বিশ্লেষণ
ড. মো. আইনুল ইসলাম
প্রকাশ : ০৪ জানুয়ারি ২০২৬ ১১:২৬ এএম
মানব ইতিহাসের দীর্ঘ পরিক্রমায় কর ব্যবস্থা কেবল রাষ্ট্রীয় কোষাগার পূর্ণ করার মাধ্যম হিসেবে নয়, বরং শাসন ক্ষমতার বৈধতা ও স্থায়িত্বের অন্যতম মানদণ্ড হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। যখনই কোনো রাষ্ট্রে করের বোঝা অসম ও অন্যায়ভাবে বণ্টিত হয়েছে, তখনই সেখানে সামাজিক অসন্তোষের দাবানল জ্বলে উঠেছে যার প্রমাণ আমরা পাই ফরাসি বিপ্লব, আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধ কিংবা ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের পতনের ইতিহাসে। আধুনিক বাংলাদেশের ৫৪ বছরের ইতিহাসে বর্তমান সময়টি রাজস্ব আদায়ের জন্য সবচেয়ে উপযোগী পরিবেশ হওয়া সত্ত্বেও আমরা এক বিশাল রাজস্ব ঘাটতি প্রত্যক্ষ করছি, যার মূলে রয়েছে একটি ত্রুটিপূর্ণ কর কাঠামো। এই কাঠামোটি মূলত দরিদ্রের পকেট থেকে ভ্যাটের মাধ্যমে অর্থ শুষে নেয় এবং ধনীদের আয়কর ও সম্পদ করের ক্ষেত্রে নজিরবিহীন ছাড় প্রদান করে। রাজস্ব আদায়ের ক্রমাগত ঘাটতি সরকারের ঋণ গ্রহণকেও উৎসাহিত করে। এই ঋণের অর্থ মূলত দরিদ্র শ্রেণিই প্রদান করে। অর্থনৈতিক ইতিহাসবিদ থমাস পিকেটির মতে, যখন সম্পদের অসম বণ্টন বৃদ্ধি পায় এবং রাষ্ট্রীয় কর ব্যবস্থা সেই বৈষম্যকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়, তখন সমাজে অস্থিরতা অনিবার্য হয়ে ওঠে। বাংলাদেশে বর্তমানে যেখানে মুষ্টিমেয় কিছু মানুষ প্রত্যক্ষ আয়কর দেয়, সেখানে প্রতিটি সাধারণ নাগরিকÑ এমনকি একজন দিনমজুরওÑ তার নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ক্রয়ের সময় ভ্যাটের মাধ্যমে রাষ্ট্রকে কর দিচ্ছে। এই ব্যবস্থাটি কেবল অর্থনৈতিক বৈষম্যই বাড়ায় না, বরং জন রলসের ‘ন্যায্যতার তত্ত্ব’কে বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করে সামাজিক চুক্তির ভিত্তিকে দুর্বল করে দিচ্ছে।
সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান
ও অর্থনৈতিক গতিবিধি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসেই মোট
রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যের বিপরীতে প্রায় ১৩.৮৯ শতাংশ ঘাটতি পড়েছে। তাৎপর্যপূর্ণ হচ্ছে,
ভ্যাট খাতে লক্ষ্যের চেয়ে কিছুটা কম আদায় হলেও এটিই রাজস্বের প্রধান উৎস হিসেবে টিকে
আছে, যেখানে আয়কর খাতে ঘাটতি ২০ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। এতে স্পষ্ট প্রমাণ হয়, দেশের ধনাঢ্য
শ্রেণি ও বড় ব্যবসায়ীরা সুকৌশলে কর ফাঁকি দিচ্ছে অথবা রাষ্ট্রীয় নীতি তাদের সেই সুযোগ
করে দিচ্ছে। রবার্ট টিগানের ‘সামাজিক চুক্তি তত্ত্ব’ অনুযায়ী, নাগরিকরা যখন অনুভব করে
যে তাদের প্রদত্ত করের ফল তারা পাচ্ছে না বরং তাদের ওপর অন্যায্য বোঝা চাপানো হচ্ছে,
তখন তারা রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য হারায়। ফলে বিদ্রোহ মনোভাব তৈরি হয়। এ জন্যই বাংলাদেশে
ঐতিহাসিকভাবে রাজস্ব আদায়ের এই ঘাটতি কেবল অর্থনৈতিক দুর্বলতা নয়, বরং এটি একটি গভীর
রাজনৈতিক সংকটেরও কারণ। অর্থনীতিবিদ অ্যাডাম স্মিথ তার ‘দ্য ওয়েলথ অব নেশনস’ গ্রন্থে
করের যে চারটি মূলনীতির কথা বলেছিলেন অর্থাৎ সমতা, নিশ্চিন্ততা, সুবিধা ও অর্থনৈতিক
কার্যকারিতা বর্তমান ভ্যাটনির্ভর কাঠামো সেই প্রতিটি নীতিই লঙ্ঘন করছে।
চলতি অর্থবছরে
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের ৫ লাখ ৫৪ হাজার কোটি টাকার বিশাল লক্ষ্য নির্ধারণের পেছনে যে
অর্থনৈতিক বাস্তবতা কাজ করেছে, তা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কাঠামোগত দুর্বলতা চিরন্তন।
বাংলাদেশে পুঁজিবাদী তত্ত্বের অনুগত মূলধারার অর্থনীতিবিদরা বাস্তবায়ন অযোগ্যতাকে স্বাভাবিক
বলে চারিয়ে দেন। অতছ জন মেইনর্ড কেইনস বলতেন, অর্থনৈতিক মন্দা বা সংকটের সময় সরকারের
ব্যয় বৃদ্ধি করা অপরিহার্য, যার জন্য প্রয়োজন একটি শক্তিশালী ও ন্যায্য রাজস্ব কাঠামো।
কিন্তু বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে দেখা যাচ্ছে, উচ্চ আয়ের শ্রেণির রাজনৈতিক প্রভাব
এতটাই শক্তিশালী যে তারা কর সংস্কারের পথে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাজনৈতিক বিজ্ঞানী
স্যামুয়েল হান্টিংটনের তত্ত্ব অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানের শক্তি যখন অসম সম্পদ বণ্টনের কারণে
দুর্বল হয়ে পড়ে, তখন রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ে। বাংলাদেশের কর ব্যবস্থায় ভ্যাটের
ওপর এই অতিনির্ভরতা মূলত সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে এবং মধ্যবিত্তকে দারিদ্র্যের
দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ
থেকে কর আদায়ের রাজনীতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, কর কেবল অর্থ সংগ্রহের হাতিয়ার নয়,
এটি রাষ্ট্র ও নাগরিকের ক্ষমতার সম্পর্কেরও প্রতিফলন। জেমস সি স্কটের গবেষণায় দেখা
গেছে, কীভাবে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কৃষকসমাজ অসম কর ব্যবস্থার বিরুদ্ধে ‘নীরব প্রতিরোধ’
গড়ে তুলেছিল। বাংলাদেশেও আজ সাধারণ মানুষের মধ্যে কর দেওয়ার প্রতি একধরনের অনীহা ও
অবিশ্বাস তৈরি হয়েছে। কারণ তারা দেখছে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় বড় শিল্পগোষ্ঠীগুলো হাজার
হাজার কোটি টাকার কর ছাড় ভোগ করছে। অন্যদিকে ভ্যাট আদায়ের ক্ষেত্রে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা
ও সাধারণ ভোক্তাদের ওপর কঠোরতা প্রদর্শন করা হচ্ছে। সমাজবিজ্ঞানী চার্লস টিলি দেখিয়েছেন
যে, ইউরোপে সংসদীয় গণতন্ত্রের বিকাশ ঘটেছিল কর আদায় ও প্রতিনিধিত্বের দরকষাকষির মধ্য
দিয়ে। কিন্তু বাংলাদেশে জবাবদিহিতার অভাবে কর আদায় প্রক্রিয়াটি স্বেচ্ছাচারী হয়ে উঠেছে।
বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে
বাংলাদেশের এই সংকট আরও গভীর হয়ে দেখা দেয় যখন আমরা দেখি স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলো
উচ্চ হারের প্রগতিশীল আয়করের মাধ্যমে একটি সফল কল্যাণ রাষ্ট্র গড়ে তুলেছে। সুইডেন বা
নরওয়েতে জিডিপির প্রায় অর্ধেকই আসে কর থেকে, যার সিংহভাগই ধনী ও করপোরেটদের ওপর আরোপিত
প্রত্যক্ষ কর। অথচ বাংলাদেশে কর-জিডিপি অনুপাত বিশ্বের সর্বনিম্ন দেশগুলোর একটি, যা
মাত্র ৭.৫ থেকে ৮.৫ শতাংশের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। অক্সফাম ও ট্যাক্স জাস্টিস নেটওয়ার্কের
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলো প্রতি বছর শত শত কোটি ডলার হারায়
বহুজাতিক কোম্পানির ট্রান্সফার প্রাইসিং এবং ধনীদের অর্থ পাচারের কারণে। এর বিপরীতে
সরকার ঘাটতি মেটাতে সাধারণ মানুষের ওপর ভ্যাটের বোঝা আরও বাড়িয়ে দেয়। থমাস পিকেটির
‘ক্যাপিটাল ইন দ্য টোয়েন্টি-ফার্স্ট সেঞ্চুরি’ গ্রন্থের মূল বক্তব্য ছিল, প্রগতিশীল
সম্পদ কর ছাড়া অর্থনৈতিক সমতা অর্জন অসম্ভব। বাংলাদেশের জন্য আজ সেই সময় এসেছে, যেখানে
ভ্যাটের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে ধনীদের আয়ের ওপর উচ্চহারে কর আরোপ এবং ডিজিটাল প্রযুক্তির
মাধ্যমে কর ফাঁকি রোধ করা জরুরি। অন্যথায় এই অর্থনৈতিক বিভাজন কেবল দরিদ্রকে আরও দরিদ্র
করবে না, বরং রাষ্ট্রের সামগ্রিক স্থিতিশীলতাকে চরম ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেবে।
চীনের তাং রাজবংশের
‘লিয়াং শুই’ বা দুই কর পদ্ধতি থেকে শুরু করে আমেরিকার ‘বোস্টন টি পার্টি’র ইতিহাস আমাদের
জন্য অমূল্য শিক্ষা বহন করে। তাং রাজবংশ কর ব্যবস্থার সরলীকরণ করে রাজস্ব ৪০০ শতাংশ
বাড়াতে সক্ষম হয়েছিল। কারণ তারা কৃষকদের ওপর চাপ কমিয়ে বাণিজ্যিক ও ভূমির সুষম কর নিশ্চিত
করেছিল। অন্যদিকে চিং রাজবংশের পতনের মূলে ছিল কর আদায়কারীদের দুর্নীতি ও অসম করের
বোঝা, যা তাইপিং বিদ্রোহের মতো রক্তক্ষয়ী সংঘাতের জন্ম দিয়েছিল। একইভাবে আমেরিকার ইতিহাসে
‘কোনো প্রতিনিধিত্ব ছাড়াই কর নয়’ নীতিটি কেবল একটি স্লোগান ছিল না, এটি ছিল নাগরিক
অধিকারের মূল দাবি। বাংলাদেশের বর্তমান ভ্যাটনির্ভর কর কাঠামোতেও নাগরিকদের সেই প্রতিনিধিত্ব
ও জবাবদিহিতার অভাব প্রকট। আমাদের দেশের নীতিনির্ধারকরা প্রায়শই কেইনসীয় চাহিদা ব্যবস্থাপনার
কথা বললেও, ভ্যাটের মাধ্যমে দরিদ্রের ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে দিয়ে তারা আসলে অভ্যন্তরীণ বাজারকেই
সংকুচিত করছেন।
পরিশেষে বলা যায়, বাংলাদেশের বর্তমান ভ্যাটনির্ভর কর কাঠামো কেবল একটি অর্থনৈতিক ব্যর্থতা নয়, বরং এটি একটি গভীর সামাজিক ও রাজনৈতিক অন্যায়ের প্রতিফলন। রাজস্ব ঘাটতি মূলত সামাজিক চুক্তির ভাঙনের একটি লক্ষণ মাত্র। ইতিহাস আমাদের সতর্ক করে যে, যেসব শাসক সমাজ ও রাজনীতির এই মনস্তত্ত্ব বুঝতে ব্যর্থ হয়েছে, তারা শেষ পর্যন্ত ক্ষমতার ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছে। বাংলাদেশের স্থিতিশীলতার জন্য প্রয়োজন একটি ‘জনকেন্দ্রিক কর ব্যবস্থা’, যেখানে কর আদায়ের ভিত্তি হবে নাগরিকের সামর্থ্য এবং ব্যয়ের ভিত্তি হবে নাগরিকের কল্যাণ। তাই নাগরিকদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে এবং একটি ন্যায়সংগত সমাজ বিনির্মাণে কর কাঠামোর আমূল সংস্কার এখন আর কেবল অর্থনীতির বিষয় নয়, বরং এটি আমাদের জাতীয় অস্তিত্বের প্রশ্ন। রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো কর ব্যবস্থার নৈতিক ভিত্তি পুনর্গঠন করা। কারণ ন্যায্য কর ব্যবস্থাই হলো একটি গণতান্ত্রিক ও স্থিতিশীল রাষ্ট্রের প্রাণশক্তি।
ড. মো. আইনুল ইসলাম
অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়