× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

পরিপ্রেক্ষিত

মাঠহীন পরিবেশ শিশুদের বেড়ে ওঠা

নাহিদ হাসান রবিন (গল্পকার)

প্রকাশ : ০৩ ডিসেম্বর ২০২৫ ১০:১৪ এএম

মাঠহীন পরিবেশ শিশুদের বেড়ে ওঠা

দেশে গত দুই দশকে বেড়েছে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা। বিশেষ করে, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর অধিকাংশই পরিচালিত হয় ভাড়া বাড়িতে। যেখানে শ্রেণিকক্ষেরই স্বল্পতা সেখানে খেলার মাঠের কথা তো কল্পনাই করা যায় না। অথচ শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে অপরিহার্য অনুষঙ্গ উন্মুক্ত প্রাঙ্গণ। কিন্তু নগরায়ণ ও বাণিজ্যিক স্বার্থের চাপে শিক্ষার এই মৌলিক শর্তটি আজ বিলাসিতায় পরিণত হয়েছে। আর এর খেসারত দিচ্ছে কোমলমতি শিশুরা।

মাঠবিহীন পরিবেশ কেবল শারীরিকভাবে নয়, মানসিকভাবেও শিশুদের ক্ষতিগ্রস্ত করে। প্রাকৃতিক আলো-বাতাসের স্পর্শ, মুক্ত আকাশের নিচে দৌড়ানোর সুযোগ, মাটির গন্ধ শিশুদের জন্য শুধু বিনোদন নয়Ñ শারীরিক সমন্বয়, ফুসফুসের সঠিক বিকাশ, হাড় মাংসপেশির স্বাভাবিক বৃদ্ধি এবং মানসিক সতেজতারও ভিত্তি। কিন্তু এর পরিবর্তে স্কুলে সারাদিন বদ্ধ থাকে কংক্রিটের ঘরে। দীর্ঘ সময় একইভাবে বসে থাকায় তাদের শরীরে স্থবিরতা বাড়ছে, মেরুদণ্ডের ব্যথা, শ্বাসকষ্ট, চোখের ক্লান্তি, এসব সমস্যা অল্প বয়সেই দেখা দিচ্ছে। ব্যাগের অতিরিক্ত ওজন টেনে স্কুলে যাওয়া এবং দিনের পর দিন খেলাধুলা থেকে বঞ্চিত থাকায় শিশুদের মধ্যে জন্ম নিচ্ছে ক্লান্তি, অনাগ্রহ, এমনকি আচরণগত পরিবর্তনও।

মাঠের অভাব শিশুদের আচরণ, মনোযোগ এবং সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়াকেও ব্যাহত করছে। দলগত খেলাধুলা শিশুদের মধ্যে সহযোগিতা, নেতৃত্ব, ধৈর্য, শেয়ারিং ক্ষমতা ও পরাজয়কে গ্রহণ করার মানসিক শক্তি তৈরি করে। প্রতিযোগিতার ভেতর দিয়ে শিশুরা নিজের দক্ষতা ও সীমানা সম্পর্কে সচেতন হয়। কিন্তু এসব সুযোগ-বঞ্চিত স্কুলগুলোতে শিশুরা ক্রমেই বই-কেন্দ্রিক, নিয়মের বেড়াজালে আটকে থাকা এবং ঝুঁকি নিতে ভয় পাওয়া প্রজন্মে পরিণত হয়।

মাঠ না থাকায় শিশুরা এখন মোবাইল, ট্যাব বা টিভির দিকে ঝুঁকছে। ভার্চুয়াল গেম শিশুদেরকে সাময়িক আনন্দ দিলেও দীর্ঘমেয়াদে দৃষ্টি সমস্যা, মনোযোগের ঘাটতি, আবেগ নিয়ন্ত্রণের দুর্বলতা এবং আচরণগত অসংগতি সৃষ্টি করছে। তবে এই সংকটের মাঝেও পরিবর্তনের সুযোগ আছে। এজন্য প্রয়োজন শুধু সঠিক নীতি, প্রতিশ্রুতি এবং বাস্তবভিত্তিক উদ্যোগ।

এ ক্ষেত্রে ভাড়া বাড়িতে পরিচালিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন বা নবায়নের সময় খেলার মাঠ বা বিকল্প খেলার জায়গার প্রমাণপত্র বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে। যদি নিজস্ব মাঠ না থাকে, তবে নিকটস্থ খালি জমি, কমিউনিটি সেন্টার কিংবা পৌরসভার উন্মুক্ত স্থানের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক করা যেতে পারে। শহর এলাকায় অব্যবহৃত খোলা জমি সামান্য সংস্কারেই শিশুদের খেলার উপযোগী করা সম্ভব। স্থানীয় সরকার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যৌথভাবে চাইলে এমন অনেক স্থানে সহজেই খেলাধুলার ব্যবস্থা তৈরি করা যায়।

এ ছাড়া স্কুলের পাঠ্যক্রমে শরীরচর্চা ও খেলাধুলাকে বাধ্যতামূলকভাবে পুনর্বিন্যাস করতে হবে। অভিভাবকদের ভূমিকা এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিশুকে কেবল পরীক্ষার ফলাফলের মাধ্যমে বিচার না করে তার মানসিক প্রশান্তি, শারীরিক সক্রিয়তা, সৃজনশীলতা ও দলগত দক্ষতা এসব বিষয়কে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। অভিভাবক-শিক্ষক সবাই মাঠ না থাকার সমস্যা নিয়ে আলোচনা এবং যৌথ দাবি তুললে কর্তৃপক্ষের ওপর চাপ তৈরি হবে। পাশাপাশি অভিভাবকেরা ঘরেও শিশুদের স্ক্রিন নির্ভরতা কমাতে এবং প্রাকৃতিক খেলাধুলা উৎসাহিত করতে পারেন।

নগর পরিকল্পনায় শিশুদের জন্য আলাদা খেলার ক্ষেত্র সংরক্ষণ করা অপরিহার্য। শহরের প্রতিটি ওয়ার্ডে ন্যূনতম একটি উন্মুক্ত খেলার মাঠ নিশ্চিত করা গেলে বেসরকারি স্কুলগুলোও সেই সুবিধা ব্যবহার করতে পারবে। নগরায়ণের চাপে যদি শিশুরা কংক্রিটের খাঁচায় বন্দি থাকে, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম শারীরিক ও মানসিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়বে, যা জাতির জন্য ভয়াবহ ক্ষতির কারণ হতে পারে। শিশুরা শুধু পাঠ্যবই মুখস্থ করার যন্ত্র নয়; তারা একটি জাতির ভবিষ্যতের ভিত্তি। তাদের প্রাণবন্ত, আত্মবিশ্বাসী ও সুস্থ বিকাশের জন্য খেলার মাঠের কোনো বিকল্প নেই। প্রয়োজনীয় নীতি তৈরি এবং বাস্তবে তা প্রয়োগের মাধ্যমে আগামী প্রজন্মকে শুধু শিক্ষিত নয়, পূর্ণাঙ্গ মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। শিশুদরকে মাঠ ফিরিয়ে দেওয়া মানে শুধু খেলার জায়গা দেওয়া নয়; এটি ভবিষ্যৎকে সুন্দর, সচেতন ও মানবিক করে তোলার বিনিয়োগ।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা