মহান বিজয় দিবস
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী
প্রকাশ : ১৬ ডিসেম্বর ২০২৫ ১০:২৭ এএম
১৬ ডিসেম্বর একাত্তরে বিজয় এসেছিল। অতবড় পরাক্রমশালী, সুসজ্জিত পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়েছিল, চতুর্দিকে আনন্দের ধ্বনি, ছুটছে গুলি, বন্ধু জড়িয়ে ধরছে বন্ধুকে। মস্ত বড় সত্য সেটা। কিন্তু ইতিহাসের আরেক ধারাও তো উপস্থিত ছিল। ঘাতকদের হাতে প্রাণ দিয়েছে বহুজন। সেই ঘাতকরা অন্য কেউ নয়, এই বাংলাদেশেরই সন্তান। এবং বিজয় শেষ হতে না হতেই শুরু হয়েছে লুণ্ঠন। সঙ্গে সঙ্গেই। এক অন্ধকার মিশে গেছে আরেক অন্ধকারের সঙ্গে।
বিষণ্ন পায়ে ফিরে
এসেছি ঘরে। নানান রকম খবর চতুর্দিকে। পাড়ার ছেলেরা যুদ্ধে গেছিল, তাদের কেউ কেউ ফিরে
এসেছে। তারা গল্প বলছে নানাবিধ। বীরত্বের, কৌতুকের, কোনোমতে বেঁচে-যাওয়ার। একটু পরে
দেখি মিছিল বের হয়েছে একটা। ঠিকই, সেই রাজাকারেরাই। সত্যি সত্যি। জয় বাংলা স্লোগান
দিচ্ছে। শেখ মুজিবের ছবি সংগ্রহ করেছে ইতোমধ্যে। এমনকি ইন্দিরা গান্ধীরও। গলায় তাদের
জোরের অভাব নেই।
রাতে আরেক দৃশ্যের
বিবরণ পেলাম। দেখেছে দুজন তরুণ। দেখে ভীষণ লজ্জা পেয়েছে। আগের দিন, পনেরোই ডিসেম্বর
তখনকার স্টেট ব্যাংকের ভোল্ট থেকে টাকা বের করে বহ্ন্যুৎসব বসিয়েছিল পাকবাহিনী। পুড়ে
ছাই করে দিয়েছিল টাকার স্তূপ। কিন্তু সবটা পোড়েনি। কিছু ছিল অর্ধ দগ্ধ, কিছু প্রায়
অক্ষত। লুঙ্গিতে ভরে বেশ কিছু টাকার নোটের বস্তা বানিয়েছে এক তরুণ; সেই বস্তা মাথায়
চাপিয়ে ছুটছে। উন্মাদের মতো। লুঙ্গিটা তার পরনের। পরনের লুঙ্গি খুলে বস্তা বানিয়েছে।
লজ্জা সংকোচের কোনো বালাই নেই। ছুটছে। খেয়াল নেই যে সে দিগম্বর, কেননা মাথায় তার টাকার
বোঝা।
ষোলো তারিখে চতুর্দিকে
গুলির শব্দ। থামছে না। সবটাই আনন্দের, উল্লাসের, বিজয়ের। কিন্তু আমার মনে হচ্ছিল, রোগ
কেটে যাওয়া মানেই স্বাস্থ্য ফিরে আসা নয়। স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধারের জন্য সময় লাগবে। নেতৃত্বও
প্রয়োজন হবে। সেই নেতৃত্ব পাওয়া যাবে কি, যে নেতৃত্ব পারবে এতসব বিশৃঙ্খলা ও পরস্পরবিরোধী
শক্তিকে একত্র করতে, মানুষ ও সম্পদের যে ক্ষতি ইতোমধ্যে হয়ে গেছে তা পূরণের ব্যবস্থা
নিতে। ওই প্রশ্নের জবাব অবশ্য পাওয়া গেছে। গত চুয়ান্ন বছর ধরেই।
আমি যে বেঁচেছি
শেষ পর্যন্ত সেটা অবশ্য সতর্কতার কারণেই। বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় থাকতাম না। পলাতক ছিলাম
ওই ৯ মাস। জানা ছিল যে খুঁজবে। অক্টোবরের ১ তারিখে শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক আবু
মহামেদ হাবিবুল্লাহ, বাংলা বিভাগের অধ্যাপক এনামুল হক, মুনীর চৌধুরী, নীলিমা ইব্রাহিম,
মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান এবং ইংরেজি বিভাগের আমিÑ এই ছয়জন টিক্কা খানের স্বাক্ষরযুক্ত
চিঠি পেলাম, তাতে মনিরুজ্জামানের ছয় মাসের জেল, অধ্যাপক হাবিবুল্লাহর চাকরিচ্যুত এবং
বাকি চারজনের রাষ্ট্রদ্রোহী তৎপরতার উল্লেখ করে কঠিন সতর্কবাণী ঘোষণা করা হয়েছিল। আমরা
আবারও নিশ্চিত হলাম যে আমাদের ওপর চোখ রাখা হয়েছে। শিক্ষক সমিতির সম্পাদক ছিলেন আমারই
সহপাঠী ও সহকর্মী আহসানুল হক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্লাবের তিনজন ক্রমান্বয়িক সাধারণ
সম্পাদক, রফিকুল ইসলাম, কে. এ. এম সাদউদ্দীন, আবুল খায়ের ও এ. এন এম. শহীদুল্লাকে ইতোমধ্যেই
আল-বদরেরা বাসা থেকে ধরে নিয়ে গিয়ে আটক করে রেখেছিল।
পাকিস্তানি হানাদার
বাহিনীর চোখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি ও শিক্ষকদের ক্লাব দুটিই ছিল মারাত্মক
প্রতিষ্ঠান। সেখানে শিক্ষকরা নিয়মিত রাষ্ট্রদ্রোহী তৎপরতা চালাত বলে তারা নিশ্চিত ছিল
এবং ছাত্ররা যে বিপথগামী হয়েছে তার জন্যও তারা শিক্ষকদেরকেই সরাসরি দায়ী মনে করত। সেজন্য
২৫ মার্চ রাত্রে তারা ছাত্রাবাস তো বটেই শিক্ষকদের আবাস এবং তাদের ক্লাবের ওপরও ট্যাংক
ও কামান নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। ক্লাবে তখন কোনো শিক্ষক ছিলেন না, থাকবার কথা নয়, কিন্তু
এতই উন্মত্ত ছিল ওই হানাদাররা যে তারা পার্থক্য করেনি। নিরীহ কর্মচারী যারা ওই ভবনে
ঘুমাচ্ছিল তাদের কয়েকজনকে হত্যা করেছে। ছাত্রাবাসে ছাত্রহত্যা ও শিক্ষকদের ঘরে ঢুকে
শিক্ষক হত্যার ব্যাপারে সে-রাতে তাদের কোনোরকম দ্বিধা বা বাছবিচার দেখা যায়নি। গিয়াসউদ্দীন
তো এসব ঘটনা অনুপুঙ্খ জানত; কিন্তু সে ক্যাম্পাস ছাড়েনি। কর্তব্যবোধের শৃঙ্খলে আটকা
পড়ে গিয়েছিল।
১৬ ডিসেম্বর আমার
অনুভূতিটা ছিল রোগমুক্তির। যেন একটা কঠিন রোগে পেয়েছিল, দুরারোগ্য ব্যাধি। রোগটা সমষ্টিগত
আবার ব্যক্তিগতও। আমরা সবাই ভুগছিলাম, একসঙ্গে এবং আলাদা। বোধটা সামান্য নয়। সাতচল্লিশে
আমরা আরও একবার স্বাধীন হই, তখন স্বাধীনতা এসেছিল স্টিমারে করে। সাতচল্লিশ সালের পনেরোই
আগস্ট দুপুরবেলা যে জাহাজটি এসে থামে, গোয়ালন্দ থেকে পদ্মাপাড়ের ভাগ্যকুলে সেটিকে আমাদের
মনে হয়েছিল স্বাধীনতার জাহাজ। নতুন রাষ্ট্র পাকিস্তানের মস্ত একটা পতাকা পতপত করে উড়ছিল,
সদম্ভে। সারা জাহাজ সুসজ্জিত ছিল ছোট ছোট অসংখ্য পতাকায়। স্টিমার ঘাটে পন্টুনে বহু
মানুষ দাঁড়িয়ে ওই জাহাজের প্রতীক্ষায়, যার মধ্যে আমিও ছিলাম। একটি কিশোর। আমার হাতেও
নিশান। সেই নিশান নাড়িয়েছি আমরা, জিন্দাবাদ দিয়েছি। জাহাজের রেলিংয়ে দাঁড়ানো যাত্রীরাও
দিয়েছে, সমান উৎসাহে। স্বাধীনতার জাহাজ পরে আটকা পড়ে গেছে, চরায়। পাকিস্তান একটি ব্যাধিতে
পরিণত হয়েছে আমাদের জন্য, যার লক্ষণ ও পীড়া স্পষ্ট হচ্ছিল, ক্রমাগত। শেষ পর্যন্ত যুদ্ধ।
বাঁচার প্রয়োজনে।
একাত্তরে রোগমুক্তি
যে আসন্ন সেটা বোঝা যাচ্ছিল। আমরা জিতব কি জিতব না, এ প্রশ্ন দেখা দিয়েছে নিশ্চয়ই,
কখনও কখনও, কারও কারও মনে। অনেকের মতো আমিও নিশ্চিত ছিলাম জিতবই। প্রশ্ন ছিল কবে, কীভাবে,
কতটা যন্ত্রণার ভেতর দিয়ে সেটা ঘটবে। হয়তো সময় লাগবে, ক্ষতি হবে, কে থাকবে কে থাকবে
নাÑ কে জানে, কিন্তু রোগটা থাকবে না। যাবেই চলে।
পঁচিশে মার্চের
পর থেকে আমার নির্দিষ্ট কোনো ঠিকানা ছিল না। নানা জায়গায় থাকতাম। আমি তখন সকলের সঙ্গে
সংলগ্ন, সকল পীড়িত মানুষের সঙ্গেই একত্র; কিন্তু আবার বিচ্ছিন্নও, রোগীরা যেমন হয়।
আমার বিচ্ছিন্ন ভাসমানতার কারণ ছিল একটি নয়, দুটি। প্রথম কারণÑ আমি বাঙালি, দ্বিতীয়
কারণ আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ওপর হানাদাররা বিশেষভাবে
ক্ষিপ্ত ছিল, ছাত্রদের সঙ্গে শিক্ষকদের যোগাযোগের দরুন। পাকিস্তানিরা ধরে নিয়েছে ছাত্রদের
বিপথগামিতার পেছনে শিক্ষকদের উস্কানি কাজ করেছে। সেটা আদৌ সত্য ছিল না। ছাত্ররা কারও
উস্কানির জন্য অপেক্ষা করেনি। নিজেরাই বের করে নিয়েছে নিজেদের পথ। প্রাণের দায়ে, বাঁচার
প্রয়োজনে। হানাদাররা শিক্ষকদের মধ্যে যে-কয়জনকে অপরাধী বলে চিহ্নিত করেছিল তাদের মধ্যে
আমিও একজন।
চৌদ্দ তারিখে কার্ফ্যুর ভেতরে আল-বদর বাহিনীর ঘাতকরা শিক্ষকদের অনেককে চোখ বেঁধে ধরে নিয়ে গেছে। বিশ্ববিদ্যালয় পাড়াজুড়ে আহাজারি। আমাকে দেখা যায়নি, কারণ আমি ছিলাম না সেখানে, আমার কোনো নির্দিষ্ট ঠিকানা ছিল না ওই ৯ মাস, না দেখে কারও কারও ধারণা হয়েছে আমিও হয়তো বেঁচে নেই, আমাকেও হয়তো-বা ধরে নিয়ে গেছে। যাদের পাওয়া যাচ্ছে না তাদের একটি তালিকা শুনিয়েছিল ওই তরুণ। পথের পাশে দাঁড়িয়ে। শুনে বিজয়ের আনন্দ যেটুকু ছিল নিঃশেষ হয়ে গেল। কেবল বেঁচে যে আছি এই স্বার্থপর চিন্তাটা ছাড়া অন্য কোনো অনুভূতি তখন সেই মুহূর্তে ছিল কি আমার? মনে পড়ে না। তবে স্মরণ করতে পারি যে, মনে হয়েছিল একটু আগে যে কয়েকটি লাশ দেখে এসেছি পথে তারা জীবন্ত হয়ে উঠেছে, আমার অত্যন্ত আপনজন হয়ে উঠেছে তারা। আরও অনেক মানুষ, যারা হারিয়ে গেছে তারাও চলে এসেছে। যেন মৃত্যুই সত্য, বিজয়ের পরে। অল্প কয়েক পা এগিয়ে আরেকটি দৃশ্য দেখেছিলাম সেদিন। সেটাও বিজয়ের নয়, পরাজয়ের। আলোর নয়, অন্ধকারের। গভর্নর হাউস তখন শত্রুমুক্ত। পাহারাদার বলতে কেউ নেই। সেই ফাঁকে কিছু লোক ঢুকছে আর বের হয়ে আসছে। যারা বের হচ্ছে তাদের মনে হচ্ছে বিজয়ী বীর, প্রকৃতই তারা ছিল না মুক্তিযোদ্ধা, ছিল না বীর। তবে বাহাদুর বটে। যেন এইমাত্র দেশকে শত্রুমুক্ত করেছে। যে যা পেরেছে, পেয়েছে হাতের কাছে নিয়ে বের হয়ে আসছে। কারও হাতে টেবিল ফ্যান, কেউ তুলে নিয়েছে সিঙ্গার মেশিন, কেউ গুছিয়ে নিয়ে চলেছে বিছানার চাদর। মুখে বীরের হাসি। বিজয়ীর। ওই সকল বাহাদুরের হাসি তো দেখে যাচ্ছি বায়ান্ন বছর ধরে।
ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়