× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

নির্বাচনী তফসিল

গণতন্ত্র সুসংহত করাই বিরাট চ্যালেঞ্জ

মেশকাত সাদিক

প্রকাশ : ১৪ ডিসেম্বর ২০২৫ ১০:২৮ এএম

গণতন্ত্র সুসংহত করাই বিরাট চ্যালেঞ্জ

ঘোষণা হয়ে গেল জাতীয় সংসদ নির্বাচনী তফসিল। ষড়যন্ত্রকারীরা চারদিকে বিষাক্ত নিঃশ্বাস উদগিরণ করছে। দেশদ্রোহীরাও এদেশে সফল হয়। কারণ আমাদের কথা-কাজে ব্যাপক অমিল থাকে। মাঝে মাঝে তা আসমান-জমিনের মতো পার্থক্য সূচিত করে। এবার ১৭ বছর পর একটি সত্যিকার অংশগ্রহণমূলক ও স্বচ্ছ নির্বাচন হতে যাচ্ছে। এই নির্বাচনের মাধ্যমে দেশে উন্নত রাষ্ট্রব্যবস্থার স্বপ্ন সর্বজনীন। উন্নত রাস্তা, সুশাসন, স্বাস্থ্যসেবা, নিরাপত্তা সবকিছুতেই আমরা ইউরোপ-আমেরিকা মানের সুবিধা চাই। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আমরা কি ইউরোপ-আমেরিকাদের মতো আচরণ করতে প্রস্তুত? রাষ্ট্রকে উন্নত করতে চাই, কিন্তু নিজের আচরণকে উন্নত করতে চাই না। এই দ্বৈতিক বৈশিষ্ট্যই আমাদের সমাজের মূল সমস্যা। সর্বত্র আমরা উন্নত রাষ্ট্র চাই, কিন্তু উন্নত নাগরিক হতে অনীহা চরমে থাকে। প্রতিটি দেশের উন্নতির ভিত্তি তার নাগরিক। ইউরোপের উন্নয়ন কেবল অর্থনৈতিক নয়; আচরণগত, নৈতিক, সাংস্কৃতিক পরিপক্বতা মিলেই তাদের অগ্রগতি এসেছে।

বাংলাদেশে আমরা উন্নয়নকে দেখি কেবল অবকাঠামোগত উন্নয়নের পরিমাপে। নির্বাচন এখানে যেন গৌণ। বাড়ি, গাড়ি, অর্থ থাকলেই মর্যাদা। আর বিনয়, নম্রতা, সভ্যতা, ভদ্রতা এবং নিয়ম মানাকে দুর্বলতা ভাবি। নিজের দায়িত্ব-জ্ঞানহীনতাকে ব্যর্থতা বলে প্রচার করি। রাষ্ট্র যদি কেবল উন্নত ভবন তোলে, মেট্রোরেল, পাতাল রেল ও অপরাপর উন্নত সিস্টেম চালু করে অথচ মানুষ যদি আগের মতোই অসভ্য আচরণে অভ্যস্ত থাকে, তাহলে উন্নয়ন কখনও পূর্ণরূপ পায় না। এমন সমাজে নির্বাচন ও গণতন্ত্র সুসংহত করাও বিরাট চ্যালেঞ্জ।

ইউরোপীয় সমাজে তিনটি ভিত্তি সবচেয়ে শক্ত। আইন, শৃঙ্খলা এবং পারস্পরিক সম্মান। সেখানে রাস্তা খালি থাকলেও সিগন্যাল ভাঙে না কেউ। লাইনে দাঁড়ানো হয় নিয়ম হিসেবে, বাধ্যতা হিসেবে নয়। অন্যের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন করা বড় অপরাধ। কিন্তু বাংলাদেশে, ট্রাফিক সিগন্যাল মানা যেন উদাসীনতার পরিচয়। যে লাইনে দাঁড়াল সেই বোকা। সরকারি সম্পদ নষ্ট করা জন্মগত অধিকার। আইন এখানে সবার জন্য সমান নয়। পারস্পরিক সম্মান এখানে কেউ অনুভব করে না। সারারাত আবাসিক এলাকায় সাউন্ড বক্সে উদ্দাম নৃত্যের বারের গান চালানো হয়। পাশের বাসায় বা ফ্ল্যাটে হয়তো পরীক্ষার্থী আছে, রোগী আছে, মসজিদ আছে অথবা পাশেই হাসপাতাল, ক্লিনিক বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কিন্তু সেদিকে ভ্রুক্ষেপ নেই। এমন সমাজে চমৎকার নির্বাচন আয়োজন ও পরিকল্পনা অনুযায়ী তা বাস্তবায়ন দুরূহতম কাজ। অর্থাৎ সমস্ত এলাকায় অসভ্যতার ছড়াছড়ি। মুখ খুললেই বিপদে পড়তে হবে। চুপচাপ সহ্য করতে হয় সব অত্যাচার। এমন সমাজে নির্বাচন হলেই কি আর না হলেই-বা কি? মানুষের পরিবর্তন অসম্ভব। সমস্যার মূল এখানেই। রাষ্ট্রকে উন্নত চাই। কিন্তু আচরণের উন্নতি চাই না। এমন মনস্তাত্ত্বিক পরিবেশে কোনো কিছুই সুষ্ঠু করা খুব সহজ কাজ নয়।

যতক্ষণ না মানুষ নিজেকে রাষ্ট্রের অংশ হিসেবে ভাববে, ততক্ষণ সত্যিকার সুষ্ঠু নির্বাচন হবে না। এদেশের মানুষের মধ্যে একটি মানসিকতা দৃশ্যমান, ‘রাষ্ট্র আমার জন্য, কিন্তু রাষ্ট্রকে রক্ষা করার দায় আমার নয়।’ এই কারণে নির্বাচনী সহিংসতা শুধু নয়, সঙ্গে সঙ্গে গণতান্ত্রিক যাত্রা বার বার বাধাগ্রস্ত হয়। সামাজিক নৈতিকতার মারাত্মক সংকট রাষ্ট্রব্যবস্থার আরেকটি বড় দুর্ভাবনার কারণ। সমাজ শিক্ষা, পরিবার, সামাজিক কাঠামোর মাধ্যমে নৈতিকতা গড়ে তোলা আজও সম্ভব হয়নি। নৈতিকতার কথা সর্বত্র বলা হয়, কিন্তু চর্চা একেবারেই কম। ধর্মীয় বা সামাজিক অনুশাসনকে আমরা ব্যবহার করি সুবিধা অনুযায়ী; প্রকৃত মূল্যবোধচর্চা অনুপস্থিত। যে সমাজ নিজের ভুল স্বীকার করে না, সমালোচনা গ্রহণ করে না, জবাবদিহি চায় না, সেই সমাজে নির্বাচন একটি ভ্রান্তি ছাড়া আর কিছু নয়।

এবার নির্বাচনের চ্যালেঞ্জ নিঃসন্দেহে ব্যাপক পরিসরে বিস্তৃত। রাজনৈতিক অস্থিরতা, আস্থাহীনতা ও রাষ্ট্রীয় পুনর্গঠনের প্রয়োজনে অনুষ্ঠেয় নির্বাচনের ওপর মানুষের আস্থাই নির্বাচনকে অনেক বেশি জটিল করে তুলেছে। সঙ্গে সঙ্গে ফ্যাসিস্টের পলাতক বাহিনীও দেশকে রীতিমতো অস্থির করে তুলবে। চোরাগোপ্তা হামলা, খুন-ছিনতাই, রাহাজানি, হত্যা-ধর্ষণের মাধ্যমে পরিকল্পিতভাবে আইনশৃঙ্খলার চরম অবনতি ঘটিয়ে দেশকে অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির ১২ তারিখে যে নির্বাচন আসছে, তা শুধু একটি রাজনৈতিক প্রক্রিয়া নয়। এটি রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা নির্ধারণের ইতিহাস-সংকট। দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক উত্তেজনা, দলীয় সংঘাত, আস্থাহীন নির্বাচন ব্যবস্থা ও ক্ষমতার দ্বন্দ্ব এমন সাংঘাতিক ঘোলাটে পরিস্থিতি তৈরি করেছে, যেখানে প্রতিটি নির্বাচনই জনমনে প্রশ্ন তোলে। এই নির্বাচন কি সত্যিই দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে, নাকি আবার একটি চক্রের পুনরাবৃত্তি হবে? এমন আশঙ্কা তো আছেই। তবে এবারের নির্বাচনে বড় তিনটি চ্যালেঞ্জ স্পষ্টভাবে সামনে দাঁড়িয়ে আছে। 

রাজনৈতিক বৈধতা, নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা, প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা। রাজনৈতিক বৈধতার চ্যালেঞ্জ : জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধার নির্বাচন কমিশনের দায়দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। গত দেড় দশকে নির্বাচন নিয়ে মানুষের আস্থার সংকট ভয়াবহ মাত্রায় পৌঁছেছে। ভোটাধিকার ক্ষুণ্ন হওয়া, একতরফা নির্বাচন, দলীয় প্রভাব, বিরোধী দলের সংকুচিত রাজনৈতিক ক্ষেত্রÑ এসবকিছু মিলেই নির্বাচনকে একটি বিতর্কিত প্রক্রিয়ায় পরিণত করেছিল। সেইসব বিতর্কের বাইরে গিয়ে এবারের নির্বাচনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হচ্ছেÑ জনগণ কি মনে করবে এটি তাদের ভোট? নাকি কারও রাজনৈতিক প্রদর্শনী? যদি নির্বাচন বৈধতা না পায়, তবে পরবর্তী সরকারও রাজনৈতিকভাবে দুর্বল হয়ে জন্ম নেবে। দুর্বল সরকার দেশের জন্য লাভের চেয়ে ক্ষতিই বেশি বয়ে আনে। এছাড়া নির্বাচনকালীন নিরাপত্তা ও সহিংসতার চ্যালেঞ্জ তো আছেই। 

নির্বাচনে প্রশাসনকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে দেখা যায়। কিন্তু প্রশ্ন থাকে, তারা কি নিরপেক্ষ? অথবা নিরপেক্ষ অবস্থান থেকে নির্বাচন পরিচালনা করার সুযোগ পায় কি না। পুলিশ প্রশাসন, ডিসি, ইউএনও, নির্বাচন কমিশন, গোয়েন্দা সংস্থা, স্থানীয় প্রশাসন অনেক সময় ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবের মধ্যে কাজ করে বলে বস্তুনিষ্ঠ অভিযোগ ওঠে। এবারের নির্বাচনে বড় চ্যালেঞ্জ হলো প্রশাসনের আস্থা পুনরুদ্ধার। যদি মানুষ বিশ্বাস না করে যে প্রশাসন নিরপেক্ষ, তাহলে ভোটের ফলও সন্দেহের মধ্যে পড়ে যায়। এ ছাড়াও বিরোধী দলের সংকট ও রাজনৈতিক ভারসাম্যহীনতা গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর। যে পাতানো ম্যাচ ২০১৩ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত আ. লীগ ও অধুনালুপ্ত জাতীয় পার্টির মধ্যে এদেশের জনগণ দেখেছে। তাই বিএনপির উচিত হবে না বিরোধী দলের সঙ্গে পাতানো ম্যাচ খেলা। অথবা বিপরীতক্রমে যদি জামায়াত ক্ষমতায় আসে তাহলে তারাও যেন বিএনপির সঙ্গে পাতানো ম্যাচ না খেলে এবং সত্যিকার গণতান্ত্রিক ম্যাচ যেন হয়, সেটি সচেতন জনগণ প্রত্যাশা করে। 

যদিও ইতঃপূর্বের সকল নির্বাচনে মুক্তিযুদ্ধ একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক পরিচয়, নৈতিক দাবি এবং জনপ্রিয় ন্যারেটিভ হিসেবে কাজ করেছে। তবে আ. লীগের গণহত্যা ও ইসলাম-বিদ্বেষী কর্মকাণ্ড মুক্তিযুদ্ধকে বিতর্কিত করেছে। তাই এবারের নির্বাচনে এই ন্যারেটিভ আরও জটিল, আরও বিভক্ত ও আরও প্রভাবশালী রূপে সামনে এসেছে। তবে মুক্তিযুদ্ধ ও ইসলামকে মুখোমুখি দাঁড় করালে জনগণ ভালোভাবে নেয় না। তার প্রমাণ ২৪-এর গণঅভ্যুত্থান। সিনেমা, নাটক, উপন্যাস, মেগাসিরিয়াল, দৈনিক পত্রিকা ও টেলিভিশন, ভারত ও আ. লীগ নিয়ন্ত্রিত এক ঝাঁক পেইড এক্টিভিস্ট অহর্নিশ চেষ্টা করেও জনগণের মনে ইসলামিস্টরা মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী এই ন্যারেটিভ প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। বর্ণিত গণমাধ্যম ও সামাজিক বিভিন্ন মাধ্যমে একযোগে প্রোপাগান্ডা-মিথ্যাচার চালিয়েও তারা সফল হয়নি। বিএনপি যদি আসন্ন নির্বাচনে আশানুরূপ ফল না পায় তাহলে সেটি এই সমস্ত জনবিচ্ছিন্ন এক্টিভিস্টদের নিরলস মিথ্যাচার একটি বড় কারণ হবে। আর যদি ভালো ফলাফল পায়, তাহলে সেটিতে এই সমস্ত দুর্মুখ, এজেন্ডাবাদী, মিথ্যা-হলপকারীদের কোনো কৃতিত্ব নেই। সেই সফলতা হবে ম্যাডাম জিয়ার প্রতি ফ্যাসিবাদীদের ব্যাপক অত্যাচার, তারেক জিয়াকে নির্যাতন করে প্রবাস জীবনে বাধ্য করা, বিএনপির মধ্যম পন্থার রাজনৈতিক আদর্শ, আধুনিক চিন্তা, জনমুখী পরিকল্পনা, ক্ষেত্রবিশেষে ভারত বিরোধিতা এবং সর্বোপরি জিয়া পরিবারের প্রতি দেশের মানুষের ব্যাপক ভালোবাসা ও অকুণ্ঠ সমর্থনের কারণে।

মুক্তিযুদ্ধ সুনিশ্চিতভাবে আমাদের আত্মপরিচয়। কিন্তু নির্বাচনের ময়দানে এটি হয়ে গেছে, দলীয় প্রতিযোগিতা এবং কথিত নৈতিক বৈধতার অস্ত্র। ভোটার আবেগ নিয়ন্ত্রণের কৌশল। মিথ্যা ইতিহাস পুনর্লিখনের প্রচেষ্টা এবং রাজনৈতিক বিভেদ তীব্র করার শক্তিশালী মাধ্যম। তবে মুক্তিযুদ্ধের মিথ্যা ও কূটকৌশলী বয়ানের প্রতি তরুণদের আগ্রহহীনতা লক্ষ করা যাচ্ছে। বিতর্কিত জনবিচ্ছিন্ন এক্টিভিস্ট মুক্তিযুদ্ধের বানানো ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বয়ান বার বার বলার কারণে বিএনপি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা আছে। বরং এই মিথ্যার জনক-জননীরা বিএনপির বিপক্ষে বললে বিএনপি বেশি ব্যবধানে প্রতিটি আসনে জয়লাভের সম্ভাবনা আছে। আসন্ন নির্বাচনে ভারত ও আওয়ামী লীগ যৌথভাবে বহুমাত্রিক নাশকতা করতে পারে। সেই বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সকলকে এখন থেকেই চূড়ান্ত প্রস্তুতিতে থাকতে হবে।


মেশকাত সাদিক

কলাম লেখক ও রাজনীতি বিশ্লেষক

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা