× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

পরিবেশ

নগর দূষণ ও প্রতিকার

আবদুল মুকতাদির মামুন

প্রকাশ : ০২ জানুয়ারি ২০২৬ ১১:৪৫ এএম

 নগর দূষণ ও প্রতিকার

পৃথিবীতে যত প্রকার ময়লা-আবর্জনা আছে, সেসবের যেন একটি জীবন্ত জাদুঘর বাংলাদেশ। এখানকার শহর, শহর সংলগ্ন জলাশয়, নদী ও খালগুলো দেখলে মনে হবে- অত্যন্ত উত্তম প্রক্রিয়ায় এখানে ময়লা-আবর্জনার চাষ করা হয়! কথাটি শুনতে খুব খারাপ শোনালেও, বাস্তবতাটা এমনই। পরিবেশ দূষণের যে ক’টি উপাদান আছে, তার সবক’টিই আমাদের শহরগুলোতে প্রতিযোগিতামূলকভাবে বিদ্যমান! যেদিকে চোখ যায়, দেখা যায় নানা পদের, নানা রঙের দূষণ উপাদান! নাকে ধাক্কা দেয়, ময়লা আবর্জনার উৎকট গন্ধ! মারাত্মক শব্দদূষণে জনজীবন হয় ওষ্ঠাগত!

বাংলাদেশের শহরগুলোর বিশেষ করে, ঢাকার পরিবেশ দূষণ বর্তমানে মারাত্মক পর্যায়ে পৌঁছেছে। প্রতিদিনের দূষণ সূচকে এই শহরটি প্রায়ই বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত শহরের তালিকায় শীর্ষে থাকে। পরিবেশ দূষণ কেবল একটি স্বাস্থ্যঝুঁকিই নয়, বরং আমাদের জীবনযাত্রার মানকেও নিম্নগামী করছে। প্রকারভেদ বিবেচনায় ঢাকাসহ বাংলাদেশের শহরগুলোর দূষণকে প্রধানত চারটি ভাগে ভাগ করা যায় : ক. বায়ুদূষণ, খ. পানিদূষণ, গ. শব্দদূষণ ও ঘ. দৃষ্টিদূষণ।

বায়ুদূষণ : রাজধানীসহ দেশের প্রায় সব শহরেই সারা বছর ছোট-বড় অজস্র ভবন নির্মাণ, রাস্তা খনন ও মেরামতের কাজ চলে। যেকোনো ধরনের নির্মাণ কাজ করার সময় নির্মাণস্থানে অস্থায়ী ছাউনি বা বেষ্টনী দেওয়ার নিয়ম আছে। বেষ্টনীর ভেতর ও বাইরে নির্মাণসামগ্রী (মাটি, বালি, ইট, রড, সিমেন্ট ইত্যাদি) যথাযথভাবে ঢেকে রাখা এবং পানি ছিটানোর কথা থাকলেও বাস্তবে সেসব নিয়ম পালন করতে দেখা যায় না।

ঢাকার আশপাশে আছে ছোট-বড় কয়েক হাজার শিল্পকারখানা। বায়ুদূষণের ৫০ শতাংশেরও বেশি ঘটে শিল্পকারখানা থেকে। এ ছাড়াও আছে প্রায় ১৫০০-১৬০০ ইটভাটা, যেগুলো বায়ুদূষণের অন্যতম কারণ। বেশিরভাগ ইটভাটায় জ্বালানি হিসেবে কয়লা, কাঠ ব্যবহার করা হয়। ফলে প্রচুর ছাই তৈরি হয় এবং কার্বন মনো-অক্সাইড, সালফার অক্সাইড ও কার্বন ডাই-অক্সাইডের মতো দূষিত কণা বাতাসের সঙ্গে মেশে। শীতকালে তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা কম থাকায় এই সময়ে অতি ক্ষুদ্র বস্তুকণাগুলো বাতাসে ভেসে বেড়ায়।

শহরের যেকোনো রাস্তায় কিছুক্ষণ দাঁড়ালেই দেখা যায়, চারপাশ কালো ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন করে বিকট শব্দে ছুটে চলছে বিভিন্ন ফিটনেসবিহীন যানবাহন, বিশেষ করে বাস ও ট্রাক। এই শহরে ফিটনেসবিহীন গাড়ি অবাধে ঘুরে বেড়াতে পারে। ধুলোবালিতে যখন ইন্ডাস্ট্রিয়াল কেমিক্যাল, ইটের ভাটা থেকে নির্গত বিভিন্ন দূষণ, গাড়ির ডিজেল পোড়া ব্ল্যাক কার্বন মিশ্রিত হয়, তখন সেটি পরিপূর্ণভাবে দূষণের একটি উৎস হিসেবে কাজ করে।

ঢাকাসহ সব শহরের সড়কগুলোর পাশে আছে অগণিত দোকানপাট। ভোরবেলা দোকান খোলার সঙ্গে সঙ্গে দোকানিদের প্রথম কাজ হলো, দোকান ঝাড়ু দিয়ে সকল ময়লা-আবর্জনা ফুটপাত, রাস্তা বা ড্রেনে ফেলা! মাত্রাতিরিক্ত ধুলোবালির আরেকটা কারণ হলো, পিচঢালা রাস্তার সঙ্গে ফুটপাতের গ্যাপ এবং ভাঙাচোরা রাস্তা ও ফুটপাত।

দুয়েকটি ব্যতিক্রম ছাড়া ঢাকাসহ বড় বড় শহরের রাস্তার পাশে কোথাও নেই কোনো ডেডিকেটেড ডাস্টবিন বা ডাস্টবিনের জায়গা! রাস্তাগুলোই যেন একেকটা ডাস্টবিন! শহরের রাস্তা থেকে বর্জ্য সংগ্রহ করে শহরের আশপাশে খোলা স্থানে স্তূপ করা হয়। ময়লার স্তূপ যেখানে থাকে, সেখানে মিথেন গ্যাস উৎপন্ন হয়। মিথেন গ্যাসের দুর্গন্ধ থেকে বাঁচার জন্য পরিচ্ছন্ন কর্মীরা আগুন জ্বালিয়ে বর্জ্য পোড়ায়। যেসব এলাকায় বর্জ্য পোড়ানো হয়, সেইসব এলাকাতেই বায়ুদূষণ বেশি হচ্ছে।

বিশ্বের বড় শহরগুলো তাদের পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখার জন্য কেবল ঝাড়ু দেওয়ার ওপর নির্ভর করে না; বরং উন্নত প্রযুক্তি, কঠোর আইন এবং সামাজিক সচেতনতার একটি সমন্বিত ব্যবস্থা গ্রহণ করে। নিচে বিশ্বের সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন শহরগুলোর ( যেমন : সিঙ্গাপুর, টোকিও, জুরিখ) প্রধান পদক্ষেপগুলো আলোচনা করা হলো :

উৎস থেকে বর্জ্য পৃথকীকরণ ও সংগ্রহ : বিশ্বের উন্নত শহরে ময়লা ফেলার সময় তা বিভিন্ন ভাগে ভাগ করা বাধ্যতামূলক। নাগরিকরা তাদের বাড়ির ময়লা জৈব (খাবারের অংশ), প্লাস্টিক, কাচ এবং কাগজÑ এভাবে ভাগ করে আলাদা আলাদা ডাস্টবিনে ফেলে। অনেক শহরে স্মার্ট বিন ব্যবহার করা হয়, যা ময়লা পূর্ণ হয়ে গেলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের সংকেত পাঠায়। এতে সময় ও জ্বালানি বাঁচে।

বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ : সিঙ্গাপুর এবং জাপানের মতো দেশে ময়লা ফেলার জন্য জায়গার অভাব থাকায় তারা অধিকাংশ ময়লা বিশেষ ইনসিনারেটর বা চুল্লিতে পুড়িয়ে ফেলে। এই প্রক্রিয়ায় উৎপন্ন তাপ থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়।

ওপরে বর্ণিত সবক’টি ব্যবস্থা গ্রহণ করা আমাদের দেশের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপট ও জনসংখ্যার ঘনত্বের কারণে হয়তো সম্ভব হবে না, তারপরও যেটুকু করা যায়, তার জন্য নগর কর্তৃপক্ষকে এখনই উদ্যোগ নিতে হবে। জ্বালানি তেলের বদলে ব্যাটারিচালিত বা ইলেকট্রিক যানবাহন এবং ভালো মানের পাবলিক ট্রান্সপোর্ট বৃদ্ধি করতে হবে।

পানিদূষণ : ঢাকাসহ বাংলাদেশের বেশিরভাগ শহরের প্রাণ হিসেবে পরিচিত নদী ও খালগুলো এখন মৃতপ্রায়। পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা উন্নত না হওয়ায় ড্রেনের পানি সরাসরি জলাশয়ে মিশছে। পলিথিন ও প্লাস্টিক বোতল ড্রেন ও খাল দখল করে পানির প্রবাহ বন্ধ করে দিচ্ছে। শহর পরিষ্কার রাখতে পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা আধুনিক হওয়া জরুরি। বিশ্বের বড় শহরগুলো তাদের স্যুয়ারেজ ওয়াটার বা নর্দমার পানি সরাসরি নদীতে ফেলে না। তারা এটি ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্টে পরিষ্কার করে আবার ব্যবহার করে। পানিদূষণ রোধে নদীর সীমানা নির্ধারণ এবং শিল্পবর্জ্য পরিশোধনে ইটিপি ব্যবহারে কঠোর আইন প্রয়োগ এবং পাটের ব্যাগ বা পচনশীল পণ্য ব্যবহারে অভ্যস্ত করার জন্য বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।

শব্দদূষণ : শব্দদূষণের ফলে উচ্চ রক্তচাপ ও শ্রবণশক্তি হ্রাসের মতো সমস্যা বাড়ছে। অপ্রয়োজনীয় হর্ন, বিশেষ করে হাইড্রোলিক হর্নের যথেচ্ছ ব্যবহার। দিনরাত মিকশ্চার মেশিন বা পাইলিংয়ের কাজ। সামাজিক বা রাজনৈতিক অনুষ্ঠানে উচ্চস্বরে মাইক বাজানো। চালকদের মধ্যে ট্রাফিক আইন ও হর্নের কুফল সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি এবং আইনের যথাযথ প্রয়োগের মাধ্যমে শব্দদূষণ রোধ করা যায়।

দৃষ্টিদূষণ : রাস্তার পাশে, ফুটপাতে ছুড়ে ফেলা ময়লা-আবর্জনা, অপরিকল্পিতভাবে টাঙানো বিজ্ঞাপনী ব্যানার ও দেওয়ালজুড়ে লাগনো পোস্টার ও স্টিকার, মাথার ওপর দিয়ে যাওয়া উন্মুক্ত বৈদ্যুতিক ও ইন্টারনেট তারের জঞ্জাল শহরের সৌন্দর্য মারাত্মকভাবে বিনষ্ট করছে।

পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখতে শাস্তিমূলক ব্যবস্থার ভূমিকা অপরিসীম। যত্রতত্র ময়লা ফেলার জন্য সিঙ্গাপুরে কয়েক হাজার ডলার পর্যন্ত জরিমানা এবং কমিউনিটি সার্ভিস করার সাজা দেওয়া হয়। প্রযুক্তির চেয়েও বড় শক্তি হলো পারিবারিক শিক্ষা ও নাগরিকদের সচেতনতা। জাপানের স্কুলে ছোটবেলা থেকেই শিক্ষার্থীদের দিয়ে নিজ শ্রেণিকক্ষ এবং চারপাশ পরিষ্কার করানো হয়। এতে বড় হয়ে তারা জনসমাগমস্থলেও ময়লা ফেলে না। রাজশাহী শহর সামগ্রিকভাবে একটি পরিচ্ছন্ন শহর এবং সিলেট শহরের অধিকাংশ এলাকা দৃষ্টিদূষণ থেকে মুক্ত। রাজশাহী ও সিলেটকে উদাহরণ হিসেবে নিয়ে এটিকে ঢাকাসহ অন্যান্য শহরে বিস্তার করা যায়।

আগামী ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠেয় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশে একটি নতুন সরকার দেশ পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করবে। আশা করা যায়, সরকারের অনেক অগ্রাধিকারের মধ্যে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা এবং পরিবেশের উন্নয়ন হবে আগামী সরকারের অন্যতম একটি কাজ। 


আবদুল মুকতাদির মামুন

উন্নয়ন গবেষক

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা