আইটি খাত
ড. তারনিমা ওয়ারদা আন্দালিব, দাউদ ইব্রাহিম হাসান
প্রকাশ : ১৮ ডিসেম্বর ২০২৫ ১১:২৬ এএম
সারা দেশে যখন জাতীয় পতাকার রঙে রঙিন হয়ে উঠছে, তখন এই উৎসবের ভিড়েও কেমন যেন এক গভীর জিজ্ঞাসা মনকে নাড়া দিয়ে যায়। একাত্তরে বিজয় এসেছিল, কিন্তু সেই বিজয়ের মূল লক্ষ্য সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার আমরা কি আজও অর্জন করতে পেরেছি? আমরা দ্রুতগতির ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্নে বিভোর, কিন্তু এই অগ্রগতির আড়ালে লুকিয়ে থাকা বৈষম্য, অব্যবস্থাপনা আর অরক্ষিত জীবনের করুণ সুর কি আমাদের এই প্রশ্ন করতে বাধ্য করে না : আমরা কি সত্যি সত্যিই বিজয়ী?
সত্যিই,
গত এক দশকে আমরা প্রযুক্তির পথে হেঁটেছি অনেক দূর। ২০১৪ সালে যেখানে ইন্টারনেট
ব্যবহারকারীর সংখ্যা ছিল ৪ কোটির কাছাকাছি, বিটিআরসি ডেটা অনুযায়ী ২০২৪ সালে তা
১৩ কোটি ছাড়িয়েছে। এই বিশাল সংখ্যাটি সংযোগের প্রসার দেখালেও, স্বাধীনতার পর
সবার জন্য সমান সুযোগের অঙ্গীকার আজও প্রশ্নবিদ্ধ, কারণ মানসম্মত ইন্টারনেট গতিতে
আমরা বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় পিছিয়ে আছি। জিডিপিতে ডিজিটাল অর্থনীতির
অবদান ২ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৪ সালে ৩.৫ শতাংশে পৌঁছেছে বলে আইসিটি বিভাগ রিপোর্ট
করেছে। এই উন্নয়ন অর্থনীতির নতুন স্তম্ভ হলেও, সাইবার অপরাধের কারণে প্রতিবছর
দেশের অর্থনীতি প্রায় ২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার সমমূল্যের ক্ষতি গুনছে বলে বাংলাদেশ
কম্পিউটার কাউন্সিল (বিসিসি) ধারণা করে। এই ক্ষতি প্রমাণ করে, স্বাধীনতার এত বছর
পরও দেশের আর্থিক নিরাপত্তা অরক্ষিত।
মোবাইল
ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (MFS) ব্যবহারকারীর সংখ্যা ২০২৪ সালে ১৮ কোটি অতিক্রম করে
আর্থিক অন্তর্ভুক্তির হার ৮৫ শতাংশে উন্নীত করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক ডেটা অনুযায়ী।
এই বিশাল অর্জন গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করেছে, কিন্তু এর উল্টো পিঠে রয়েছে
ফিনটেক ইন্ডাস্ট্রিতে প্রতারণার ভয়াবহ চিত্র। ডিএমপি সাইবার ক্রাইম ইউনিট রিপোর্ট
করেছে যে, ফিনটেক প্রতারণার ঘটনা ২০২৪ সালে ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এই বৃদ্ধি
সাধারণ মানুষের সঞ্চয়কে হুমকির মুখে ফেলছে, এবং এই দুর্বলতা আমাদের বিজয়ের
আনন্দকে ম্লান করে দেয়। ভুয়া ই-কমার্স প্লাটফর্মের মাধ্যমে ২০২৪-২৫ সালে ৫০০
কোটি টাকারও বেশি অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে, যা প্রমাণ করে, গ্রাহক সুরক্ষার
দুর্বলতা কতটা ভয়াবহ।
সামাজিক
ন্যায়বিচারের ক্ষেত্রে এই বিভাজন আরও বেশি স্পষ্ট। ২০১৫ সালের ০.৪৮ গিনি সহগ
বেড়ে বর্তমানে ০.৫ এর ওপরে রয়েছে বলে বিবিএস রিপোর্ট নির্দেশ করে। এই চরম বৈষম্য
প্রমাণ করে, আমাদের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হলেও সমাজের গরিব মানুষ প্রতিদিন পেছাচ্ছে
এবং ধনীরা আরও ধনী হচ্ছে, যা বিজয়ের মূলমন্ত্র ‘সাম্য’ থেকে আমাদের দূরে সরিয়ে
দিয়েছে। অন্যদিকে, ২০১৫ সালে বেকারত্বের হার ৪.২ শতাংশ থাকলেও, ছদ্ম বেকারত্বসহ
প্রকৃত বেকারত্বের হার প্রায় ১২ শতাংশে পৌঁছেছে বলে শ্রম ও কর্মসংস্থান
মন্ত্রণালয় ধারণা করে। এই বিশাল কর্মহীন জনশক্তি, যাদের স্বপ্ন আজও পূরণ হয়নি,
তাদের অব্যবহৃত থাকাটা যেন বিজয়ের আনন্দকে ম্লান করে দেয়।
শিক্ষা
এবং স্বাস্থ্য খাতেও এই ‘অবিজয়’ স্পষ্ট। শিক্ষা খাতে জিডিপির বরাদ্দ ২০১৫ সাল
থেকেই ২ শতাংশের নিচেই ঘোরাফেরা করছে। এই অপর্যাপ্ত বরাদ্দই আমাদের ভবিষ্যৎ
মানবসম্পদকে দুর্বল করে দিচ্ছে। আন্তর্জাতিক মানের দক্ষতা সূচকে বাংলাদেশের
অবস্থান ১২০টির মধ্যে ৯০-এর নিচে রয়েছে বলে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরাম (WEF) রিপোর্ট
নির্দেশ করে। এই চিত্র প্রমাণ করে, আমরা জ্ঞানভিত্তিক সমাজে বিজয়ী হতে পারিনি।
ডিজিটাল
প্লাটফর্মে প্রতারণার নিত্যনতুন কৌশল আমাদের নিরাপত্তাহীনতার বোধকে বাড়িয়ে
দিচ্ছে। ২০২৪-২০২৫ সালে এটিএম সিস্টেম হ্যাক করে ৩ কোটি টাকা লোপাট, ফিশিং লিংকের
মাধ্যমে সরকারি প্রতিষ্ঠানের ৫০০০ কর্মীর ই-মেইল তথ্য চুরি এবং জনপ্রিয় একটি
মোবাইল ব্যাংকিং এজেন্টের পিন ক্লোনিং করে প্রায় ১ কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার মতো
ঘটনাগুলো প্রমাণ করে যে, আমরা সাইবার যুদ্ধের এক অরক্ষিত ফ্রন্টলাইনে দাঁড়িয়ে
আছি। আমাদের ব্যক্তিগত তথ্য এবং কর্মজীবনের নিরাপত্তাÑ সবকিছুই আজ হুমকির মুখে, যা
প্রমাণ করে ডেটা সুরক্ষা আইন না থাকা আমাদের জন্য বিশাল ভুল ছিল। অনলাইন জুয়ার
কারণে প্রতিবছর প্রায় ৩০০ কোটি টাকা বিদেশে পাচার হচ্ছে। এই পরিসংখ্যান শুধু অর্থ
পাচার নয়, এটি সমাজের নৈতিক অবক্ষয় এবং যুবকদের ভবিষ্যতের প্রতি উদাসীনতার ফল।
যদি এই
সমস্যাগুলো সমাধান না হয়, তবে ২০২৫ সাল থেকে ২০৪০ সাল পর্যন্ত আমাদের ভবিষ্যৎ আরও
অন্ধকার হতে পারে। বৈদেশিক প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ (FDI) ২০৪০ সালের মধ্যে ৪০ শতাংশ
কমে যেতে পারে বলে অর্থনৈতিক পূর্বাভাসে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এই বিনিয়োগ হ্রাস ২০৫০
সালে বেকারত্বের হারকে ১৮ শতাংশে নিয়ে যেতে পারে।
কিন্তু এই
অন্ধকার ভেদ করে আলো আনার পথ আমাদেরই তৈরি করতে হবে। বিজয়ের মূলমন্ত্রকে বাস্তব
করতে প্রথম করণীয় হলো, সাইবার নিরাপত্তা খাতে সরকারি বিনিয়োগ ২০৩০ সালের মধ্যে
জিডিপির ১ শতাংশে উন্নীত করা। দ্বিতীয়ত, দেশের ৬০ শতাংশ আইটি পেশাদারকে
আন্তর্জাতিক সাইবার নিরাপত্তা মানদণ্ড অনুযায়ী প্রশিক্ষিত করতে হবে। তৃতীয়ত,
স্কুল পর্যায় থেকে কোডিং এবং সাইবার নিরাপত্তা শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করতে হবে।
চতুর্থত, সকল ফিনটেক লেনদেনের জন্য দ্বি-স্তরীয় যাচাইকরণ (Two-Factor
Authentication) বাধ্যতামূলক করা এবং ব্লকচেইন প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়িয়ে আর্থিক
লেনদেনের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। পঞ্চমত, জাতীয় ডেটা নিরাপত্তা ও প্রাইভেসি
আইন ২০২৬ সালের মধ্যে প্রণয়ন করতে হবে। ষষ্ঠত, গ্রামীণ অঞ্চলে হাই-স্পিড
ইন্টারনেট সংযোগের হার ২০৩০ সালের মধ্যে ৯০ শতাংশে উন্নীত করতে হবে।
জনগণকে অবশ্যই সচেতনতার ১৫টি মন্ত্র মেনে চলতে হবে। ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা রক্ষা করা, সকল অ্যাকাউন্টে শক্তিশালী পাসওয়ার্ড ব্যবহার করা এবং দ্বি-স্তরীয় যাচাইকরণ (2FA) সর্বদা সক্রিয় রাখা আজ আর ঐচ্ছিক বিষয় নয়, বরং জীবনের সুরক্ষার জন্য অপরিহার্য। এই সংকট সমাধানযোগ্য এবং এটি সম্ভব যদি সঠিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়। আমাদের মনে রাখতে হবে, নতুন বাংলাদেশ গড়তে আমাদের শুধু ইটের পর ইট গাঁথতে হবে না, গাঁথতে হবে বিশ্বাস আর ঐক্যের ভিত্তি।
ড. তারনিমা ওয়ারদা আন্দালিব, সহকারী অধ্যাপক, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়
দাউদ ইব্রাহিম হাসান, রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্ট, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়