প্রধান উপদেষ্টার আহ্বান
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ১৫ জানুয়ারি ২০২৬ ১৩:০১ পিএম
দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে তরুণদের প্রত্যাশা ও আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ রেখে গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। একই সঙ্গে আঞ্চলিক পর্যায়ে উচ্চশিক্ষায় সহযোগিতা বাড়াতে সার্ককে পুনরুজ্জীবিত করার ওপর জোর দিয়েছেন তিনি। ১৩ জানুয়ারি ঢাকায় তিন দিনব্যাপী ‘দক্ষিণ এশিয়ার উচ্চশিক্ষার বর্তমান অবস্থা ও ভবিষ্যৎ পথনির্দেশনা’ শীর্ষক আঞ্চলিক সম্মেলন (সার্চে-২০২৬)-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে শিক্ষার্থীদের ভূমিকার কথা তুলে ধরে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, কয়েক মাস আগেই এই শহরে তরুণরা কেন অস্ত্রের মুখে দাঁড়িয়ে নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছিল তাদের প্রত্যাশা ও আকাঙ্ক্ষা কী ছিল, তা বোঝার চেষ্টা না করলে একটি বড় সুযোগ নষ্ট হবে। এই তরুণদের নিজেদের চিন্তা ও মনন আছে। তারা অধিকার আদায়ে ফ্যাসিবাদী শাসনের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে জীবন দিয়ে প্রতিবাদ করেছে।
আমাদের বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা মৌলিকভাবে
চাকরিকেন্দ্রিক। শিক্ষার উদ্দেশ্য কেবল চাকরির জন্য মানুষ তৈরি করা তিনি এই ধারণা
থেকে বেরিয়ে আসার আহ্বান জানান। তার মতে, মানুষ জন্মগতভাবেই সৃজনশীল; সৃজনশীলতাই মানবসভ্যতার
মূল শক্তি। চাকরি-নির্ভর শিক্ষা সেই সৃজনশীল মানুষকে দাসে পরিণত করে। তিনি মনে করেন,
শিক্ষাব্যবস্থার লক্ষ্য হওয়া উচিত তরুণদের উদ্যোক্তা ও পরিবর্তনের কারিগর হিসেবে গড়ে
তোলা। ঢাকায় উচ্চপর্যায়ের শিক্ষাবিদদের এ সন্মেলনকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলেও তিনি
মন্তব্য করেন। বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) অধীনে বাংলাদেশ সরকার
ও বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে বাস্তবায়িত হায়ার এডুকেশন অ্যাকসেলারেশন অ্যান্ড ট্রান্সফরমেশন
(হিট) প্রকল্পের আওতায় এই সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। এতে যুক্তরাজ্য, মালদ্বীপ, মালয়েশিয়া,
নেপাল, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কাসহ বিভিন্ন দেশের ৩০ জন আন্তর্জাতিক প্রতিনিধি এবং বিশ্বব্যাংকের
প্রতিনিধিরা অংশ নিচ্ছেন। সন্মেলন আজ বৃহস্পতিবার শেষ হচ্ছে।
তরুণদের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে মিল রেখে শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে প্রধান
উপদেষ্টার এই আহ্বান নিঃসন্দেহে সময়োপযোগী ও বাস্তবতানির্ভর। কারণ একটি দেশের ভবিষ্যৎ
নির্ধারিত হয় তার তরুণ প্রজন্মের চিন্তা, দক্ষতা ও মূল্যবোধের মাধ্যমে। অথচ দীর্ঘদিন
ধরে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা বাস্তব জীবনের চাহিদা, কর্মবাজারের পরিবর্তন এবং তরুণদের
স্বপ্ন-সম্ভাবনার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে ব্যর্থ হচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে প্রধান উপদেষ্টার
বক্তব্য শুধু নীতিগত ঘোষণা নয়; এটি একটি জরুরি সংস্কারের দিকনির্দেশনাও বলা যায়।
অস্বীকার করার সুযোগ নেই, বর্তমান শিক্ষা-কাঠামো এখনও মুখস্থ-নির্ভর,
পরীক্ষাকেন্দ্রিক ও সনদপ্রধান। তাই শিক্ষার্থীরা ভালো ফলের পেছনে ছোটে। যে কারণে তারা
জীবনঘনিষ্ঠ দক্ষতা, সৃজনশীলতা, সমালোচনামূলক চিন্তা কিংবা প্রযুক্তিগত সক্ষমতা অর্জনে
পিছিয়ে পড়ছে। তরুণরা আজ বৈশ্বিক বাস্তবতায় নিজেদের জায়গা করে নিতে চায়। তারা চায় উদ্ভাবনী
শিক্ষা, ডিজিটাল দক্ষতা, উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ এবং নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধের বিকাশ।
বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় এসব আকাঙ্ক্ষা ধারণ জরুরি।
স্বীকার করতে হবে, একদিকে আমাদের চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের চ্যালেঞ্জ,
অন্যদিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অটোমেশন ও ডিজিটাল অর্থনীতির বিস্তারÑ এই বাস্তবতায়
পাঠ্যক্রমে দ্রুত সংস্কার অপরিহার্য। বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিতের পাশাপাশি
মানববিদ্যা, পরিবেশ শিক্ষা, নাগরিকত্ব ও নৈতিকতার সমন্বয় প্রয়োজন। শুধু বিশ্ববিদ্যালয়
নয়, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তর থেকেই সমস্যা সমাধান, দলগত কাজ, যোগাযোগ দক্ষতা ও সৃজনশীলতার
চর্চা নিশ্চিত করতে হবে।
তরুণদের আরেকটি বড় আকাঙ্ক্ষা হলো কর্মসংস্থান। শিক্ষা ও চাকরির বাজারের
মধ্যে যে গভীর ফাঁক রয়েছে, তা কমাতে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষাকে সামাজিক মর্যাদা
দিতে হবে। ইন্টার্নশিপ, অ্যাপ্রেন্টিসশিপ, শিল্প-শিক্ষা সংযোগ এবং স্থানীয় ও বৈশ্বিক
চাহিদাভিত্তিক দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি জোরদার করা জরুরি। একই সঙ্গে উদ্যোক্তা শিক্ষা
ও স্টার্টআপ সংস্কৃতি গড়ে তুললে তরুণরা চাকরিপ্রার্থী নয়, চাকরিদাতা হিসেবেও আত্মপ্রকাশ
করতে পারবে, যা প্রধান উপদেষ্টার ভাষণে উঠে এসেছে।
আমরা মনে করি, তরুণদের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ শিক্ষাব্যবস্থা
গড়ে তোলা মানে কেবল পাঠ্যবই বদলানো নয়Ñ এটি একটি দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন। রাষ্ট্র, শিক্ষা
প্রশাসন, শিক্ষক, অভিভাবক ও শিক্ষার্থীÑ সবার সম্মিলিত উদ্যোগেই সম্ভব এই রূপান্তর।
আমাদের বিশ্বাস, প্রধান উপদেষ্টার আহ্বান বাস্তবায়িত হলে শিক্ষা হবে জীবনের জন্য, জীবিকার
জন্য এবং একটি আলোকিত ভবিষ্যতের জন্য। আমরা চাই, শিক্ষা
হোক জীবনমুখী ও যুগোপযোগী।