ব্যাংক খাত
নিরঞ্জন রায়
প্রকাশ : ১২ ডিসেম্বর ২০২৫ ১১:৫৯ এএম
সম্প্রতি আমেরিকার সিনেটে ব্যাংকিং-সংক্রান্ত একটি বিল অনুমোদনের জন্য বিবেচনাধীন আছে, যার মাধ্যম আমেরিকার ব্যাংকিং খাতে ক্ষুদ্র আমানতকারীদের পাশাপাশি মাঝারি আমানতকারীদেরও স্বার্থ সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে। এই বিলে এক কোটি বা দশ মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত ব্যাংক আমানতের নিশ্চয়তা দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে। এই বিল পাস হলে আমেরিকার ব্যাংকে যারা আমানত রাখবেন, তাদের দশ মিলিয়ন ডলার ফিরে পাওয়ার নিশ্চয়তা থাকবে। অর্থাৎ আমেরিকার কোনো ব্যাংক যদি দেউলিয়া ঘোষিত হয় বা বন্ধ হয়ে যায়, সেক্ষেত্রে যেসব আমানতকারী দশ মিলিয়ন পর্যন্ত ব্যাংকে আমানত রাখবেন, তারা তাদের অর্থ ফিরে পাবেন। ব্যাংক আমানত ফিরে পাওয়ার নিশ্চয়তা আগে ছিল মাত্র এক লাখ ডলার, যা গত ২০০৮ সালের আর্থিক মন্দার পর বৃদ্ধি করে ২ লাখ ৫০ হাজার ডলার করা হয়েছিল। তখন মূলত ক্ষুদ্র আমানতকারীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করাই ছিল ব্যাংক আমানতের নিশ্চয়তার উদ্দেশ্য। কিন্তু বছর দুয়েক আগে যখন আমেরিকার মধ্যম সারির ব্যাংক, সিলিকন ভ্যালি ব্যাংকসহ কয়েকটি ছোট এবং আঞ্চলিক ব্যাংক বন্ধ হয়ে যায়, তখন অনেক মধ্যবিত্ত পরিবার ক্ষতির সম্মুখীন হয়। এই ঘটনায় এটাও লক্ষ করা গেছে যে ব্যাংকে মধ্যবিত্ত আমানতকারী ক্ষতিগ্রস্ত হলে, তার ক্ষতিকর প্রভাব একদিকে যেমন দেশের মুদ্রাবাজারে পড়ে, অন্যদিকে তেমনই অর্থনীতিতেও পড়ে। তাছাড়া একটি দেশের আর্থিক খাত এবং অর্থনীতির জন্য ক্ষুদ্র আমানতকারীর গুরুত্ব যেমন অপরিসীম, তেমনই মাঝারি আমানতকারী বা মধ্যবিত্ত শ্রেণির ভূমিকাও অনেক বেশি। সেই বিবেচনা থেকেই আমেরিকার সরকার আমানত নিশ্চয়তার (ডিপোজিট গ্যারান্টি) সর্বোচ্চ সীমা দশ মিলিয়ন ডলারে উন্নিত করার উদ্যোগ নিয়েছে।
এখন অনেকই বলার চেষ্টা করবেন যে, আমেরিকার গল্প বাংলাদেশে করে লাভ কী। প্রত্যক্ষ লাভ না থাকলেও পরোক্ষ লাভ যে একেবারে নেই, তেমন নয়। আমেরিকা হচ্ছে এমন এক বিশাল অর্থনীতির দেশ, যেখানে নাগরিকরা যেমন শিক্ষিত, তেমনি সচেতন। তাছাড়া আমেরিকায় চাকরি পাওয়ার নিশ্চয়তা আছে, কেননা সেখানে বেকার সমস্যার হার মাত্র তিন থেকে চার শতাংশ, যার অর্থ হচ্ছে প্রায় ৯৫ শতাংশ মানুষ কর্মে নিয়োজিত। তদুপরি, আমেরিকায় আছে সামাজিক নিরাপত্তা, অর্থাৎ শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং অবসর ভাতার নিশ্চয়তা। তার চেয়েও বড় কথা হচ্ছে আমেরিকার অধিকাংশ মানুষ আর্থিক খাত সম্পর্কে পুরোপুরি অবহিত এবং কোথায় অর্থ জমা রাখা সবচেয়ে বেশি নিরাপদ ও লাভজনক, তা জেনেই আমেরিকার মানুষ ব্যাংকে অর্থ জমা রাখে। সেরকম একটি দেশেও সরকার ক্ষুদ্র আমানতকারীদের নিশ্চয়তা দিয়ে আসছে এবং এখন সেই নিশ্চয়তার আওতায় মধ্যবিত্ত শ্রেণিকে নিয়ে আসার প্রক্রিয়া চলমান। অথচ আমাদের দেশে চাকরি পাওয়ার নিশ্চয়তা নেই বললেই চলে। আর সামাজিক নিরাপত্তার কথা এখন পর্যন্ত আলোচনার বিষয়ই রয়ে গেছে। এরকম একটি অনিশ্চিত অবস্থায় ব্যাংক আমানতের কোনোরকম নিশ্চয়তা নেই।
আমাদের দেশে মানুষ কষ্ট করে অর্থ সঞ্চয় করে ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার কথা বিবেচনায় রেখে। ভবিষ্যতে ছেলেমেয়েদের উচ্চশিক্ষা, অসুস্থ হলে তার চিকিৎসা এবং বৃদ্ধ বয়সে বা অবসর জীবনে জীবনযাত্রা নির্বাহের জন্য মানুষ বর্তমান ভোগ পরিহার করে অর্থ সঞ্চয় করে। এই সঞ্চয়ের বড় অংশ জমা রাখা হয় বাণিজ্যিক ব্যাংকে। আমাদের দেশে যেহেতু ব্যাংক আমানতই হচ্ছে একমাত্র উল্লেখযোগ্য ঝুঁকিমুক্ত বিনিয়োগ মাধ্যম, তাই মানুষ তাদের সঞ্চয় ব্যাংকেই জমা রাখে। সঞ্চয়পত্রে কিছু বিনিয়োগ সুবিধা থাকলেও, তার সুযোগ খুবই সীমিত। তাই মানুষ ব্যাংকেই তাদের সঞ্চিত অর্থ জমা রাখে। ব্যাংকে অর্থ জমা রাখার আরও একটি কারণ হচ্ছে সর্বোচ্চ মাত্রার তারল্য। অর্থাৎ আমানতকারী যখন প্রয়োজন মনে করবে তখনই তাদের অর্থ ব্যাংক থেকে উত্তোলন করতে পারবে। এমনকি মেয়াদি আমানত, যা সাধারণত মেয়াদ পূর্তির আগে উত্তোলন করার সুযোগ নেই, সেই মেয়াদি আমানতের অর্থও যদি কোনো গ্রাহক তাৎক্ষণিক উত্তোলন করতে চায়, ব্যাংক তাহলে সেই অর্থ ফেরত দিতে বাধ্য এবং দিয়েও থাকে। হয়তো এই আমানতের ওপর খণ্ডিত সময়ের জন্য সুদ দিতে না পারে, কিন্তু আমানতের অর্থ ফেরত দিতে বাধ্য।
ব্যাংক থেকে অর্থ ফেরত পাওয়ার এই নিশ্চয়তার কারণেই মানুষ তাদের কষ্টার্জিত সঞ্চয় ব্যাংকে জমা রাখে। কিন্তু সম্প্রতি কিছু ব্যাংক, বিশেষ করে যে ব্যাংকগুলো এক ধরনের সমস্যায় পড়েছে বলে অভিযোগ আছে, তারা আমানতকারীদের চাহিদামাফিক অর্থ ফেরত দিতে ব্যর্থ হয়েছে। প্রথমদিকে অনেক ব্যাংক সরাসরি অর্থ ফেরত দেয়ার কথা অস্বীকার করেছে। এখনও দুয়েকটি ব্যাংক তাদের গ্রাহকদের অর্থ ফেরত দেয়ার কথা সরাসরি অস্বীকার করেই চলেছে। অনেক ব্যাংক আবার সরাসরি অস্বীকার করার পথ এড়িয়ে নানা কৌশলে গ্রাহকদের অর্থ প্রদান করা থেকে বিরত থাকছে। এর ফলে জনগণ পড়েছে মহাবিপদে। একদিকে তারা তাদের প্রয়োজন মেটাতে পারছে না, অন্যদিকে তাদের কষ্টার্জিত অর্থ আদৌ ফেরত পাবে কি না, তা নিয়ে ভীষণ উদ্বেগের মধ্যে আছে। আমার পরিচিত অনেকে তাদের চিকিৎসা ব্যয় মিটানো এবং ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার খরচ চালানোর প্রয়োজনেও ব্যাংক থেকে অর্থ উত্তোলন করতে পারেনি। সেই ব্যাংক সাফ জানিয়ে দিয়েছে যে, ব্যাংকের অবস্থা ভালো হলে টাকা ফেরত দেয়ার চেষ্টা করা হবে। একটি ব্যাংক গ্রাহকদের টাকা ফেরত দিতে ব্যর্থ হয়ে এরকম কথা বলতে পারে, তা ভাবতেও অবাক লাগে।
সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে গ্রাহকদের এই দুর্ভোগ দেখার মতো কেউ আছে বলে মনে হয় না। বাংলাদেশ ব্যাংক দেশের ব্যাংকিং খাতের অনেক কিছু উলটপালট করে ফেলছে, কিন্তু কিছু ব্যাংক যে সমস্যার অজুহাত দেখিয়ে গ্রাহকদের অর্থ দিতে ব্যর্থ হচ্ছে বা অর্থ প্রদান করতে গড়িমসি করছে, সেই বিষয়ে কোনোরকম ব্যবস্থা নিতে পারছে না। একটি ব্যাংক গ্রাহকদের টাকা ফেরত না দিয়ে টিকে থাকে কীভাবে। বিশ্বে কোথাও একটি ব্যাংক টাকা ফেরত না দিয়ে এক মুহূর্ত টিকে থাকতে পারবে না। যেসব ব্যাংক গ্রাহকদের টাকা ফেরত দিতে গড়িমসি করছে, সেসব ব্যাংকের মালিকানা গ্রহণ করে সরকারি সহযোগিতায় গ্রাহকদের অর্থ ফেরত প্রদানের মাধ্যমে আস্থা ফিরিয়ে এনে বিশেষ ব্যবসায়িক পরিকল্পনার মাধ্যমে ব্যাংকগুলোকে ঘুরে দাঁড় করাতে হবে এবং তারপর সেসব ব্যাংক ভালো লাভে আবার বেসরকারি খাতে স্থানান্তর করা যাবে।
শুধু মার্জার বা অধিগ্রহণ করার মাধ্যমে এটা সম্ভব নয়। শুধু মার্জারের মাধ্যমে করতে গেলে সম্মিলিত পাঁচটি ব্যাংকের জন্য যেমন এমডি খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না, ঠিক সেরকম অবস্থাই হবে। এজন্য প্রয়োজন বিস্তর কর্মপরিকল্পনা, যার মধ্যে থাকবে, (১) অর্থ ফেরত দিতে ব্যর্থ ব্যাংকের বোর্ড ভেঙে দিয়ে দক্ষ ও অভিজ্ঞ ব্যাংকার এবং অন্যান্য পেশাদারদের মাধ্যমে নতুন বোর্ড গঠন করা, (২) ব্যাংকের ম্যানেজমেন্ট পুনর্গঠন করে যোগ্যদের নিয়োগ দেওয়া, (৩) আগামী পাঁচ থেকে দশ বছরের জন্য একটি ব্যবসায়িক পরিকল্পনা প্রদান, (৪) নতুন বোর্ড এবং ম্যানেজমেন্ট এই ব্যবসায়িক পরিকল্পনা অনুসারে ব্যাংক পরিচালনা করবে, (৫) একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ আমানতের সরকারি নিশ্চয়তা প্রদান, (৬) ঋণ প্রদানের ক্ষেত্রে কঠোর বিধিনিষেধ মেনে চলতে বাধ্য করা, অর্থাৎ সরকারি খাত, নগদ জামানতের বিপরীতে, অন্যান্য ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে এবং সুপ্রতিষ্ঠিত বৃহৎ বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ব্যতীত অন্য কোথায় ঋণ প্রদানের সুযোগ না রাখা, (৭) সরকার ঘাটতি বাজেট এবং উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য ঋণ গ্রহণের ক্ষেত্রে এসব ব্যাংককে অগ্রাধিকার দেওয়া এবং (৮) সর্বোপরি এসব বিধিনিষেধ ডিজিটাল পদ্ধতিতে পরিপালনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা, যাতে এর ব্যত্যয় ঘটানোর সুযোগ না থাকে। বিষয়গুলো কীভাবে গৃহীত এবং বাস্তবায়িত হতে পারে, তা ব্যাখ্যা করতে গেলে বিস্তারিত আলোচনার প্রয়োজন, যার সুযোগ এখানে নেই।
কিছু ব্যাংক গ্রাহকদের অর্থ ফেরত দিতে ব্যর্থ বা গড়িমসি করার কারণে সাধারণ মানুষ তো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেই, সেই সঙ্গে দেশের ব্যাংকিং খাতে ভয়ানক এক খারাপ দৃষ্টান্ত স্থাপন হয়ে গেল, যার সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়বে দেশের গুরুত্বপূর্ণ এই খাতে। আমাদের দেশের ব্যাংকিং খাতের সমস্যা নতুন নয়। সেই আশির দশকের বেসরকারি ব্যাংকিং খাতের যাত্রার শুরু বা তারও আগে দেশে শিল্পায়নের নামে শিল্প ব্যাংক এবং শিল্প ঋণ সংস্থা সৃষ্টির শুরু থেকে খেলাপি ঋণের সংস্কৃতি চালু হওয়া এবং পরবর্তীতে নামে-বেনামে ঋণ নেওয়ার যে দুর্নীতি শুরু হয়েছিল, তা কখনোই বন্ধ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। উল্টো এই দুর্নীতি এবং ঋণ কেলেঙ্কারি ক্রমান্বয়ে মাত্রাতিরিক্ত বৃদ্ধি পেতে পেতে আজকের এই ভয়াবহ অবস্থায় এসে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু ব্যাংক তাদের আমানতকারীর অর্থ ফেরত দিতে পারেনি, এমন ঘটনা আগে কখনোই ঘটেনি। এখন ভবিষ্যতে অনেক ব্যাংকই ইচ্ছা করলেই নানান কারণ দেখিয়ে গ্রাহকদের অর্থ ফেরত নাও দিতে পারে। তখন দেখা যাবে সমাজে যাদের প্রভাব-প্রতিপত্তি আছে, তারাই ব্যাংক থেকে অর্থ ফেরত পাবেন। আর সাধারণ গ্রাহকদের অর্থ ফেরত পাওয়ার বিষয়টি ব্যাংকের মর্জির ওপর নির্ভর করবে। এরকম অবস্থার সৃষ্টি হলে দেশের ব্যাংকিং কাঠামোই ভেঙে পড়বে।
আসলে আমাদের দেশের ব্যাংকিং খাত যে জরাজীর্ণ অবস্থায় পড়েছে, সেখান থেকে উত্তরণ ঘটাতে হলে পুরো ব্যাংকিং খাতকে ঢেলে সাজাতে হবে। ব্যাংক পরিচালনার ক্ষেত্রে আনতে হবে আমূল পরিবর্তন। নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকেও আনতে হবে ব্যাপাক পরিবর্তন। সবার ওপরে স্থান দিতে হবে ব্যাংকের আমানতকারীদের। আর এটা শুধুমাত্র বাংলাদেশ ব্যাংকের একার পক্ষে সম্ভব নয়। বিশেষ করে আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষা করতে হলে প্রতিষ্ঠা করতে হবে স্বতন্ত্র ডিপোজিট ইনস্যুরেন্স করপোরেশন। বিষয়টি নিয়ে আমি ইতোমধ্যে একাধিক কলাম লিখেছি বিধায় এখানে আর পুনরাবৃত্তির প্রয়োজন নেই।
নিরঞ্জন রায়
সার্টিফাইড অ্যান্টি-মানি লন্ডারিং স্পেশালিস্ট ও ব্যাংকার, টরন্টো, কানাডা