× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

জলবায়ু পরিবর্তন

কৃষির ওপরই বেশি প্রভাব পড়ছে

সাদেকুর রহমান

প্রকাশ : ০১ ডিসেম্বর ২০২৫ ১০:৫৬ এএম

কৃষির ওপরই বেশি প্রভাব পড়ছে

সবকিছু পরিবর্তনশীলÑপ্রকৃতির ক্ষেত্রেও এ কথা সত্য। তবে প্রকৃতির পরিবর্তনের জন্য মানুষের কার্যকলাপও দায়ী। প্রকৃতির পরিবর্তন মানুষের জীবনযাপনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। প্রকৃতির পরিবর্তনগুলোর মধ্যে একটিÑজলবায়ু পরিবর্তন। এটি খুব ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হয়। বাংলাদেশের জলবায়ু মৌসুমি ভাবাপন্ন। ষড়ঋতুর এ দেশে অনেক নদী-নালা, খাল-বিল রয়েছে। জাতীয় নদী কমিশনের মতে, বাংলাদেশে ১হাজার ১শ ৯৪টি নদী রয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বাংলাদেশের ওপর বেশি পড়বে। এর কারণ ভৌগোলিকভাবে বাংলাদেশের অবস্থান নিম্ন সমুদ্রপৃষ্ঠে। জলবায়ুর পরিবর্তনে বিশ্বের তাপমাত্রা বাড়ছে। আমাদের আয়তনের এক-তৃতীয়াংশ উপকূলীয় অঞ্চল। 

‘এন আনসাসটেনেইবল লাইফ: দ্য ইমপ্যাক্ট অন হেলথ এন্ড দ্য ইকোনমি অব বাংলাদেশ’Ñ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৯৮০ থেকে বাংলাদেশের গড় তাপমাত্রা বেড়েছে ১.১ ডিগ্রি সেলসিয়াস। তাপমাত্রা যতটুকু বেড়েছে, মানুষের অনুভূত তাপমাত্রা তার থেকে বেশি। এ সময়ে মানুষের অনুভূত তাপমাত্রা বেড়েছে প্রায় ৪.৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। গরমের প্রভাবের দিক দিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয় স্থানে। তাপমাত্রা বাড়ার কারণ, কার্বন নিঃসরণের মাত্রা বেড়ে যাওয়া। এর পেছনে রয়েছেÑনগরায়ণ, অপরিকল্পিত শিল্পায়ন, নদী-নালা ভরে ফেলা কিংবা বন ও বৃক্ষ কেটে ফেলা। কার্বন নিঃসরণের জন্য শিল্পনির্ভর দেশগুলো মূলত দায়ী। কিন্তু ফলাফল ভোগ করে নিম্ন সমুদ্রপৃষ্ঠের দেশগুলো। ২০২৩ সালে বিশ্বে সবচেয়ে বেশি কার্বন নিঃসরণ করেছে চীন, যার পরিমাণ ৩০.১ শতাংশ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র করেছে ১১.৩ শতাংশ। বাংলাদেশের নির্গমন ০.৫ শতাংশের নিচে।

তাপমাত্রা বাড়ার প্রভাব মানুষের শরীর ও মনের ওপর পড়ে। বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদন বলা হয়েছেÑ ৩৫ ডিগ্রির বেশি তাপমাত্রা হলে মানুষের বিষণ্নতা ২৩.৮ শতাংশ ও উদ্বেগ ৩৭.১ শতাংশ বেড়ে যায়। এর ফলে মানুষের কর্মক্ষমতা কমে যায়। গ্রীষ্মকালে তাপমাত্রা ৩৭ ডিগ্রির ওপরে হয়ে গেলে মানুষের উৎপাদনশীলতা কমে যায়। ২০২৪ সালে বাংলাদেশের প্রায় আড়াই কোটি কর্মদিবস নষ্ট হয়েছে।

বাংলাদেশে শীতকালের তুলনায় গ্রীষ্মকালে কাশি, ডায়রিয়া, শারীরিক অসুস্থতার পরিমাণ বেশি দেখা যায়। এটির পরিমাণ প্রায় দ্বিগুণ। শীতকালে কাশিতে ও ডায়রিয়াতে আক্রান্ত হয় যথাক্রমে ৩.৩ শতাংশ ও ১.৮ শতাংশ। অন্যদিকে গ্রীষ্মকালে আক্রান্ত হয় যথাক্রমে ৬ ও ৪.৪ শতাংশ। শারীরিক অসুস্থতার কারণে গ্রীষ্মকালে মানুষ গড়ে ১.৪ দিন ও শীতকালে ১.২ দিন কাজ করতে পারেনি। ফলে দেশের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ার শুধু যে ডায়রিয়া কিংবা কাশি-সর্দির পরিমাণ বেড়েছে তাই নয়; বিভিন্ন ধরনের রোগ যেমন- ম্যালেরিয়া, ডেঙ্গু রোগে আক্রান্তের সংখ্যাও বেড়েছে। তবে বয়সভেদে তাপমাত্রার প্রভাবও ভিন্ন হয়। ৩৬-৬৫ বছর বয়সি কর্মক্ষম মানুষের ক্লান্তি বেশি। অপরদিকে ৬৬ বছর বয়সীদের তাপজনিত ক্লান্তি বেশি। বিষণ্নতার দিকেও একই বিষয় লক্ষ করা যায়। শীতকালের চেয়ে গ্রীষ্মকালে মানুষ বেশি বিষণ্নতায় ভোগে।

জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বায়ুদূষণের পরিমাণও বাড়ছে। ২০২২ সালেই বায়ুদূষণের কারণে দেশে মারা গেছে প্রায় ২ লাখ ২৫ হাজার মানুষ। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে অনেক দেশই ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। বাংলাদেশ এর মধ্যে অন্যতম। আমাদের অর্থনীতি মূলত কৃষিনির্ভর। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এই খাতের ওপর পড়বে। তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ায় জলবায়ু অভিবাসীর সংখ্যা বেড়ে যাবে। উপকূলীয় অঞ্চল তলিয়ে গেলে এই মানুষগুলো সহায়-সম্বলহীন হবে। ধারণা করা হয় ২০৫০ সাল নাগাদ বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চল তলিয়ে যেতে পারে। এর ফলে প্রায় ৭০ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হবে। এ বিপুল সংখ্যক মানুষের জন্য কর্মসংস্থান, বাসস্থান ব্যবস্থা করা কঠিন হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে তাপমাত্রা ১ মিটার বাড়লে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে খুলনা বিভাগ। শুধু তাই নয়, ঢাকা বিভাগেরও ১৪ শতাংশ জায়গা তলিয়ে যাবে।

২০০১-২০১৯ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে প্রায় ১৭০টি জলবায়ু পরিবর্তনজনিত দুর্যোগ দেখা দিয়েছে। এর ফলে দেশে অনেক অঞ্চলে ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় ২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার এইসব ক্ষতিগ্রস্ত বাড়িঘর মেরামত করতে খরচ হয়। উপকূলীয় অঞ্চলে প্রাকৃতিক দুর্যোগ বেশি হয়ে থাকে। তাই এই অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত খাতে খরচও বেশি হয়ে থাকে। প্রতিটি পরিবারকে প্রতিবছর ৬হাজার ৬শ ৮০ টাকা বাসস্থান মেরামতের জন্য খরচ করতে হয়। ঘরবাড়ি মেরামতের জন্য যে অর্থ ব্যবহার করা হয়, তা পরিবারের প্রতিদিনের জীবনযাপনের জন্য বরাদ্দকৃত টাকা থেকেই ব্যয় হয়।

একটি ঘটনার সঙ্গে অন্য আরেকটি ঘটনা জড়িত। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে নদীভাঙন হবে। অনেক মানুষ ঘরবাড়ি হারাবে। নিজের বাসস্থান হারানোর কারণে নতুন একটি জায়গায় যাবে। সাধারণত মানুষ গ্রাম থেকে শহরে যেতে পছন্দ করে। ভবিষ্যতের কথা, নতুন কর্মসংস্থানের কথা চিন্তা করে শহরে আসবে। শহর ঘনবসতি হবে। এটির প্রভাব পড়বে যানজটে। জীবনযাত্রা মন্থর হয়ে যাবে। এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যেতে বেশি সময় লাগবে। গত ১০ বছরে ঢাকায় গাড়ির গতি কমে ২১ থেকে ৭ কিলোমিটারে নেমে এসেছে। আগামী ২০৩৫ সালে এটি কমে হয়ে যেতে পারে ৪ কিলোমিটার। যদি এটি চলমান থাকে, তাহলে দিনে ৫ মিলিয়ন ঘণ্টা কর্মক্ষমতা অপচয় হতে পারে। এর অর্থনৈতিক ক্ষতি হবে ১১.৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।

জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে চাষযোগ্য জমির পরিমাণ কমছে। সিজিআইএআর-এর মতে, ২২ বছরে পদ্মা ও যমুনা নদীর ভাঙনে ৫ লাখেরও বেশি মানুষ গৃহহীন হয়েছে। এর ফলে বিলীন হয়েছে ৫০ হাজার হেক্টর জমি। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলাফল হ্রাসের জন্য বাংলাদেশ অনেকগুলো পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। তবে শুধু সরকারের গৃহীত পদক্ষেপই যথেষ্ট নয়। উপকূলীয় অঞ্চলে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি নেওয়ার পাশাপাশি কৃষিপণ্যের জন্য লবণাক্ত পানির উপযোগী ধান, ভুট্টা, সুগারবিট, আখ, সূর্যমুখী চাষ করা যেতে পারে। জলবায়ুর কথা বিবেচনায় রেখে শস্য বিন্যাস ও শস্যক্রমের পরিবর্তন করা যেতে পারে। শুধু তাই নয়, হাঁস-মুরগির নতুন জাতের উদ্ভাবনের চেষ্টা করা যেতে পারে। এগুলোর জন্য কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ বিষয়ক গবেষণা কার্যক্রম আরও বাড়াতে হবে।

জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে মিল রেখে বাংলাদেশ কিছু পদক্ষেপ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর মধ্যে একটিÑজলবায়ু সহনশীল ভবিষ্যতের জন্য ২০৩০ সালের মধ্যে জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা কৌশল গ্রহণ করা। ২০০৯ সালে গৃহীত বাংলাদেশ ক্লাইমেট চেঞ্জ স্ট্র্যাটেজি অ্যান্ড অ্যাকশন প্ল্যান জলবায়ু অভিযোজনের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি। এ ছাড়া বাংলাদেশ নিজস্ব তহবিলের মাধ্যমে জলবায়ু প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য ক্লাইমেট চেঞ্জ ট্রাস্ট ফান্ড গঠন করেছে। এই প্রকল্পে উপকূলীয় বাঁধ নির্মাণ ও উন্নয়ন, বনায়ন কর্মসূচি, সাইক্লোন শেল্টার স্থাপন এবং জলবায়ু সহনশীল কৃষিপ্রযুক্তি উন্নয়নসহ নানা কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। 

জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট পরিস্থিতিকে মোকাবিলা করার জন্য বিদেশি অর্থায়ন প্রয়োজন। অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। এজন্য জলবায়ু কূটনীতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব সারা বিশ্বের মধ্যেই রয়েছে। তাই বাংলাদেশকে নানামুখী সমস্যার মুখোমুখি হতে হবে। এজন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং টেকসই উন্নয়ন কৌশল গ্রহণ করা। বাংলাদেশের কতগুলো বিষয়ের ওপর অধিক গুরুত্ব দিতে হবে। এগুলো হলো জলবায়ু-সংক্রান্ত প্রযুক্তিগত দক্ষতা বৃদ্ধি, বেসরকারি খাতের অধিকতর অংশগ্রহণ এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার পরিমাণ বাড়ানো।


সাদেকুর রহমান

গবেষণা কর্মকর্তা, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড 

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা