ব্যাংকের এমডি পদ
নিরঞ্জন রায়
প্রকাশ : ০৫ ডিসেম্বর ২০২৫ ১২:১৬ পিএম
আমি যখন বাংলাদেশে একটি বাণিজ্যিক ব্যাংকে কর্মরত ছিলাম, তখন একজন নির্বাহী কর্মকর্তার অধীনে দায়িত্ব পালনের সুযোগ হয়েছিল। সেই উচ্চপদস্থ নির্বাহী সারা দিনে মাত্র দুটো স্বাক্ষর করতেন। যেসব চিঠি গ্রাহকদের কাছ থেকে আসত, সেগুলো নিয়ে কোন কর্মকর্তা দায়িত্ব পালন করবে, তার নাম লিখে নিজের স্বাক্ষর করে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার কাছে পাঠিয়ে দিতেন। আমরা সারাদিন ফাইল ঘাঁটাঘাঁটি করে চিঠির একটি উত্তর তৈরি করে তার নাম-পদবিসহ তার কাছে নিয়ে গেলে তিনি তখন সেই চিঠিতে স্বাক্ষর করে পাঠিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করতেন। সাধারণত কোনো চিঠি একজন কর্মকর্তার কাছে পাঠাতে হলে, সংক্ষেপে লিখে দিতে হয় কি করতে হবে। আর এরকম কিছু লিখতে হলে সেই চিঠি ভালোভাবে পড়তে এবং সংশ্লিষ্ট ফাইল সম্পর্কে ন্যূনতম ধারণা থাকতে হয়। কিন্তু সেই সুযোগ ও সময় তার ছিল না। ফলে অধিকাংশ ক্ষেত্রে তিনি যা লিখতেন তা চিঠির বক্তব্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতো না। একদিন আমি ওনাকে বললাম যে এরকম মন্তব্য লিখলে তো আমাদের কাজ করতে অসুবিধা হয় এবং অডিট প্রশ্ন তুলতে পারে। তখন তিনি আমাকে বললেন, তাহলে তিনি কী লিখবেন। আমি বললাম, ‘স্যার, আপনি কিছু না লিখে শুধু আমাদের নাম লিখে দিলেই চলবে। আমরা নিজেরাই বুঝে নিব যে কি করতে হবে’। এরপর থেকে তিনি প্রাপ্ত চিঠির ওপর কিছু না লিখে শুধু আমাদের নাম লিখে দিতে শুরু করলেন এবং মাঝেমধ্যে ‘আলোচনা করুন’ লিখে স্বাক্ষর করতেন। মূলত, সেই নির্বাহী কর্মকর্তার দীর্ঘদিন ব্যাংকে কাজ করার অভিজ্ঞতা থাকলেও, ঋণ বিভাগে কাজ করার অভিজ্ঞতা ছিল না বললেই চলে। অথচ তিনি নির্বাহী কর্মকর্তার দায়িত্ব পেয়েছিলেন ব্যাংকের ঋণ আদায় বিভাগে। ফলে যা হওয়ার তাই হয়েছে।
প্রায় দুই যুগ আগের নিজের অভিজ্ঞতার কথা মনে পড়ে গেল, যখন দেখলাম যে বাংলাদেশ ব্যাংক দেশের ব্যাংকগুলোতে ব্যাংকিং পেশার বাইর থেকে এমডি নিয়োগের নির্দেশনা জারি করেছে। লেখার শুরুতে আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার উল্লেখ করে আমি মোটেই বোঝানোর চেষ্টা করছি না যে বাংলাদেশ ব্যাংকসহ নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্বাহীরা ব্যাংকের এমডি পদে নিয়োগ পেলে এমনটা করবেন। তবে বাস্তবতা হচ্ছে, শুধু নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্বাহী কেন, অন্য যে কেউ দায়িত্ব পালনে এরকম অস্বস্তিকর অবস্থার সম্মুখীন হবেন, যদি না তার সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে হাতে-কলমে কাজের বিস্তর অভিজ্ঞতা থাকে।
সম্প্রতি, বাংলাদেশ ব্যাংক দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকে এমডি বা প্রধান নির্বাহী পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে এক নির্দেশনা জারি করেছে। ব্যাংকের এমডি পদে নিয়োগ-সংক্রান্ত যেসব সার্কুলার ইতঃপূর্বে বাংলাদেশ ব্যাংক জারি করেছে তার সঙ্গে এবারের নির্দেশনার পার্থক্য হচ্ছে যে, এখন থেকে বাংলাদেশ ব্যাংক, বিএসইসি (বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন) বা অন্যান্য নিয়ন্ত্রক সংস্থায়, যেমনÑ ইন্সিউরেন্স উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রক সংস্থায় (ইনস্যুরেন্স ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড রেগুলেটরি অথোরিটি) দায়িত্ব পালন করা নির্বাহী কর্মকর্তারাও বাণিজ্যিক ব্যাংকের এমডি পদে নিয়োগের জন্য বিবেচিত হবেন। এমনকি এই পদে দায়িত্ব পালন করে যারা অবসরে গেছেন, তারাও ব্যাংকের এমডি পদের জন্য যোগ্য হবেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনাটি দেশের ব্যাংকিং খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের মাঝে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। বাণিজ্যিক ব্যাংকে যারা কর্মরত আছেন তাদের অধিকাংশই হতাশ এবং অসন্তুষ্ট হয়েছেন। কেননা তাদের ব্যাংকিং পেশার শীর্ষ পদে পৌঁছার পথটা আপাতদৃষ্টিতে বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
পক্ষান্তরে যারা দেশের ব্যাংকিং খাত, পুঁজিবাজার এবং ইনস্যুরেন্স খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্বাহী পদে দায়িত্ব পালন করেছেন, তারা বেজায় খুশি। কেননা তারা আরও কয়েক বছর উচ্চপদে দায়িত্ব পালন করে ভালো অঙ্কের অর্থ উপার্জনের সুযোগ পাবেন। ব্যক্তিগতভাবে আমার কাছেও সিদ্ধান্তটি এক মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে। একদিকে দেশের ব্যাংকিং খাতের যে শোচনীয় অবস্থা, সেখানে ব্যাংকিং পেশার বাইর থেকে এমডি নিয়োগের মতো অবস্থা এখনও তৈরি হয়নি। অন্যদিকে, বিগত দুই দশক ধরে অনেক অযোগ্য ব্যাংকার তোষামোদ করে যেভাবে অনেক ব্যাংকের এমডি পদে নিয়োগ পেয়েছেন, সেই বিবেচনায় সিদ্ধান্তটি ভালোই হয়েছে।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকের এমডি পদে নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্বাহীদের নিয়োগদান কতটা যৌক্তিক এবং বাস্তবসম্মত। এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে আমাদের তিনটি বিষয় বিবেচনায় নিতে হবেÑ যার মধ্যে আছে আইনগত ভিত্তি, বাস্তব অবস্থা এবং স্বার্থের দ্বন্দ্ব বা কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট। আইনগত দিকটি দেখলে বাণিজ্যিক ব্যাংকে এমডি পদে নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্বাহীদের নিয়োগদানের ক্ষেত্রে কোনো সমস্যা নেই। কেননা যেসব আইন মেনে একটি ব্যাংক প্রতিষ্ঠিত হয়, সেখানে এমডি নিয়োগের ক্ষেত্রে এমন কিছু নেই, যার ফলে নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্বাহীদের এমডি পদে নিয়োগ দেওয়া যাবে না। তা ছাড়া আমাদের দেশের ব্যাংকে এমডি নিয়োগের বিষয়টি বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে জারিকৃত সারকুলার বা নির্দেশনা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়ে থাকে। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকেই যেহেতু এরকম নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, তাই এ ব্যাপারে আইনগত প্রতিবন্ধকতা একেবারেই নেই।
শুধু আইনগত ভিত্তি থাকলেই কোনোকিছু বাস্তবায়ন করা যায় না, যদি বাস্তব অবস্থা পক্ষে না থাকে। আমাদের দেশের ব্যাংকিং খাতের যে শোচনীয় অবস্থা, তাতে একজন দক্ষ এবং অভিজ্ঞ ব্যাংকারও যদি একটি ব্যাংকে এমডি নিয়োগ পান, তাকেও পরিস্থিতি সামাল দিতে যথেষ্ট বেগ পেতে হবে। এরকম অবস্থায় একজন নন-ব্যাংকার যদি এমডি হন, তাহলে তিনি কীভাবে দায়িত্ব পালন করবেন, তা কল্পনা করাও কঠিন। শুধু তাই নয়, আমাদের দেশে ব্যাংকিং খাতের প্রধান এবং অন্যতম সমস্যা হচ্ছে খেলাপি ঋণ এবং ঋণঝুঁকি ব্যবস্থাপনা। ব্যাংকিং খাতের এই দুটো বিষয় এতটাই বাস্তবধর্মী যে ঋণঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং ঋণ আদায়ে বিস্তর অভিজ্ঞতা না থাকলে এখানে সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করা সম্ভব নয়।
বিষয়টা ডাক্তার, প্রকৌশলী বা আইন পেশার মতো। অনেকে এসব বিষয়ে পাণ্ডিত্য অর্জন করতে পারেন, ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করতে পারেন, কয়েকটি বই লিখতে পারেন এবং এমনকি শ্রেণিকক্ষে পাঠদান করে শত শত পেশাদার ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার এবং আইনজীবী তৈরি করতে পারেন। কিন্তু তাদের কেউই একজন অসুস্থ লোকের চিকিৎসা, একটি যন্ত্র নির্মাণ বা আদালতে একটি মামলা পরিচালনা করতে পারবেন না। ব্যাংকিং কার্যক্রমও এরকম। যে ব্যক্তি কোনোদিন ঋণ বিতরণের কাজ করেননি, তিনি যত বড় পণ্ডিতই হোন না কেন, ঋণের ব্যাপারে সঠিক সিদ্ধান্ত দিতে পারবেন না। এরকম অবস্থায় কেউ যদি একটি ব্যাংকের এমডি পদে বসেন, তখন তিনি প্রতিটা সিদ্ধান্তের জন্য অধস্তনদের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকবেন। এ কারণেই আমাদের দেশের ব্যাংকের এমডি নিয়োগের প্রধানতম শর্ত থাকা উচিত কমপক্ষে পনেরো বছর বাণিজ্যিক ব্যাংকে ঋণঝুঁকি ব্যবস্থাপনা বিভাগে সফল দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা এবং খেলাপি ঋণ আদায়ের ভালো ট্র্যাক রেকর্ড। সুতরাং বাস্তব অবস্থা বিবেচনায় নিলে বাংলাদেশ ব্যাংকের এরকম সিদ্ধান্ত মোটেই বাস্তবসম্মত হয়নি।
আমাদের দেশের ব্যাংকিং খাতে ন্যূনতম সুশাসন নিশ্চিত হয়নি এবং এখানে স্বার্থের দ্বন্দ্ব একটি মারাত্মক সমস্যা। এরকম অবস্থায় নিয়ন্ত্রক সংস্থার কর্মকর্তা যদি নিয়ন্ত্রিত প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালনের সুযোগ পান, তাহলে স্বার্থের দ্বন্দ্ব মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হতে বাধ্য। যদি বাংলাদেশ ব্যাংক বা বিএসইসি থেকে সদ্য অবসরে যাওয়া কোনো নির্বাহী পরিচালক একটি ব্যাংকের এমডি পদে নিয়োগ পান, তখন যারা বাংলাদেশ ব্যাংক বা বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক থাকবেন, তারা সবাই সেই ব্যাংকের এমডির জুনিয়র কর্মকর্তা হবেন। এসব কর্মকর্তা তখন সেই ব্যাংকের এমডিকে পূর্বের পদবি অনুসরণ করে স্যার বলতে বলতে মুখে ফেনা তুলে ফেলবেন। এরকম অবস্থায় বাংলাদেশ ব্যাংক বা বিএসইসির নতুন নির্বাহীরা সেই ব্যাংককে অনেক কিছু মেনে চলতে বাধ্য করতে সমস্যার সম্মুখীন হবেন। এমনকি কোনোরকম অন্যায়ের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিতেও দ্বিধান্বিত হয়ে পড়বেন। সবচেয়ে বড় সমস্যা দেখা দিবে যখন কোনো বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক বা বিএসইসি খুব সহজে ম্যানেজ হয়ে যাবে। নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে ম্যানেজ করার উদ্দেশ্যেই দেশের অনেক বৃহৎ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান অবসরপ্রাপ্ত সরকারি আমলাদের উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দিতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। এখন বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনার কারণে দেশের ব্যাংকিং খাতে এই ম্যানেজ করার ভালো সুযোগ সৃষ্টি হয়ে গেল। ব্যাংকের মালিক পক্ষ নিশ্চয়ই বাংলাদেশ ব্যাংকের এমন নির্দেশনায় বেশ খুশি হবেন। কেননা তারা এই সুযোগ খুব সুন্দরভাবে কাজে লাগাতে পারবেন। যেসব ব্যাংক সমস্যায় আছে তাদের মালিক পক্ষ সহসাই বাংলাদেশ ব্যাংক এবং বিএসইসির অবসরপ্রাপ্ত নির্বাহী পরিচালকদের ব্যাংকের এমডি পদে নিয়োগ দিতে শুরু করবে।
সবদিক বিবেচনা করলে আমাদের দেশের ব্যাংকিং খাতে নন-ব্যাংকার বা নিয়ন্ত্রক সংস্থার কর্মকর্তাদের এমডি হিসেবে নিয়োগ দানের সময় এখনও আসেনি। ভবিষ্যতে যদি ব্যাংকিং খাতের মান সেই মাত্রায় উন্নীত হয়, বিশেষ করে আমেরিকা, কানাডাসহ উন্নত বিশ্বের মতো অবস্থায় যায়, তখন হয়তো সিদ্ধান্তটি বিবেচনা করা যেতে পারে। উল্লেখ্য, আমেরিকা-কানাডার মতো উন্নত ব্যাংকিং ব্যবস্থায়ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্বাহীদের বাণিজ্যিক ব্যাংকের প্রধান নির্বাহী হিসেবে নিয়োগ দানের নজির খুব একটা নেই। বরং বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বা সরকারি প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ পাওয়ার নজির যথেষ্টই আছে। তাই বর্তমান প্রেক্ষাপটে দেশের ব্যাংকিং খাত যে অবস্থায় আছে, সেখানে বাংলাদেশ ব্যাংক বা বিএসইসির অবসরপ্রাপ্ত নির্বাহীদের ব্যাংকের এমডি হিসেবে নিয়োগ দিলে দেশের ব্যাংকিং খাতের খুব একটা যে লাভ হবে না, তা মোটামুটি নিশ্চিত করেই বলা যায়। উল্টো আরও অনেক ক্ষতি হয়ে যেতে পারে। তাই বাংলাদেশ ব্যাংকের উচিত সিদ্ধান্তটি পুনর্বিবেচনা করা এবং প্রয়োজনে সংশোধন করে নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্বাহীদের এমডির পরিবর্তে, ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের পরিচালক হওয়ার সুযোগ করে দিলে কিছুটা ভালো ফল পাওয়া যেতে পারে।
নিরঞ্জন রায়
সার্টিফাইড অ্যান্টি-মানি লন্ডারিং স্পেশালিস্ট ও ব্যাংকার, টরন্টো, কানাডা