শব্দদূষণ
সম্পাদকীয়
প্রকাশ : ২৯ নভেম্বর ২০২৫ ১১:০৯ এএম
বিশ্বের সবচেয়ে শব্দদূষণ-প্রবণ শহরগুলোর অন্যতম আমাদের রাজধানী ঢাকা। এই শহরে বসবাস মানেই অবিরাম শব্দের সঙ্গে সহাবস্থান। কর্মব্যস্ত এই মহানগরীতে যানবাহনের হর্ন, নির্মাণকাজের শব্দ, লাউড স্পিকার, রাস্তার পাশের ইঞ্জিনের গর্জনÑ সব মিলিয়ে শহরটি যেন এক অদৃশ্য শব্দের খাঁচা। তবে সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি যে শব্দটি কানে আসে তা হলো যানবাহনের অবিরাম হর্ন। কে কত জোরে এবং কতবার হর্ন বাজাতে পারেÑ যেন তারই প্রতিযোগিতা চলে অবিরাম। বাস-ট্রাক, মাইক্রোবাস, মোটরসাইকেল, ভ্যান-রিকশার উচ্চস্বরে হর্ন এখন নিত্যদিনের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নির্মাণকাজ, লাউড স্পিকার, বাজার ও ব্যস্ত মোড়ের বিভিন্ন উৎসের শব্দ। এতে রাজধানীর পরিবেশ ভয়াবহ শব্দদূষণে আক্রান্ত, যা মানুষের মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যের পক্ষে মারাত্মক ক্ষতিকর। ফলে এখানকার মানুষ কেবল দম বন্ধ শ্বাস নিচ্ছে না, ধীরে ধীরে তাদের মন ও শরীরও ক্ষয়ে যাচ্ছে।
২৮ নভেম্বর প্রতিদিনের বাংলাদেশ-এ ‘শব্দদূষণে অতিষ্ঠ নগরজীবন’ শীর্ষক প্রতিবেদনে দূষণের ভয়াবহ তথ্য উঠে এসেছে। বিশেষজ্ঞ ও চিকিৎসকরা বলছেন, অতিরিক্ত শব্দদূষণ সব বয়সের মানুষের জন্য সমান ক্ষতিকর। এতে শ্রবণশক্তির ক্ষতি, মস্তিষ্কে চাপ, রাগ-উত্তেজনা, মনোযোগ ভেঙে যাওয়া, কর্মক্ষমতা হ্রাস এবং ঘুমের ব্যাঘাত ঘটে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন অব নয়েজ কন্ট্রোলের তথ্য বলছে, উচ্চমাত্রার শব্দের কারণে আলসার, মাথাব্যথা, রক্তচাপ বৃদ্ধি, হৃদরোগসহ নানা শারীরিক সমস্যা দেখা দিতে পারে। শুধু তাই নয়, দীর্ঘমেয়াদে এটি মানসিক অস্থিরতা ও স্নায়বিক ভারসাম্যহীনতার ঝুঁকিও বাড়ায়। এমনকি মাতৃগর্ভে থাকা শিশুর ওপরও শব্দদূষণের নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, ৫৫ ডেসিবেলের বেশি শব্দ মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। অথচ ঢাকার অনেক স্থানে ৯০-১০৫ ডেসিবেলের বেশি শব্দ পাওয়া যাচ্ছে, যা সুস্থ একজন মানুষকে ধীরে ধীরে মানসিক চাপ, উচ্চ রক্তচাপ, শ্রবণশক্তি হ্রাস, অনিদ্রা, এমনকি হৃদরোগের ঝুঁকির দিকে ঠেলে দেয়। চলতি বছর প্রকাশিত ‘স্পেশিও-টেম্পোরাল প্যাটার্নস ইন এয়ার পলিউশন অ্যান্ড সাউন্ড ইন ঢাকা, বাংলাদেশ’ শীর্ষক গবেষণায় ঢাকার ৭০টি স্থানে শব্দমাত্রা পর্যবেক্ষণ করা হয়। গবেষণায় উঠে এসেছে, শহরের অধিকাংশ স্থানে শব্দের মাত্রা দিন-রাতের অনুমোদিত সীমা অতিক্রম করে। পরিবহন করিডোর, বাণিজ্যিক কেন্দ্র এবং মিশ্র ব্যবহারের এলাকায় শব্দদূষণের মাত্রা সবচেয়ে বেশি পাওয়া যায়। ২০২৪ সালে ফ্রন্টিয়ার্স ইন পাবলিক হেলথ জার্নালে প্রকাশিত অন্য এক গবেষণায় দেখা যায়, জরিপকৃত প্রতিটি এলাকাতেই শব্দের গড় মাত্রা আইনসংগত সীমার ওপরে। বিশেষ করে সাপ্তাহিক ছুটির আগের দিন অফিস শেষে যানবাহনের চাপ বাড়ার ফলে শব্দমাত্রা চরম পর্যায়ে পৌঁছে যায়।
অন্যদিকে কোনো নিয়ম, মানদণ্ড, শব্দ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ছাড়াই নগরীর ভেতরে নির্মাণকাজ চলছে প্রায় সারা বছরই। রাতে কেউ ঘুমাতে চাইলেও পাশেই হঠাৎ কংক্রিট কাটার যন্ত্রের ঘর্ষণ শুরু হয়Ñ এ যেন নগরবাসীর জীবনে এক করুণ পরিহাস। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানসহ রাজনৈতিক সভা-সমাবেশ সবখানেই মাইক বা হাই-সাউন্ড সিস্টেম ব্যবহার যেন অপরিহার্য উপকরণ। কিন্তু এগুলো ব্যবহারে আইনের যে নির্দেশনা আছে, সেই আইন যেন বইয়ের পাতাতেই বন্দি।
এ কথা সত্য, দেশে শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে যথেষ্ট আইন আছে, তবে এর প্রয়োগ নেই। অনেকে আইন জানেন না, কেউ কেউ জেনেও তা লঙ্ঘন করেন। শব্দদূষণ আইনে অপরাধ করলে সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড বা জরিমানার বিধান রয়েছে। এ ছাড়া আবাসিক এলাকা ও বাণিজ্যিক এলাকার জন্য শব্দের মাত্রা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে এবং এই মাত্রা লঙ্ঘন করলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলা আছে। তবুও প্রশাসন বা নগর কর্তৃপক্ষ যেন চোখ বন্ধ রেখেই আছে। মাঝে মাঝে কিছু অভিযানে হাইড্রলিক হর্ন বাজেয়াপ্ত করা হয় কিন্তু সেটি সাময়িক আতঙ্ক-সৃষ্টির উদ্যোগ হিসেবে, কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। আমরা মনে করি, এই আইন অনুযায়ী, উচ্চশব্দ সৃষ্টিকারী যানবাহন, নির্মাণকাজ ও অন্যান্য উৎসের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা সম্ভব।
শব্দদূষণ একটি নীরব ঘাতক। এই ঘাতককে অবশ্যই রুখতে হবে। আমরা ঢাকা শহরকে যদি বাসযোগ্য নগরীতে পরিণত করতে চাই, তাহলে শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণকে অগ্রাধিকারের তালিকায় নিতে হবে। যানবাহনের হর্ন বাজানোর বিরুদ্ধে যথাযথ আইন প্রয়োগ দরকার। নির্মাণকাজের সময়ও শব্দ নিয়ন্ত্রণ আইন মানতে হবে, রাতে ভারী শব্দ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ হওয়া দরকার। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, নাগরিকদের শব্দদূষণের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে সচেতন করতে হবে। স্কুল, বিশ্ববিদ্যালয়, সামাজিক সংগঠনÑ সবাইকে এ ক্ষেত্রে ভূমিকা নিতে হবে।
আমরা মনে করি, ঢাকা শহর কেবল দেশের অর্থনৈতিক হৃদপিণ্ড নয়Ñ এখানে বাস করে প্রায় সাড়ে তিন কোটি মানুষের স্বপ্ন, ভবিষ্যৎ ও মানসিক স্থিতি। শব্দদূষণে অতিষ্ঠ এই শহর যদি শান্ত না হয় তবে ঢাকা হারাবে তার জীবনীশক্তি। তাই শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ আইনের যথাযথ প্রয়োগের বিকল্প নেই। সংশ্লিষ্ট প্রশাসন যদি নিয়মিত অভিযান পরিচালনা ও তদারকি করে তাহলে জনসচেতনতা বাড়বে। আমরাও বিশ্বাস করি, জনসচেতনতা ও যথাযথ আইনের প্রয়োগই পারে এই ভয়াবহ শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ করতে।