বেগম খালেদা জিয়া
এ. কে. এম. আহসান হাবিব নাফি
প্রকাশ : ০৮ ডিসেম্বর ২০২৫ ১১:৩৬ এএম
আপডেট : ০৮ ডিসেম্বর ২০২৫ ১১:৩৭ এএম
বাংলাদেশের রাজনৈতিক অভিধানে কিছু নাম কেবল ব্যক্তিকে নির্দেশ করে না তারা একটি সময়কে, একটি আন্দোলনকে, একটি জাতির স্বপ্নকে প্রতিনিধিত্ব করে। সেই ইতিহাস-নির্মাতা নামগুলোর অন্যতম বেগম খালেদা জিয়া। তিনি শুধু একজন রাজনৈতিক নেতৃত্ব নন; তিনি আপসহীনতার মূর্ত প্রতীক, গণতন্ত্রের শেষ আশ্রয়স্থল এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিহিংসার সামনে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানো এক অনমনীয় সাহসী নারী।
বেগম খালেদা জিয়া শোককে রূপ দিয়েছেন শক্তিতে। ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে জাতি যখন আতঙ্কিত দিশাহারা, বিভাজন ও অনিশ্চয়তার অন্ধকারে নিমজ্জিত; তখন তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের দায়িত্ব নেন। ইতিহাস ভেবেছিল এ নারীর পথ শেষ, এখানেই তার সীমারেখা। কিন্তু খালেদা জিয়া দেখিয়েছেনÑ নেতৃত্ব জন্মসূত্রে নয়, নেতৃত্ব সংগ্রামের আগুনে তৈরি হয়।
১৯৯০-এর গণঅভ্যুত্থানে তার নেতৃত্ব শুধু রাজনৈতিক ছিল নাÑ এটি ছিল এক নৈতিক ঘোষণা, যেখানে স্বাধীনতার মানে কেবল পতাকা নয়, জনগণের ভোটাধিকার। বাংলাদেশের ইতিহাসে একমাত্র তিনিই ওমন প্রতিকূল সময়েও ছাত্রদল, ছাত্রলীগ, জাসদসহ বিপরীত মতাদর্শের ছাত্র সংগঠনগুলোকে এক ব্যানারে এনে দাঁড় করিয়েছিলেন। তিনি তিনবার দেশের প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। কিন্তু এটাই তার অর্জনের শেষ পরিচয় নয়। তার নেতৃত্বে নির্মিত হয়েছে স্বপ্ন, অর্থনীতির ভিত, বন্দর ও অবকাঠামো, নারীর ক্ষমতায়ন, কৌশলগত জোট যেগুলো আজও বাংলাদেশের মানুষের শক্তি। তিনি প্রমাণ করেছেন ক্ষমতা দখল নয়, ক্ষমতাকে জনগণের হাতে ফিরিয়ে দেওয়াই প্রকৃত রাজনীতি।
বেগম জিয়ার রাজনৈতিক সংগ্রাম শুধু নয়, ব্যক্তিগত ক্ষত, যা ইতিহাসকেও স্তম্ভিত করে। স্বামী শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে হারিয়েছেন রাজনৈতিক হত্যার ষড়যন্ত্রে, ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকো মৃত্যুবরণ করেছেন মায়ের চোখের সামনে, বড় ছেলে এবং পরিবার থেকে দীর্ঘদিন বিচ্ছিন্ন থেকেছেন, নানাবিধ মিথ্যা মামলা, বন্দিত্ব ও অপমান সহ্য করেছেন, নাতি-নাতনিদের বড় হতে দেখার অধিকার থেকেও বঞ্চিত হয়েছেন। একজন মা, একজন স্ত্রী, একজন নারী হিসেবে যে দুঃখের বোঝা বহন করলে মানুষ ভেঙে পড়ে বেগম জিয়া সেখানে দাঁড়িয়ে হয়েছেন আরও দৃঢ়, আরও কঠোর। হয়ে উঠেছেন ইতিহাসের অংশ।
তাকে ধ্বংস করতে চেয়েছে রাষ্ট্রশক্তি বারবার, কিন্তু ব্যর্থ হয়েছে প্রতিবার। ২০০৭-এর ১/১১-তে তাকে স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়েছিলÑ ‘রাজনীতি ছাড়ুন, মুক্তি পান।’ তিনি উত্তর দিয়েছিলেনÑ‘আমি নত হব না; কারণ আমার মাথা আপনার বন্দিশালার জন্য নয়, বাংলাদেশের মানুষের জন্য।’ এই একটি বাক্যই আজ আমাদের গণতন্ত্রের শেষ অক্ষয়বাণী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ২০০৯ সালের পর থেকে শুরু হয় তার বিরুদ্ধে চলমান এক ভয়াবহ প্রতিহিংসার রাজনীতি। মিথ্যা মামলা, ইচ্ছাকৃত কারাবন্দি করা, শর্তাধীন মুক্তির প্রস্তাব, চরিত্রহননের পরিকল্পিত অপপ্রচারের নানা কৌশল প্রয়োগ করা হয়েছে, লক্ষ্য একটাইÑ বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক মৃত্যু। কিন্তু তারা ভুলে গেছে, যাকে জনগণ হৃদয়ে স্থান দেয়, তাকে হত্যা করা যায় না।
২০১৮ সালে গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় তাকে কারাবন্দি করা হয়। মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে তাকে বলা হয়Ñ ‘রাজনীতি থেকে অবসর নিন, আত্মসমর্পণ করুন, আমরা আপনাকে বাঁচতে দেব।’ তিনি মাথা তুলে উত্তর দেন- ‘জীবন বাঁচানোর বিনিময়ে অধিকার বিসর্জন নয়, এটা জিয়ার পরিবারের শিক্ষা নয়।’
আজ তিনি জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে, আর তার সেই প্রিয় দেশ ও দেশের আপামর জনগণ অশ্রুসিক্ত। আজ বাংলাদেশের শহর-বন্দর, গলি-গ্রাম, মসজিদ-মন্দির যেখানেই তাকাবেন, একটাই সুর, একটাই প্রার্থনাÑ ‘বেগম খালেদা জিয়া সুস্থ হয়ে উঠুন।’ ধর্ম-বর্ণ-গোত্র-দলীয় বিভাজন ভুলে মানুষ হাত তুলেছে তার জন্য। এটি কোনো রাজনৈতিক প্রচারণা নয়Ñ এটি সেই আবেগ, যা কেবল ইতিহাসের নির্বাচিত মানুষদের জন্যই সংরক্ষিত থাকে। ক্ষমতা, পদমর্যাদা, প্রটোকল এসব ক্ষণস্থায়ী। কিন্তু মানুষের অশ্রু, ভালোবাসা ও প্রার্থনা এগুলোই অমরত্ব। বেগম জিয়া সেই অমরত্ব অর্জন করেছেন বহু আগেই; আজ তার প্রমাণ আরও স্পষ্ট হচ্ছে।
এখন প্রশ্ন নয়Ñ সময় আমাদের সামনে নির্দেশ রেখে গেছে। বাংলাদেশ আজ দ্বিধার মোড়ে দাঁড়িয়েÑ আমরা কি ভয়, দমন-পীড়ন, প্রোপাগান্ডার কাছে আত্মসমর্পণ করব? নাকি আমরা দাঁড়াব সেই নারীর পাশে, যিনি আমাদের ভোটাধিকার, আমাদের মুক্তি, আমাদের ভবিষ্যতের জন্য জীবন পণ করেছেন? আমাদের উত্তর সময়ের ওপর অপেক্ষা করছে।
সমাপ্তি নয়, শপথ নিতে চাইÑ যতদিন বাংলাদেশ থাকবে, যতদিন মানুষ স্বাধীনতার মর্ম বুঝবে, ততদিন একটি নাম ইতিহাসের বুক চিরে প্রতিধ্বনিত হবে। খালেদা জিয়া মানে প্রতিরোধ, খালেদা জিয়া মানে আপসহীনতা, খালেদা জিয়া মানে গণতন্ত্রের শেষ দুর্গ। তিনি কোনো দলীয় নেত্রী ননÑ তিনি এই জাতির স্পন্দন।
এ. কে. এম. আহসান হাবিব নাফি
চিকিৎসক ও লেখক