মির্জা ফখরুলের বক্তব্য
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ০১ ডিসেম্বর ২০২৫ ১১:০১ এএম
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মুখে গত বছরের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা রেজিমের পতন ঘটে। দীর্ঘদিন জাতির ওপর চেপে থাকা জগদ্দল পাথরের মতো স্বৈরশাসনের অবসান হয়। কিন্তু এর পরপরই দেশের বিভিন্ন স্থানে শিল্পকারখানায় হামলা, আগুন, ভাঙচুরের কারণে শিল্প খাতে কিছু সংকট তৈরি হয়। আমাদের কারখানাগুলো বিপর্যয়ের মুখে পড়ে। তবে বর্তমানে সে পরিস্থিতি অনেকটাই কাটিয়ে ওঠা গেলেও এখনও বন্ধ আছে অনেক কলকারখানা। সার্বিক বিনিয়োগ পরিবেশ নিয়েও রয়েছে অস্থিরতা। সরকারের আন্তরিকতায় ‘মব’ কমে এলেও সে আতঙ্ক পুরোপুরি মিলিয়ে যায়নি। এই সংকট থেকে বেরিয়ে এসে সাধারণ মানুষ স্বস্তির পথ খুঁজছে। আশার কথা, আমাদের রাজনীতিবিদরাও জনগণের সেই আকাঙ্ক্ষাকে মূল্যায়নের পথেই হাঁটছেন।
৩০ নভেম্বর প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ প্রকাশিত ‘লুটেরাদের শাস্তি দিন, প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে বেকারত্ব বাড়াবেন না’ শিরোনামের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে চতুর্থ বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সম্মেলন ২০২৫–এ বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ‘বিগত ১৫ বছরে যারা লুটপাটে জড়িত তাদের শাস্তি দিন। কিন্তু তাদের প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে বেকারত্ব তৈরি করা কোনো সমাধান নয়।’ গত এক বছরে নানা কারণে দেশের বিভিন্ন স্থানে অনেক শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ১৪ লাখ মানুষ চাকরি হারিয়েছেন বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি আরও বলেছেন, ‘তারা যাবে কোথায়? আমরা কেন নতুন করে বেকারত্ব সৃষ্টি করছি?’
বিএনপি মহাসচিবের এই বক্তব্যকে আমরা স্বাগত জানাই। রাজনীতিবিদদের এই উপলব্ধিকে আমরা আন্তরিকভাবে অভিনন্দিত করি। কারণ, রাজনীতির লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য মানুষের কল্যাণ। যারা অপরাধী তারা অবশ্যই তাদের কৃতকর্মের জন্য শাস্তি পাবে। তাদের সে শাস্তি নিশ্চিত করার দায়দায়িত্ব রাষ্ট্রের। কিন্তু রাষ্ট্রের সম্পদ নষ্ট করার অধিকার কারও নেই।
আমাদের অর্থনীতিতে সবচেয়ে বড় ভরসার খাত তৈরি পোশাক শিল্প। এ শিল্পের সঙ্গে যেমন দেশের লাখ লাখ শ্রমিকের জীবন ও জীবিকা জড়িয়ে, তেমনি এই খাতটি আমাদের অর্থনীতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের পাঠানো অর্থের বাইরে অর্থনীতিতে সবচে বড় বৈদেশিক মুদ্রার জোগানদাতা তৈরি পোশাক খাত। অথচ এই শিল্পকে ঘিরেও চলছে দেশি-বিদেশি নানা ষড়যন্ত্র। যার সুবিধা পার্শ্ববর্তী দেশসহ পোশাক শিল্পে আমাদের প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলো ভোগ করছে। আমাদের তৈরি পোশাক খাতে অস্থিরতা তৈরি হলে, আমাদের কারখানা বন্ধ হয়ে গেলেÑ কারা বেশি লাভবান হবে সেদিকটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। এতে করে শুধু লাখ লাখ মানুষই কর্মহীন হবে না, এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবেও আমাদের মোকাবিলা করতে হবে। একইভাবে আমরা স্মরণ করিয়ে বলিÑ সভ্যতার অন্যতম অনুষঙ্গ চাকা। এই চাকা আবিষ্কার মানুষের জীবন ও সভ্যতার গতিকে পাল্টে দিয়েছে। একসময় রিকশা থেকে যেকোনো যানবাহনের চাকা তথা টায়ারের জন্য আমাদেরকে বাইরের দেশের দিকে তাকিয়ে থাকতে হতো। সেই তাকিয়ে থাকার বিকল্প তৈরি হয়েছিল দেশেই। স্থানীয় পর্যায়ে উৎপাদিত টায়ার দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশেও রপ্তানি হয়েছে। এতে করে যেমন কর্মসংস্থানের সুযোগ হয়েছিল তেমনিভাবে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রাও সাশ্রয় হয়েছে। অথচ সরকার পরিবর্তনের পর যেভাবে দেশের একটি বড় টায়ার শিল্পকারখানা পুড়িয়ে ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে তার সুদূরপ্রসারী ক্ষত কাটাতে অনেক সময়ের প্রয়োজন। এরই মধ্যে দেশের বাজার আবার বিদেশি টায়ার কোম্পানির দখলে চলে গেছে। তৈরি হয়েছে মনোপলি ব্যবস্থা, লাফিয়ে লাফিয়ে দামও বাড়ছে।
আমরা দুঃশাসনের বিরুদ্ধে, স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে। একই সঙ্গে প্রতিবাদ-আন্দোলনের নামে যারা দেশের সম্পদ বিনিষ্ট করে, তাদেরও বিরুদ্ধে। প্রতিবাদের নামে যেভাবে দেশের শিল্পকারখানা পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে তা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। এতে করে আমাদের ভঙ্গুর অর্থনীতিকেই শুধু আরও পেছনে ঠেলে দেওয়া হয়নি বরং এসব শিল্পকারখানার সঙ্গে জড়িত অসংখ্য মানুষকেও কর্মহীন করে দেওয়া হয়েছে। অথচ এই প্রতিষ্ঠানগুলো ধ্বংস না করে সহজেই সরকারিভাবে নিয়ন্ত্রণ নেওয়া যেত। এসব প্রতিষ্ঠানে সরকারের তরফ থেকে রিসিভার নিয়োগ দেওয়া যেত। যাতে করেÑ যারা দুর্নীতি, লুটপাটের মাধ্যমে জনগণের টাকা হরণ করে শিল্পকারখানা গড়েছিল, সেগুলোর মালিকানা সরকারের নিয়ন্ত্রণে আনার সুযোগ তৈরি হয়েছিল। জনগণের সম্পদ জনগণের কাছেই ফিরিয়ে দেওয়া যেত। এতে অর্থনীতির চাকা যেমন সচল থাকত, তেমনি এসব কারখানায় কর্মরতদেরও কর্মহীন হয়ে পড়তে হতো না। আমরা মনে করি, বিনিয়োগের পূর্বশর্তÑ নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা। বর্তমানে আমরা একটা কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। গত বছরের গণঅভ্যুত্থানের পর যেসব শিল্পকারখানায় হামলা হয়েছে, বন্ধ হয়ে গেছেÑ সেসব কারখানা নতুনভাবে চালুর বিষয়ে আমরা সরকারের মনোযোগ দাবি করি। সেই সঙ্গে নতুন করে যাতে আর কোথাও হামলা না হয়, সে ব্যাপারে সতর্ক থাকার জন্যও বলি।