× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

পরিবেশ

বিল ভরাট কি বন্ধ হবে

ড. বিভূতি ভূষণ মিত্র

প্রকাশ : ০৮ জানুয়ারি ২০২৬ ১১:০৩ এএম

আপডেট : ০৮ জানুয়ারি ২০২৬ ১১:১২ এএম

 বিল ভরাট কি বন্ধ হবে

বেশ কিছুদিন আগে একটি পত্রিকার খবরে প্রকাশ যে কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রাম উপজেলার রোদ্দা-মামদা-পাতিদিয়া-ডুইয়া বিলের ওপর নির্ভরশীল মানুষগুলো মানবেতর জীবন যাপন করছে। কারণ এইসব বিল ভরাট হয়ে যাওয়ায় এখন আর মাছ নেই। মাছ নেই মানে আয় নেই। সেখানকার জেলেরা সংসার চালাতে পারছেন না। যদিও সেখানকার সমিতির মতে বিলটি ভরাট হয়েছে প্রাকৃতিক কারণে। এখানকার প্রায় ৬০ একর জায়গা প্রাকৃতিক কারণে বালু জমে ভরাট হয়ে গেছে। এতে করে মাছ উৎপাদন হয় না বললেই চলে। জেলে পরিবারগুলো এখন দিনমজুরি করে কোনোরকমে সংসার চালায়।

এমন বিলভরাটের ঘটনা একটি বা দুইটি নয়। খোদ ঢাকা শহরেই প্রশাসনের নাকের ডগায় খাল-বিল ভরাট করে চলছে বহুতল ভবন নির্মাণ। আড়িয়াল বিলের কথাই মনে করা যাক। ২০২৪ সালেরই সেপ্টেম্বর মাসে আড়িয়াল বিল নিয়ে একটি সংবাদ পত্রিকায় আসে। সংবাদে মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগরের আড়িয়াল বিল নিয়ে পরিবেশ উপদেষ্টার একটি বক্তব্য উঠে আসে। তাতে দেখা যায়, পরিবেশ উপদেষ্টা আড়িয়াল বিলে কে বা কারা মাটি ভরাট করছে এমন বিষয় অবহিত করেন এবং দ্রুত এর বিরুদ্ধে স্থানীয় প্রশাসনকে উদ্যোগ নিতে বলেন। সেই সঙ্গে তিনি এও জানান, আড়িয়াল বিলে কোনো ধরনের আবাসন ও শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠবে না। জীববৈচিত্র্য ও কৃষি খাতে ফসল উৎপাদনের স্বাভাবিকতা ফিরিয়ে আনতে তিনি যেকোনো মূল্যে অবৈধ আবাসন ও মাটি কাটা বন্ধের কঠোর নির্দেশনা দেন। একটি পত্রিকার প্রতিবেদন অনুযায়ী আড়িয়াল বিল এখন হাউজিং কোম্পানি ও বাণিজ্যিক দখলদারদের দখলে চলে গেছে। হাউজিং ব্যবসায়ীরা ড্রেজার দিয়ে কৃষি ও সরকারি খাস জমিসহ খাল, দিঘি, পুকুর ভরাট করে চলেছে। একসময় এখানে আড়িয়াল বিল রক্ষা কমিটিও গঠন করা হয়েছিল। ২০১১ সালের কথা। সে সময় আড়িয়াল বিলে একটি বিমানবন্দর করার পরিকল্পনা করা হয়েছিল। এ সময় হাজার হাজার কৃষক, নারী-পুরুষের আন্দোলনের মুখে সরকার সে প্রকল্প থেকে সরে দাঁড়ায়। কিন্তু সেই কৃষকরাই এখন অধিক টাকার লোভে হাউজিং কোম্পানির দালালদের কাছে বিক্রি করে দিচ্ছে তাদের বাপদাদার জমি। হাউজিং কোম্পানিগুলো ডোবা-নালা-খাল-বিল ভরাট করে জমি দখল নিচ্ছে। যদিও ২০২৩ সালে হাইকোর্ট আড়িয়াল বিলের জমি দখল ও মাটি ভরাট বন্ধে একটি নির্দেশ দেয়। হাউজিং কোম্পাগিুলো নানা ধরনের বিলবোর্ড টানিয়ে সেখানকার জলাধার বালু দিয়ে ভরাট করে চলেছে, যদিও প্রাকৃতিক জলাধার সংরক্ষণ আইন ২০০০ অনুযায়ী কোনো জলাধার ভরাট করা বে-আইনি।

বিল হলো এক ধরনের বিশাল জলাভূমি। এটি মূলত নিম্নভূমি। বর্ষাকাল এলে তা পানিতে ভরে যায়। বাংলাদেশের প্রধার প্রধান বিলগুলো হলোÑ চলন বিল, বিল ডাকাতিয়া, তামাবিল, আড়িয়াল বিল, গাজনার বিল ইত্যাদি। ছোট-বড় মিলিয়ে বাংলাদেশে এরকম বিলের সংখ্যা ১০০০-এরও বেশি। বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে রয়েছে বড় বিল, তাগরাই বিল, লুনিপুকুর বিল, বড় মির্জাপুর, নড়াইল ও কেশপাথার বিল। দক্ষিণাঞ্চলে রয়েছে বয়রা, ডাকাতিয়া, বড় বিল, কোলা, পটলা, চাতাল ও শ্রীরামপুর বিল। দেশের পূর্বাঞ্চলের বিলগুলো অনেক ছোট। এ সমস্ত বিল দিন দিন হারানোর পথে। অনেক বিল সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে। একটি তথ্য মতে, ঊনবিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে চলন বিলের আয়তন ছিল ১০৮৫ বর্গকিলোমিটার। ১৯০৯ সালে এর আয়তন কমে হয়েছে ৩৬৪ বর্গকিলোমিটার। বর্তমানে এটি আরও সংকুচিত হয়ে হয়েছে মাত্র ২৬ বর্গকিলোমিটার। বিল সংকোচনের মূল কারণ নদীবাহিত পলি জমা, অবকাঠামোগত উন্নয়ন, দখল ও দূষণ, জলপ্রবাহ হ্রাস। আত্রাই ও বড়াল নদী থেকে আসা পলি জমে বিল ভরাট হয়ে যাচ্ছে। রেলপথ, সড়ক, বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ইত্যাদি নির্মাণের কারণেও বিল ভরাট হচ্ছে। যেমন ঈশ্বরদী-সিরাজগঞ্জ রেললাইনের কারণে বিল ভরাট হচ্ছে, আবার হাটিকুমরুল-বনপাড়া এ ধরনের মহাসড়কের কারণে বিল মরে যাচ্ছে। শিল্পপ্রতিষ্ঠান স্থাপন, নদী-জলাশয়-লেক-জলাভূমিতে বসতবাড়ি নির্মাণ, জলাশয়ে পয়োপ্রণালি স্থাপন, বিভিন্ন তরল ও কঠিন বর্জ্য নির্গমন, বালি-পাথর আহরণ ইত্যাদির কারণেও ধ্বংস হচ্ছে বিল।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের তথ্য মতে, সারা দেশে প্রতিবছর ৪২ হাজার একর কৃষিজমি ও জলাশয় ভরাট হচ্ছে। তাদের মতে, ২০১৫ সালে ঢাকা শহরে সবুজ এলাকা ও ফাঁকা জায়গা ছিল ৫৩.১১ বর্গকিলোমিটার। ২০২৩ সালে তা কমে হয়েছে ২৯.৮৫ বর্গকিলোমিটার। ১৯৯৫ সালে ঢাকায় জলাভূমি ও জলাধার ছিল ৩০.২৪ বর্গকিলোমিটার। জলাভূমি ভরাট হতে হতে এখন তা হয়েছে মাত্র ৪.২৮ বর্গকিলোমিটার। জলাধার শুধু কমে যাওয়া নয় এখানকার ভূগর্ভস্থ পানির স্তরও নিচে নেমে যাচ্ছে দিন দিন। বিশেষজ্ঞদের মতে, যদিও একটি শহরে কমপক্ষে ১৫% জলাধার থাকা দরকার, কিন্তু বাস্তবে এখন তা ৪-৫%-এরও কম। ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার মডেলিংয়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী ঢাকায় ১৯৮৫ সাল থেকে এখন পর্যন্ত ১ হাজার হেক্টরের বেশি জলাভূমি নাই হয়ে গেছে। তাদের মতে, এভাবে চলতে থাকলে ২০৩১ সালের মধ্যে জলাভূমির পরিমাণ ১০ ভাগেরও নিচে নেমে আসবে। ঢাকা জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী সেখানে খালের সংখ্যা ৪৭টি। রিভার অ্যান্ড ডেলটা রিসার্চ সেন্টারের হিসাব মতে, ঢাকায় ৫৬টি খাল খাকার কথা থাকলেও সবগুলোই প্রায় মৃত। যদিও ২৬টি খাল উদ্ধারের পরিকল্পনা নিয়েছে দুই সিটি করপোরেশন। ভূমি মন্ত্রণালয়ের এক জরিপ অনুযায়ী বাংলাদেশের জলাভূমি গত ৫০ বছরে ৭০ ভাগ কমে গেছে। ১৯৭১ সালে জলাভূমির পরিমাণ ছিল ৯৩ লাখ হেক্টর। তা কমে এখন হয়েছে ২৮ লাখ হেক্টরে। অর্থাৎ ৬৫ লাখ হেক্টর জলাভূমি কমেছে।

জলাধার সংরক্ষণ আইন-২০০০ অনুযায়ী কোনো পুকুর, জলাশয়, নদী, খাল ইত্যাদি ভরাট করা বে-আইনি। প্রাকৃতিক জলাধার হিসেবে চিহ্নিত জায়গায় কোনো ব্যবহার, ভাড়া, ইজারা বা হস্তান্তর বে-আইনি। এই বিধি লঙ্ঘন করলে ৫ বছরের কারাদণ্ড বা অনধিক ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। পরিবেশ সংরক্ষণ আইন সংশোধিত (২০১০) অনুযায়ীও যেকোনো ধরনের জলাশয় ভরাট করা নিষিদ্ধ। সম্প্রতি বন, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় ও পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় উপদেষ্টা রিজওয়ানা হাসান বলেছেন, প্রাকৃতিক জলাভূমি এবং জীববৈচিত্র্য রক্ষা এখন সময়ের দাবি। গাজীপুরের কাপাসিয়া এলাকায় কাতুরিয়া বিল পরিদর্শনের আগে তিনি বলেন, বিল ভরাট করা যাবে না। এতে খাদ্য নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়বে। শিল্পদূষণ থেকেও বিলকে বাঁচাতে হবে। কিন্তু কেউ কি শুনছে কারও কথা। সেদিন পত্রিকায় খিলগাঁওয়ের এক বাসিন্দার বক্তব্য প্রকাশ করেছে। তাতে তিনি বলেছেন, খিলগাঁওয়ের জমিতে তিনি ফসল ফলিয়েছেন। গেল এক দশকে সেখানে বালু ফেলে জলাভূমি ভরাট করে নির্মিত হয়েছে বহুতল ভবন। উনি চিন্তিত এই ভবনগুলো কি ঝুঁকিমুক্ত? আমরা জানি না এই সব জলাধার ভরাটের শাস্তি আমরা কীভাবে পাব। কিন্তু এটা তো নিশ্চিত প্রকৃতি একদিন প্রতিশোধ নেবে।


ড. বিভূতি ভূষণ মিত্র

পরিবেশ বিষয়ক লেখক

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা