× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

ভিক্ষাবৃত্তি

সমাজের এক অনিবার্য বাস্তবতা

মতিলাল দেব রায়

প্রকাশ : ০৭ জানুয়ারি ২০২৬ ১২:৪৭ পিএম

  সমাজের এক অনিবার্য বাস্তবতা

ঢাকার ভিখারির সঠিক সংখ্যা বলা কঠিন, তবে বিভিন্ন সূত্র অনুযায়ী, এই সংখ্যা প্রায় ৪০ হাজার থেকে ২ লক্ষাধিক, যেখানে একটি গবেষণা বলছে, শুধু ঢাকাতেই প্রায় ৪০ হাজার ভিক্ষুক রয়েছে এবং অন্য সূত্রগুলো দেশে মোট ২.৫ লাখ থেকে প্রায় ৭ লাখ ভিক্ষুকের কথা উল্লেখ করছে, যার একটি বড় অংশ ঢাকায় বাস করে। ঢাকার রাস্তায়, সিগন্যালে, বাসস্ট্যান্ডে, রেলস্টেশনে আমরা প্রতিদিন তাদের দেখি। শুধু হাত বাড়িয়ে অর্থ চাওয়াই যেন তাদের পরিচয়ের একমাত্র মাধ্যম হয়ে গেছে। অথচ প্রত্যেকটি মানুষের পেছনেই রয়েছে একটি অনুচ্চারিত গল্প, হয়তো অন্নের অভাব, হয়তো পরিবার হারানোর বেদনা, হয়তো প্রতিবন্ধকতা, হয়তো কোনো দুর্ভাগ্যের অনিবার্য পরিণতি।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, গ্রামাঞ্চল থেকে বিকলাঙ্গ, শিশু-কিশোরসহ হতদরিদ্র ও বয়োবৃদ্ধ নারী-পুরুষ রাজধানীতে এনে ভিক্ষাবৃত্তিতে নিয়োগ করছে এ সিন্ডিকেট। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ছত্রছায়ায়ই চলে এই সিন্ডিকেট। সিন্ডিকেটভুক্ত না হয়ে কেউ নির্বিঘে ভিক্ষা করতে পারে না। সিন্ডিকেট অবুঝ শিশুদের কোলে নিয়ে, কখনও-বা শারীরিক প্রতিবন্ধীদের কাজে লাগিয়ে হাতিয়ে নিচ্ছে বিপুল অর্থ। এমনকি সুস্থ মানুষকেও কৃত্রিম উপায়ে প্রতিবন্ধিত্বের কবলে ফেলে চলে ভিক্ষাবৃত্তি।

জানা গেছে, রাজধানীতে দৈনিক অন্তত ২০ কোটি টাকার ভিক্ষা-বাণিজ্য হয়। এ হিসাবে মাসে লেনদেন হয় ৬০০ কোটি টাকা। বিপুল এই ‘অর্থনৈতিক লেনদেন’-এর খাত বন্ধ কিংবা নিয়ন্ত্রণে জাতীয় বাজেটে বরাদ্দ রাখা হয় মাত্র সাড়ে ৩ থেকে ৪ কোটি টাকা। নগণ্য পরিমাণ এ অর্থ দেশের ভিক্ষাবৃদ্ধি বন্ধ কিংবা নিয়ন্ত্রণে হাস্যকর বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।

তবে ঢাকায় ভিক্ষুকের উৎপাত এখন সহ্যের সীমা ছাড়িয়েছে। যদিও এ বাস্তবতা মানতে নারাজ সমাজসেবা অধিদপ্তর। তাদের দাবি, রাজধানীর ভিক্ষাবৃত্তি বৃদ্ধি রোধে সরকার রাজধানীর বেশ কিছু এলাকা ‘ভিক্ষুকমুক্ত’ ঘোষণা করেছে। বিমানবন্দরে প্রবেশপথে পূর্ব পাশের চৌরাস্তা, বিমানবন্দর পুলিশ ফাঁড়ি ও এর আশপাশ এলাকা, হোটেল রেডিসন সংলগ্ন এলাকা, ভিআইপি রোড, বেইলী রোড, হোটেল সোনারগাঁও ও হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল সংলগ্ন এলাকা ও কূটনৈতিক জোনসমূহ। কিন্তু বাস্তবে এসব এলাকায় ভিক্ষুকের জন্য চলাচল করাই দায়। রাজধানীর ফুটওভারগুলোর গোড়ায় পথচারীদের দু’পাশ দিয়ে রীতিমতো আগলে দাঁড়ায় ভিক্ষুক। বিপণিবিতান, শপিং কমপ্লেক্স, কাঁচাবাজার, সবজি, গোশতের দোকান, মাছবাজার, আড়ত, হোটেল-রেস্টুরেন্টের সামনে, মসজিদ, খানকা, মাজারগেট, আদালত প্রাঙ্গণ, ব্যস্ততম গুলিস্তান, মতিঝিল, ফার্মগেট, নিউমার্কেট, সদরঘাট, কমলাপুর স্টেশন, বাস টার্মিনাল, খাবারের দোকানের সামনে, গাড়িবহুল রাস্তার প্রতিটি ট্রাফিক সিগন্যাল, বাসাবাড়ি, প্রতিষ্ঠানÑ কোথায় নেই এরা?

প্রশ্ন উঠতেই পারেÑ ভিক্ষাবৃত্তি কীভাবে এত ব্যাপকভাবে বিস্তার লাভ করল? প্রথমত, অর্থনৈতিক বৈষম্য। ঢাকায় রয়েছে বিশাল আয়-বৈষম্য : এক পাশে লাখ লাখ মানুষের দুর্দশা, অন্য পাশে একটি ক্ষুদ্র গোষ্ঠীর অঢেল সম্পদ। দ্বিতীয়ত, কর্মসংস্থানের অভাব। শহরে দৈনিক মজুরি শ্রমিকরাও অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটান। যখন কাজ নেই, অভাবই মানুষকে হাত পাততে বাধ্য করে। তৃতীয়ত, সংগঠিত ভিক্ষাবৃত্তির সিন্ডিকেট। এটি একটি বাস্তবতা, যা আমরা দেখতে চাই না, কিন্তু এটি আমাদের আশপাশেই চলছে। কেউ কেউ শুধু ব্যবহার হচ্ছে, কোনো অন্ধ ভিখারিকে কেউ নজর দেখায়, আর তার পেছনে থাকে একটা গোষ্ঠী, যারা তার উপার্জনের বড় অংশ কেড়ে নেয়। এই ধরনের সংবাদ গণমাধ্যমে বহুবার এসেছে। ঠিক এখানেই আমার ব্যক্তিগত অনুভূতিটা বলতে হয়Ñ আমি কখনও কাউকে অর্থ দিলে বুকের ভেতর একদিকে দয়ার আবেগ তৈরি হয়, আবার অন্যদিকে প্রশ্ন জাগেÑ এই অর্থ কি তাদের সাহায্য করছে, নাকি এই ভিক্ষাবৃত্তির চক্রকে আরও শক্তিশালী করছে? কি করা উচিত? সরাসরি টাকা দিব? নাকি খাদ্য দিব? নাকি চাকরির ব্যবস্থা করার চেষ্টা করব? উত্তরটা সহজ নয়, কারণ সমস্যাটা বহুমাত্রিক।

আমি যদি কোনো ভিখারিকে দেখি যে সে কাজ করতে পারে কিন্তু ভিক্ষা করছে তখন মনে হয়, সমাজ তাকে কাজের সুযোগ দিতে ব্যর্থ হয়েছে। যখন দেখি কেউ হাঁটতে পারে না, চোখে আলো নেই, শরীর অচলÑ তখন মনে হয় আমাদের রাষ্ট্রীয় কল্যাণ ব্যবস্থা এই ধরনের নাগরিকদের জন্য যথেষ্ট কিছুই করছে না। প্রতিবন্ধী ভাতা, বৃদ্ধভাতাÑ এসব বাস্তব জীবনে খুবই অপ্রতুল এবং অনেকেই তা পায় না।

ভিক্ষুক সৃষ্টির কারণসমূহে হাত না দিয়ে নীতিনির্ধারক মহলকে সব সময় আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার কথাই বলতে শোনা যায়। অথচ যতদূর জানি, ভিক্ষাবৃত্তি রোধে এখন পর্যন্ত স্বয়ংসম্পূর্ণ কোনো আইনই প্রণয়ন হয়নি। ভিক্ষাবৃত্তি নিয়ন্ত্রণ কিংবা পুনর্বাসনের চেষ্টা চলে ‘ভবঘুরে নিয়ন্ত্রণ আইন’-এর আওতায়। যদিও ভিক্ষাবৃত্তি বন্ধে কাজে আসছে না ভবঘুরে নিয়ন্ত্রণ আইনও। প্রণয়নের প্রায় দেড় দশক অতিবাহিত হলেও এর কোনো সুফল আসেনি। অত্যন্ত প্রয়োজনীয় এ আইনটি এখন পর্যন্ত কার্যকর করা হয়নি। আইনটির পর্যালোচনায় দেখা যায়, ভবঘুরে নিয়ন্ত্রণে আইন থাকলেও পুনর্বাসনের প্রশ্নে রয়েছে অস্পষ্টতা। পেশাদার ভিক্ষুকসংখ্যা বৃদ্ধির এটি বড় একটি কারণ। সরকারের এ ধরনের দৃষ্টিভঙ্গির কারণেই অসাধু ব্যক্তিরা ভিক্ষাবৃত্তিতে নিত্যনতুন মাত্রা যুক্ত করছে।

বাস্তবে একবার যিনি ভিক্ষাবৃত্তিতে নাম লেখায় তাকে আর এ পেশা থেকে ফেরানো যায় না। ভিক্ষাবৃত্তি ‘পেশা’ হিসেবে স্বীকৃত না হলেও সামাজিক ভিত্তি বেশ মজবুত। এ পেশায় ঝুঁকি নেই। পুঁজিও লাগে না। আত্মমর্যাদাবোধ এবং সামাজিক লাজ-লজ্জা বিসর্জন দিয়ে হাত বাড়াতে পারলেই হাতে আসছে টাকা। আমি মনে করি, রাজধানীর সৌন্দর্যবর্ধন কিংবা নগরায়নের বাহারি প্রকল্প দিয়ে এই সমস্যার সমাধান হবে না। ফ্লাইওভার বানালেই ভিখারি হারিয়ে যাবে না। কারণ সমস্যাটি ফুটপাতের পাথরে নয়- এটি মানুষের জীবনে। আমাদের দরকার একটি মানবিক উন্নয়ন কৌশল- যেখানে শহরের উন্নতি মানে হবে মানুষের উন্নয়ন।

তাই সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি বদলানো জরুরি। ভিক্ষাবৃত্তিকে আমরা শুধু সমস্যা হিসেবে দেখি, কিন্তু আমরা যদি এর পেছনের সামাজিক পরিবেশ, অর্থনৈতিক ইতিহাস, মানবিক দুর্বলতাকে বুঝিÑ তবেই আমরা সমাধানে পৌঁছতে পারব। সমাজকর্মীরা যে স্কিল ট্রেনিং, ক্ষুদ্রঋণ, পুনর্বাসন, কর্মসংস্থানের উদ্যোগÑ এসব নীতি ব্যবস্থার কথা বলেন, তা গুরুত্ব পাওয়া উচিত। তাদের পুনর্বাসন, কাজের প্রশিক্ষণ, সামান্য ব্যবসা করার সুযোগÑ এগুলো কার্যকর হতে পারে।

এখন নিজের কথা বলিÑ আমি যখন একজন ভিখারির সামনে দাঁড়াই, আমি ওই মানুষটির চোখের দিকে তাকাই। সেখানে দেখি ক্ষুধা, ভয়, অনিশ্চয়তাÑ কিন্তু দেখি আরেকটি দিকওÑ সেটা বেঁচে থাকার মরিয়া ইচ্ছা। সেই মুহূর্তে বুঝতে পারিÑ আমাদের নগর সভ্যতার সাফল্য তখনই সত্য যখন আমাদের সবচেয়ে দুর্বল মানুষটি সুরক্ষা পায়, সম্মান পায়, একটা মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের সুযোগ পায়।

ঢাকার ভিখারিরা আমাদের নগর বিবেকের আয়না। আমরা যারা পথ পার হয়ে হেঁটে যাই, তাদের দিকে এক মুহূর্ত তাকিয়ে যদি নিজেদের প্রশ্ন করিÑ আমি যদি ওই জায়গায় জন্ম নিতাম, তবে হয়তো আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিটা পাল্টে যেত।

আমি বলতে চাই, সমস্যাটি শুধু সরকারের নয়, সমাজের নয়, আমাদের প্রত্যেকের। আমরা চাইলে আমাদের সামান্য উদ্যোগও বড় পরিবর্তন আনতে পারে। হয়তো একজন ভিখারির হাতে খাবার তুলে দেই, অথবা একটা কাজের সুযোগ করে দেই, অথবা অন্তত তার প্রতি সম্মান দেখাই। মনে রাখতে হবেÑ দয়া দেখানো সহজ, কিন্তু মানবিকতা দেখানো কঠিন। তারা ভিখারি নয়, তারা জীবনের কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থাকা মানুষ। তারা আমাদেরই সমাজের অংশ। আমরা কেউই তাদের থেকে আলাদা নইÑ শুধু ভাগ্য এবং সুযোগের ব্যবধান ছাড়া।


মতিলাল দেব রায়

কলাম লেখক ও সমাজ সংগঠক


শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা