স্বাস্থ্য
শেলী সেনগুপ্তা
প্রকাশ : ০৪ ডিসেম্বর ২০২৫ ১২:০৪ পিএম
প্রতিদিন সকাল হয় ভালো থাকার প্রত্যাশা নিয়ে। কারণ ভালো থাকাটা মানুষের আজন্ম অধিকার। অবশ্য এ কথাও অনস্বীকার্য সে এই ভালো থাকার সঙ্গে উত্তম খাদ্যের নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। আমরা জানি, মানুষের মৌলিক অধিকারের একটি হলো খাদ্য এবং এটি পাঁচটি অধিকারের মধ্যে অন্যতম। প্রতিটি প্রাণী বেঁচে থাকার জন্য দরকার খাদ্য এবং এ খাদ্য যদি স্বাস্থ্যকর না হয়, তাহলে সমাজ পঙ্গু হয়ে যাবে। আমাদের দেশে বর্তমানে খাদ্য নিরাপত্তা অনেকটাই নিশ্চিত হয়েছে, কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি যে, শতভাগ স্বাস্থ্যকর খাবার প্রাপ্তি এখনও নিশ্চিত হয়নি। এটি বিশেষ কারও একার বা বিশেষ কোনো একটি শ্রেণির কাজ নয়। এজন্য সবাইকে একযোগে কাজ করে যেতে হবে।
বেঁচে থাকার জন্য দরকার খাবার এবং শহরের মানুষ সারা দিনের মধ্যে কখনও না কখনও বাইরের খাবারের স্বাদ গ্রহণ করতে বাধ্য হয়। এটি হয় কখনও কাজ থেকে ঘরে ফেরার সময়ের অভাবে আবার কখনও পরিবার, বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার জন্য। দুঃখের সঙ্গে বলতে হয়, এসব খাবারের মধ্যে ৯০ শতাংশই অনিরাপদ বা অস্বাস্থ্যকর।
ক্ষুধার্ত মানুষ সব সময় মুখরোচক খাদ্যের দিকে ছুটে এবং মুখরোচক খাদ্য বলতে প্রথমেই মাথায় আসে স্ট্রিট ফুডের কথা, যা রাস্তার পাশে তৈরি, বিক্রয় ও পরিবেশন করা হয়। বায়ুদূষণ, পরিবেশদূষণ ও পানিদূষণে পরিপূর্ণ পরিবেশে তৈরি করা হয় এসব দৃষ্টি লোভনীয় খাবার। হয়তো পাশেই চলছে সড়ক সংরক্ষণের কাজ, চলছে ড্রেন সংস্করণ কিংবা ভবন নির্মাণের কাজ। সেখান থেকে উদ্ভাবিত বালুকণাসহ পরিবেশ বিপর্যয়কারী সব বস্তু ও স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ বস্তু মিশ্রিত হচ্ছে এসব খাবারে। আর আনন্দের সঙ্গে সেই খাবার গ্রহণ করছে ক্ষুধার্ত পথচারী। খাবারগুলো এমনভাবে প্রস্তুত করা হয় যে দেখলেই সুস্বাদু মনে হয়, জিভে জল আসে এবং ক্রেতারাই তা আনন্দের সঙ্গে তা গ্রহণ করে থাকে।
অনেক সময় ফুটপাতের খাবার ক্ষতিকর জেনেও ভোক্তারা গ্রহণ করে থাকে। এর পেছনের কারণ একদিকে যেমন সাশ্রয়ী তেমনি ঝামেলামুক্ত ও লোভনীয়। একই সঙ্গে বলতে পারি এসব মুখরোচক কিন্তু অস্বাস্থ্যকর খাবার, তাতে পুষ্টিমান বলতে কিছুই থাকে না। ফলে আমাদের দেশের একটা বিশাল জনগোষ্ঠী অপুষ্টির শিকার হচ্ছে। এতে বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি।
তা ছাড়া আমাদের দেশের ১৮ থেকে ৬৯ বছর বয়সি ৩৭ দশমিক ২ শতাংশ মানুষ খাবারের সময় বাড়তি লবণ গ্রহণ করে থাকে এবং একই বয়সি ৩৫ শতাংশ নারী ও ২৩ শতাংশ পুরুষের ওজন অতিরিক্ত। পাশাপাশি দেখা যাচ্ছে প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে পাঁচজনে একজন ডায়াবেটিস এবং ১০ জনের মধ্যে একজন উচ্চ রক্তচাপে ভোগে। এসব ধরনের সমস্যার মূলে রয়েছে অস্বাস্থ্যকর খাদ্যগ্রহণ।
এখন বলতে হয় আমাদের ভবিষ্যৎ কান্ডারি অর্থাৎ শিশুদের কথা। আমাদের দেশে ৬২% শিশুই অস্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণ করে থাকে। এটা হয় স্কুলের টিফিন, বাড়িতে আসা অতিথির মাধ্যমে উপহার আবার কখনও অফিস বা কর্মস্থল ফেরত বড়দের আদরের প্রতীক হিসেবে আনা খাদ্যের মাধ্যমে।
দুঃখজনক হলেও সত্য, দেশের ৬ থেকে ২৩ মাস বয়সি ৬১ দশমিক ৮ শতাংশ শিশুকে অস্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়ানো হয়। অধিকাংশ শিশুই কোমলপানীয়তে আসক্ত এবং পরিবার এবং পরিবারের বাইরের মানুষ আনন্দের সঙ্গে এসব খাবার শিশুর হাতে তুলে দেয়। অন্যদিকে চিপস, চাটনি, চানাচুর ও ইনস্ট্যান্ট নুডলসে থাকা প্রচুর পরিমাণে কার্বোহাইড্রেট ও লবণ শিশুর শরীরে যুক্ত হয়। এসব খাবার শিশুর শৈশবকালীন স্থূলতার ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়। বিশেষ করে অতিরিক্ত চিনিযুক্ত খাবার দাঁত ক্ষয় করে এবং অস্বাস্থ্যকর চর্বিযুক্ত খাবার শিশুদের ওজন বাড়ায়। এসব সুস্বাদু ও অস্বাস্থ্যকর খাবারে অভ্যস্ত শিশুর শরীরে পুষ্টি সরবরাহে বাধা সৃষ্টি করে। তা ছাড়া এসব প্রিজারভেটিভ দেওয়া খাবারে পুষ্টিমান বলতে কিছুই থাকে না। যার ফলে শিশুদের একটা বড় অংশেরই মানসিক ও শারীরিক বিকাশ ভীষণভাবে বাধাগ্রস্ত হয়।
এখন সময় এসেছে শিশুর খাদ্য ব্যবস্থাপনার দিকনির্দেশনা নিয়ে আলোচনা ও তা বাস্তবায়ন করার। আমাদের দেশের অধিকাংশ স্কুলগামী শিশু অনেকটা সময় স্কুলেই কাটায়। তাদের খাবারের তালিকাটা অবশ্যই বিবেচনায় আনতে হবে। অধিকাংশ শিশুই বাসা থেকে খাবার নিয়ে আসে না, স্কুলে এসে খাবার কিনে খায়। এসব শিশুর মধ্যে ৮০ শতাংশই অস্বাস্থ্যকর খাবার খেয়ে থাকে এবং পুষ্টিহীনতায় ভোগে। এর প্রতিকার হওয়া দরকার।
আমাদের দেশের কোনো কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ক্যান্টিন আছে। এখানে প্রায় সব শিক্ষার্থীই খাবার গ্রহণ করে থাকে। এই খাবার যেন পুষ্টিকর ও স্বাস্থ্যকর করে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। এজন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ভিত্তিক খাদ্য নির্দেশনা তৈরি করা যায়। বাংলা ভাষায় তৈরি এসব নির্দেশিকা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিতরণ করতে হবে। তা ছাড়া ক্যান্টিন কী ধরনের খাবার দিচ্ছে, তাও তদারক করতে হবে।
পাঠ্যসূচিতে স্বাস্থ্যকর খাবারের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করতে হবে, এ বিষয়ে শিশুরা যেন জীবনের শুরু থেকেই জানতে ও পালন করতে পারে, সেদিকেও খেয়াল রাখতে পারে। স্কুলে এবং স্কুলের আশপাশে যেন অস্বাস্থ্যকর খাবার বিক্রি না হয়, সেজন্য নানাভাবে প্রচার ও প্রচারণার ব্যবস্থা করতে হবে। সঠিকভাবে তদারক করতে হবে।
অস্বাস্থ্যকর খাবারের লোভনীয় প্রচারণাও রোধ করতে হবে, এজন্য সবচেয়ে ভালো ভূমিকা রাখতে পারে গণমাধ্যম। আমরা জানি, শিশুর জন্মের পর থেকেই তার পুষ্টির বিষয়টি বিবেচনায় আনতে হয়। জন্মের পর থেকে ছয় মাস পর্যন্ত আবশ্যই মাতৃদুগ্ধ পানের ক্ষেত্রে যথেষ্ট সচেতনতা তৈরি করতে হবে। ছয় মাস পর থেকে শিশুকে ঘরে প্রস্তুতকৃত খাবার খাওয়াতে হবে। এক বছর পর্যন্ত শিশুকে লবণ ও চিনিযুক্ত খাবার দেওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। এ বিষয়ে বাবা-মাসহ পরিবারের সবাইকে সচেতন হতে হবে।
এরপর আসছে কিশোর-কিশোরীদের খাবারের বিষয়টি। তাদের এখন বেড়ে ওঠার সময়, তাই সঠিক পুষ্টিমানের খাবার দিতে হবে। কারণ এই খাদ্যের ওপর নির্ভর করছে কিশোর-কিশোরীদের মেধাবিকাশের বিষয়টিও। তাদের জন্য দরকার মেধাবিকাশকারী উন্নত ও পুষ্টিকর খাদ্য।
একথা ঠিক যে, মানুষের অভ্যাস ও রুচি পরিবর্তন করা খুবই কঠিন। চাইলেই মানুষ ফাস্ট ফুড গ্রহণের মানসিকতা থেকে বের হয়ে আসতে পারে না। তবে অস্বাস্থ্যকর খাবারকে ‘রিফর্মুলেশন’ করে স্বাস্থ্যকর খাবারে পরিণত করা যায়। এটি করাটা অত্যন্ত জরুরি এবং এটি এখন সময়ের চাহিদাও বলা যায়।
তা ছাড়া আইন করে খাবারে কতটুকু চিনি, লবণ ও সম্পৃক্ত চর্বি আছে, তা দৃশ্যমান করে মোড়কে উল্লেখ করতে হয়। লেখা হবে ১০০ মিলিমিটারের চেয়ে বড় যেন সহজেই চোখে পড়ে। একই সঙ্গে উৎপাদনের তারিখ ও মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখও উল্লেখ করতে হবে। বিষয়টি হতে হবে আধুনিক ও যুগোপযোগী।
দেশে শিশুদের মধ্যে অপুষ্টির হার বেশি, তাই তাদের প্রতি বেশি খেয়াল রাখতে হবে। মনে রাখতে হবে, আমাদের দেশের সব শিশুই যেন পুষ্টিকর খাবার পায়, তাও প্রস্তুত করতে হবে সুস্বাদু উপায়ে। সময় এখন বিজ্ঞাপনের, তা ছাড়া বর্তমান সময়ে সোশ্যাল মিডিয়া থেকে শুরু করে টেলিভিশনের সব মাধ্যমেই ফাস্ট ফুড ও অস্বাস্থ্যকর খাবারের বিজ্ঞাপন দেখা যায়, যা শিশু-কিশোরদের আগ্রহ বৃদ্ধি করে।
একইভাবে বিজ্ঞাপন দিয়েও পুষ্টিকর ও স্বাস্থ্যসম্মত খাবারের প্রতি শিশুদের আগ্রহ বাড়ানো যায়। ছোটবেলা থেকেই শিশুদের খাবারের পুষ্টি বিষয়ে সচেতন করা যায়। তাতে শিশু-কিশোররা পুষ্টির গুরুত্ব বুঝতে পারবে এবং নিজেরাই স্বাস্থ্য খাবার গ্রহণে আগ্রহী হয়ে উঠবে। পুষ্টি প্রশ্নে আমরা এখন প্রান্তিক পর্যায়ে পৌঁছে গেছি। তাই অস্বাস্থ্যকর খাবার বর্জন করে স্বাস্থ্যসম্মত খাবার গ্রহণে আগ্রহী করার জন্য কৃষি, স্বাস্থ্য, সামাজিক নিরাপত্তা খাতসহ বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারিতে একযোগে কাজ করতে হবে। তবেই আমাদের দেশের মানুষরা অপুষ্টির কবল থেকে মুক্ত হতে পারবে।
শেলী সেনগুপ্তা
কলাম লেখক