারও কণ্ঠে উচ্চারিত হয়েছে বিচারবহির্ভূত হত্যা ও পৈশাচিক নির্যাতনের লোমহর্ষক বিবরণ।
‘আমরা বিএনপি পরিবার’ ও ‘মায়ের ডাক’-এর যৌথ আয়োজনের এই মতবিনিময় সভায়
সারা দেশ থেকে আসা গুম, খুন ও বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার পরিবারের সদস্য ও স্বজনরা
অংশ নেন। গুম ও রাষ্ট্রীয় সহিংসতার শিকার পরিবারগুলোর কষ্ট এমন গভীর যে সান্ত্বনার
ভাষা খুঁজে পাওয়া কঠিন। আমরা প্রত্যেকটি পরিবারের ব্যথায় সমব্যথী। গুম-খুনের মাধ্যমে
শুধু মাধ্যমে শুধু এক-একটি জীবন কেড়ে নেওয়া হয়নি, বরং গুমের শিকার ব্যক্তির পরিবারকেও
ঠেলে দেওয়া হয়েছে এক অনিশ্চিত-অন্ধকার ভবিষ্যতের দিকে। স্বাভাবিক মৃতের পরিবারের যে
শোক, তা একসময় স্তিমিত হয়ে আসে। কিন্তু গুমের শিকার ব্যক্তির পরিবার প্রতিনিয়ত অনিশ্চয়তার
মাঝে দিন পার করেন। গুম হওয়া মানুষের আপনজনেরা জানেন না তিনি জীবিত নাকি মৃত। মেরে
ফেলা হয়ে থাকলে তার মৃত্যুদিন কবে, শেষকৃত্য হয়েছে কিংবা কোথায় সমাহিত করা হয়েছে সে
খবরও তারা জানেন না। তাদের সামনে একদিকে থাকে গুম হওয়া ব্যক্তির ফিরে আসার আশা, অন্যদিকে
দিনের পর দিন অনিশ্চিত সময় তাদেরকে বিদ্ধ করে যন্ত্রণায়। অন্তহীন অপেক্ষা সেইসব পরিবারকেও
ধুঁকে ধুঁকে নিয়ে যায় মৃত্যুর দিকে। দীর্ঘ দেড় দশকেরও বেশি সময় পুরো দেশে গুম নামের
যে বিভীষিকা ছেয়ে ছিল, আমরা এই নিষ্ঠুরতার অবসান দেখতে চাই। আমরা প্রত্যাশা করি আগামীতে
এমন যন্ত্রণাদায়ক নিষ্ঠুরতার শিকার আর কোনো পরিবারকে হতে হবে না।
গুম কমিশনের চূড়ান্ত তথ্যে জানা যায়, গত সরকারের ১৫ বছরে প্রায় ৬
হাজার মানুষ গুমের শিকার হয়েছেন। এই সংখ্যাটি শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়। এটি আমাদের
ব্যর্থতা ও মানবিকতার হেরে যাওয়ারও এক মর্মান্তিক দলিল। এর দায় রাষ্ট্রের। স্বজন হারানোর
এই বেদনার ভার আমাদের সকলের। গুম-খুন ও নির্যাতনের শিকার হওয়া ব্যক্তি ও তাদের পরিবারকে
ন্যায়বিচার ও সঠিক তথ্য প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে হবে। আমরা প্রত্যাশা করি, ফেব্রুয়ারিতে
অনুষ্ঠিত নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের দ্বারা যে দল বা সংগঠনই সরকার গঠন করুন, তারা গুম-খুনের
অপরাধীদের বিচার নিশ্চিত করবেন। আমরা মনে করি, ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা এবং ভুক্তভোগীদের
সুরক্ষা ও দায়ীদের বিচারের আওতায় আনার মাধ্যমেই এই অন্ধকার থেকে বেরিয়ে আসা সম্ভব।
এজন্য প্রয়োজন রাষ্ট্রীয় অঙ্গীকার। আর এই অঙ্গীকারের মাধ্যমেই সম্ভব গুমের রাজনীতির
অবসান ঘটিয়ে গণতন্ত্রের পথে ফেরা সম্ভব।
সেই সঙ্গে নিখোঁজ ব্যক্তিদের যে পরিবারগুলো এখনও অপেক্ষায়Ñ আমরা
গুমের শিকার হয়ে নিখোঁজ সেই সব ব্যক্তিকে জীবিত অবস্থায় উদ্ধারে অনুসন্ধান অব্যাহত
রাখার তাগিদ দিই। সঙ্গে ভবিষ্যতে যেন জোরপূর্বক গুমের পরিবেশ তৈরি না হয়, সেজন্য আগামীতে
নির্বাচিত হয়ে যারা সরকার গঠন করবেন, তাদের প্রতিও আহ্বান জানিয়ে রাখি। গত দেড়
যুগে দেশে বিরুদ্ধ মত দমাতে এবং জোরপূর্বক শাসনক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখতে গুম-খুনের
যে রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল, আমরা তারও অবসান চাই। রাজনৈতিক কারণে তো বটেই, কোনো
কারণেই যেন বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের কালিমা আর আমাদের ওপরে না লাগে, সে ব্যাপারেও
সতর্ক থাকতে হবে। আইনের শাসনের যে অভাব রয়েছে তা দূর করার পাশাপাশির সবার ক্ষেত্রে
আইনের সমান প্রয়োগও জরুরি। আমরা মনে করি, সুশাসনই নিশ্চিত করবে নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক
পরিবেশ। পারস্পরিক সহমর্মিতায় গড়ে উঠবে সুখী-সমৃদ্ধ বাংলাদেশের ভিত। যেখানে গুম থাকবে
না, রাজনৈতিক কারণে প্রতিপক্ষকে হত্যার ঘৃণ্য চাল থাকবে না। মানুষের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা
থাকবে।