বিশ্লেষণ
মারুফ কামাল খান
প্রকাশ : ১৭ ডিসেম্বর ২০২৫ ১১:২৯ এএম
আপডেট : ১৭ ডিসেম্বর ২০২৫ ১১:৩১ এএম
নয় মাস যুদ্ধের পর দখলদার পাকিস্তানি বাহিনী ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর আত্মসমর্পণ করে ঢাকায় রেসকোর্স ময়দানে মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় মিত্রবাহিনীর যৌথ কমান্ডের কাছে। ১৬ ডিসেম্বর অপরাহ্ণের সেই ঐতিহাসিক মাহেন্দ্রক্ষণে মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক জেনারেল মহম্মদ আতাউল গণি ওসমানী অনুপস্থিত ছিলেন। ফলে আত্মসমর্পণের দলিলে বাংলাদেশের পক্ষে মুক্তিফৌজ সই করতে পারেনি। এতে বিজয় লগ্নেই আমাদের মুক্তিযুদ্ধের মহিমা ক্ষুণ্ন হয়েছে বলে গোড়া থেকেই একটা বিতর্ক চলে আসছে।
ঢাকার তদানীন্তন রেসকোর্স মাঠে পাকিস্তানি ফৌজের আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে
ওসমানীর অনুপস্থিতি সম্পর্কে ভারতীয় বিশিষ্ট সাবেক কূটনীতিক জে. এন. দীক্ষিত তার ‘ইন্ডিয়া-পাকিস্তান
ইন ওয়ার এন্ড পিস’ বইতে লিখেছেন : His helicopter had been sent astray so that he
could not reach Dacca in time and the focus of attention at the ceremony would
be on the Indian military commanders.
ভারতীয় মেজর জেনারেল জে. আর. এফ জ্যাকব আত্মসমর্পণে পাকিস্তানী বাহিনীকে
রাজী করানো এবং এ সংক্রান্ত আনুষ্ঠানিকতার আয়োজন ও তদারকির দায়িত্বে ছিলেন। তিনি তার
লেখা ‘সারেন্ডার অ্যাট ঢাকা : বার্থ অব এ ন্যাশন’ বইতে লিখেছেন : দুর্ভাগ্যবশত
ওসমানী এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকতে পারেনি। তার জন্য পাঠানো হেলিকপ্টার পথিমধ্যে শত্রুর
গুলির আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং সময়মতো সেটা মেরামত করে তোলা সম্ভব হয়নি। তার অনুপস্থিতির
ভুল ব্যাখ্যা করা হয়। পরবর্তীতে তা অনেক সমস্যার জন্ম দেয়।
ভারতীয় এসব তথ্য থেকেই জানা যায় যে, মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক স্বেচ্ছায়
আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে অনুপস্থিত থাকেননি। জেনারেল ওসমানীর মৃত্যুর পর বিশেষ মহল থেকে
বানোয়াট দুরকম প্রচার শুরু করা হয়। এর একটা হলো, জেনারেল ওসমানী নিজে থেকেই আত্মসমর্পণ
অনুষ্ঠানে যোগ দিতে রাজি হননি।
অপর প্রচারণাটি হচ্ছে, তার সময়মতো খুঁজে পাওয়া যায়নি। এর কোনোটাই
সত্য নয়।
বিভিন্ন মতলবে যে যাই প্রচার করুক, সে সব প্রচারণার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ
এ সম্পর্কে জেনারেল ওসমানী নিজে কী বিবরণ দিয়েছেন। ২৩ মার্চ, ১৯৮০ তারিখে প্রকাশিত
সাপ্তাহিক রোববার পত্রিকার স্বাধীনতা দিবস সংখ্যায় ওসমানীর একটি সাক্ষাৎকার ছাপা হয়।
পরে সেটি ‘বঙ্গবীর ওসমানী’ নামের পুস্তিকায় হুবহু মুদ্রিত হয়। সাক্ষাৎকারে জেনারেল
ওসমানী বলেন : ‘… আমি তখন রণাঙ্গনে সফররত। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার, বিশেষ করে
অস্থায়ী প্রেসিডেন্ট এবং প্রধানমন্ত্রী জানতেন আমাকে কোথায় পাওয়া যাবে। তা ছাড়া মিত্রবাহিনীর
উচ্চতম কর্মকর্তারাও জানতেন আমি কোথায়। তা সত্ত্বেও আমাকে কোনো খবর দেওয়া হয় নাই। বরং
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারপ্রধান আমার ডেপুটি চিফ অব স্টাফ তদানীন্তন গ্রুপ ক্যাপ্টেন
একে খন্দকারকে পাঠান।
ওইদিন ও এর আগের দিন আমি ময়নামতির রণাঙ্গনে এবং ১৬ ডিসেম্বর দুপুরে
লে. জেনারেল স্বাগত সিংয়ের সঙ্গে মধ্যাহ্ন ভোজন করি। ১৬ ডিসেম্বর দুপুরের পর তদানীন্তন
লে. কর্নেল শফিউল্লাহর অধিনায়কত্বে ‘এস’ ফোর্স রণাঙ্গন পরিদর্শন করার জন্য আমার যাওয়ার
কথা ছিল। জেনারেল স্বাগত সিং সেদিন না যেতে অনুরোধ করেন। তিনি বলেন যে, ‘এস’ ফোর্স
পরিদর্শনে অসুবিধা হতে পারে, যেহেতু তারা অগ্রসর হচ্ছেন। আমি তখন আমার সফরসূচি পরিবর্তন
করে সিলেট ‘জেড’ ফোর্স পরিদর্শনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিই।
উপরোক্ত বাস্তব তথ্য ও পরবর্তী ঘটনাবলি হতে এটাই প্রতীয়মান হয় যে,
ভারতীয় ও গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ উভয় সরকারের শীর্ষপর্যায়ের মহান ব্যক্তিবর্গ (স্ব
স্ব কারণে বা উদ্দেশ্যে) চাইতেন না যে, এই আত্মসমর্পণ বাংলাদেশ তথা মুক্তিবাহিনীর সর্বাধিনায়কের
নিকট হোক, যদিও মুক্তিবাহিনী (নিয়মিত ও অনিয়মিত) সুদীর্ঘ নয় মাস যুদ্ধ করেছিল এবং তাদের
সর্বাধিনায়ক কেবিনেট মন্ত্রী সমপর্যায়ের মর্যাদার অধিকারী ছিলেন।’
১৬ ডিসেম্বর ওসমানী হেলিকপ্টারযোগে রওনা দেন এবং তার হেলিকপ্টারে
গুলি করা হয়। জীবনের সেই বিশেষ ঘটনার স্মৃতি তুলে ধরতে গিয়ে জেনারেল ওসমানী বলেন :
বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর দুটি ছোট হেলিকপ্টার আগরতলা বিমানঘাঁটিতে পৌঁছলে বাংলাদেশ বিমান
বাহিনীর স্কোয়াড্রন লিডার সুলতান মাহমুদ জানান যে, আমাদের ছোট দুটি হেলিকপ্টারের পরিবর্তে
তিনি ভারতীয় বিমানবাহিনীর একটি বড় রুশী হেলিকপ্টার বন্দোবস্ত করেছেন। বিমানঘাঁটিতে
হঠাৎ করে কয়েকজন বিদেশি সাংবাদিক আমাকে ঘিরে ধরলে সময় নষ্ট হয়। তারপর সমবেত বৈমানিকদের
নিকট থেকে বিদায় নেওয়ার জন্য সুলতান কিছু সময় নষ্ট করে ফেললেন। কেন যেন কী মনে হলো,
তাই সুলতানকে বললাম, ‘আমাদেরকে রেখে এই হেলিকপ্টার যদি সময় মতো না ফেরে তবে খবর নিও।
প্রয়োজন হলে নিজে হেলিকপ্টার নিয়ে এসো।’
হেলিকপ্টারে উঠতে বিকাল ৪টার ঊর্ধ্বে হয়ে যায়। হেলিকপ্টারের পেছনের
‘রাম্প’ খোলা ছিল। হেলিকপ্টারে ভারতীয় বিমানবাহিনীর দুজন তরুণ অফিসার, একজন পাইলট এবং
আরও একজন সহ-পাইলট, তৎসহ কেরালার অধিবাসী একজন ওয়ারেন্ট অফিসার ছিলেন। পাইলটদের বললাম
যে, সিলেট বিমানঘাঁটিতে যাব না, মাইন বা বাঁধা থাকতে পারে। আমরা যাব মেজর (পরে লে.
কর্নেল) জিয়াউদ্দিন, বীরউত্তমের অধীনে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের প্রথম ব্যাটালিয়নের
হেডকোয়ার্টারে। আমার জানা মতে, তার হেডকোয়ার্টার সিলেট ‘কেটল ফার্মের’ সন্নিকটে। এর
কাছেই কলেজের হোস্টেল, সামনে বিরাট খেলার মাঠ, হেলিকপ্টার নামার উপযোগী। পাইলটকে বললাম,
সিলেট শহরের নিকটে সুরমা নদীর কাছে পৌঁছলে আমাকে ডাকবে আমি তোমাকে গাইড করব। ছেলেটি
চলে গেল তার ‘ককপিটে’।
আমার সঙ্গে ছিলেন মুক্তিবাহিনীর ‘চিফ অব দি স্টাফ’ রূপে আমার সহকারী
ও মুক্তিযুদ্ধের উপ-সর্বাধিনায়ক লে. কর্নেল (পরে মেজর জেনারেল) এমএ রব বীরউত্তম, ভারতীয়
কমান্ডের ‘লিয়াজোঁ অফিসার’ ব্রিগেডিয়ার উজ্জ্বল গুপ্ত, ডাক্তার জাফরউল্লাহ চৌধুরী,
সাময়িকভাবে আমার গণসংযোগ অফিসার মোস্তফা আল্লামা এবং আমার এডিসি সেকেন্ড লে. শেখ কামাল।
হেলিকপ্টার কিছুক্ষণ থেকে তিন সাড়ে তিন হাজার ফুট ওপর দিয়ে শান্ত
ভাবে চলছে। আমি দাঁড়িয়ে আমার চিফ অব স্টাফ কর্নেল রবের সঙ্গে কথা বলছি, তিনি আমার নিকট
বসা। হঠাৎ একটা মৃদু বিস্ফোরণের শব্দে সবাই চমকে উঠলাম। মশার মতো আমার কানের ধার দিয়ে
কয়েকটি গুলি গেল। সঙ্গে সঙ্গে হেলিকপ্টারটা উভয় পাশে গড়ান দিল। খোলা রাম্প দিয়ে যেন
পড়েই গিয়েছিলাম বলে মনে হলো। কর্নেল রব গুলিবিদ্ধ হয়ে মেঝেতে পড়ে যান। আমি ছাড়া মনে
হলো অন্যরা সবাই আহত। ডাক্তার জাফরউল্লাহ তৎক্ষণাৎ মেঝেতে পড়া কর্নেল রবের পাশে বসে
তার দেখছেন, বেশ রক্তপাত হচ্ছে। আমার ধ্যান তেলের ট্যাঙ্কের দিকে, দুটি ছিদ্র দিয়ে
তেল বয়ে পড়ছে। নির্বোধের মতো হাত দিয়ে থামাতে গিয়ে আমার হাতে ফোসকা পড়ল। তখন প্রবাসী
বাঙালিদের প্রেরিত আমার বৃষ্টি ও বাতাস হতে রক্ষাকারী জ্যাকেট দিয়ে তেলপ্রবাহ থামাবার
আপ্রাণ চেষ্টা করি। এদিকে ওয়ারেন্ট অফিসার যন্ত্রপাতি চেক করছেন। ডা. জাফরউল্লাহ্
হাত দিয়ে দেখলেন কর্নেল রব নাড়িহীন। তবুও তিনি তার বুকে কী যেন করছিলেন।
হেলিকপ্টার গতি পরিবর্তন করে যেন ঘুরছে। সন্ধ্যার অন্ধকার নেমে এসেছে।
কিছুক্ষণেই তেলপ্রবাহ বন্ধ হয়ে গেল এবং সকলেই আমার দিকে তাকাচ্ছেন। তারা যেন আমার মনোবল
কী বা কতটুকু তা মাপছেন। এড়াবার জন্য পাইলটের ‘ককপিটে’ গিয়ে বললাম : ‘Son our
number seems to up.’ তরুণ পাইলট গেজের দিকে তাকিয়ে বলল : ‘শেষ হয়েছে’। আমি তার
কাঁধে হাত দিয়ে বললাম : ‘Don’t worry, take it easy, it has to come for
every one. Why did you go into a swing?’ (ঘাবড়িয়োনা, সকলকেই একদিন যেতে হবে। তুমি
হেলিকপ্টারকে গড়িয়েছিলে কেন?)। সহ-পাইলট বলল : ‘There is something in the
air, Sir.’ (আকাশে কী যেন ছিল, স্যার)। আমি তখন বেশ চিন্তিত। বললাম : ‘See if you
come get down any where’ (দেখে একটি জায়গায় নেমে যাও)। তখনও আমার হাতটা ছেলেটার ঘাড়ে,
জানি না এতে সে স্বস্তিবোধ করছিল কি না।
আমরা ঘুরে ঘুরে নামারই চিন্তা করছিলাম, এমন সময় একটা উজ্জ্বল নগরী
যেন কোথা হতে নিচে ভেসে উঠল। হঠাৎ মাথায় ঢুকল না, এটা কোন জায়গা। শুধুই চিন্তা, কোন
সময় হেলিকপ্টারের ইঞ্জিন বন্ধ হবে বা আগুন লেগে খাড়াভাবে ভূমিতে পড়ে একটা বিস্ফোরণ
হবে। অন্ধকারে পাইলট নামার চেষ্টা করলে আমি একবার বিরাট জলাশয় ও একবার বিরাট পাহাড়
দেখে ওপরে উঠে যেতে বললাম। হঠাৎ মনে হলো ‘Landing light’-এর কথা। বলতেই পাইলট সেটা
জ্বালাল এবং আমরা একটা ধানশূন্য ক্ষেতের ওপর নিজেদের পেয়ে বললাম : ‘এখানেই নামো’।
পাইলট অতি স্থির ও শান্তভাবে হেলিকপ্টার নামাল। নামার সঙ্গে সঙ্গে
আপনাআপনি পাখা বন্ধ হয়ে গেল। আমরা জানি না কোথায়, আমি প্রথমে লাফ দিয়ে নামি, কোথায়
এলাম দেখতে। নেমে দেখি ফেঞ্চুগঞ্জ ব্রিজের সন্নিকটে, লোকজন এসে ভিড় করলে তাদের একটি
চৌকি আনতে বলি। ইতোমধ্যে, ডাক্তার জাফরউল্লাহ কর্নেল রবকে নামালেন এবং বললেন :
‘Sir. His pulse is back’। তার কথায় কিছুটা আশ্বস্ত হয়ে মহান সৃষ্টিকর্তাকে ধন্যবাদ
জানালাম।
এমন সময় মিত্র বাহিনীর মাউন্টেন ডিভিশনের এক ফুল কর্নেল এসে উপস্থিত।
তিনি কুশিয়ারা পার হচ্ছিলেন। হেলিকপ্টারটা সংকটাপন্ন অবস্থায় নামতে দেখে এসেছিলেন।
তিনি একটা অ্যাম্বুলেন্স গাড়িও জোগাড় করলেন। আমরা হেঁটে এবং কর্নেল রবকে মাইজগাঁও রেলস্টেশনে
এএসডিতে (অ্যাডভান্সড ড্রেসিং স্টেশন) ডাক্তারের কাছে পৌঁছাই। তারপর জিপে করে রেললাইনের
ওপর দিয়ে মৌলভীবাজার যাওয়ার উদ্দেশ্যে কুলাউড়া অভিমুখে রওনা দিই।
ভারতীয় তরুণ পাইলটকে আমার লেখায় তাদের সামরিক পদকে ভূষিত করা হয়।
মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক এ ঘটনার ব্যাপারে আর বেশি কিছু বলেননি।
বিভিন্ন সময়ে সাংবাদিকরা প্রশ্ন করলে তিনি বলতেন, এখনও অনেক কথা বলার সময় বা পরিবেশ
আসেনি। মুক্তিযুদ্ধের ঘটনাবলিভিত্তিক স্মৃতিকথামূলক ইতিহাস লিখছি আমি; সেখানে সব পাবেন।
জেনারেল ওসমানীর মৃত্যুর সঙ্গে তার লিখে শেষ করা সেই বইটির পাণ্ডুলিপিও উধাও হয়ে গেছে। বইটি লিখবার সময় আমি ব্যক্তিগতভাবে এ কাজে তার কিছুটা সহায়তা করতাম। ইংরেজি টাইপরাইটারে এক আঙুলে টাইপ করে তিনি পাতলা কাগজে বইটির পাণ্ডুলিপি তৈরির কাজ শেষ করেছিলেন। টাইপ করেছিলেন পাঁচটি কপি। বিলেতের একটি নামকরা প্রকাশনী থেকে বইটি প্রকাশের আলোচনাও চূড়ান্ত হয়েছিল। আমার জানা মতে, জীবনের শেষ অসুস্থতার চিকিৎসার জন্য লন্ডন যাওয়ার সময়ে জেনারেল ওসমানী বইটির দুটি কপি সঙ্গে করে নিয়ে গিয়েছিলেন। বাকি তিনটি কপি সিলেট শহরের নাইওরপুলে তার বাসা ‘নূর মঞ্জিল’-এ রেখে গিয়েছিলেন। লন্ডন থেকে তার লাশের সঙ্গে পাণ্ডুলিপির কপি দুটি ফেরেনি। সিলেটের বাসার কপিগুলোও আর খুঁজে পাওয়া যায়নি।
মারুফ কামাল খান
সম্পাদক, প্রতিদিনের বাংলাদেশ