× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা

ভুয়া তথ্য ও বাংলাদেশের নির্বাচন : সংকট ও উত্তরণের পথ

হাবিব বাবুল

প্রকাশ : ১৫ ডিসেম্বর ২০২৫ ১১:২৯ এএম

ভুয়া তথ্য ও বাংলাদেশের নির্বাচন : সংকট ও উত্তরণের পথ

বাংলাদেশের সামনে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন কেবল রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার পরীক্ষাই নয়, বরং এটি তথ্যযুদ্ধের এক ভয়ংকর ময়দান হিসেবেও আবির্ভূত হয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতির ফলে ভুয়া ভিডিও (ডিপফেক), ভুয়া ফটোকার্ড, বিকৃত অডিও ক্লিপ, মনগড়া সংবাদ ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত গুজব এখন সামাজিক মাধ্যমে ভয়াবহ গতিতে ছড়িয়ে পড়ছে। এটি আর ভবিষ্যতের আশঙ্কা নয়, এটি বর্তমানের বাস্তবতা। ইতোমধ্যেই ভুয়া ভিডিও বিশ্বাস করে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি, উত্তেজনা এবং সামাজিক বিভাজন সৃষ্টি হয়েছে, যা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার জন্য গভীর হুমকি।

এআই দিয়ে তৈরি ডিপফেক ভিডিও এমনভাবে বানানো হচ্ছে যেখানে রাজনৈতিক নেতাদের মুখভঙ্গি, কণ্ঠস্বর ও আচরণ এতটাই বাস্তব মনে হয় যে সাধারণ মানুষ তো বটেই, অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষিত শ্রেণিও বিভ্রান্ত হচ্ছে। একটি মিথ্যা বক্তব্য বা কৃত্রিম ভিডিও মুহূর্তেই লাখ লাখ মানুষের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে, যার সত্যতা যাচাই করার আগেই সেটি জনমতকে প্রভাবিত করছে। নির্বাচনকালীন এই ধরনের ভুয়া কনটেন্ট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।

ভুয়া তথ্য কেন এত বিপজ্জনক। কারণ ভুয়া তথ্য কেবল বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে না, এটি গণতন্ত্রের ভিত্তিকেই দুর্বল করে। নির্বাচন একটি আস্থার প্রক্রিয়াÑ ভোটারদের আস্থা থাকতে হয় যে তারা সঠিক তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। কিন্তু যখন তথ্যই বিকৃত হয়, তখন ভোটারদের সিদ্ধান্তও ভুল পথে পরিচালিত হয়। এর ফলে রাজনৈতিক সহিংসতা, সামাজিক মেরুকরণ এবং রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতা হুমকির মুখে পড়ে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিষয়টি আরও সংবেদনশীল। সামাজিক মাধ্যমের বিস্তার দ্রুত হলেও ডিজিটাল লিটারেসি এখনও পর্যাপ্ত নয়। অনেক মানুষ যাচাই-বাছাই ছাড়াই তথ্য বিশ্বাস করেন এবং শেয়ার করেন। রাজনৈতিক আবেগ, দলীয় আনুগত্য এবং গুজবপ্রবণতা এই সমস্যাকে আরও তীব্র করে তুলছে।

শুধু বাংলাদেশই নয়, ইউরোপ ও আমেরিকার মতো উন্নত রাষ্ট্রও এই সমস্যার বাইরে নয়। ২০১৬ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন থেকেই ভুয়া খবর ও ডিজিটাল ম্যানিপুলেশন নিয়ে বিশ্বজুড়ে আলোচনা শুরু হয়। পরবর্তীতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিভিন্ন নির্বাচনে ডিপফেক ও ভুয়া তথ্য বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দেয়। তবে পার্থক্য হলোÑ তারা এই সংকট মোকাবিলায় বহুমুখী ও কাঠামোগত উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।

এক্ষেত্রে তারা যে কাজটি করেছে, প্রথমত তা হলোÑ আইন ও নীতিমালা। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ‘ডিজিটাল সার্ভিসেস অ্যাক্ট’ এবং ‘এআই অ্যাক্ট’-এর মতো আইন প্রণয়ন করেছে, যেখানে ভুয়া কনটেন্ট শনাক্ত, অপসারণ এবং দায়বদ্ধতা নির্ধারণ করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে ফেডারেল ও অঙ্গরাজ্য পর্যায়ে ডিপফেক নিয়ন্ত্রণে আলাদা আইন প্রণয়ন হচ্ছে, বিশেষ করে নির্বাচন ও ব্যক্তিগত সম্মানহানির ক্ষেত্রে।

দ্বিতীয়ত, প্রযুক্তিগত সমাধান। ইউরোপ ও আমেরিকায় বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাধ্য করা হয়েছে এআই-নির্মিত কনটেন্টে লেবেলিং করতে, অর্থাৎ কোনটি আসল আর কোনটি কৃত্রিমÑ তা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে। একই সঙ্গে ফ্যাক্ট-চেকিং অ্যালগরিদম, ডিপফেক শনাক্তকরণ সফটওয়্যার এবং স্বয়ংক্রিয় রিপোর্টিং সিস্টেম চালু করা হয়েছে।

তৃতীয়ত, স্বাধীন ফ্যাক্ট-চেকিং সংস্থা। ইউরোপ ও আমেরিকায় বহু স্বাধীন ও বিশ্বাসযোগ্য ফ্যাক্ট-চেকিং প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যারা রাজনৈতিক বক্তব্য, ভিডিও ও খবর যাচাই করে দ্রুত জনগণের সামনে সত্য তুলে ধরে। গণমাধ্যম ও সোশ্যাল মিডিয়া প্লাটফর্মগুলো এসব সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করে।

চতুর্থত, জনসচেতনতা ও মিডিয়া লিটারেসি। স্কুল, কলেজ এবং জনপরিসরে মিডিয়া লিটারেসি শিক্ষা দেওয়া হচ্ছেÑ কীভাবে ভুয়া তথ্য চেনা যায়, কীভাবে উৎস যাচাই করতে হয় এবং কেন যাচাই ছাড়া কিছু শেয়ার করা বিপজ্জনক। এটি দীর্ঘমেয়াদি হলেও সবচেয়ে কার্যকর সমাধানগুলোর একটি।

এক্ষেত্রে বর্তমান পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের জন্য করণীয় যা, তাহলো এই সংকট মোকাবিলায় কয়েকটি বাস্তবসম্মত ও জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। প্রথমত, নির্বাচনকালীন ডিজিটাল নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে। নির্বাচন কমিশনের অধীনে একটি বিশেষ ডিজিটাল মনিটরিং সেল গঠন করা যেতে পারে, যারা ভুয়া ভিডিও, গুজব ও বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট দ্রুত শনাক্ত ও প্রতিরোধ করবে।

দ্বিতীয়ত, আইন প্রয়োগে স্বচ্ছতা ও ভারসাম্য জরুরি। ভুয়া তথ্যের বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগ করতে গিয়ে যেন মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন না হয়Ñ এই ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে, নইলে আইন নিজেই বিতর্কের উৎস হয়ে উঠবে।

তৃতীয়ত, গণমাধ্যমের দায়িত্বশীল ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মূলধারার সংবাদ মাধ্যমকে যাচাই ছাড়া কোনো ভিডিও বা তথ্য প্রকাশ না করার কঠোর নীতি অনুসরণ করতে হবে। একই সঙ্গে অনলাইন নিউজ পোর্টালগুলোর জন্য নৈতিক মানদণ্ড নিশ্চিত করা জরুরি।

চতুর্থত, রাজনৈতিক দলগুলোর সমঝোতা ও আচরণবিধি প্রয়োজন। নির্বাচনকালীন ভুয়া তথ্য ব্যবহার না করার বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে একটি নৈতিক চুক্তি হতে পারে, যা অন্তত উত্তেজনা কমাতে সহায়ক হবে।

সবশেষে, সাধারণ নাগরিকের সচেতনতাই সবচেয়ে বড় শক্তি। একজন নাগরিক যদি শেয়ার করার আগে প্রশ্ন করেনÑ ‘এটা কি সত্য?’, ‘উৎসটা কী?’Ñ তাহলেই ভুয়া তথ্যের বিস্তার অনেকাংশে কমে যাবে।

সবশেষে বলা যায়, এআই প্রযুক্তি নিজে কোনো শত্রু নয়; এটি একটি শক্তিশালী হাতিয়ার। কিন্তু ভুল হাতে পড়লে এটি গণতন্ত্রের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে উঠতে পারে। বাংলাদেশের আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এই পরীক্ষার মুখে দাঁড়িয়ে আছে। ইউরোপ ও আমেরিকার অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে যদি আমরা এখনই আইন, প্রযুক্তি, গণমাধ্যম এবং জনসচেতনতার সমন্বিত উদ্যোগ নিতে পারি, তবে এই সংকটকে সুযোগে পরিণত করা সম্ভব। অন্যথায় ভুয়া ভিডিও ও গুজবের স্রোতে সত্য, আস্থা ও গণতন্ত্রÑ সবই ভেসে যাওয়ার ঝুঁকিতে থাকবে।


হাবিব বাবুল

প্রধান সম্পাদক, শুদ্ধস্বর ডটকম

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা