প্রধান উপদেষ্টার ভাষণ
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ১৮ ডিসেম্বর ২০২৫ ১২:০২ পিএম
মঙ্গলবার মহান বিজয় দিবস উপলক্ষে জাতির উদ্দেশে দেওয়া প্রধান উপদেষ্টার ভাষণে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার এবং রাষ্ট্র সংস্কারের অঙ্গীকারের বিষয়গুলো স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। টানা ১৭ মিনিটের এ ভাষণে তিনি জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট, সংস্কার কর্মসূচির অগ্রগতি, বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া ও ইনকিলাব মঞ্চের নেতা ওসমান হাদির চিকিৎসা এবং দেশের শান্তিশৃঙ্খলা বিনষ্টে পলাতক ফ্যাসিস্ট শক্তির অপতৎপরতাসহ নানা বিষয়ও তুলে ধরেন।
ভাষণের শুরুতে তিনি বলেন, বিজয় দিবস বাংলাদেশের ইতিহাসের এক অবিস্মরণীয় গৌরবময় দিন। আমরা ১৯৭১ সালে ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ শেষে অনেক ত্যাগ-তিতিক্ষা আর লাখো শহীদের রক্তের বিনিময়ে একটি স্বাধীন দেশ ও লাল-সবুজের পতাকা পেয়েছি। তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতার যে নতুন সূর্য উদিত হয়েছিল, বিগত বছরগুলোতে তা স্বৈরাচার ও ফ্যাসিবাদে ম্লান হয়েছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে আমরা আবারও একটি বৈষম্যহীন, দুর্নীতিমুক্ত, স্বাধীন ও সার্বভৌম গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার সুযোগ পেয়েছি।
উল্লেখ্য, তার এই ভাষণ বাংলাদেশ
টেলিভিশন, বিটিভি নিউজ ও বাংলাদেশ বেতারে একযোগে সম্প্রচার করা হয়।
উল্লেখ করা প্রয়োজন, ভাষণের গুরুত্বপূর্ণ অংশজুড়েই ছিল আসন্ন জাতীয়
নির্বাচন নিয়ে। প্রধান উপদেষ্টা প্রতিশ্রুতি দেন নির্বাচন হবে অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য।
কোনো রাজনৈতিক দল বা গোষ্ঠীর স্বার্থে নয়, জনগণের ভোটাধিকার রক্ষাই হবে তার সরকারের
প্রধান লক্ষ্য। তিনি সব রাজনৈতিক শক্তিকে সংযম, সহনশীলতা ও শান্তিপূর্ণ আচরণের আহ্বান
জানান। তিনি বলেন, নির্বাচন
কমিশন ইতোমধ্যে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেছে। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি সাধারণ নির্বাচন
ও গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। এই লক্ষ্যে যাবতীয় প্রস্তুতি চূড়ান্ত করা হচ্ছে। সরকার নির্বাচন
কমিশনকে সর্বাত্মক সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছে।
তার ভাষণে একটি বিশেষ বার্তা ছিল তরুণ সমাজের প্রতি। তিনি মনে করেন,
মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণ ও গণতন্ত্র রক্ষার দায়িত্ব আজকের তরুণদের কাঁধেই সবচেয়ে বেশি।
তাই তিনি অকপটে বলেছেন, তরুণদের
রক্ষা করুন; তাহলে আমরা সবাই এবং আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি রক্ষা পাবে। তিনি বলেন, যারা
দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেছে তারা বুঝে গেছে তরুণ যোদ্ধারা তাদের পুনরুত্থানের পক্ষে ভীষণ
রকম বাধা। এই অস্ত্রহীন, ভীতিহীন, ব্যক্তিগত স্বার্থ সম্বন্ধে সম্পূর্ণ উদাসীনÑ এই
চেহারার ছেলেমেয়েদের নিয়ে তাদের সাংঘাতিক ভীতি। তাদের লক্ষ্য হলো নির্বাচন আসার আগেই
পথের এই বাধাগুলো সরিয়ে ফেলা, নিজেদের রাজত্ব আবার কায়েম করা। তিনি বলেন, আমি পরিষ্কারভাবে
বলতে চাই, পরাজিত শক্তি ফ্যাসিস্ট টেররিস্টদের এই অপচেষ্টা সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ করে
দেওয়া হবে। ভয় দেখিয়ে, সন্ত্রাস ঘটিয়ে বা রক্ত ঝরিয়ে এই দেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা
কেউ থামাতে পারবে না। তিনি সবাইকে বিভ্রান্তি, গুজব ও উগ্রতার রাজনীতি
পরিহার করে দেশ গঠনে সক্রিয় ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান ।
আমরা মনে করি, জাতির উদ্দেশে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের
এই ভাষণটি কেবল একটি আনুষ্ঠানিক বার্তা নয়; এটি আগামী জাতীয় নির্বাচন ঘিরে রাষ্ট্র,
রাজনীতি ও সমাজের সামনে থাকা সংকট ও সম্ভাবনার এক গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা। ভাষণে
গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজন এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে
জনগণের আস্থার জায়গায় ফেরানোর অঙ্গীকার উচ্চারিত হয়েছে। একই সঙ্গে তিনি তরুণ সমাজকে
আশার শক্তি হিসেবে তুলে ধরেছেন এবং সতর্ক করেছেনÑ গণতন্ত্রবিরোধী ফ্যাসিস্ট শক্তি যেন
আর মাথাচাড়া দিতে না পারে।
ভুলে গেলে চলবে না, আমাদের জনসংখ্যার বড় অংশ তরুণ।
এই তরুণ সমাজ একদিকে যেমন পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখে, অন্যদিকে তেমনই বিভ্রান্তি ও হতাশারও
শিকার। দীর্ঘদিন ধরে ভোটাধিকার সংকুচিত হওয়া, রাজনৈতিক সহিংসতা, বেকারত্ব ও বৈষম্য
তাদের মনে ক্ষোভ জমিয়েছে। ভাষণে তরুণদের উদ্দেশে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনে প্রধান উপদেষ্টার
আহ্বান তাই সময়োপযোগী। আমরাও মনে করি, ভোটার হিসেবে সচেতন থাকা, গুজব ও উস্কানিতে পা
না দেওয়া এবং শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক অংশগ্রহণÑ এসবই তরুণ সমাজের জন্য আগামী দিনে সবচেয়ে
বড় পরীক্ষা।
আসলে জাতীয় নির্বাচন ঘিরে ফ্যাসিস্ট মানসিকতার
শক্তিগুলো নতুন কৌশলে সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছেÑ এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই। এদের
পরিকল্পনার কেন্দ্রে রয়েছে বিভাজন সৃষ্টি, ভয়ভীতি ছড়ানো এবং নির্বাচন ব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ
করা। প্রধান উপদেষ্টার ভাষণে এ ধরনের অপচেষ্টার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের ইঙ্গিতও স্পষ্ট।
আমাদের বিশ্বাস, রাষ্ট্র কোনোভাবেই সহিংসতা, দমননীতি বা ভোট কারচুপির রাজনীতি মেনে
নেবে না।
এমন প্রেক্ষাপটে নির্বাচন কমিশন, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা
বাহিনীর নিরপেক্ষতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভাষণে প্রধান উপদেষ্টা যে লেভেল প্লেয়িং
ফিল্ডের কথা বলেছেন, তা বাস্তবায়িত না হলে নাগরিকদের হতাশা স্থায়ী রূপ নিতে পারে। এই
ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্বও কম নয়। তরুণদের কেবল স্লোগান বা মাঠের শক্তি হিসেবে
ব্যবহার না করে তাদের নীতি-নির্ধারণে যুক্ত করতে হবে। গণতন্ত্রের শিক্ষা পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান
ও সামাজিক পরিসর থেকে শুরু না হলে নির্বাচন শুধু একটি আনুষ্ঠানিকতা হয়েই থাকবে।
আমরা মনে করি, বিজয়ের প্রকৃত অর্থ তখনই পূর্ণতা পাবে, যখন বাংলাদেশ
হবে বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক ও মানবিক রাষ্ট্র। বিজয় দিবসে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদের
ভাষণ জাতিকে সেই লক্ষ্যের দিকেই নতুন করে অগ্রসর হওয়ার অনুপ্রেরণা দিয়েছে।