মূল্যস্ফীতির চাপ
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ০২ জানুয়ারি ২০২৬ ১২:১৪ পিএম
গত এক বছরে দেশের অর্থনীতিতে এক অদ্ভুত নীতি কাজ করেছিল। একদিকে উন্নয়ন কার্যক্রমে দৃশ্যমান খরা, অন্যদিকে নিত্যপণ্যের বাজারে লাগামছাড়া মূল্যস্ফীতির চাপ। এই উন্নয়ন ও মূল্যস্ফীতি দুই বিপরীতমুখী বাস্তবতা সাধারণ মানুষের জীবনে তৈরি করেছে গভীর অনিশ্চয়তা ও ক্ষোভ। যে উন্নয়ন মানুষের স্বস্তি আনার কথা, সেই উন্নয়নই যেন থমকে আছে। অথচ দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি প্রতিদিন নতুন নতুন বোঝা চাপিয়ে দিচ্ছে। হতাশাজনক তথ্য হচ্ছে, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়ন ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে। পাশাপাশি সাধারণ মানুষকে চাপে রেখেছে মূল্যস্ফীতি।
৩১ ডিসেম্বর প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ ‘উন্নয়ন কার্যক্রমে খরা মূল্যস্ফীতির চাপ’ শীর্ষক এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্তÑ এ সময়ে এডিপি বাস্তবায়নে আশানুরূপ কোনো অগ্রগতি নেই। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এডিপি বাস্তবায়নের হার ইতিহাসে সর্বনিম্ন পর্যায়ে চলে যায়। ওই অর্থবছরে বাস্তবায়নের হার ৬৮ শতাংশেরও কম ছিল। আইএমইডির তথ্য বলছে, গত অর্থবছরে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যয় হয়েছে ১ লাখ ৫৩ হাজার ৪৫০ কোটি টাকা। বিদায়ি অর্থবছরে সংস্থার নিজস্ব তহবিলের অর্থায়নসহ সংশোধিত এডিপিতে বরাদ্দ ছিল ২ লাখ ২৬ হাজার ১৬৪ কোটি টাকা। অন্যদিকে মূল্যস্ফীতি কমলেও নিয়ন্ত্রণে নেই। প্রায় ১১ শতাংশ খাদ্য মূল্যস্ফীতি নিয়ে শুরু হয় ২০২৫ সাল। সর্বশেষ নভেম্বর মাসে তা নেমেছে ৭ দশমিক ৩৬ শতাংশে। সার্বিক মূল্যস্ফীতিও ৯ দশমিক ৯৪ থেকে ৮ দশমিক ২৯ শতাংশে নেমেছে। বাস্তবতা হচ্ছে, মূল্যস্ফীতি কাগজে-কলমে কিছুটা কমলেও সেটা সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরেই ছিল। এ বিষয়ে অর্থনীতিবিদ ড. মোস্তফা কে মুজেরী বলেছেন, খাদ্য খাতের মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে না আনলে মানুষের দুর্ভোগ কমবে না। বাজার ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা আনা জরুরি।
অবশ্য পরিকল্পনা উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেছেন, বিগত সময়ে প্রকল্পগুলো একটি মাফিয়া চক্রের হাতে ছিল। মাফিয়ারা রেল, সড়ক, সেতু, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়সহ কয়েকটি খাতের প্রকল্প বাস্তবায়নে জড়িত ছিল। যেগুলো বর্তমান সরকার বাতিল করেছে। ফলে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন কিছু সময়ের জন্য থমকে গিয়েছিল। তবে এখন ধীরে ধীরে গতি ফিরছে। মূল্যস্ফীতির ব্যাপারে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বাজারে কারসাজি করে কৃত্রিমভাবে দাম বাড়ানো হয়। পরে সরকারের উদ্যোগে কমলেও যতটা ওঠে ততটা আর কমে না। সঠিক মনিটরিং করতে না পারায় মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনা যায়নি।
মানতে হবে, সরকারি ও বেসরকারি খাতে বড় বড় উন্নয়ন প্রকল্পের গতি কমে গেছে। অনেক প্রকল্প স্থবির, কোথাও কাজ চলছে ধীরগতিতে। এর পেছনে রয়েছে অর্থসংকট, বৈদেশিক ঋণচাপ, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং নীতি-অনিশ্চয়তা। উন্নয়ন কার্যক্রমে খরা মানে শুধু অবকাঠামো নির্মাণ থেমে যাওয়া নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে কর্মসংস্থান হ্রাস, শ্রমিকের আয় কমে যাওয়া এবং বাজারে চাহিদার সংকোচন। ফলে অর্থনীতির চাকা আরও ধীর হয়ে পড়ছে। অন্যদিকে মূল্যস্ফীতি যেন লাগামছাড়া ঘোড়া। খাদ্যপণ্য থেকে শুরু করে নিত্যপ্রয়োজনীয় সবকিছুর দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। শহর ও গ্রাম উভয় ক্ষেত্রেই নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছে। আয় বাড়ছে না, অথচ ব্যয় প্রতিনিয়ত বাড়ছে।
এটা স্বীকার করতে হবে, উন্নয়ন কার্যক্রমে খরা ও মূল্যস্ফীতির চাপ একে অন্যকে আরও তীব্র করছে। যখন উন্নয়ন প্রকল্প কমে যায়, তখন কর্মসংস্থান সংকুচিত হয়, মানুষের হাতে নগদ অর্থ কমে যায়। কিন্তু একই সময়ে মূল্যস্ফীতি বাড়লে সেই সীমিত আয়ের ওপর চাপ বহুগুণ বেড়ে যায়। এতে বাজারে এক ধরনের স্থবিরতা তৈরি হয়Ñ ভোগ কমে, ব্যবসা ঝুঁকিতে পড়ে, বিনিয়োগকারীরা নতুন সিদ্ধান্ত নিতে দ্বিধায় পড়ে।
এই সংকট থেকে উত্তরণে দরকার সমন্বিত ও বাস্তবমুখী পদক্ষেপ। এই ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে উৎপাদনমুখী ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী উন্নয়ন প্রকল্পগুলো সচল করতে হবে। অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমিয়ে অর্থনৈতিকভাবে ফলপ্রসূ প্রকল্পে বিনিয়োগ বাড়ানো জরুরি। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বাজার ব্যবস্থাপনায় কঠোর নজরদারি দরকার। সিন্ডিকেট ভাঙা, সরবরাহ চেইন শক্তিশালী করা এবং কৃষি উৎপাদন বাড়াতে কৃষকদের সহায়তা দেওয়া এখন সময়ের দাবি। একই সঙ্গে আর্থিক নীতিতে শৃঙ্খলা, রাজস্ব আহরণে স্বচ্ছতা এবং সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি জোরদার করা প্রয়োজন। কারণ উন্নয়ন ও মূল্যস্ফীতির ভারসাম্য রক্ষা না করতে পারলে সাধারণ মানুষের জীবনে স্বস্তি ফিরবে না। মনে রাখতে হবে, উন্নয়ন থমকে থাকা ও বাজার অস্থির থাকাÑ দুই ক্ষেত্রেই বড় চ্যালেঞ্জ মানুষের আস্থা ধরে রাখা। আমরা মনে করি, সংকট নিরসনে এখনই কার্যকর সিদ্ধান্ত ও সদিচ্ছা জরুরি।