পর্যবেক্ষণ
রোকেয়া ইসলাম
প্রকাশ : ০৪ ডিসেম্বর ২০২৫ ১২:০৮ পিএম
অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসা এগুলো মানুষের মৌলিক চাহিদা। বেঁচে থাকার জন্য এগুলো অপরিহার্য। এই চাহিদাগুলো পূরণ না হলে মানুষের পক্ষে বেঁচে থাকা অসম্ভব। সেইসঙ্গে স্বাভাবিক জীবনযাপনও সম্ভব হয় না। মৌলিক এই চাহিদাগুলোর পূরণের পেছনে লুকিয়ে আছে একটি মৌলিক শক্তিÑ কর্ম। কর্মই মানুষকে আত্মনির্ভর করে তোলে, আর ভিক্ষা সেই শক্তিকে নিঃশেষ করে দেয়। ‘ভিক্ষা নয়, কর্ম হোক হাতিয়ার’Ñ এই আহ্বান শুধু একটি স্লোগান নয়; এটি এক জাতির আত্মমর্যাদা, আত্মনির্ভরতা ও উন্নয়নের অঙ্গীকার। ভিক্ষাবৃত্তি সমাজে একটি অসম্মানজনক কাজ হিসেবেও চিহ্নিত। ভিক্ষা মানে শুধুই অর্থ বা দ্রব্য চাওয়া নয়Ñ এটি এক মানসিক পরাজয়ের প্রতীক। সমাজবিজ্ঞানীরা বলেন, যখন কোনো মানুষ বা সমাজ কর্মের ওপর নয় বরং ভিক্ষায় নির্ভরশীল হয়, তখন তারা নিজেদের ভবিষ্যৎ অন্যের দয়ার ওপর ছেড়ে দেয়।
বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার বহু অঞ্চলে দারিদ্র্য, বেকারত্ব, প্রাকৃতিক দুর্যোগ কিংবা সামাজিক বৈষম্যের কারণে মানুষ বাধ্য হয়ে ভিক্ষার আশ্রয় নেয়। কিন্তু এই ‘বাধ্যতা’ ধীরে ধীরে অভ্যাসে পরিণত হয়Ñ যেখানে মানুষ নিজেকে উৎপাদনের অংশ নয় বরং ভোগের প্রার্থী হিসেবে দেখতে শেখে। সাধারণত দারিদ্র্য, নদীভাঙন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, প্রতিবন্ধিতা, কিছু দুষ্টচক্রের অর্থ লালসা, ভিক্ষাবৃত্তিতে অর্থোপার্জনে সহজলভ্যতা ইত্যাদি কারণে দেশের বড় শহরগুলোতে ভিক্ষুকের সংখ্যা বেড়ে গেছে। শহরাঞ্চলের প্রধান প্রধান সড়ক, ফুটপাত, ট্রাফিক সিগন্যাল, সুপার মার্কেট, পার্ক, সরকারি অফিস, মসজিদ ও মাজারের সামনে জনাকীর্ণ স্থানে বিভিন্ন বয়সি পুরুষ ও মহিলাদের ভিক্ষাবৃত্তিতে নিয়োজিত থাকতে দেখা যায়। এদের মধ্যে একটা বড় সংখ্যা প্রতিবন্ধী, বয়স্ক এবং শিশু।
ভিক্ষাবৃত্তি বন্ধে প্রশাসনিক, সামাজিক এবং ব্যক্তিগত পর্যায়ে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। এর মধ্যে রয়েছে ভিক্ষুকদের চিহ্নিত করে পুনর্বাসন কর্মসূচি, যেমন কর্মসংস্থান প্রশিক্ষণ, আশ্রয় এবং ক্ষুদ্র শিল্পে বিনিয়োগ করানো। একই সঙ্গে, কঠোর আইন প্রয়োগ এবং সচেতনতা বৃদ্ধি করাও প্রয়োজন। ব্যক্তিগত পর্যায়ে, সরাসরি টাকা না দিয়ে খাদ্য বা প্রয়োজনীয় জিনিস দেওয়া এবং সমস্যাটি স্থানীয় প্রশাসন বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো যেতে পারে। আমার জানা মতে, সমাজসেবা অধিদপ্তরের আওতায় পরিচালিত বিভিন্ন কার্যক্রমের মধ্যে ‘ভিক্ষুক পুনর্বাসন ও বিকল্প কর্মসংস্থান’ রাজস্ব বাজেটে পরিচালিত একটি অন্যতম কর্মসূচি। ভিক্ষুকদের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে পুনর্বাসন এবং পর্যায়ক্রমে ভিক্ষাবৃত্তি নিরসন লক্ষ্য নির্ধারণ করে ২০১০ সালে প্রাথমিক ধারণাপত্র প্রণয়ন করা হয়। ধারণাপত্রের আলোকে কর্মসূচি বাস্তবায়ন নীতিমালা তৈরি করা হয়। এর অগ্রগতি অনুসরণ করে সামনের দিকে এগোতে হবে।
বাংলাদেশের সমাজকল্যাণ অধিদপ্তরের ২০২৩ সালের এক সমীক্ষা অনুযায়ী, দেশে প্রায় ৬ লাখেরও বেশি ভিক্ষুক রয়েছে, যাদের বেশিরভাগই শহরমুখী। এই সংখ্যা কমছে না, কারণ এখন ‘পেশাদার ভিক্ষাবৃত্তি’ একটি অনানুষ্ঠানিক অর্থনৈতিক কাঠামোতে রূপ নিচ্ছে। জনসমাগমের জায়গাগুলো তারা ভিক্ষাবৃত্তির জন্য উপযুক্ত স্থান হিসেবে বেছে নেয়Ñ মার্কেট, মসজিদ, মন্দির, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতালসহ যেখানে মানুষকে ইমোশনালি ব্ল্যাকমেল করা যায়। অনেক সুস্থ, কর্মক্ষম মানুষও মানুষকে প্রতারণামূলক কর্ম করে রোজগার করে। মানবসভ্যতার শুরু থেকেই মানুষ বেঁচে থেকেছে কর্মের মাধ্যমে। কৃষক জমি চাষ করেছে, কারিগর বানিয়েছে হাতের কারুকাজ, জেলে ধরেছে মাছ, শিক্ষক দিয়েছে জ্ঞানের আলো। কর্ম কেবল অর্থ উপার্জনের উপায় নয়; এটি মানুষকে সমাজে মর্যাদা দেয়, আত্মসম্মান জোগায় এবং উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত করে। একটি রাষ্ট্র তখনই টেকসই হয়, যখন তার জনগণ কর্মনিষ্ঠ ও সৃজনশীল হয়।
আমাদের হাতে বিপুল মানবসম্পদ আছে, তা যদি দক্ষতায় ও সুযোগে পরিণত করা যায়, তবে ‘ভিক্ষা’ শব্দটি এই মাটিতে বিলীন হয়ে যাবে। বাংলাদেশ সরকারও ভিক্ষুক পুনর্বাসনের জন্য ইতোমধ্যে বিভিন্ন কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। ‘ভিক্ষা নয়, কর্মই সম্মান’ প্রকল্পের আওতায় শত শত ভিক্ষুককে ছোট ব্যবসার জন্য প্রশিক্ষণ, ক্ষুদ্রঋণ ও দোকান স্থাপনের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। সমাজসেবা অধিদপ্তর ‘ভিক্ষুকমুক্ত জেলা’ কর্মসূচির আওতায় কুড়িগ্রাম, গাজীপুর, পঞ্চগড়সহ বেশ কয়েকটি জেলায় পুনর্বাসন কার্যক্রম চালু করেছে। অনেক এনজিও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে মাইক্রোক্রেডিট ও দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ দিয়ে কর্মমুখী করছে। তবুও বাস্তবে দেখা যায়, পুনর্বাসিত অনেক মানুষ আবারও ভিক্ষায় ফিরে যায়Ñ মূলত দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষণ, বাজারে স্থায়ী সহায়তা ও মানসিক পুনর্বাসনের অভাবে।
ভিক্ষাবৃত্তি সমাজে কেবল অর্থনৈতিক সমস্যা নয়, এটি একটি নৈতিক অবক্ষয়ও তৈরি করে। একদিকে, কর্মক্ষম মানুষ সহজ অর্থের লোভে ভিক্ষার পথে যায়। অন্যদিকে, সমাজে দয়ার মোড়কে দান করার প্রবণতা বেড়ে যায়, যা কখনও কখনও দয়াশীলতার নামে নির্ভরতা বাড়ায় কিন্ত সত্যিকারের দারিদ্র্যমুক্ত জীবন গঠনে কাজ করে না।
ভিক্ষা সংস্কৃতি সমাজে ‘প্রয়াসহীন জীবনের’ মানসিকতা তৈরি করে। ফলে নতুন প্রজন্মের মধ্যে কর্মের প্রতি শ্রদ্ধা ও আত্মসম্মান কমে যায়। কর্মের ভিত্তি হলো শিক্ষা। কিন্তু শুধুই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নয়Ñ দক্ষতা, কারিগরি প্রশিক্ষণ ও বাস্তবজীবনের অভিজ্ঞতা মানুষকে কর্মক্ষম করে তোলে। বাংলাদেশে বর্তমানে টেকনিক্যাল ও ভোকেশনাল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রায় ২৭০০টির মতো, তবে জনসংখ্যার তুলনায় তা যথেষ্ট নয়। তরুণ প্রজন্মকে যদি হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ, উদ্যোক্তা সহায়তা ও ক্ষুদ্র উদ্যোগের সুযোগ দেওয়া যায়, তবে তারা নিজের পায়ে দাঁড়াবেÑ কারও দয়ার নয়, নিজের শ্রমের ওপর নির্ভর করবে।
সব ধর্মেই শ্রম ও কর্মকে মর্যাদাপূর্ণ বলা হয়েছে। আমাদের মনে রাখতে হবেÑ কর্ম মানে সৃষ্টির সঙ্গে সংযোগ, আর ভিক্ষা মানে বিচ্ছিন্নতা। বাংলাদেশে নারীরা এখন কর্মক্ষেত্রে এক বিশাল শক্তি। তৈরি পোশাক শিল্পে প্রায় ৮০ শতাংশ কর্মী নারী, যারা আজ দেশের বৈদেশিক মুদ্রার প্রধান উৎসে অবদান রাখছে। যেসব নারী আগে অর্থনৈতিকভাবে নির্ভরশীল ছিল, তারা আজ আত্মনির্ভরÑ এই পরিবর্তনই ‘ভিক্ষা নয়, কর্ম হোক হাতিয়ার’ ধারণার বাস্তব প্রমাণ।
আজকের ডিজিটাল যুগে কর্মের সংজ্ঞা বদলেছে। অনলাইন ফ্রিল্যান্সিং, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, ই-কমার্স, কনটেন্ট ক্রিয়েশনÑ সবই আধুনিক কর্মের রূপ রান্না করা খাবারসহ সব ধরনের ব্যবসা বাংলাদেশ এখন বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম ফ্রিল্যান্সার সরবরাহকারী দেশ, যেখানে প্রায় ৬ লাখ তরুণ অনলাইনে কর্মসংস্থানে যুক্ত। এই প্রমাণ করে, ইচ্ছা থাকলে কর্মের পথ কখনও বন্ধ থাকে নাÑ শুধু দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হয়।
ভিক্ষা নয়, কর্মকে জীবনের মূল দর্শন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে হলে স্কুল-কলেজ থেকেই শ্রমের মূল্য শেখাতে হবে। শিশুরা যেন ছোট থেকেই বুঝতে শেখেÑ কাজ করা লজ্জার নয়, বরং সম্মানের। যে সমাজে ‘পরিশ্রম’ উৎসবের মতো উদ্যাপিত হয়, নিজের অর্থনৈতিক অবস্থা মেনে জীবন যাপন করা নিজের কর্মকে পুণ্য মনে করা। সেখানে ভিক্ষা টিকে থাকতে পারে না। ভিক্ষা মানুষকে বাঁচিয়ে রাখতে পারে, কিন্তু তার আত্মাকে জীবিত রাখে না। অন্যের করুণার ওপর দাঁড়িয়ে কোনো জাতি মর্যাদাশীল হতে পারে না। একজন কৃষকের ঘাম, একজন শিল্পীর হাত, একজন শ্রমিকের শ্রমÑ এসবই জাতির প্রকৃত সম্পদ। ‘ভিক্ষা নয়, কর্ম হোক হাতিয়ার’Ñ এটি কেবল দরিদ্রের জন্য নয়; এটি প্রতিটি নাগরিকের জন্য এক আহ্বান। নিজের জীবনে, সমাজে, রাষ্ট্রেÑ যেখানে পারি, কর্মকে মর্যাদা দেই, সুযোগ সৃষ্টি করি এবং প্রত্যেকে নিজের দায়িত্বে অবদান রাখি। তবেই একদিন আমরা বলতে পারবÑ এই বাংলায় ভিক্ষার জায়গা নেই, এখানে শুধু কর্ম, আত্মমর্যাদা আর অগ্রযাত্রার জয়গান। জাতির অগ্রগতি দয়ার ওপর নয়, শ্রমের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। তাই , ভিক্ষার পথ ত্যাগ করে, কর্মকে করি জীবনের সত্য হাতিয়ার।
রোকেয়া ইসলাম
কবি ও কথাসাহিত্যিক, চেয়ারপারসন
প্রশিকা মানবিক উন্নয়ন কেন্দ্র