ইন্টারনেট
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ১৩ জানুয়ারি ২০২৬ ১০:৩৯ এএম
ইন্টারনেট এখন মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অপরিহার্য অংশ। নিত্যদিনের যোগাযোগ, তথ্য জানা ও আদান-প্রদান করা, বৈদ্যুতিক মিটার রিচার্জ করা, মোবাইলে আর্থিক সেবা গ্রহণ, ব্যাংকিং, বিভিন্ন ক্লিয়ারেন্সসহ নানা পরিষেবা এখন ইন্টারনেটের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। ব্যবসায়িক যোগাযোগ, আর্থিক লেনদেনসহ বাণিজ্যের ক্ষেত্রও ইন্টারনেট পরিষেবার ওপর নির্ভরশীল। ইন্টারনেট সুবিধার অভাবে এসব গুরুত্বপূর্ণ কাজ বাধাগ্রস্ত হলে, ভোগান্তি চরমে পৌঁছে। অপ্রিয় হলেও সত্য, বাংলাদেশে ইন্টারনেট সেবার মান ও উচ্চমূল্য নিয়ে গ্রাহকদের রয়েছে একগাদা অভিযোগ। এমন বাস্তবতায়, ইন্টারনেট নিয়ে বড় সুখবরের কথা শোনা গেল। এবার মাসিক মূল্য অপরিবর্তিত রেখেই উন্নত ও দ্রুতগতির ইন্টারনেট সেবা নিশ্চিত করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশনস কোম্পানি লিমিটেড (বিটিসিএল)। নতুন এই উদ্যোগের ফলে বিদ্যমান সব ইন্টারনেট প্যাকেজে সর্বোচ্চ তিনগুণ পর্যন্ত গতি বৃদ্ধি পাবে।
১১ জানুয়ারি রবিবার ডাক, টেলিযোগাযোগ
ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়,
গ্রাহকরা একই খরচে আগের তুলনায় অনেক বেশি গতির ইন্টারনেট সুবিধা পাবেন। এতে অনলাইন
শিক্ষা, অফিসিয়াল কাজ, ভিডিও স্ট্রিমিং ও গেমিংসহ বিভিন্ন স্মার্ট সেবা ব্যবহারে নতুন
গতি আসবে। গ্রাহক সন্তুষ্টি ও মানসম্মত সেবা
নিশ্চিত করার বিটিসিএলের এই উদ্যোগকে
আমরা স্বাগত জানাই। আমরা মনে করি, এই উদ্যোগ গ্রাহকদের আরও নির্ভরযোগ্য, দ্রুত ও মানসম্মত
ইন্টারনেট সেবা নিশ্চিত করবে। এতে দেশের ডিজিটাল রূপান্তরের গতি আরও বৃদ্ধি পাবে।
বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের
(বিটিআরসি) মতে, বর্তমানে দেশে মোট ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ১৩ কোটির বেশি।
এর মধ্যে মোবাইল ইন্টারনেট গ্রাহক ১১ কোটি ৬০ লাখ আর ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট গ্রাহক
১ কোটি ৪০ লাখ। তবে চড়া দামের প্যাকেজনির্ভর মোবাইল ইন্টারনেট প্রান্তিক পর্যায়ে
পৌঁছলেও নানা কারণে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সেবা কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় জনগণের দোরগোড়ায়
পৌঁছেনি। ফলে গতিময় ইন্টারনেট থেকে যে সুবিধা আমাদের পাওয়ার সুযোগ ছিল তা থেকে
আমরা বঞ্চিত। আশার কথা হচ্ছে, অন্তর্বর্তী সরকার এ খাতটিকে ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ
নিয়েছে। ইতোমধ্যে ‘টেলিযোগাযোগ নেটওয়ার্ক ও লাইসেন্সিং ব্যবস্থার সংস্কার
নীতিমালা ২০২৫ (খসড়া)’ প্রকাশ করেছে বিটিআরসি। নতুন এই উদ্যোগ তারই অংশ বলে আমরা
মনে করি।
এ কথা সত্য, ডিজিটাল বাংলাদেশ থেকে স্মার্ট বাংলাদেশের যাত্রাপথে
ইন্টারনেট এখন আর বিলাসিতা নয় এটি আরও মৌলিক সংযোজন। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ব্যবসা-বাণিজ্য,
প্রশাসন কিংবা যোগাযোগÑ সবখানেই নির্ভরতা ইন্টারনেটের ওপর। দীর্ঘদিন ধরেই দেশের সাধারণ
গ্রাহকরা উচ্চমূল্য, ধীরগতি ও অনির্ভরযোগ্য ইন্টারনেট সেবার অভিযোগ করে আসছেন। এই প্রেক্ষাপটে
বিটিসিএল বিদ্যমান খরচে উন্নত ও দ্রুতগতির ইন্টারনেট সেবা চালু করে যে উদ্যোগ নিয়েছে
তা নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার।
বলা বাহুল্য, বিটিসিএল রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান হওয়ায় এর
প্রতি জনগণের প্রত্যাশাও বরাবর বেশি। দীর্ঘদিন লোকসান, অব্যবস্থাপনা ও আধুনিকায়নের
ঘাটতিতে থাকা এই প্রতিষ্ঠানটি সম্প্রতি ফাইবার অপটিক নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ ও ব্যয় কমানোর
দিকে মনোযোগ দিয়েছে। এতে গ্রাহকদের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ কমছে, একই সঙ্গে ইন্টারনেটের
গতি ও স্থিতিশীলতা বাড়ছে। সংবাদটি শুধু শহরেই নয়, গ্রাম ও মফস্বল অঞ্চলের জন্যও অত্যন্ত
ইতিবাচক।
বাস্তবতা হচ্ছে, বেসরকারি আইএসপি ও মোবাইল অপারেটরদের তুলনায় অনেক
ক্ষেত্রে ইন্টারনেট এখনও ব্যয়বহুল। সেখানে বিটিসিএলের এই উদ্যোগ বাজারে এক ধরনের ভারসাম্য
তৈরি করতে পারে। প্রতিযোগিতা বাড়লে সেবার মান যেমন বাড়ে, তেমনি দামও সহনীয় পর্যায়ে
আসে। ফলে ভোক্তা সরাসরি উপকৃত হন। এই সেবার ফলে দূরত্বজনিত বৈষম্য কমবে, প্রত্যন্ত
এলাকার শিক্ষার্থী, উদ্যোক্তা ও ফ্রিল্যান্সাররা দ্রুতগতির ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ
পাবেন। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলোÑ সরকারি দপ্তর, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও স্বাস্থ্য খাতে
নির্ভরযোগ্য ইন্টারনেট সংযোগ নিশ্চিত করা। বিটিসিএলের ফাইবার নেটওয়ার্ক যদি পরিকল্পিতভাবে
বিস্তৃত করা যায়, তবে ই-গভর্ন্যান্স, অনলাইন শিক্ষা ও টেলিমেডিসিন আরও কার্যকর হবে।
এতে সরকারের ডিজিটাল রূপান্তর লক্ষ্যও ত্বরান্বিত হবে।
বিটিসিএলের এই উদ্যোগকে সফল করতে কয়েকটি বিষয়ে নজর দেওয়া জরুরি। শুধু
সংযোগ দিলেই হবে নাÑ নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, গ্রাহকসেবা উন্নয়ন এবং দ্রুত সমস্যার সমাধান
নিশ্চিত করতে হবে। অতীতের মতো যেন লাইন বিচ্ছিন্নতা, ধীরগতির অভিযোগ বা সেবা পেতে দীর্ঘ
অপেক্ষার চিত্র ফিরে না আসে, সেদিকে কঠোর দৃষ্টি প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে বলা যায়, বিদ্যমান খরচে উন্নত ও দ্রুতগতির ইন্টারনেট সেবা চালুর মাধ্যমে বিটিসিএল নতুন করে আস্থার জায়গা তৈরি করার সুযোগ পেয়েছে। সঠিক পরিকল্পনা, স্বচ্ছতা ও আধুনিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এই উদ্যোগ বাস্তবায়ন হলে বিটিসিএল আবারও টেলিযোগাযোগ খাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে। আমার কথা, সরকার সব খাতকে ডিজিটালাইজেশন করার উদ্যোগ নিয়েছে। সেই আলোকে সেবার পরিধি, মান এবং সাশ্রয়ী করার এই উদ্যোগ কার্যত সময়েরই দাবি।