রাজনীতির মুখোশ
হাবিব বাবুল
প্রকাশ : ০৮ জানুয়ারি ২০২৬ ১০:৫৮ এএম
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে জুলাই আন্দোলন ছিল একটি মোড় ঘোরানো অধ্যায়। রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়ন, গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ এবং রাজনৈতিক বদ্ধতার বিরুদ্ধে ছাত্র-যুবসমাজ যে প্রতিবাদ গড়ে তুলেছিল, তা কেবল একটি আন্দোলন নয়, তা ছিল একটি নতুন রাজনৈতিক কল্পনার জন্ম। সেই কল্পনার ওপর ভর করেই আত্মপ্রকাশ করেছিল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। দলটি দাবি করেছিল, তারা পুরনো ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতির বাইরে গিয়ে একটি মধ্যপন্থী, মানবিক ও আধুনিক রাজনৈতিক ধারা প্রতিষ্ঠা করবে। কিন্তু আজ সেই এনসিপিই নিজের ঘোষিত আদর্শের সম্পূর্ণ বিপরীত পথে হাঁটছে। জামায়াতে ইসলামীর মতো মুক্তিযুদ্ধবিরোধী, পশ্চাৎপন্থী ও সাম্প্রদায়িক শক্তির সঙ্গে নির্বাচনী সমঝোতার মাধ্যমে এনসিপি কার্যত রাজনৈতিক আত্মহত্যার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
এনসিপির এই সিদ্ধান্তকে
কোনোভাবেই ‘রাজনৈতিক কৌশল’ বা ‘নির্বাচনী বাস্তবতা’ বলে হালকা করা যায় না। এটি আদর্শিক
আত্মসমর্পণ। জামায়াতে ইসলামী কেবল একটি রাজনৈতিক দল নয়; এটি বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি
কলঙ্কিত অধ্যায়। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় এই দল সরাসরি পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর
সহযোগী হিসেবে গণহত্যা, ধর্ষণ ও মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িত ছিল। স্বাধীনতার পর বহু দশক
পেরিয়ে গেলেও জামায়াত সেই অপরাধের জন্য জাতির কাছে নিঃশর্ত ক্ষমা চায়নি, বরং নানা কৌশলে
তাদের রাজনৈতিক বৈধতা পুনর্গঠনের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। সেই জামায়াতের সঙ্গে জোট মানে
শুধু একটি দলকে নয়, বরং একটি ইতিহাসবিরোধী রাজনীতিকে বৈধতা দেওয়া।
এনসিপির জন্মলগ্নে
নেতারা যে ‘মধ্যপন্থী রাজনীতি’র কথা বলেছিলেন, তার সঙ্গে জামায়াতের রাজনীতির কোনো মিল
নেই। জামায়াত নারীর সম-অধিকার, ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতাÑ
এসব মৌলিক গণতান্ত্রিক প্রশ্নে চরমপন্থী অবস্থান নিয়ে পরিচিত। তাহলে প্রশ্ন ওঠে, কোন
যুক্তিতে এনসিপি এই দলের সঙ্গে হাত মেলাতে যাচ্ছে? উত্তরটি খুবই সরল ও ভয়াবহÑ ক্ষমতার
লোভ।
বিএনপির সঙ্গে
আসন সমঝোতার আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর এনসিপির একাংশ যে দ্রুত জামায়াতের দিকে ঝুঁকে পড়েছে,
তা তাদের রাজনৈতিক দেউলিয়াত্বেরই প্রমাণ। একটি নতুন রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে জনগণের কাছে
বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জনের বদলে তারা শর্টকাটে সংসদে যাওয়ার রাস্তা খুঁজছে। কিন্তু ইতিহাস
বলে, শর্টকাট রাজনীতি শেষ পর্যন্ত দীর্ঘমেয়াদি ধ্বংসই ডেকে আনে।
এই জোট সিদ্ধান্তের
বিরুদ্ধে এনসিপির ভেতর থেকেই যে প্রবল প্রতিরোধ গড়ে উঠেছে, তা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
দলের দুই শীর্ষস্থানীয় নেত্রীÑ তাসনিম জারা ও তাসনূভা জাবীনের পদত্যাগ কেবল ব্যক্তিগত
সিদ্ধান্তই নয়Ñ এটি একটি রাজনৈতিক প্রতিবাদ। তারা স্পষ্ট করে বুঝিয়ে দিয়েছেন, জামায়াতের
সঙ্গে আপস করা মানে নিজের বিবেক ও আদর্শকে বিসর্জন দেওয়া। তাসনূভা জাবীনের বক্তব্য
বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেছেন, এই জোট কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, বরং একটি পরিকল্পিত
প্রক্রিয়ার ফল। অর্থাৎ দলের শীর্ষ নেতৃত্ব সচেতনভাবেই এনসিপিকে একটি বিপজ্জনক পথে ঠেলে
দিচ্ছে।
আরও উদ্বেগজনক
বিষয় হলো, এনসিপির ৩০ জন নেতা আনুষ্ঠানিক স্মারকলিপি দিয়ে আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামকে সতর্ক
করলেও সেই সতর্কবার্তাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। এটি প্রমাণ করে, এনসিপির অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র
আজ গুরুতর সংকটে। যে দল গণতন্ত্রের কথা বলে জন্ম নিয়েছিল, সেই দলেই আজ ভিন্নমতের জায়গা
সংকুচিত হচ্ছে।
জুলাই আন্দোলনের
যে মূল স্পিরিটÑ স্বচ্ছতা, নৈতিকতা ও গণতান্ত্রিক দায়বদ্ধতাÑ এনসিপির এই সিদ্ধান্ত
তার সম্পূর্ণ বিপরীত। ছাত্র-যুবসমাজ যে স্বপ্ন দেখেছিল, একটি অসাম্প্রদায়িক ও মানবিক
বাংলাদেশের, এনসিপি সেই স্বপ্নকে ভেঙে চুরমার করছে। এই প্রজন্ম রাজনীতিতে পরিবর্তন
চেয়েছিল, পুরনো অন্ধকার শক্তির পুনর্বাসন নয়।
এনসিপির নেতারা
হয়তো ভাবছেন, কয়েকটি আসনের বিনিময়ে জামায়াতের সঙ্গে সমঝোতা করে তারা রাজনৈতিকভাবে লাভবান
হবেন। কিন্তু তারা ভুলে যাচ্ছেন, রাজনীতিতে সবচেয়ে বড় পুঁজি হলো বিশ্বাস। সেই বিশ্বাস
একবার হারালে তা আর ফিরে পাওয়া যায় না। যারা মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তির সঙ্গে আপস করে
ক্ষমতার সিঁড়ি বেয়ে উঠতে চায়, ইতিহাস শেষ পর্যন্ত তাদের কঠোরভাবে বিচার করে।
এখনও সময় আছে। এনসিপি চাইলে এই আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসতে পারে, নিজের ঘোষিত আদর্শে ফিরে যেতে পারে। কিন্তু যদি তারা এই পথেই এগিয়ে যায়, তবে এটি শুধু এনসিপির পতন নয়Ñ এটি জুলাই আন্দোলন থেকে জন্ম নেওয়া নতুন রাজনীতির সম্ভাবনারও এক মর্মান্তিক পরাজয় হবে। ইতিহাস সাক্ষী থাকবে, আর জনগণই শেষ কথা বলবে।
হাবিব বাবুল
জার্মানভিত্তিক সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক