জন্মনিবন্ধন
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ১২ ডিসেম্বর ২০২৫ ১২:০২ পিএম
জন্মনিবন্ধন প্রত্যেক নাগরিকের মৌলিক পরিচয়ের স্বীকৃতি। পাসপোর্ট ইস্যু, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি, চাকরিতে নিয়োগ, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলা, ড্রাইভিং লাইসেন্স, বিয়ে নিবন্ধন, ভোটার তালিকা প্রণয়নসহ সামাজিক নিরাপত্তা ভাতার মতো মৌলিক সেবাগুলো পেতে এই সনদ আবশ্যকীয়। কিন্তু দুঃখজনক হলো, দেশে জন্মনিবন্ধন সেবা ভোগান্তির আরেক নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনলাইন সার্ভার ডাউন, তথ্য সংশোধনে জটিলতা, দুর্নীতি ও দালালচক্রের দৌরাত্ম্য- সব মিলিয়ে সাধারণ মানুষকে হয়রানির এক দীর্ঘপথ পাড়ি দিতে হচ্ছে। গ্রামে-গঞ্জে ইউনিয়ন পরিষদ থেকে শুরু করে শহরের সিটি করপোরেশন পর্যন্ত কোথাও নাগরিক এই সেবাটির মান সন্তোষজনক নয়। অনেক ক্ষেত্রে জন্মতারিখ সামান্য ভুল হলেও তা সংশোধনে মাসের পর মাস অপেক্ষা করতে হয়। নানা অজুহাতে পুরো প্রক্রিয়াকে করা হচ্ছে অস্বচ্ছ ও অকার্যকর। এর সুযোগ নিয়ে দালালচক্র অতিরিক্ত অর্থ আদায় করছে, যা নাগরিক অধিকারের স্পষ্ট লঙ্ঘন।
১১ ডিসেম্বর প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ ‘জন্মনিবন্ধনে চরম ভোগান্তি ক্ষুব্ধ অভিভাবকরা’ শীর্ষক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে নাগরিক এই সেবাটির ভোগান্তির নানা চিত্র। প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অপর্যাপ্ত সার্ভার সক্ষমতা, পুরনো যন্ত্রপাতি এবং দক্ষ জনবলের অভাব এ সমস্যার জন্য মূল দায়ী। ভোগান্তির সমাধানে দ্রুত সার্ভার সক্ষমতা বৃদ্ধি, ক্লাউড প্লাটফর্মে স্থানান্তর, লোড ব্যালান্সার স্থাপন, নিয়মিত ডেটাবেজ রক্ষণাবেক্ষণ ও মনিটরিং জরুরি। পাশাপাশি স্থানীয় দপ্তরে উচ্চগতির ইন্টারনেট, আধুনিক কম্পিউটার ও প্রশিক্ষিত কর্মী নিশ্চিত করতে হবে। আইন সংশোধনের পাশাপাশি বিদ্যমান আইনের কার্যকর বাস্তবায়নে নিবন্ধন বিষয়ে সাধারণ মানুষের সচেতনতা বাড়াতে, জনবল ঘাটতি দূর করতে, প্রযুক্তিগত সমস্যার সমাধানে, প্রক্রিয়াগত জটিলতা কমাতে সংশ্লিষ্ট সব খাতকে সমন্বিতভাবে কাজ করার কথাও বলা হচ্ছে। সহজ করে বললে, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ও প্রশাসনিক সমন্বয় মিলেই সেবা হবে দ্রুত, নিরবচ্ছিন্ন ও নির্ভরযোগ্য।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন আইন, ২০০৪ দ্রুত সংশোধন করে হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানকে আইনগতভাবে নিবন্ধনের দায়িত্ব দেওয়া হলে এ কার্যক্রমে অগ্রগতি আসবে। এতে স্বাস্থ্যসেবার আওতায় জন্ম নেওয়া প্রায় ৬৭ শতাংশ শিশু স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিবন্ধনের আওতায় আসবে। পাশাপাশি মৃত্যুনিবন্ধন নিশ্চিতকরণের মাধ্যমে উত্তরাধিকার, সামাজিক নিরাপত্তা ও নারীর অধিকার সুরক্ষা করা সম্ভব। জন্ম ও মৃত্যুর ৪৫ দিনের মধ্যে নিবন্ধন সনদের ভুল সংশোধনের আবেদনের ফি মওকুফ এবং নিবন্ধন তথ্য ব্যবহার করে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর মাধ্যমে ‘ভাইটাল স্ট্যাটিস্টিকস’ প্রস্তুত বাধ্যতামূলক করার কথাও বলছেন তারা। প্রসঙ্গত, বর্তমানে দেশে জন্মনিবন্ধনের হার মাত্র ৫০ শতাংশ এবং মৃত্যুনিবন্ধন ৪৭ শতাংশ, যেখানে বৈশ্বিক গড় যথাক্রমে ৭৭ ও ৭৪ শতাংশ। দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশ যেমন মালদ্বীপ ও শ্রীলঙ্কা ইতোমধ্যে প্রায় সর্বজনীন নিবন্ধন নিশ্চিত করেছে, সেখানে বাংলাদেশ এখনও পিছিয়ে।
এ প্রসঙ্গে জিএইচএআইয়ের বাংলাদেশ কান্ট্রি লিড মুহাম্মাদ রুহুল কুদ্দুস বলেন, ‘আইন সংস্কারের মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানকে নিবন্ধনের দায়িত্ব দিলে ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের সবাইকে নিবন্ধনের আওতায় আনা সম্ভব হবে।’
সবচেয়ে বেশি ভোগান্তির চিত্র দেখা যায় শিক্ষা খাতে। নতুন বছর সামনে রেখে সন্তানদের স্কুলে ভর্তির ব্যস্ততা শুরু হয়েছে অভিভাবকদের। বেশিরভাগ বিদ্যালয়ে নভেম্বর বা ডিসেম্বরের মধ্যে ভর্তির প্রক্রিয়া শেষ হয়। জাতীয় শিক্ষানীতি-২০১০ অনুযায়ী, বিদ্যালয়ে ভর্তির সময় শিশুর বয়স শনাক্ত করতে আবেদন ফরমের সঙ্গে জমা দিতে হয় জন্মসনদের ফটোকপি। ২০২১ সালের করা সরকারি নিয়ম অনুযায়ী, ২০০১ সালের পর জন্ম নেওয়া ব্যক্তিদের জন্মনিবন্ধন করাতে হলে মা-বাবার জন্মসনদ থাকা আবশ্যক। ফলে কয়েক মাস আগে থেকে শিশুর ও নিজেদের জন্মসনদ সংগ্রহে অনেক অভিভাবকের দৌড়ঝাঁপ শুরু হয়। অনেক অভিভাবকের জন্মসনদ থাকে না, থাকলেও সন্তানের জন্মসনদের তথ্যের সঙ্গে থাকে তারতম্য কিংবা বানান ভুল। ফলে এই সময়ে জন্মসনদ সংশোধনের প্রক্রিয়ায় ঢুকে পড়তে হয় ভোগান্তিতে।
সরকার ডিজিটাল সেবা নিশ্চিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হলেও জন্মনিবন্ধন ব্যবস্থায় সেই ডিজিটাল রূপান্তরের সুফল এখন নাগরিকের হাতে পৌঁছেনি। অথচ আধুনিক, দ্রুত, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক একটি সিস্টেম নিশ্চিত করাই সংশ্লিষ্টদের প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত। আমরা মনে করি, সার্ভার শক্তিশালী করা, স্থানীয় পর্যায় থেকে দক্ষ জনবল নিয়োগ, নিয়মিত মনিটরিং এবং দালালমুক্ত স্বচ্ছ প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা গেলে নাগরিক হয়রানি অনেকটাই কমবে। মনে রাখতে হবে, জন্মনিবন্ধন নাগরিকের অধিকার, অনুগ্রহ নয়। তাই এই সেবায় ভোগান্তি দূর করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। সহজ, দ্রুত ও নিরাপদ জন্মনিবন্ধনই একটি আধুনিক রাষ্ট্রের পরিচয়। তাই রাষ্ট্রের কাছে আমাদের দাবি- ভোগান্তিমুক্ত নাগরিক সেবা নিশ্চিত করুন।