প্রেক্ষাপট
আল শাহারিয়া
প্রকাশ : ১৯ ডিসেম্বর ২০২৫ ১১:৫১ এএম
পৃথিবী নামক এই গ্রহটি আজ এক ভয়াবহ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। আমরা এমন একসময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি যখন আমাদের অস্তিত্বের প্রশ্নটি সবচেয়ে বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। মানবসভ্যতার ইতিহাসে অনেক যুদ্ধ হয়েছে, অনেক মহামারি এসেছে, অনেক সাম্রাজ্যের পতন ঘটেছে। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের মতো এমন সর্বগ্রাসী সংকট আগে কখনও আসেনি। এটি এখন অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক এবং পরিবেশগত সমস্যায় পরিণত হয়েছে। বিজ্ঞানীরা অনেক বছর ধরেই সতর্ক করে আসছেন, আমরা সেই সতর্কবার্তায় খুব একটা গুরুত্ব দেইনি। তার ফল এখন আমরা ভোগ করতে শুরু করেছি। প্রকৃতি এখন প্রতিশোধ নিতে শুরু করেছে। আগামী দিনগুলোতে এই সংকট আরও ঘনীভূত হবে। তাই নির্দ্বিধায় বলা যায়, জলবায়ু পরিবর্তনই বিশ্বের পরবর্তী মহাসংকট।
তাপমাত্রা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর
মারাত্মক প্রভাব পড়ছে। হিটস্ট্রোক এখন সাধারণ ঘটনায় পরিণত হয়েছে। অতিরিক্ত গরমে
মানুষের কর্মক্ষমতা কমে যাচ্ছে। এর বাইরেও আছে নতুন রোগের প্রাদুর্ভাব। মশা ও
কীটপতঙ্গবাহিত রোগগুলো নতুন নতুন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ছে। ডেঙ্গু বা ম্যালেরিয়ার মতো
রোগগুলো এখন এমনসব দেশে দেখা যাচ্ছে, যেখানে আগে এগুলো ছিল না। মেরু অঞ্চলের বরফ
গলে যাওয়ার ফলে হাজার বছর ধরে সুপ্ত থাকা অনেক ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়া জেগে উঠতে
পারে। বিজ্ঞানীরা আশঙ্কা করছেন, এর ফলে বিশ্বে নতুন কোনো মহামারি দেখা দিতে পারে।
আমাদের বর্তমান স্বাস্থ্যব্যবস্থা এই নতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত নয়।
বায়ুদূষণ ইতোমধ্যেই লাখ লাখ মানুষের প্রাণ কেড়ে নিচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তন এই
পরিস্থিতিকে আরও খারাপের দিকে নিয়ে যাচ্ছে।
সমুদ্রের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে মানুষ
তাদের ঘরবাড়ি হারাচ্ছে। লোনা পানি লোকালয়ে ঢুকে পড়ায় চাষযোগ্য জমি নষ্ট হচ্ছে।
সুপেয় পানির অভাব দেখা দিচ্ছে। এসব কারণে মানুষ তাদের ভিটেমাটি ছাড়তে বাধ্য হচ্ছে।
এদের বলা হচ্ছে জলবায়ু শরণার্থী। বিশ্বব্যাংকের মতে ২০৫০ সালের মধ্যে কেবল জলবায়ু
পরিবর্তনের কারণেই ২১ কোটিরও বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হতে পারে। এই বিপুলসংখ্যক
মানুষ কোথায় যাবে তা এক বিরাট প্রশ্ন। এক দেশ থেকে অন্য দেশে মানুষের ঢল নামবে। এর
ফলে সীমান্তে উত্তেজনা বাড়বে। সামাজিক অস্থিরতা তৈরি হবে। ধনী দেশগুলো নিজেদের
সীমানা বন্ধ করে দিতে চাইবে। এতে মানবিক বিপর্যয় দেখা দেবে। ইতোমধ্যেই আফ্রিকা ও
এশিয়ার অনেক দেশ থেকে মানুষ ইউরোপ বা আমেরিকার দিকে পাড়ি জমাচ্ছে। এই প্রবণতা
ভবিষ্যতে আরও বাড়বে এবং তা বিশ্বরাজনীতির মোড় ঘুরিয়ে দেবে।
জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর তালিকায়
বাংলাদেশ প্রথম সারিতে। যদিও এই পরিবর্তনের জন্য আমাদের দায় খুব সামান্য। আমাদের
কার্বন নিঃসরণের পরিমাণ নগণ্য। অথচ আমরাই এর বড় শিকার। আমাদের দক্ষিণাঞ্চলের
জেলাগুলোতে লোনা পানি ঢুকে পড়ছে। এতে কৃষিজমি নষ্ট হচ্ছে। মানুষ কাজের সন্ধানে
শহরমুখী হচ্ছে। ঢাকা শহরের ওপর চাপ বাড়ছে। উত্তরের জেলাগুলোতে খরা ও বন্যা দুটোই
বাড়ছে। নদীভাঙনে প্রতিবছর হাজার হাজার মানুষ নিঃস্ব হচ্ছে। ঘূর্ণিঝড়ের প্রকোপ ও
তীব্রতা বেড়েছে। সিডর বা আইলার মতো ঘূর্ণিঝড়গুলো আমাদের অর্থনীতিকে বারবার পিছিয়ে
দিচ্ছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় অনেক প্রতিশ্রুতি দিলেও সাহায্য খুব একটা পাওয়া
যাচ্ছে না। আমাদের নিজেদের লড়াইটা নিজেদেরই করতে হচ্ছে। কিন্তু এই লড়াই কতদিন
চালিয়ে যাওয়া সম্ভব তা নিয়ে সংশয় আছে।
জলবায়ু
পরিবর্তন কোনো তাত্ত্বিক বিষয় নয়। এটি আমাদের দরজায় কড়া নাড়ছে। আমরা যদি এখনই
ব্যবস্থা না নেই তবে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আমাদের ক্ষমা করবে না। তারা একটি
বাসযোগ্য পৃথিবী পাবে না। তারা পাবে এক ধ্বংসস্তূপ। বিজ্ঞান আমাদের পথ দেখিয়েছে।
সমাধান আমাদের হাতেই আছে। এখন প্রয়োজন কেবল ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা। ধনী-দরিদ্র
নির্বিশেষে সব দেশকে এক হয়ে কাজ করতে হবে। এটি কোনো নির্দিষ্ট দেশের সমস্যা নয়।
এটি সমগ্র মানবজাতির সমস্যা। পৃথিবীকে বাঁচানোর এই লড়াইয়ে আমাদের জিততেই হবে। কারণ
আমাদের যাওয়ার জন্য দ্বিতীয় কোনো গ্রহ নেই। সময় দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে। এখনই কাজ
শুরু করার সঠিক সময়। আজ যদি আমরা ব্যর্থ হই তবে কাল আমাদের অস্তিত্ব থাকবে না। তাই
জলবায়ু পরিবর্তনকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে আমাদের কর্মপরিকল্পনা সাজাতে হবে।
প্রকৃতিকে তার আপন রূপে ফিরিয়ে দিতে হবে। তবেই আমরা এই নীলগ্রহে নিরাপদে বেঁচে
থাকতে পারব।
আল শাহারিয়া
শিক্ষার্থী, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর