এলপিজি সংকট
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ০৪ জানুয়ারি ২০২৬ ১১:৩৬ এএম
হঠাৎ করেই বাজার থেকে উধাও হয়ে গেছে এলপিজি। ফলে সারা দেশে এই তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে চলছে এ সংকট। দুঃখজনক হচ্ছে, সরকারের নিয়ন্ত্রক সংস্থা এখানে কার্যকর কোনো ভূমিকা রাখতে পারছে না। গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদে জানা যায়, সরকারি হিসাবে ১২ কেজির একটি সিলিন্ডারের দাম ১ হাজার ২৫৩ টাকা হওয়ার কথা থাকলেও বাজারে তা বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার ১০০ টাকায়। বলা হচ্ছে, সরবরাহ-সংকটকে অজুহাত দেখিয়ে একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী বাজারে এ অস্থিতিশীলতা তৈরি করেছেন। উল্লেখ্য, শীতকালে বিশ্ববাজারে এলপিজির উচ্চ চাহিদার কারণে এমনিতেই দাম বাড়ে। তার ওপর আমদানির ঘাটতি ‘মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে দাঁড়ায়। আমদানিকারকরা বলছেন, চাহিদা অনুযায়ী সিলিন্ডার সরবরাহ করা যাচ্ছে না। এখানে যে কৃত্রিম সংকট তৈরির চেষ্টা হচ্ছে তা অনেকটা স্পষ্ট।
রান্নাঘর থেকে হোটেল-রেস্তোরাঁ, ক্ষুদ্র ব্যবসা থেকে শুরু করে গ্রামাঞ্চলের
সাধারণ পরিবারÑ সবখানেই একই অভিযোগÑ গ্যাস নেই, আর যেখানে আছে সেখানে দাম অস্বাভাবিক
বেশি। এই সংকট কেবল সরবরাহ ঘাটতির ফল নয়, বরং এর পেছনে সক্রিয় সিন্ডিকেট, বাজার কারসাজি
ও নিয়ন্ত্রণহীনতার নগ্ন চিত্র স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। খোদ রাজধানী ঢাকার চিত্রই ভয়াবহ। শহরের
মহল্লাগুলোর বাসাবাড়িতে গ্যাসের লাইনে তীব্র গ্যাস সংকট বহুদিনের। আর শীতকাল এলে পাইপলাইনের
গ্যাসের সংকট আরও তীব্রভাবে দেখা দেয়। এই সংকটের মধ্যে এলপিজি গ্যাস বর্তমানে একটি
অত্যাবশ্যকীয় পণ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে সিন্ডিকেট এলপিজি বোতলজাত গ্যাসের
দাম বাড়িয়ে দেয়।
এ কথা সত্য যে, পাইপলাইনের গ্যাস না থাকলে যেমন দেশজুড়ে হাহাকার তৈরি
হয়। এলপিজির ক্ষেত্রে তেমনটা দেখা যায় না। এর প্রধান কারণ হলো, এই খাতের প্রায় পুরোটা
এখন বেসরকারি কোম্পানিগুলোর হাতে। কিন্তু এ খাতের ভোক্তাদের ভোগান্তির বিষয়টি সেভাবে
সামনে আসছে না, কারণ এই সমস্যাটি সারা দেশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন,
ভোক্তাদের স্বার্থরক্ষায় সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে। কোনোভাবেই যেন ভোক্তাদের চাহিদার
ওপর কোম্পানিগুলো দাম বাড়াতে না পারে, সে বিষয়ে কোম্পানিগুলোর সঙ্গে আলোচনায় বসে কার্যকর
পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
পরিসংখ্যান বলছে, শহর ও
গ্রাম মিলিয়ে দেশে এখন কোটি কোটি মানুষ এলপি গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল। প্রাকৃতিক
গ্যাসের সংযোগ বন্ধ বা সীমিত হওয়ার পর এলপি গ্যাসই হয়ে উঠেছে প্রধান ভরসা। সাম্প্রতিক
সময়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে
কয়েকশ টাকা বেশি দরে বিক্রি হচ্ছে। কোথাও আবার সিলিন্ডারই মিলছে না। ডিলাররা
বলছেন, কোম্পানি সরবরাহ দিচ্ছে না, আর কোম্পানিগুলোর দাবি, ডিলাররাই গুদামে মজুদ
করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করছে। এই ঠেলাঠেলির মাঝখানে ভোগান্তির বোঝা চাপছে সাধারণ
মানুষের ঘাড়ে। এই সংকটের সবচেয়ে বড় শিকার নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবার। বাড়তি দামে
গ্যাস কিনতে গিয়ে সংসারের অন্য খাতে ব্যয় কমাতে হচ্ছে। হোটেল-রেস্তোরাঁ ও ক্ষুদ্র
খাদ্যব্যবসায়ীদের উৎপাদন খরচ বেড়ে যাচ্ছে, যার প্রভাব পড়ছে পণ্যের দামে। ফলে
গ্যাসের সংকট শেষ পর্যন্ত সামগ্রিক মূল্যস্ফীতিকে আরও উস্কে দিচ্ছে।
এই বাস্তবতায় প্রশ্নÑ
নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো কোথায়? বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)
নিয়মিতভাবে দাম নির্ধারণ করলেও মাঠপর্যায়ে তদারকিতে তারা কার্যকর নয় কেন? কেন
মনিটরিং ব্যবস্থা দুর্বল আর শাস্তির দৃষ্টান্ত নেই? কোন শক্তিতে সিন্ডিকেট আরও
বেপরোয়া হয়ে উঠছেÑ এসব প্রশ্ন করাই যায়। আমরা মনে করি, যারা নিয়ম ভাঙছে, তাদের
বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা না নেওয়া হলে এই সংকট বারবার ফিরে আসবে।
আমরা আরও মনে করি, বিইআরসি
ও ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরকে সমন্বিতভাবে আরও দায়িত্বশীল হতে হবে, নিয়মিত
অভিযান পরিচালনা করতে হবে। সরবরাহ শৃঙ্খল পুরোপুরি ডিজিটাল মনিটরিংয়ের আওতায় আনতে
হবে। কোম্পানি থেকে ডিলার, ডিলার থেকে খুচরা বিক্রেতা পর্যন্ত, কাউকে ছাড় দেওয়া
যাবে না। প্রয়োজনে মজুদদারি ও অতিরিক্ত দামে বিক্রির বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালত ও
নিয়মিত অভিযান জোরদার করতে হবে। ভোক্তা অভিযোগ দ্রুত গ্রহণ ও নিষ্পত্তির জন্য
কার্যকর হটলাইন চালু করা জরুরি।
মনে রাখতে হবে, সিলিন্ডার
গ্যাস বিলাসিতা নয়Ñ এটি এখন নিত্য প্রয়োজনীয় উপকরণ। এই চাহিদাকে জিম্মি করে
সিন্ডিকেটের মুনাফালোভ মেনে নেওয়া যায় না। এই ক্ষেত্রে সরকারকে আরও কঠোর,
নিয়ন্ত্রণ সংস্থাকে আরও দায়িত্বশীল হতে বলব। নইলে গ্যাসের এই সংকট শুধু রান্নাঘরেই
নয়, পুরো অর্থনীতিতেই বিস্তার ঘটাবে।