আগুনে শিশুর মৃত্যু
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ২২ ডিসেম্বর ২০২৫ ১৪:০৭ পিএম
অপ্রিয় হলেও সত্য, স্বাধীনতার ৫৪ বছরেও সমাজ বা রাষ্ট্র আমাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারেনি। মুখে যতই উন্নয়ন-অগ্রগতির ফুলঝুরি ছোটানো হোক, সমাজে-রাষ্ট্রে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার প্রতিফলন কার্যত নেই। ফলে এখনও মধ্যযুগীয় বর্বরতার সাক্ষী হতে হচ্ছে আমাদের। ময়মনসিংহের ভালুকায় পোশাক শ্রমিক দিপু চন্দ্র দাসকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যার ক্ষত এখনও শুকায়নি। ধর্ম অবমাননার অভিযোগে গাছে ঝুলিয়ে আগুন দিয়ে যেভাবে দিপুকে পুড়িয়ে মারা হয়েছে তা হার মানিয়েছে মধ্যযুগের বর্বরতাকেও। এই নৃশংসতার রেশ মেলাতে না মেলাতেই পুড়িয়ে হত্যা করা হলো আট বছরের শিশু আয়েশা আক্তার সানজুকে।
ঘটনাটি ঘটেছে লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার ভবানীগঞ্জ ইউনিয়নের চর মনসা গ্রামের সুতার গোপটা এলাকায়, বেলাল হোসেন চৌধুরী নামের স্থানীয় এক বিএনপি নেতার বাড়িতে। সংবাদ মাধ্যমের প্রতিবেদন বলছে, শুক্রবার রাতে ঘুমোচ্ছিলেন বেলাল হোসেন এবং তার পরিবারের সদস্যরা। রাত ২টার দিকে দুর্বৃত্তরা সদর দরজায় তালা লাগিয়ে পেট্রোল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়। প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, বেলাল হোসেনের বসতঘরের দরজায় বাইরে থেকে তালা লাগিয়ে আগুন ধরিয়ে দিলে ঘুমন্ত অবস্থায় ৮ বছরের শিশু আয়েশা অগ্নিদগ্ধ হয়ে মারা যায়। এ ঘটনায় ওই পরিবারের নারী ও শিশুসহ আরও অন্তত ছয়জন গুরুতর আহত হয়েছেন। বেলাল হোসেনের অন্য দুই মেয়ে গুরুতর দগ্ধ হওয়ায় আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাদেরকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়েছে।
আমরা এমন পৈশাচিক ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাই, একইসঙ্গে অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করছি। আমরা মনে করি, এই ধরনের তাণ্ডব যেকোনো মূল্যে সরকারকে থামানোর উদ্যোগ নিতে হবে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঠেকাতে হবে। মনে রাখতে হবে, এই সমাজ ক্ষমতাধরদের দুর্বলতাকে নিপীড়নের সুযোগ করে দিচ্ছে বলেই অপরাধের মাত্রা বেড়ে চলেছে।
বিচারহীনতা, বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা, ধর্মীয়, রাজনৈতিক, আর্থ-সামাজিক অথবা পারিবারিক জটিলতা, সেই সঙ্গে সার্বিক নিরাপত্তাহীনতার কারণে অপরাধের সংখ্যা বাড়ছেই। জুলাই অভ্যুত্থানের পর পুলিশ সদস্যদের দুর্বল অবস্থান এবং ভেঙে পড়া শৃঙ্খলা ফিরিয়ে পুলিশকে সক্রিয় করার করে তোলার চেষ্টার মধ্যেই সারা দেশে ‘মব’ সন্ত্রাসের মাধ্যমে একশ্রেণির দুর্বৃত্ত ফায়দা হাসিলের চেষ্টা চালায়। তারা আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে সমাজে ও রাষ্ট্রে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অপপ্রয়াস বজায় রাখে। এই অপতৎপরতা এখনও চলমান। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, মবের নামে যারা আইন নিজের হাতে তুলে নিয়েছে, সামাজিক শৃঙ্খলা ভেঙে জননিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছে তাদের বিরুদ্ধে সরকারের তরফে জোরালো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। রাষ্ট্রীয় কাঠামোকে সুশৃঙ্খলা করতে পুনঃশৃঙ্খলা ফেরাতে যথাযথ দৃশ্যমান উদ্যোগ চোখে পড়েনি। অপরাধীরা থেকে গেছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। একের পর এক ঘৃণ্য অপরাধ ঘটানোর পরও চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের আইনের আওতায় আনা হয়নি। গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রেও গ্রেপ্তারের সংখ্যা নগণ্য। ফলে ভুক্তভোগীর পরিবার অভিযোগ জানাতেও ভয় পাচ্ছে।
ইতঃপূর্বে সরকারের তরফে এ ধরনের ঘৃণ্য ঘটনার পর বিবৃতি দিয়ে পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করা হয়েছে। শোক ও নিন্দা জানানো হয়েছে। কিন্তু তাতে করে পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। বরং এক ‘অদ্ভুত অন্ধকার’ গ্রাস করছে জনজীবনকে। জাতি অধীরে আগ্রহে অপেক্ষা করছে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের। এই নির্বাচন ঘিরে পুরো জাতি যখন জেগে উঠেছে, তাদের ভোটের অধিকার ফিরে পাওয়ার আনন্দে উদ্বেলিতÑ তখন সবচেয়ে বেশি জরুরি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি। আইনশৃঙ্খলার অবনতি জাতির স্বপ্ন ও আগ্রহে যেমন ছাই চাপা দিতে পারে, তেমনি সরকারকেও ঘরোয়া এবং আন্তর্জাতিক পরিসরে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে। আমরা মনে করি, আইনের শাসন ছাড়া একটি রাষ্ট্র কোনোভাবেই আধুনিক দাবি করতে পারে না। আইনের শাসন ছাড়া সভ্যতার নিক্তিতে আমরা নিজেদের ‘সভ্য’ বলে দাবি করতে পারি না। তাই আইনের শাসন কায়েম করা রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান কাজ। আমরা আরও মনে করি, শুধু আইন প্রণয়ন করে আর কড়া শাস্তির চোখ রাঙানিতে পরিস্থিতির উন্নতি হবে না। এক্ষেত্রে আইনের যথাযথ প্রয়োগও জরুরি। সেই সঙ্গে বিচারের দীর্ঘসূত্রতা ঝেড়ে ফেলে দোষীদের দ্রুত শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই।