ব্যাংকিং খাত
নিরঞ্জন রায়
প্রকাশ : ১৬ জানুয়ারি ২০২৬ ১২:৪৪ পিএম
কিছুদিন আগে এই পত্রিকায় আধুনিক ব্যাংকিং ব্যবস্থায় চেকের আদৌ প্রয়োজন আছে কি না, সে বিষয়ে একটি লেখা লিখেছিলাম। লেখাটি পড়ে বেশ কয়েকজন পাঠক, যাদের অনেকে আবার পেশায় ব্যাংকার, তারা আমাকে অনুরোধ করেছিলেন ব্যাংকে ব্যবহৃত বিভিন্ন ধরনের চেক নিয়ে লেখার জন্য। তাদের আগ্রহের বিষয়টি বিবেচনা করেই আজকের এই বিষয় নিয়ে লেখা। আমি ব্যাংকিং-সংক্রান্ত যেকোনো বিষয় নিয়ে লিখতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করলেও, চেক নিয়ে লেখা বেশ কষ্টকর। কেননা চেক ব্যাংকিং লেনদেনের ক্ষেত্রে একটি অপরিহার্য হস্তান্তরযোগ্য দলিল, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু বিষয়টি এতটাই জটিল এবং দুর্বোধ্য যে একটি কলাম লিখে বিষয়টি পাঠকদের সামনে তুলে ধরা সম্ভব নয়। এজন্য প্রয়োজন একাডেমিক আলোচনা বা শ্রেণিকক্ষের প্রশিক্ষণ।
আজ
থেকে দেড়শ বছর আগে প্রণীত এন-আই অ্যাক্টের (নেগোশিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্ট অ্যাক্ট ১৮৮১)
অধীনে এই চেক ব্যবহৃত হয়। এন-আই অ্যাক্ট এতটাই জটিল ভাষায় লেখা যে, সাধারণ ব্যাংকার
তো পরের কথা, অনেক আইন পেশার লোকদেরকেই বুঝে উঠতে হিমশিম খেতে হয়। তার ওপর আছে বিভিন্ন
রকমের চেক, যেমনÑ বাহক চেক, অর্ডার চেক এবং দাগ কাটা বা ক্রসড চেক। দাগ কাটা চেক আবার
হরেক রকমের, যেমন শুধু দাগ কাটা চেক, (ওপেন ক্রসড চেক), প্রাপকের হিসাবে প্রদেয় দাগ
কাটা চেক (অ্যাকাউন্ট পেয়ি ক্রসড চেক), ‘অ্যান্ড কো’ লেখা দাগ কাটা চেক এবং ‘নট-নেগোশিয়েবল’
লেখা দাগ কাটা চেক। এতগুলো বিষয় কোনো অবস্থাতেই একটি লেখার মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা সম্ভব
নয়। বিষয়টি সঠিকভাবে বোঝাতে গেলে একটা বই লেখা প্রয়োজন। তারপরও চেষ্টা করব, একটি বিশেষ
ধরনের ‘নট-নেগোশিয়েবল’ লেখা দাগ কাটা চেক নিয়ে আলোচনার।
ব্যাংকিং
লেনদেনে যত ধরনের চেক আছে, তার মধ্যে ‘নট-নেগোশিয়েবল’ লেখা
দাগ কাটা চেক হচ্ছে একটি অদ্ভুত ধরনের হস্তান্তরযোগ্য দলিল বা নেগোশিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্ট।
এটি এমন এক ধরনের চেক, যা কাজির গরু কেতাবে আছে কিন্তু গোয়ালে না থাকার মতো। অর্থাৎ
‘নট-নেগোশিয়েবল’ লেখা দাগ কাটা চেক আইনে ঠিকই আছে, কিন্তু বাস্তবে এর ব্যবহার নেই বললেই
চলে। ব্যাংকিং লেনদেন নিষ্পত্তি হতে এই ধরনের চেক কখনোই ব্যবহৃত হতে দেখা যায় না। আমি
আমার ব্যাংকিং পেশায় কখনোই এই ‘নট-নেগোশিয়েবল’ লেখা দাগ কাটা চেক লেনদেন নিষ্পত্তিতে
ব্যবহার হতে দেখিনি। এমনকি আমি যে সকল জ্যেষ্ঠ ব্যাংকারের সান্নিধ্যে যাওয়ার সুযোগ
পেয়েছিলাম, তাদের সবার কাছে জানতে চেয়েও ব্যর্থ হয়েছি। কেননা তারাও তাদের কর্মজীবনে
কখনও ‘নট-নেগোশিয়েবল’ লেখা দাগ কাটা চেক দিয়ে লেনদেন নিষ্পত্তি হতে দেখিনি। কিন্তু
বাস্তবতা হচ্ছে, আমি এবং আমার জ্যেষ্ঠ ব্যাংকাররা বাস্তবে এই চেক না দেখলেও প্রত্যেকটা
ব্যাংকারকে এই ‘নট-নেগোশিয়েবল’ লেখা দাগ কাটা চেক সম্পর্কে ভালোভাবে জানতে হয়। বিশেষ
করে, প্রশিক্ষণের এবং পদোন্নতির পরীক্ষায় সঠিক উত্তর লেখার জন্য এই বিশেষ ধরনের চেক
সম্পর্কে ভালোভাবে জানা প্রয়োজন।
‘নট-নেগোশিয়েবল’
লেখা দাগ কাটা চেক সম্পর্কে ভালোভাবে জানার প্রবল আগ্রহ থাকলেও খুব সহজে জানা সম্ভব
হয় না। কেননা অধিকাংশ ব্যাংকার এই চেক সম্পর্কে খুব একটা পরিষ্কার ধারণা রাখে না। আমি
নিজেও যে খুব একটা জানি, তেমন নয়। আমার ব্যাংকিং পেশার শুরুতে গুরুত্বপূর্ণ এক প্রশিক্ষণের
সুযোগ পেয়েছিলাম এবং সেই প্রশিক্ষণে এন-আই অ্যাক্ট নিয়ে বিস্তর প্রশিক্ষণ দেওয়ার ব্যবস্থা
ছিল, যার দায়িত্বে ছিলেন খুবই স্বনামধন্য একজন কেন্দ্রীয় ব্যাংকার, যিনি পরবর্তীতে
আমার কর্মরত ব্যাংকের প্রশিক্ষণ একাডেমির প্রধান ছিলেন। আমার কাছে তিনি ছিলেন একজন
পণ্ডিত ব্যাংকার এবং এই এন-আই অ্যাক্টের ওপর ছিল অগাধ জ্ঞান। একদিন প্রশিক্ষণ ক্লাসে
তিনি যখন বিভিন্ন ধরনের দাগকাটা চেক নিয়ে আলোচনা করছিলেন, তখন আমি তার কাছে সুনির্দিষ্টভাবে
‘নট-নেগোসশিয়েবল’ লেখা দাগ কাটা চেক সম্পর্কে জানতে চেয়েছিলাম। এ ব্যাপারে তার সংক্ষিপ্ত
উত্তর ছিল ‘বোঝেন নাই, এটা হচ্ছে চুরিবিদ্যা বড় বিদ্যা, যদি না পড়ে ধরা’। এই বক্তব্য
থেকে আমি আসলে ‘নট-নেগোশিয়েবল’ লেখা দাগ কাটা চেক সম্পর্কে কিছুই জানতে পারিনি। আমি
নিশ্চিত যে আমার সঙ্গে অন্য যারা সেই প্রশিক্ষণে অংশ নিয়েছিল, তারাও এই চেক সম্পর্কে
তখন জানতে পারেনি। পরবর্তীতে আমি বিআইবিএমের (বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট)
অনেক প্রশিক্ষণে অংশ নিয়েছি এবং সব সময়ই এই ধরনের চেক সম্পর্কে জানার চেষ্টা করেও সফল
হতে পারিনি।
সত্যি
বলতে কি, এই ধরনের চেকের ব্যাখ্যা করতে না পারার জন্য আমার সেই শ্রদ্ধেয় প্রশিক্ষক
বা অন্যান্য ব্যাংকার প্রশিক্ষক মোটেই দায়ী নন। এই চেকের ধরনই এমন। চাইলেও খুব সহজে
ব্যাখ্যা করে বোঝানো সম্ভব নয়। ‘নট-নেগোশিয়েবল’ লেখা দাগ কাটা চেক বলতে কী বোঝায়, এর
বৈশিষ্ট্যই বা কী, কীভাবে এবং কোন কোন শর্তে এই চেকের লেনদেন নিষ্পত্তি করা যাবে, তা
কোথাও সেভাবে বিস্তারিত ব্যাখ্যা করে লেখা নেই। আমি অন্তত দেখিনি। তা ছাড়া এই ধরনের
চেক যেহেতু বাস্তবে ব্যবহার হয় না, তাই এর সঠিক ব্যাখ্যা বা বর্ণনা সেভাবে লিপিবদ্ধ
নেই। এমনকি এই চেক নিয়ে আদালতের রায়ও সেভাবে খুঁজে পাওয়া যায় না। এন-আই অ্যাক্ট ১৮৮১-এর
১৩০ ধারায় এই ‘নট-নেগোশিয়েবল’ লেখা দাগ কাটা চেক সম্পর্কে উল্লেখ থাকলেও বিস্তারিত
ব্যাখ্যা নেই। এসব কারণে চাইলেও এই চেক সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায় না।
আমি
নিজের আগ্রহ থেকে এই ‘নট-নেগোশিয়েবল’ লেখা দাগ কাটা চেক সম্পর্কে জানার জন্য আপ্রাণ
চেষ্টা করেছি, কিন্তু পুরোপুরি সফল হয়েছি, তা হয়তো বলা যাবে না। তবে যতটুকু উদ্ধার
করতে পেরেছি, সেটাই আজ পাঠকদের সঙ্গে শেয়ার করলাম। চেকের একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য হচ্ছেÑ
চেক যে ইস্যু করে, তার ওপরই চেক প্রত্যাখ্যানের দায়িত্ব বর্তায়। চেক প্রদানের আগে নিশ্চিত
হতে হয় যে যখন এই চেকের অর্থ প্রদানের জন্য ব্যাংকের কাছে উপস্থাপন করা হবে, তখন ব্যাংক
যেন নিশ্চিতভাবে সেই অর্থ প্রদান করতে পারে। ব্যাংকের হিসেবে অপর্যাপ্ত অর্থ জমা থাকা
বা চেকের অন্য কোনোরকম ভুলত্রুটির জন্য বা এমনকি জালজালিয়াতির কারণে যদি প্রকৃত প্রাপক
চেকের অর্থ না পায়, তাহলে চেক ইস্যুকারী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান দায়ী থাকবে এবং এজন্য
তাকে নানারকম শাস্তির সম্মুখীন হতে হবে। এই দায়মুক্তির একটি উপায় হিসেবে দাগকাটা চেকে
‘নট-নেগোশিয়েবল’ লিখে চেকটি প্রদান করা হয়। এই কথাগুলো লেখার অর্থ হচ্ছেÑ প্রাপক চেকের
অর্থ পেলে ভালো। আর যদি কোনো কারণে চেকের অর্থ ব্যাংক থেকে না পায়, তাহলে চেক ইস্যুকারীকে
কোনো অবস্থাতেই দায়ী করা যাবে না। এক কথায় এই ধরনের চেকের অর্থ হচ্ছেÑ টাকা পেলে ভালো,
না পেলে আমার কোনো দোষ নেই।
এখন
প্রশ্ন হচ্ছেÑ অর্থ প্রাপ্তির পুরো অনিশ্চয়তা থাকা সত্ত্বেও এই ধরনের চেক কেনই-বা ইস্যু
করা হয় এবং প্রাপক গ্রহণই-বা করবে কেন? অনেক সময় দেনাদারকে বা অর্থ প্রদানে বাধ্য ব্যক্তি
বা প্রতিষ্ঠানকে ইচ্ছার বিরুদ্ধে চেক ইস্যু করতে হয়। যেমন, অনেক সময় পাওনাদার জোর দিয়ে
বলার চেষ্টা করে যে টাকা পরে দিলেও চলবে, এখন অন্তত একটা চেক দেন। যতই দেনাদার বোঝানোর
চেষ্টা করুক না কেন যে ব্যাংকে টাকা জমা থাকার নিশ্চয়তা নেই, তাই তিনি চেক দিতে চান
না। কিন্তু পাওনাদার মানতে রাজি না। তিনি পাওনা টাকার সপক্ষে একটি চেক নিতে বদ্ধপরিকর।
এরকম অবস্থায় দেনাদার ‘নট-নেগোশিয়েবল’ লেখা দাগ কাটা চেক প্রদান করে এই কারণে যে, তিনি
তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে চেক ইস্যু করেছেন, যাতে করে এই চেক প্রত্যাখ্যাত হলে প্রাপক তার
বিরুদ্ধে কোনোরকম আইনগত ব্যবস্থা নিতে না পারে। সাধারণত কোনো প্রাপক এই ধরনের চেক গ্রহণ
করবে না। এরপরও অনেকে এই যুক্তিতে গ্রহণ করতে পারে যে চেক প্রত্যাখ্যানের জন্য দেনাদারকে
দায়ী করা না গেলেও, তিনি যে চেক ইস্যুকারী ব্যক্তির কাছে প্রকৃতই অর্থ পান, সেটি অন্তত
প্রমাণ হয়ে যাবে।
আইনের ব্যাখ্যায় যাই থাকুক না কেন এবং আইনের দৃষ্টিতে যতই বৈধ লেনদেনের মাধ্যম হোক না কেন, যে চেকের অর্থ প্রাপ্তির নিশ্চয়তা নেই এবং যে চেকের অর্থ না পাওয়ার কারণে ইস্যুকারী ব্যক্তিকে দায়ী করা যায় না, সেই চেককেও স্বজ্ঞানে গ্রহণ করবে না, তা সে এমনিতেই বা জোর করেই নেওয়া হোক না কেন। আর এ কারণেই ‘নট-নেগোশিয়েবল’ লেখা দাগ কাটা চেক বাস্তবে লেনদেন নিষ্পত্তিতে ব্যবহার হতে দেখা যায় না। এরপরও আমাদের দেশে ব্যাংকিং কার্যক্রমে এই চেকের উল্লেখ আছে এবং প্রত্যেক ব্যাংকারকে এরকম একটি জটিল ও দুর্বোধ্য চেক সম্পর্কে জানতে হয়। এমনকি এন-আই অ্যাক্টে এখনও এই চেকের উল্লেখ আছে। উন্নত বিশ্বসহ অনেক উন্নয়নশীল দেশে এই ধরনের চেকের কথা অনেক আগেই বাতিল হয়ে গেছে। আমাদের দেশে কেন এখনও চালু আছে, তা আমার কাছে বোধগম্য নয়।
নিরঞ্জন রায়
সার্টিফাইড অ্যান্টি-মানি লন্ডারিং স্পেশালিস্ট ও ব্যাংকার, টরন্টো, কানাডা