অনিরাপদ ফেসবুক
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ১০ ডিসেম্বর ২০২৫ ১০:৩৩ এএম
ডিজিটাল যুগে শিশুদের হাতে স্মার্টফোন তুলে দেওয়া এখন আর নতুন কিছু নয়। অনলাইন শিক্ষা, বিনোদন ও যোগাযোগের প্রয়োজনে শিশুরা প্রতিদিনই কোনো না কোনো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রবেশ করছে। কিন্তু সেই প্রবেশপথের সবচেয়ে বড় ঝুঁকির নাম এখন ফেসবুক। বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় এই প্লাটফর্মটি বয়সভিত্তিক নিরাপত্তা দাবি করলেও বাস্তবে শিশুদের জন্য এটি অনিরাপদ মাধ্যম হিসেবে উঠে এসেছে বিভিন্ন গবেষণা ও অভিজ্ঞতায়। বাংলাদেশের অভিভাবকরাও এই ভয়ংকর প্রভাবের সঙ্গে লড়াই করছেন প্রতিনিয়ত।
গবেষণায়
দেখা গেছে, অনলাইন প্লাটফর্মে ২৩ শতাংশ শিশু মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়েছে, যার মধ্যে ফেসবুক
হচ্ছে সবচেয়ে বেশি অনিরাপদ। সম্প্রতি ‘বাংলাদেশে প্রতিবন্ধী শিশু এবং শিশুদের অনলাইন
যৌন শোষণ প্রতিরোধ’ বিষয়ক এক গবেষণার ফলাফলে এ তথ্য পাওয়া গেছে। ৮ ডিসেম্বর, রাজধানীর
একটি হোটেলে আন্তর্জাতিক সংস্থা ‘টেরে দেস হোমস্ নেদারল্যান্ডস (টিডিএইচ-এনএল)’ আয়োজিত
কর্মশালায় এই গবেষণা তথ্য তুলে ধরা হয়। গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, অন্তর্ভুক্তিমূলক সুরক্ষার
অভাবে বাড়ছে শিশুদের অনলাইন যৌন শোষণসহ নানান ঝুঁকি। অনলাইনে ৮ শতাংশ শিশু আংশিক ঝুঁকিতে
এবং ৬৯ শতাংশ শিশু আংশিক নিরাপদ অবস্থায় আছে। এ ক্ষেত্রে ফেসবুক ব্যবহারে সর্বোচ্চ
৭৭ শতাংশ শিশু ঝুঁকিতে আছে। এ ছাড়া ইনস্টাগ্রাম ব্যবহারে ১৫ শতাংশ ও অন্যান্য সামাজিক
যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারেও শিশুরা নিরাপদ নয়। বিশ্লেষকরা বলছেন, এই ঝুঁকি মোকাবিলায়
শিশুদের নিরাপদ অনলাইন প্লাটফর্ম ব্যবহারে অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা, শিক্ষক প্রশিক্ষণ
ও সহজলভ্য বিচারব্যবস্থায় বিনিয়োগ জরুরি।
নানা
পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, ফেসবুকে শিশুদের জন্য সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো অযাচিত কনটেন্ট। বয়সসীমা
১৩ বছর নির্ধারিত হলেও বাস্তবে ৮-১২ বছর বয়সি অগণিত শিশু নকল বয়স ব্যবহার করে ফেসবুকে
ঢুকে পড়ে। ফলে তাদের সামনে আসে সহিংসতা, অশ্লীলতা, বুলিং, ঘৃণামূলক বক্তব্য বা মানসিক
চাপ সৃষ্টিকারী পোস্ট। অ্যালগরিদমের কারণে শিশুরা এমন কনটেন্টের ঘূর্ণিতে পড়ে আরও বেশি
সময় আটকে থাকে, যা তাদের মানসিক বিকাশে গুরুতর ক্ষতিকারক প্রভাব ফেলে।
ফেসবুককে
অপরিচিত প্রাপ্তবয়স্করা বন্ধুত্বের নামে শিশুদের কাছে আসে, বিশ্বাস অর্জন করে ব্যক্তিগত
তথ্য, ছবি বা ভিডিও আদায় করাকে লক্ষ্য করে। অনেক সময় এসব শিশুকে ব্ল্যাকমেল করে মানব
পাচার, যৌন নিপীড়ন বা অন্য অপরাধে ফেলার নজিরও রয়েছে। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, ফেসবুকে
এসব অপরাধ শনাক্ত ও প্রতিরোধের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা এখনও নেই।
সাইবার-বুলিং
বর্তমানে শিশু-কিশোরদের অন্যতম বড় মানসিক সংকট। স্কুল, পরিবার বা সমাজের বাইরে ডিজিটাল
দুনিয়ায় তারা আরও বড় ধরনের হেনস্তার মুখোমুখি হয়। এমনও দেখা গেছে, একটি ব্যঙ্গাত্মক
মন্তব্য, বিকৃত ছবি বা ভুল তথ্য ছড়িয়ে দিলে শিশুর মনোজগতে যে আঘাত লাগে, তা অনেক সময়
জীবনের সব আনন্দ, স্বাভাবিকতা কেড়ে নেয়। সাম্প্রতিক সময়ে আত্মহত্যার ঘটনাতেও সোশ্যাল
মিডিয়া বুলিংয়ের প্রভাব স্পষ্ট।
আরেকটা
বিষয় লক্ষণীয় যে, ফেসবুক শিশুদের গোপনীয়তা রক্ষায় ব্যর্থ। তাদের ব্যক্তিগত তথ্য, ছবি
এমনকি অবস্থানও অনেক সময় নজরদারি বা অনাকাঙ্ক্ষিত অ্যাক্সেসের ঝুঁকিতে থাকে। বিজ্ঞাপন
প্রদর্শন ও ডেটা সংগ্রহের প্রতিযোগিতায় শিশুদের মানসিক দুর্বলতা বা আগ্রহকে কাজে লাগিয়ে
ফেসবুক যে অ্যালগরিদম পরিচালনা করে, তা নৈতিকভাবেও প্রশ্নবিদ্ধ। আমরা মনে করি, শিশুর
সুস্থ বিকাশের স্বার্থে এসব বন্ধ করতে হবে। এ বিষয়ে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে সমন্বিত
উদ্যোগ নিতে হবে।
এই
পরিস্থিতিতে আমাদের সন্তানদের সুরক্ষায় দ্রুত সমাধানের পথ খুঁজতে হবে। এই ক্ষেত্রে
প্রথমেই অভিভাবকদের ডিজিটাল সচেতনতা বাড়ানো জরুরি। আমরা বলতে চাই, প্রযুক্তি সুবিধা
শিশুরা পাবে, তবে নিয়ন্ত্রণ অবশ্যই থাকা উচিত অভিভাবক তথা বড়দের হাতে। এই নীতিতে পরিবারকে
কঠোরভাবে চলতে হবে। বয়স ভেরিফিকেশন ছাড়া যেন কোনো শিশু অ্যাকাউন্ট খুলতে না পারেÑ সে
বিষয়ে ফেসবুককে আরও শক্তিশালী ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে ‘বাংলাদেশে শিশু অনলাইনে
সুরক্ষা আইন’ কার্যকর করে সোশ্যাল মিডিয়ার ওপর কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে।
মনে
রাখতে হবে, ডিজিটাল সুযোগ যদি সঠিকভাবে কাজে না লাগানো যায় তা বিপর্যয়ের রূপ নেয়। তাই
পরিবার, রাষ্ট্র এবং ফেসবুক সব পক্ষকে আরও সক্রিয় হতে হবে। শিশুদের ডিজিটাল সুরক্ষা
নিশ্চিত করতে হবে।