বিশ্লেষণ
মহিউদ্দিন খান মোহন
প্রকাশ : ২৯ ডিসেম্বর ২০২৫ ১৩:৪৩ পিএম
দিনটি ছিল কুয়াশাচ্ছন্ন। রাত থেকেই শীত নেমেছিল জাঁকিয়ে। বছরের সবচেয়ে কড়া শীত অনুভূত হয়েছে সেদিন। সকালটা ছিল ঘন কুয়াশায় ঢাকা। উত্তুরে ঠান্ডা হাওয়া সবাইকে কাঁপাচ্ছিল ঘরে-বাইরে। অনেকটা দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার মতো অবস্থা। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া কেউ ঘরের বাইরে বের না হওয়াটাই ছিল স্বাভাবিক। কিন্তু পৌষের সে প্রচণ্ড শীত উপেক্ষা করে লাখো মানুষে সমবেত হয়েছিল উন্মুক্ত ময়দানসম পূর্বাচল এক্সপ্রেসওয়েতে; যেটা ‘তিনশ ফুট’ নামেই সমধিক পরিচিত। হাড়কাঁপানো শীতকে থোড়াই কেয়ার করে সেদিন যারা তিনশ ফুট এক্সপ্রেসওয়েতে সমবেত হয়েছিলেন, তারা এসেছিলেন একজন মানুষকে দেখতে, তার কথা শুনতে। গত ২৫ ডিসেম্বর দীর্ঘ সতেরো বছরের নির্বাসিত জীবনের অবসান ঘটিয়ে দেশে ফিরেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তাকে গণসংবর্ধনা দেওয়ার আয়োজন করছিল তার দল। সারা দেশ থেকে নেতাকর্মীরা আগের রাত থেকেই জমায়েত হতে শুরু করেছিল তিনশ ফুটে। দেশের সব সড়ক-মহাসড়ক এসে মিলেছিল এক মোহনা।
তারেক রহমানকে বহনকারী বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের উড়োজাহাজটি সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হয়ে ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে দুপুর পৌনে ১২টার দিকে। সেখান থেকে সংবর্ধনাস্থল তিনশ ফুটে পৌঁছতে সময় লেগে যায় প্রায় সাড়ে ৩ ঘণ্টা। দলীয় নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের প্রচণ্ড ভিড় ঠেলে তাকে বহনকারী বাসটিকে চলতে হচ্ছিল শম্বুকগতিতে। রাস্তাজুড়ে উৎফুল্ল জনতার হিল্লোল। সে সঙ্গে মুহুর্মুহু স্লোগানে মুখরিত চারদিক। এ এক অবিস্মরণীয় দৃশ্যপট! তারেক রহমান যখন নেতৃবৃন্দকে সঙ্গে নিয়ে সংবর্ধনা মঞ্চে আরোহণ করলেন, তখন ঢেউ উঠেছিল সেই জনসমুদ্রে। তারপর তিনি শুরু করলেন তার কথা। সেটা গতানুগতিক রাজনৈতিক বক্তৃতা ছিলনা। দীর্ঘদিন পরে তিনি তার মানুষদের সঙ্গে সরাসরি কথা বললেন। শোনালেন কিছু প্রত্যাশার কথা। সমবেত জনতাকে সাক্ষী রেখে বললেন, নতুন এক পরিকল্পনার কথা। কী সে পরিকল্পনা তা বুঝতে কারও বাকি থাকার কথা নয়। এ দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য যে সমন্বিত পরিকল্পনা দরকার, হয়তো তারই সারমর্ম তিনি মাত্র দুই লাইনে ব্যক্ত করে থাকবেন।
নির্বাসন-ফেরত তারেক রহমানকে স্বাগত জানাতে কত লাখ লোক ২৫ ডিসেম্বর তিনশ ফুটের ওই মহাসড়কে সমবেত হয়েছিল, তা গুনে বলা সম্ভব ছিল না। তিনশ ফুটে সমবেত মানুষের সংখ্যা এখানে বড় বিষয় নয়। বরং গোটা বাংলাদেশই সেদিন তারেক রহমানকে সংবর্ধিত করেছে। টেলিভিশন এবং অনলাইন সম্প্রচারের মাধ্যমে গোটা বাংলাদেশ যোগ দিয়েছিল সে ঐতিহাসিক সংবর্ধনায়। সরাসরি কিংবা টিভি পর্দায়, সবারই দৃষ্টি ছিল সতেরো বছর আগে জোরপূর্বক দেশত্যাগে বাধ্য করা এক আহত-অসুস্থ তরুণের প্রতি; যিনি আজ বয়সের দিক দিয়ে প্রৌঢ়ত্বে পা দিয়েছেন। শুধু রাজনৈতিক প্রতিহিংসাবশত একজন উদীয়মান রাজনীতিকের জীবন ধ্বংস করার চক্রান্তে যারা সেদিন মেতেছিল, আজ তাদের কারওই কোনো অবস্থান নেই। কোথায় তারা হারিয়ে গেছেন কালের স্রোতে!
২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি বাংলাদেশের ওপর নাজেল হওয়া জরুরি অবস্থার গজবের আগে থেকেই টার্গেট করা হয়েছিল তারেক রহমানকে। তিনি টার্গেট হয়েছিলেন আধিপত্যবাদী শক্তির ক্রীড়নকদের। ২০০১ সালে ভূমিধস বিজয়ের মাধ্যমে ক্ষমতাসীন বিএনপি জোট সরকারের আমলেই সক্রিয় হয়ে উঠেছিল ওই অপশক্তিটি। তাদের পোষ্য মিডিয়ার মাধ্যমে তারেক রহমানের চরিত্র হননের লক্ষ্যে ক্রমাগত অপপ্রচার চালানো হয়েছিল। সেসব অপপ্রচারে জনসাধারণের একটি অংশ যে বিভ্রান্ত হয়নি তা নয়। বিএনপির মিডিয়া-উদাসীনতার কারণে সেসব অপপ্রচারে বিপরীতে জুতসই পাল্টা প্রচারণা চালানো যায়নি। ফলে জনগণের একটি অংশের মধ্যে তারেক রহমান সম্পর্কে একটি ভুল ধারণা সৃষ্টি হয়। আর এর সুযোগ নেয় আধিপত্যবাদী শক্তির নয়া তল্পিবাহক কথিত ওয়ান-ইলেভেন সরকার। তারা কাাল্পনিক দুর্নীতির মামলায় তারেক রহমানকে গ্রেপ্তার করে বর্বরোচিত শারীরিক নির্যাতন চালায়। তারপর একদিন তাকে চাপের মুখে দেশত্যাগে বাধ্য করে। ২০০৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর তিনি মাতৃভূমি ত্যাগ করে যুক্তরাজ্যে চলে যেতে বাধ্য হন।
আহত তারেক রহমান দেশত্যাগ করলেও অপশক্তি তার পিছু ছাড়েনি। ততদিনে বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতায় পরিবর্তন হয়েছে। ওয়ান-ইলেভেনের আধাসামরিক সরকার কূটকৌশলের নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় বসিয়ে যায় আধিপত্যবাদী শক্তির পরীক্ষিত ক্রীড়নক আওয়ামী লীগকে। চক্রান্তের ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখে তারা। বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের পরবর্তী নিশানবরদার তারেক রহমান যাতে আর কখনোই রাজনীতিতে ফিরে আসতে না পারেন সেজন্য বানোয়াট মামলায় সাজা দেওয়া হয় তাকে। তার পরের ইতিহাস এখানে পুনরুল্লেখ নিষ্প্রয়োজন। কেননা, সে ন্যক্কারজনক ইতিহাসের সাক্ষী এ দেশের সবাই। দীর্ঘ পনেরো বছর চরম ফ্যাসিবাদী শাসন কায়েমের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ তথা শেখ হাসিনা দেশে যে শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছিল, তার উদ্দেশ্য ছিল দুঃশাসনকে চিরস্থায়ী করা। ফ্যাসিবাদী শাসকরা ক্ষমতাকে পাকাপোক্ত করতে তাদের পথের কাঁটাসমূহকে উপড়ে ফেলার চেষ্টা করে। শেখ হাসিনাও তা-ই করেছেন। তিনি একসঙ্গে তার পথের দুটি কাঁটাকে উৎপাটন করতে চেয়েছিলেন। একজন খালেদা জিয়া, অপরজন তারই পুত্র তারেক রহমান। মিথ্যা মামলায় ফরমায়েশি রায়ের মাধ্যমে জাতীয়তাবাদী শক্তির এই দুই স্তম্ভকে গুঁড়িয়ে দিতে চেয়েছিলেন তিনি।
কিন্তু দুনিয়ার সব ফ্যাসিস্ট শাসকের পরিণতি শেখ হাসিনাও এড়াতে পারেননি। যুগে যুগে ফ্যাসিস্ট শাসকেরা ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য চরম বর্বরতা-নৃশংসতার আশ্রয় নিলেও যেমন তাদের শেষরক্ষা হয়নি, তেমনি শেখ হাসিনাও পারেননি টিকে থাকতে। প্রচণ্ড গণরোষের অগ্নুৎপাতে ভস্ম হয়ে গেছে তার তখতে তাউস। আর তাতেই স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের দ্বার খুলে যায় তারেক রহমানের। তিনি বীরোচিত ভাবমূর্তিতে দেশে প্রত্যাবর্তন করেছেন। আর পনেরো বছরের দুঃশাসক হাসিনা আজ নিক্ষিপ্ত ইতিহাসের আঁস্তাকুড়ে।
সংবর্ধনা মঞ্চে তারেক রহমান মাত্র ১৬ মিনিট কথা বলেছেন। তাতে তিনি জাতিকে শুনিয়েছেন এক বিরাট আশার বাণী। বিশ্ববিখ্যাত মার্কিন মানবাধিকার কর্মী মার্টিন লুথার কিংয়ের ‘আই হ্যাভে এ ড্রিম’-এর উদ্ধৃতি দিয়ে তারেক রহমান বলেছেন, ‘আই হ্যাভ এ প্ল্যান ফর দ্য পিপল অব মাই কান্ট্রি, ফর মাই কান্ট্রি।’ অর্থাৎ দেশের মানুষের জন্য ও দেশের জন্য তার একটি পরিকল্পনা রয়েছে। যদিও তিনি সে প্ল্যানের বিশদ কোনো ব্যাখ্যা দেননি। সেটা ওই মুহূর্তে সম্ভবও ছিল না। তবে এটা অনুমান করা যায়, এই দেশ, এই জাতির কল্যাণে কোনো ইতিবাচক প্ল্যানের কথাই তিনি বুঝিয়ে থাকবেন। হয়তো অচিরেই দেশবাসী তার সে প্ল্যান সম্বন্ধে বিস্তারিত অবগত হতে পারবে। তার সে প্ল্যানে বাংলাদেশকে একটি স্বনির্ভর গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে পূর্ণতা দেওয়ার নিশ্চয়তা অবশ্যই থাকবে বলে দেশবাসী আশাবাদী। দীর্ঘদিন তিনি একটি অগণতান্ত্রিক শক্তির বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছেন। তাই বাংলাদেশ যাতে আর কোনো অগণতান্ত্রিক শক্তির কবলে না পড়ে, সেজন্য জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলার ঐতিহাসিক দায়িত্ব আজ তারই কাঁধে অর্পিত হয়েছে।
২৫ ডিসেম্বর যে বীরোচিত সংবর্ধনা তারেক রহমানকে দেওয়া হয়েছে, তা আমাদের আরেকটি ঐতিহাসিক সংবর্ধনার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। ষাটোর্ধ্ব যারা জীবিত রয়েছেন, তাদের নিশ্চয়ই সে সংবর্ধনার কথা মনে আছে। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালের ৮ জানুয়ারি পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করেন ১০ জানুয়ারি। তাকেও সেদিন দেওয়া হয়েছিল বিপুল সংবর্ধনা। সে সংবর্ধনার সঙ্গে তার ওপর অর্পিত হয়েছিল সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশকে এগিয়ে নেওয়ার গুরুদায়িত্ব। কিন্তু তিনি সে দায়িত্ব পালনে সক্ষম হননি। কেন তিনি সে দায়িত্ব পালন করতে পারেননি সে বিতর্ক এখানে অবান্তর। তবে এটা অবশ্যই স্বীকার্য যে, তিনি বাংলাদেশের গণমানুষের প্রত্যাশাকে উপলব্ধি ও মূল্যায়ন করতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। ফলে মাত্র তিন বছরের মাথায় তার জনপ্রিয়তা নেমে গিয়েছিল হিমাংকের নিচে। ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে আজ তারেক রহমানকে তার কর্মপন্থা নির্ধারণ করতে হবে।
বিপুল জনসমর্থন ও বর্ণাঢ্য সংবর্ধনা একজন নেতার দায়বদ্ধতাও সৃষ্টি করে। তার এ দায়বদ্ধতা তাদের প্রতি, যারা তাকে সমর্থন দেয়, ফুলেল শুভেচ্ছায় সিক্ত করে। নেতার কর্তব্য সেই সমর্থক-শুভানুধ্যায়ীদের প্রত্যাশাকে বাস্তবে রূপ দেওয়া। ২৫ ডিসেম্বর ঐতিহাসিক গণসংবর্ধনার মধ্য দিয়ে এ দেশের বঞ্চিত মানুষের কাছে নতুন করে দায়বদ্ধ হয়েছেন তারেক রহমান। তাদের সে প্রত্যাশা পূরণের দায়িত্ব এখন তার। আর সেক্ষেত্রে তাকে অবশ্যই এ দেশে জাতীয়তাবাদী রাজনীতির উদগাতা রাষ্ট্রপতি শহীদ জিয়াউর রহমানকে অনুসরণ করতে হবে। তার সততা, নিখাদ দেশপ্রেম আর দূরদর্শিতা তারেক রহমানের জন্য আলোকবর্তিকা হিসেবে কাজ করবে। তাকে একটি কথা অবশ্যই মনে রাখতে হবে, পিতা হিসেবে নয়, জাতীয়তাবাদী রাজনীতির প্রবক্তা হিসেবে জিয়াউর রহমানই হবেন তার আদর্শ। তার ১৯ দফা কর্মসূচিকে ভিত্তি করেই প্রণয়ন করতে হবে রাজনীতি ও আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের নবতর কর্মসূচি। মনে রাখতে হবে, এ দেশে গতানুগতিক রাজনীতির বাইরে উন্নয়ন ও উৎপাদনের যে রাজনীতির সূচনা জিয়াউর রহমান করে গেছেন, তাকে এগিয়ে নিতে পারলেই সফলতা অর্জন সম্ভব হবে।
তারেক রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের সকালটি ছিল কুয়াশায় ঘেরা। কুয়াশা কখনও স্থায়ী হয় না। ষড়যন্ত্র-চক্রান্তের যে কুয়াশা জাতির ভবিষ্যৎকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে, তারেক রহমানকে সে কুয়াশার চাদর ছিন্ন করে জাতিকে একটি রৌদ্রকরোজ্জ্বল প্রভাত উপহার দিতে হবে।
মহিউদ্দিন খান মোহন
সাংবাদিক ও কলাম লেখক