বেগম খালেদা জিয়া
আবু জুবায়ের
প্রকাশ : ০৩ ডিসেম্বর ২০২৫ ০৯:৩১ এএম
রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার ইট-কাঠ-পাথরের জঞ্জাল আর যান্ত্রিক কোলাহলের একপ্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা এভারকেয়ার হাসপাতালের ধবধবে সাদা বিছানায় শুয়ে আজ যিনি মৃত্যুর চোখে চোখ রেখে এক অসম যুদ্ধে লিপ্ত, তিনি কেবল একজন রক্ত-মাংসের মানুষ নন, তিনি এই বদ্বীপ রাষ্ট্রটির বিগত চার দশকের রাজনৈতিক ইতিহাসের জীবন্ত মহাকাব্য। জীবনানন্দ দাশের কবিতার সেই বিহঙ্গের মতোই, অন্ধকারের ঘনঘটা সত্ত্বেও তিনি ডানা বন্ধ করেননি, বরং জীবনের শেষ সীমান্তে দাঁড়িয়েও অস্তিত্বের লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন এক অদম্য স্পর্ধায়। হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের (আইসিইউ) কৃত্রিম আলোর নিচে, মনিটরের বিরামহীন বীপ-বীপ শব্দের মাঝে আজ জীবন ও মৃত্যুর যে দ্বৈরথ চলছে, তা কেবল একজন বেগম খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত লড়াই নয়Ñ এটি যেন বাংলাদেশের গণতন্ত্র, সংগ্রাম এবং এক আপসহীন চেতনার মূর্ত প্রতীকের টিকে থাকার এক মহাকাব্যিক উপাখ্যান।
সময় বড় নিষ্ঠুর, বড়ই নির্মম তার রথযাত্রা। যে নারীর অঙ্গুলি
হেলনে একদিন স্তব্ধ হয়ে যেত রাজপথ, যার বজ্রকণ্ঠের হুংকারে কেঁপে উঠত স্বৈরাচারের মসনদ,
আজ তিনি নিস্তব্ধ, নীরব। কিন্তু এই নীরবতা পরাজয়ের নয়, এই নীরবতা এক গভীর আগ্নেয়গিরির
সুপ্ত দহন। লিভার সিরোসিস, কিডনি জটিলতা, হৃদরোগ আর বার্ধক্যের ভারে ন্যুব্জ শরীরটি
আজ আধুনিক চিকিৎসার সব আয়োজনকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে কেবল মনের জোরে, কেবল এক অলৌকিক
আত্মশক্তিতে বলীয়ান হয়ে মৃত্যুর হিমশীতল স্পর্শকে প্রতিহত করে চলেছেন। চিকিৎসাবিজ্ঞানের
যাবতীয় সমীকরণ যেখানে হার মেনে যায়, সেখানে বেগম জিয়ার এই টিকে থাকা, এই ‘পাঞ্জা লড়া’
প্রমাণ করে তিনি সাধারণ কোনো ধাতুতে গড়া নন; তিনি ফিনিক্স পাখি, যিনি ভস্মের মাঝেও
প্রাণের স্পন্দন জিইয়ে রাখতে জানেন।
বেগম খালেদা জিয়ার জীবনকে কোনো সাধারণ রাজনৈতিক সমীকরণে
ফেলা বাতুলতা মাত্র। তিনি ইতিহাসের সেই সাকসেস হিরোইন, যার জীবনে শোক আর শক্তি, বঞ্চনা
আর বিজয় একাকার হয়ে আছে। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের রক্তাক্ত বিদায়ের পর এক সলজ্জ
গৃহবধূ থেকে তিনি যেভাবে রাজপথের লড়াকু সৈনিকে রূপান্তরিত হয়েছিলেন, তা ছিল এক বিস্ময়কর
মেটামরফোসিস বা রূপান্তর। আশির দশকে স্বৈরাচারের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে, টিয়ারশেলের
ধোঁয়া আর বুলেটের বৃষ্টির মধ্যে দাঁড়িয়ে তিনি যে ‘আপসহীন’ ভাবমূর্তি গড়ে তুলেছিলেন,
তা কোনো দলীয় প্রপাগান্ডা ছিল না; তা ছিল এক জ্বলন্ত সত্য। ক্যান্টনমেন্টের নিভৃত ছায়াবীথি
থেকে বেরিয়ে তিনি মিশে গিয়েছিলেন ধুলো-কাদা মাখা জনতার স্রোতে। সেই দিনগুলোর কথা আজ
যখন হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে তার অবচেতন মনে ভেসে ওঠে, তখন কি তিনি শিহরিত হন?
আজ তিনি এভারকেয়ারের চার দেয়ালের মাঝে বন্দি, কিন্তু
তার আত্মা পরিভ্রমণ করছে টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়ার প্রতিটি ধূলিকণায়। তার শারীরিক অবস্থা
সংকটাপন্ন, চিকিৎসকরা উদ্বিগ্ন, দলীয় নেতাকর্মীরা অশ্রুসজল চোখে প্রার্থনারত কিন্তু
এই দৃশ্যপটের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক গভীর বিষাদগাথা। একটি স্বাধীন দেশের তিনবারের প্রধানমন্ত্রী,
যিনি সংসদীয় গণতন্ত্রের পুনঃপ্রবর্তক, তাকে কিছুদিন আগেও সুচিকিৎসার জন্য, বেঁচে থাকার
ন্যূনতম অধিকারটুকুর জন্য আদালতের বারান্দায় আর আমলাতান্ত্রিক জটিলতার ফাইলে ফাইলে
ঘুরপাক খেতে হয়েছে। এই যে রাষ্ট্রীয় অকৃতজ্ঞতা, এই যে রাজনৈতিক জিঘাংসার এক চরম বহিঃপ্রকাশ
তা ইতিহাস কোনোদিন ক্ষমা করবে না। পৃথিবীর কোনো সভ্য সমাজে একজন অসুস্থ সাবেক রাষ্ট্রনায়কের
প্রতি এমন আচরণ কল্পনাতীত। তবুও তিনি কোনো অভিযোগ করেননি, কারও কাছে করজোড়ে প্রাণভিক্ষা
চাননি। তার এই ঋজুতা, এই মেরুদণ্ড সোজা রাখা ভঙ্গিই তাকে সমসাময়িক সকল নেতার চেয়ে যোজন
যোজন উঁচুতে স্থান দিয়েছে।
শারীরিক যন্ত্রণা তাকে কুঁকড়ে দিয়েছে, কিন্তু মানসিক
দৃঢ়তায় তিনি আজও হিমালয়সম। ভেবে দেখুন সেই মুহূর্তটির কথা, যখন তিনি কারান্তরীণ ছিলেন
নাজিমউদ্দিন রোডের সেই পরিত্যক্ত কারাগারে। স্যাঁতসেঁতে দেয়াল, নির্জন প্রকোষ্ঠ আর
অসুস্থতা সব মিলিয়ে তাকে মানসিকভাবে ভেঙে ফেলার এক নীল নকশা ছিল প্রস্তুত। কিন্তু তিনি
ভাঙেননি। এরপর যখন প্রিয়পুত্র কোকোর নিথর দেহ তার সামনে এলো, তখনও তিনি পাথরচাপা কষ্টে
নিজেকে সংবরণ করেছেন। আজ যখন তিনি মৃত্যুর দুয়ারে দাঁড়িয়ে, তখন তার বড় ছেলে তারেক রহমান
হাজার মাইল দূরে নির্বাসিত, ছোট ছেলে কবরে শায়িত, আর স্বামী ইতিহাসের স্মৃতিমাত্র।
একাকিত্বের এই চরম শিখরে দাঁড়িয়েও তিনি যে লড়াইটা করছেন, তা কেবল বেঁচে থাকার লড়াই
নয়, তা হলো নিজের আদর্শ আর দেশের সম্মানের সঙ্গে আপস না করার লড়াই।
এভারকেয়ার হাসপাতালের সিসিইউ-তে আজ যে মহীয়সী নারী জীবন-মৃত্যুর
সন্ধিক্ষণে, তিনি বাংলাদেশের এক বিশাল জনগোষ্ঠীর কাছে কেবল নেত্রী নন, ‘মা’ হিসেবে
পূজনীয়। গ্রামবাংলার সাধারণ মানুষ, যারা রাজনীতির জটিল তত্ত্ব বোঝে না, তারা মনে করে
খালেদা জিয়া মানেই এক নিরাপদ আশ্রয়, এক সাহসের নাম। তার শরীরে আজ বহু ব্যাধি বাসা বেঁধেছে,
চিকিৎসকরা বলছেন, অবস্থা ‘ক্রিটিক্যাল’, যেকোনো মুহূর্তে ঘটতে পারে অঘটন। কিন্তু লাখো-কোটি
মানুষের দোয়া আর ভালোবাসা যেন এক অদৃশ্য বর্ম হয়ে তাকে ঘিরে রেখেছে। বিজ্ঞান যেখানে
হাল ছাড়ে, বিশ্বাস সেখান থেকেই শুরু হয়। মানুষের ভালোবাসার যে শক্তি, তা কি কোনো মেডিকেল
বোর্ড পরিমাপ করতে পারে?
বেগম জিয়ার এই অসুস্থতা এবং মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়া
আমাদের রাজনৈতিক দেউলিয়াত্বের দিকেও আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে। রাজনীতি যখন মানবিকতা
বর্জিত হয়, তখন তা আর রাজনীতি থাকে না, তা হয়ে ওঠে পিশাচের উল্লাস। একজন প্রবীণ নাগরিক,
যিনি এই দেশের মাটির সঙ্গে মিশে আছেন, তাকে বিদেশে উন্নত চিকিৎসার সুযোগ না দেওয়াটা
কেবল আইনের দোহাই নয়, বরং এক ধরনের নিষ্ঠুরতা ছিল শেখ হাসিনার ফ্যাসিস্ট আমলে। কিন্তু
এই নিষ্ঠুরতাই পরোক্ষভাবে বেগম জিয়াকে আরও মহিমান্বিত করেছে। তিনি প্রমাণ করেছেন, ক্ষমতার
মসনদ ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু ত্যাগের মহিমা চিরস্থায়ী। তিনি যদি আজ কোনো আপস করতেন, হয়তো
তিনি মুক্ত বাতাসে, বিদেশের কোনো উন্নত হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে পারতেনÑ তাহলে শারীরিক
পরিস্থিতি এত খারাপ হতো না। কিন্তু তিনি বেছে নিয়েছেন কষ্টের পথ, কণ্টকাকীর্ণ পথ। এই
জেদ, এই অনমনীয়তাÑ এটাই তো জাতীয়তাবাদী রাজনীতির মূল নির্যাস।
মৃত্যু অবধারিত, নশ্বর এই পৃথিবীতে কেউ চিরস্থায়ী নয়।
কিন্তু কিছু মৃত্যু, কিছু বিদায়, কিছু লড়াই ইতিহাসকে থমকে দেয়। বেগম খালেদা জিয়া আজ
সেই মাহেন্দ্রক্ষণে দাঁড়িয়ে। তার ফুসফুসে বাতাস কম ঢুকছে হয়তো, লিভার হয়তো ঠিকমতো কাজ
করছে না, কিন্তু তার অস্তিত্বের প্রতিটি কোষজুড়ে রয়েছে বাংলাদেশ। তিনি আজ কথা বলতে
পারছেন না, কিন্তু তার নীরবতা আজ হাজারো স্লোগানের চেয়েও শক্তিশালী। এই নীরবতা শাসকগোষ্ঠীর
হৃদপিণ্ডে কম্পন ধরায়, এই নীরবতা বিবেকবান মানুষের ঘুম কেড়ে নেয়। তিনি এভারকেয়ারের
বিছানায় শুয়ে আছেন বটে, কিন্তু তার ছায়া দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয়ে গ্রাস করছে বাংলাদেশের
রাজনৈতিক আকাশ।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছিলেন, ‘মানুষের মৃত্যু হলে তবুও
মানব থেকে যায়’। বেগম খালেদা জিয়ার যদি আজ কোনো অঘটন ঘটেও, তবুও তিনি ‘থেকে’ যাবেন।
তিনি থেকে যাবেন স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের মশাল হয়ে, তিনি থেকে যাবেন গণতন্ত্রের মানসকন্যা
হয়ে, তিনি থেকে যাবেন আপসহীনতার প্রতীক হয়ে। তার এই জীবনসায়াহ্নে দাঁড়িয়ে আজ আমরা প্রত্যক্ষ
করছি এক মহীয়সী নারীর অন্তিম সংগ্রাম। এ সংগ্রাম বড় একার, বড় নিঃসঙ্গতার। কিন্তু এই
নিঃসঙ্গতাই তার শক্তি। তিনি একা নন, তার সঙ্গে আছে ইতিহাসের অমোঘ বিশ্লেষণ।
এভারকেয়ার হাসপাতালের ওই কেবিনটি আজ বাংলাদেশের রাজনীতির
তীর্থস্থান। ওখানে শুয়ে আছেন এমন একজন, যিনি পরাজয় মানতে শেখেননি। যমদূত হয়তো দুয়ারে
কড়া নাড়ছে, কিন্তু বেগম জিয়ার জীবনীশক্তি সেই কড়া নাড়াকে উপেক্ষা করে বলছে ‘আমি আছি,
আমি থাকব’। তার এই ‘থাকা’টা জরুরি। বড় বেশি জরুরি। কারণ, তিনি কেবল একটি দলের নন, তিনি
এই রাষ্ট্রের ভারসাম্য রক্ষার এক অপরিহার্য স্তম্ভ। তার নিঃশ্বাস-প্রশ্বাসের সঙ্গে
জড়িয়ে আছে এদেশের রাজনীতির ভবিষ্যৎ গতিপ্রকৃতি।
কবিগুরুর সেই পঙ্ক্তির সূত্র ধরেই বলতে হয়, ‘ওরে বিহঙ্গ, বন্ধ করো না পাখা’। হে মহীয়সী, আপনি হাল ছাড়বেন না। মৃত্যুর সঙ্গে আপনার এই পাঞ্জা লড়া বৃথা যাবে না। আপনার এই যন্ত্রণাদগ্ধ মুহূর্তগুলো আগামী প্রজন্মের জন্য সাহসের পাথেয় হয়ে থাকবে। ইতিহাস সাক্ষী, আপনি মাথা নত করেননিÑ না স্বৈরাচারের কাছে, না অন্যায়ের কাছে। সমগ্র বাংলাদেশ আজ আপনার শিয়রে বসে বিনিদ্র রজনী যাপন করছে, প্রার্থনায় নতজানু হয়ে বলছে ফিরে আসুন, মৃত্যুর গুহা থেকে ফিরে আসুন সেই সূর্যের মতো, যা মেঘের আড়াল ছিঁড়ে আবার উদ্ভাসিত হয় স্বমহিমায়। আপনার ক্ষয় নেই, আপনার বিনাশ নেই; আপনি মৃত্যুঞ্জয়ী চেতনার এক অনির্বাণ শিখা।