ইমেইল থেকে
প্রজ্ঞা দাস
প্রকাশ : ০৬ ডিসেম্বর ২০২৫ ১২:২৩ পিএম
মা, মাটি, দেশ, কৃষি ও কৃষকÑ একই সূত্রে গাঁথা পাঁচটি শব্দ। যার গভীরতা আকাশচুম্বী। বাংলাদেশের অর্থনীতি কৃষিনির্ভর। আর কৃষক সেই মানুষ, যার ঘামে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা দাঁড়িয়ে আছে। অথচ তিনি নিজেই ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত। অর্থনীতির ভাষায়, ‘কৃষকই সবচেয়ে বড় ঝুঁকির বাহক, অথচ সবচেয়ে কম লাভবান।’ এই সত্য আজ আরও নির্মম, আরও স্পষ্ট। গত দশকে বাংলাদেশে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে নিঃসন্দেহে। কিন্তু উৎপাদনের গ্রাফ যতই ওপরে উঠুক না কেন, কৃষকের লাভের রেখা পরিবর্তন হয়নি। কেননা বাজারে দাম বাড়লেও লাভের অঙ্ক ভোগ করছেন মধ্যস্বত্বভোগী, রপ্তানিকারক বা আড়তদার। দাম কমলে ক্ষতি সবটাই কৃষকের। এই বেমানান বাস্তবতার মধ্যেই ধীরে ধীরে আকার নিচ্ছে গ্রামীণ অর্থনীতির গভীর সংকট। এভাবে চলতে থাকলে বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনীতি বড়োসড়ো ঝুঁকির মুখোমুখি হবে। কৃষক তার পেশা থেকে সরে যাবে এবং উৎপাদন প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হবে, যা কোনোভাবেই বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য ভালো সংকেত বহন করে না।
গ্রামীণ অর্থনীতি এক অদৃশ্য শেকলে বাঁধা, যেখানে শেকলের প্রতিটি অংশই কৃষকের ন্যায্যমূল্যহীনতার সঙ্গে জড়িত। যে দেশে অধিকাংশ মানুষের জীবন কৃষির সঙ্গে বাঁধা, সেখানে কৃষক যদি অন্ততপক্ষে দুইটা ডালভাত খেয়ে বাঁচতে না পারে তাহলে গ্রাম বাঁচবে কী উপায়ে। আর যদি গ্রাম না বাঁচে তাহলে দেশ তো ডুকরে ডুকরে মরবে। এটি শুধু কথার কথা নয়Ñ এটিই বাস্তবতা। দেশে সরকারি বিভিন্ন রিপোর্টে উল্লেখ করা হয় প্রতিনিয়ত উৎপাদন বাড়ছে, কিন্তু উৎপাদন বাড়লে উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত সবচেয়ে ঘনিষ্ঠজনের অর্থাৎ কৃষকের লাভও বাড়া উচিত। কিন্তু কৃষকের ক্ষেত্রে তা ব্যতিক্রম। ট্রাক ভরে ফসল বাজারে নিয়ে গেলেও সেই ফসলের লাভ ট্রাকচালক, পরিবেশক, আড়তদার, পাইকার সবাই পায়, কিন্তু কৃষক পায় শুধুই ক্ষতি, অমানুষিক পরিশ্রম আর ভর্ৎসনা।
কৃষক ঠকছে শুধু বাজারেই নয়, ঠকছে নীতিনির্ধারণের টেবিলেও। সঠিক সময়ে কৃষিঋণ পাচ্ছে না, পেলেও তা জটিল শর্তের অধীন। ফলে বাধ্য হয়ে এনজিওর সাপ্তাহিক কিস্তির ঋণ নিতে হয়, যা একসময় কৃষকের জীবনে অভিশাপে পরিণত হয়। ফসল বিক্রি না হতেই কিস্তি শুরু হয়, যার চাপ কৃষকের আর্থিক অবস্থা এবং মনোবল উভয়কেই আরও ধ্বংস করে দেয়। ফলে কখনও সম্পর্ক ভাঙে, কখনও কৃষকের শিশুর পড়ালেখা থেমে যায়, কখনও পরিবারের রোগাক্রান্ত সদস্য ন্যূনতম চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হয়। যদিও কৃষকের ন্যায্যমূল্যহীনতার এই প্রভাব আমরা শুধু অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখি; কিন্তু আসল ক্ষতগুলো তৈরি হয় কৃষকের ঘরের ভেতরে, তার জীবনের অন্তস্তলে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনের অস্থিরতা। বছরের পর বছর বন্যা, খরা, অকালবৃষ্টিসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ। যার ফলশ্রুতিতে ফসল অর্ধেক নষ্ট হয়, আবার বাকি অর্ধেক কম দামে বিক্রি হয়। এই দ্বিমুখী ক্ষতি কৃষককে এমন এক জায়গায় দাঁড় করিয়েছে, যেখানে কৃষি কিংবা কৃষক মানেই এক দারিদ্র্যচক্রের নাম। কৃষকের সন্তানরা এখন আর কৃষিকাজ করতে চাচ্ছে না। যারা একসময় মাঠে চাষাবাদ করত, গরু চড়াত, তারা এখন শহরের রিকশা টানে কিংবা গার্মেন্টস কারখানায় কম বেতনে কাজ নেয়। কৃষি তাদের কাছে আর ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতি নয় বরং প্রতিবন্ধকতার প্রতীক হয়ে উঠেছে। এই পরিস্থিতি শুধু কৃষি খাতে বিপর্যয় ডেকে আনছে না, এটি দেশের দীর্ঘমেয়াদি খাদ্য নিরাপত্তাকেও ভয়াবহ ঝুঁকিতে ঠেলে দিচ্ছে। গ্রামীণ অর্থনীতি এভাবে ভেঙে পড়লে শহরে চাপ বাড়বে। বস্তিতে মানুষের সংখ্যা বাড়বে, কর্মসংস্থান ক্ষেত্র সংকুচিত হবে, অপরাধ ও সামাজিক অস্থিরতা বাড়বে। মূলত কৃষির সংকট এমন একটি শেকল যা অর্থনৈতিক প্রতিটি অংশকে ধরে রেখেছে। তাই কৃষকের ন্যায্যমূল্যের অভাব মানে কেবল একটি সেক্টরের ক্ষতি নয়, এটি জাতীয় অর্থনীতির মেরুদণ্ডে আঘাত।
এই সংকটের সমাধান সহজ নয়, কিন্তু অসম্ভবও নয়। বাজারে দালালচক্র এবং মধ্যস্থতাভোগীদের দৌরাত্ম্য বন্ধ করতে হবে। সরকারিভাবে সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ফসল কেনার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। নীতিনির্ধারণে কৃষকের জন্য আলাদা ন্যায্যমূল্য নির্ধারণ কমিশন গঠন করতে হবে। গ্রামে গ্রামে আধুনিক সংরক্ষণাগার, সরাসরি বিক্রির বাজার তৈরি করতে হবে, যাতে কৃষক ফসল নষ্ট হওয়ার ভয়ে কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য না হয়। কৃষিঋণকে সহজ করতে হবে। জলবায়ু দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের জন্য আলাদা ক্ষতিপূরণ তহবিল গঠন করতে হবে। বাংলাদেশকে টেকসই করতে হলে কৃষি এবং কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার বিকল্প নেই। যে হাতে দেশের খাদ্য নিরাপত্তার ভবিষ্যৎ রচিত হয়, সেই হাতই যেন ক্ষুধার্ত না থাকে তা নিশ্চিত করা আমাদের দায়িত্ব।
প্রজ্ঞা দাস
শিক্ষার্থী, অর্থনীতি বিভাগ, ইডেন মহিলা কলেজ