ভেজাল গুড়
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ০৫ ডিসেম্বর ২০২৫ ১২:১৮ পিএম
শীতের মৌসুম মানেই নতুন গুড়ের ঘ্রাণে মৌ মৌ করা একটা সময়। তখন বাংলার ঘরে ঘরে খাদ্য-তালিকায় গুড়ের কদর বেড়ে যায়। পিঠা-পায়েস থেকে শুরু করে বিভিন্ন মিষ্টান্ন-সবেতেই অপরিহার্য উপাদানের নাম খাঁটি গুড়। গুড় যে কেবল সুস্বাদু খাবার এমনটা নয়, গুড়ের আছে নানা স্বাস্থ্যকর গুণও। কিন্তু দুঃখজনক সত্য হলো, এই মৌসুমেই বাজারে সবচেয়ে বেশি ভেজাল গুড়ের আধিক্য দেখা যায়। আর এই ব্যাপক চাহিদাকে সামনে রেখে বছরের অন্যান্য সময়ের তুলনায় এই সময়টায় অসাধু ব্যবসায়ীরা বেশি পরিমাণে ভেজাল গুড় উৎপাদন করে। যা মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর।
৪ ডিসেম্বর প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ ‘শীত মৌসুমে ভেজাল গুড়ে সয়লাব’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানা গেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফরিদপুরে একটি কারখানায় বিপুল পরিমাণ ভেজাল গুড়, গুড় তৈরির সরঞ্জাম ও উপকরণ জব্দ করেছে জেলা প্রশাসন।
জানা গেছে, জেলার শহরতলির মাচ্চর ইউনিয়নের শিবরামপুরের ছোট বটতলায় এই ভেজাল গুড়ের কারখানাটির সন্ধান মেলে। চারদিকে উঁচু টিনের প্রাচীর দিয়ে ঘেরা নোংরা ও স্যাঁতসেঁতে জায়গায় কারখানাটিতে রাত-দিন চলত ভেজাল গুড় উৎপাদন। প্রতিদিন টনকে টন ভেজাল গুড় ঢাকা, রাজশাহীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করা হতো।
গণমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন তথ্যে জানা যায়, আখের গুড় তৈরিতে ব্যবহার করা হয় সুগারমিলের পরিত্যক্ত গো-খাদ্য চিটাগুড়, চিনি, হাজার পাওয়ারের রঙ ও আটা। খেজুর গুড় তৈরিতে গাছিরা ব্যবহার করছে রসের পাশাপাশি চিনি, রঙ এবং আটা। সাধারণত অধিক লাভ ও ওজন বৃদ্ধির জন্য গুড় উৎপাদনকারীরা এসব ক্ষতিকর গো-খাদ্যসহ বিভিন্ন রাসায়নিক ব্যবহার করছে। ভেজাল গুড় তৈরির সবচেয়ে প্রচলিত পদ্ধতি হচ্ছে আখের রস বা খেজুরের রস ছাড়াই সস্তা চিনি, স্যাকারিন, ফিটকিরি, কাপড়ের রঙ, এমনকি চামড়ার ট্যানারিতে ব্যবহৃত রাসায়নিক মিশিয়ে গুড়ের মতো আকার দেওয়া, যা দেখতে চকচকে ও গাঢ় রঙের হলেও প্রকৃত কোনো পুষ্টিগুণ নেই। বরং এসব রাসায়নিকে রয়েছে ক্যানসার, কিডনি-লিভার বিকল, তীব্র অ্যালার্জি, হজমে সমস্যা ও শিশুদের অতিরিক্ত স্বাস্থ্যঝুঁকির মতো ভয়াবহ বিপদ। বিশেষজ্ঞদের মতে, রাসায়নিক রঙ ও স্যাকারিনযুক্ত গুড় দীর্ঘমেয়াদে যকৃৎকে দুর্বল করে এবং পেটের আলসার ও গ্যাস্ট্রিকের ঝুঁকি বাড়ায়। আর সাধারণ মানুষ শুধু রঙ-চকচকে দেখে গুড় কিনে প্রতিদিন অজান্তেই বিষ খাচ্ছে। এই চিত্র কেবল ফরিদপুরেরই নয়, যশোর, রাজশাহী, নাটোরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে রয়েছে এমন অসংখ্য কারখানা। দীর্ঘদিন ধরে একাধিক চক্র এ ভেজাল গুড় তৈরি করে এলেও রহস্যজনক কারণে অপরাধীরা থাকে ধরাছোঁয়ার বাইরে। যদিও শীতকালে বাড়তি নজরদারি থাকার কথা, কিন্তু বাস্তবে সেই নজরদারি খুবই সামান্য।
বাজারের চিত্র আরও হতাশাজনক। খাদ্য অধিদপ্তর, বিএসটিআই বা স্থানীয় প্রশাসনের অভিযানের অভাব কাজে লাগিয়ে এসব কারখানার আধা-মান্দায় রান্না করা গুড় ও রাসায়নিক মিশ্রিত ‘ইটের মতো’ শক্ত গুড় সহজেই ঢুকে যায় শহরের বাজারে। পাইকারি বাজারে চাহিদা বেশি হওয়ায় ব্যবসায়ীরা মান যাচাই না করেই এসব নিয়ে আসছেন। খাঁটি গুড়ের দাম তুলনামূলক বেশি হওয়ায় অনেক ভোক্তা সস্তা দামের দিকে ঝুঁকে আরও বড় প্রতারণার শিকার হচ্ছেন।
আমরা মনে করি, এই অবস্থায় মৌসুমি ভেজালবিরোধী অভিযান জোরদার করা জরুরি। জেলা-উপজেলা প্রশাসন, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ও বিএসটিআইকে সমন্বিত উদ্যোগে খেজুর ও আখের গুড়ের উৎপাদন কেন্দ্রগুলোতে নিয়মিত অভিযান চালাতে হবে। খাঁটি গুড় উৎপাদকদের নিবন্ধন ও মান নির্ধারণ করে বাজারে ‘সার্টিফায়েড’ লেবেল দেওয়ার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এতে ভোক্তা বুঝতে পারবে কোনটি নিরাপদ। ভেজালকারীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন। আমরা বিশ্বাস করি, কয়েকটি বড় অভিযানে কঠোর দণ্ড হলে বাজারে অভিযানের সুফল দৃশ্যমান হবে।
এই ক্ষেত্রে ভোক্তাদের আরও সচেতন হতে হবে। খুব চকচকে, অতিরিক্ত লাল বা কালচে গুড় এড়ানো উচিত। খাঁটি গুড় সাধারণত তুলনামূলক কম রঙিন, স্বাদে স্বাভাবিক এবং পানিতে দিলে সহজে গলে না। পাশাপাশি বিশ্বস্ত উৎপাদক ও স্থানীয় খামারিদের কাছ থেকে গুড় কেনার প্রবণতা বাড়ালে বাজারে ভেজালের চাপ কমবে। আমরা মনে করি, বাঙালির শীতের ঐতিহ্যকে রক্ষা করতে হলে এখনই লাগাম টানা দরকার। ভেজাল গুড়ের সয়লাব শুধু খাদ্য প্রতারণা নয়, এটি জনস্বাস্থ্যের জন্য নীরব এক ঘাতক। প্রশাসনের কঠোর নজরদারি, উৎপাদকের নৈতিকতা এবং ভোক্তার সচেতনতাই পারে এই ভেজালের হাত থেকে মানুষকে রক্ষা করতে।