× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

প্রেক্ষাপট

গণভোট প্রশ্নে বিএনপির অবস্থান কি?

রাসেল আহমদ

প্রকাশ : ১৪ জানুয়ারি ২০২৬ ১১:৪৪ এএম

 গণভোট প্রশ্নে বিএনপির অবস্থান কি?

অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ১৩ নভেম্বর ২০২৫ তারিখে জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের রূপরেখা ঘোষণা করেছেন। ওই ভাষণে জানানো হয়, জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট একই দিনে অনুষ্ঠিত হবে এবং নির্বাচন কমিশন সে লক্ষ্যে ভোট গ্রহণের সময় এক ঘণ্টা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

এর আগে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা শেষে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন ছয়টি সংস্কার কমিশনের ৮৪টি প্রস্তাব নিয়ে জুলাই জাতীয় সনদ তৈরি করে। এর মধ্যে ৪৮টি প্রস্তাব সরাসরি সংবিধান সংশ্লিষ্ট। তবে এসব প্রস্তাবের একটি বড় অংশে বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ভিন্নমত ও আপত্তি ছিল, যা নোট অব ডিসেন্ট হিসেবে সংযুক্ত করা হয়।

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে একই দিনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট আয়োজনের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের লক্ষ্যে অন্তর্বর্তী সরকার দুটি আইনগত দলিল জারি করেছে ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫’ এবং ‘গণভোট অধ্যাদেশ, ২০২৫’। এখানেই প্রথম বড় প্রশ্নটি সামনে আসে।

সংবিধানের ১৫২(১) অনুচ্ছেদে ‘আইন’-এর সংজ্ঞায় আদেশ শব্দটি থাকলেও রাষ্ট্রপতির স্বতন্ত্র আইনগত আদেশ জারির কোনো বিধান সংবিধানে নেই। সংবিধানের ৯৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি সংসদের অনুপস্থিতিতে কেবল অধ্যাদেশ জারি করতে পারেন। সে বিবেচনায় রাষ্ট্রপতির আদেশের মাধ্যমে গণভোটের ঘোষণা সাংবিধানিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ বলেই মনে হয়। এরপর আসে গণভোটের প্রশ্ন কাঠামোর বিষয়টি। সরকার সংবিধান সংস্কার-সংক্রান্ত ৪৮টি প্রস্তাবকে একত্র করে একটি ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ প্রশ্ন তৈরি করেছে, যার ভেতরে রয়েছে চারটি বড় উপ-প্রশ্ন। বাস্তবে এর অর্থ হলো, ভোটার যদি চারটির মধ্যে এক বা একাধিক প্রস্তাবে ভিন্নমত পোষণ করেন, তবুও তাকে একটি সামগ্রিক উত্তরের দিকে যেতে বাধ্য করা হবে। এতে নাগরিকের স্বতন্ত্র মতামতের প্রকাশ কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়ে।

গণভোটের মতো একটি গুরুতর ও মৌলিক প্রক্রিয়ায় এ ধরনের প্রশ্ন কাঠামো গণতান্ত্রিক চর্চার সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ সেই প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক। আরও বড় বাস্তবতা হলো, জটিল সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক প্রস্তাব সাধারণ ভোটার কতটা বুঝে সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন, তা নিয়েও সংশয় রয়েছে। ফলে এই গণভোট প্রকৃত অর্থে জনমতের প্রতিফলন হবে, নাকি কেবল একটি প্রতীকী আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হবে, তা নিয়ে সন্দেহ থেকেই যায়।

বাংলাদেশের ইতিহাসেও গণভোটের অভিজ্ঞতা আশাব্যঞ্জক নয়। ১৯৭৭, ১৯৮৫ ও ১৯৯১ সালের গণভোটগুলোতে কাগজে-কলমে বিপুল ভোট পড়ার দাবি থাকলেও গবেষণা ও বিশ্লেষণে দেখা যায়, বাস্তবে জনগণের অংশগ্রহণ ছিল সীমিত এবং ফলাফল ছিল ক্ষমতাসীনদের প্রত্যাশানুযায়ী। অর্থাৎ গণভোট বারবারই রাজনৈতিক বৈধতা তৈরির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।

এ অবস্থায় জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সেই সুপারিশ বিশেষভাবে উদ্বেগজনক, যেখানে বলা হয়েছে, আগামী সংসদ প্রথম ২৭০ দিন সংবিধান সংস্কার পরিষদ হিসেবে কাজ করবে এবং গণভোটে পাস হওয়ার প্রস্তাবগুলো নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সংবিধানে যুক্ত করতে হবে; অন্যথায় সেগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংবিধানের অংশ হয়ে যাবে। সাংবিধানিক গণতন্ত্রে এমন ‘স্বয়ংক্রিয় সংশোধন’ ধারণা নজিরবিহীন। সংবিধান পরিবর্তন সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ মতামতের মাধ্যমেই হতে হয়; গণভোট কখনোই সংসদীয় বিতর্ক ও সিদ্ধান্তের বিকল্প হতে পারে না।

এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সংসদের মর্যাদা ও জনপ্রতিনিধিদের ভূমিকা খর্ব হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। যেহেতু সংসদ সদস্যরাই জনগণের প্রত্যক্ষ প্রতিনিধি, সেহেতু সংসদকে পাশ কাটিয়ে সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া মানে জনগণের ক্ষমতাকেই সীমিত করা।

এই প্রেক্ষাপটে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের নামে যে গণভোট আয়োজনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তার রাজনৈতিক পরিণতি অনুমান করা কঠিন নয়। অন্তর্বর্তী সরকার ও তাদের সমর্থক রাজনৈতিক জোট যেকোনো মূল্যে ‘হ্যাঁ’ ভোট নিশ্চিত করতে সচেষ্ট হবে, এমন আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। এতে নির্বাচনোত্তর রাজনীতিতে নতুন অস্থিরতা তৈরি হওয়ার ঝুঁকিও রয়ে যায়।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য সবচেয়ে জরুরি হলো একটি গ্রহণযোগ্য জাতীয় নির্বাচন এবং নির্বাচিত সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর। এই মুহূর্তে দেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে বিএনপির দায়িত্ব কেবল নির্বাচনে অংশ নেওয়া নয়; বরং আইনগত ও সাংবিধানিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ এই গণভোট বিষয়ে নিজেদের অবস্থান জনগণের সামনে সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরা। নীরবতা বা অস্পষ্টতা এখানে রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় উভয় ক্ষেত্রেই ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।



  রাসেল আহমদ

সাংবাদিক ও কলাম লেখক

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা