ইমেইল থেকে
মো. শামীম মিয়া
প্রকাশ : ২৯ নভেম্বর ২০২৫ ১০:৫৪ এএম
বিশ্বজুড়ে এখন যে সংকটটি সবচেয়ে গভীরভাবে মানবজীবনকে আঘাত করছে, তা হলো জলবায়ু সংকট। এটি কেবল প্রকৃতির ভারসাম্য নষ্ট করছে না, বরং মানবজীবনের প্রতিটি স্তরকে প্রভাবিত করছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) সম্প্রতি ঘোষণা করেছেÑ ‘জলবায়ু সংকট আসলে স্বাস্থ্য সংকট।’ এই ঘোষণাটি শুধুমাত্র প্রতীকী নয়, বরং এটি মানবসভ্যতার ভবিষ্যৎ টিকে থাকার প্রশ্নকেও সামনে নিয়ে এসেছে। একসময় আমরা ভাবতাম জলবায়ু পরিবর্তন মানেই তাপমাত্রা বৃদ্ধি, হিমবাহ গলন বা সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি। কিন্তু এখন প্রমাণিত যে, এসব পরিবর্তনের সবচেয়ে ভয়াবহ প্রভাব পড়ছে মানুষের শরীর, মানসিক স্থিতি এবং সামগ্রিক জনস্বাস্থ্যের ওপর।
আজ পৃথিবীর প্রতিটি অঞ্চলেই দেখা যাচ্ছে তাপমাত্রা বৃদ্ধিজনিত নানা রোগ, খাদ্য ঘাটতি, পানির সংকট, বায়ুদূষণ, ডায়রিয়া, ম্যালেরিয়া, ডেঙ্গু, মানসিক চাপ, উদ্বেগ এবং অপুষ্টিজনিত অসুস্থতা। জলবায়ুর পরিবর্তন যেন এক অদৃশ্য রোগের মতো, যা আমাদের শরীরে, সমাজে এবং রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় ধীরে ধীরে বিষ ছড়িয়ে দিচ্ছে।
উচ্চ তাপমাত্রা মানুষের শরীরের পানিশূন্যতা, হৃদরোগ এবং শ্বাসযন্ত্রের জটিলতা বাড়ায়। শিশু ও বৃদ্ধদের জন্য এই অবস্থা আরও মারাত্মক। অন্যদিকে, অতিবৃষ্টি ও বন্যা ডায়রিয়া, কলেরা, টাইফয়েডের মতো পানিবাহিত রোগের বিস্তার ঘটায়। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি উপকূলীয় অঞ্চলগুলোকে লবণাক্ত করছে, যার ফলে বিশুদ্ধ পানির অভাব দেখা দিচ্ছে। সেই লবণাক্ত পানি খাওয়ার কারণে দক্ষিণাঞ্চলে উচ্চ রক্তচাপ, কিডনি রোগ এবং গর্ভবতী নারীদের জটিলতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাংলাদেশে উপকূলীয় নারীদের মধ্যে লবণাক্ত পানির কারণে প্রি-এক্লাম্পসিয়া নামক মারাত্মক গর্ভকালীন জটিলতার হার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন মশাবাহিত রোগের বিস্তারও বাড়াচ্ছে। উষ্ণতা বাড়লে মশার প্রজনন দ্রুত হয়, ফলে ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া, ম্যালেরিয়ার মতো রোগ ক্রমেই নতুন নতুন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ছে। সম্প্রতি দেখা গেছে, আফ্রিকার কিছু এলাকায় যেখানে আগে ম্যালেরিয়া ছিল না, সেখানে এখন এ রোগ দেখা যাচ্ছে। এমনকি দক্ষিণ ইউরোপেও ডেঙ্গুর সংক্রমণ শুরু হয়েছে, যা এক দশক আগেও অকল্পনীয় ছিল। জলবায়ু পরিবর্তন সরাসরি প্রভাব ফেলছে খাদ্য উৎপাদনে। অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, খরা ও মাটির উর্বরতা হ্রাস কৃষি উৎপাদন কমিয়ে দিচ্ছে। এর ফলে দামের ঊর্ধ্বগতি, খাদ্যসংকট ও অপুষ্টি একযোগে ছড়িয়ে পড়ছে। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের দেশগুলোতে এর প্রভাব মারাত্মক। যখন খাদ্য উৎপাদন কমে যায়, তখন শিশুদের মধ্যে অপুষ্টি ও বিকাশজনিত সমস্যা বেড়ে যায়।
জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় কেবল প্রযুক্তি নয়, প্রয়োজন বিজ্ঞানসম্মত পরিকল্পনা, জনসচেতনতা ও নীতির বাস্তবায়ন। সরকারকে যেমন নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও সবুজ অবকাঠামোয় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে, তেমনি জনগণকেও স্বাস্থ্য-সচেতন হতে হবে। পানি সংরক্ষণ, বৃক্ষরোপণ, প্লাস্টিক ব্যবহার কমানো এবং টেকসই জীবনযাপনÑ এসব ব্যক্তিগত উদ্যোগও সম্মিলিতভাবে স্বাস্থ্য রক্ষার অংশ। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক সহযোগিতাও অপরিহার্য। জলবায়ু পরিবর্তন একটি বৈশ্বিক সমস্যা, তাই এর সমাধানও বৈশ্বিক হতে হবে। উন্নত দেশগুলোকে তাদের প্রতিশ্রুত তহবিল বাস্তবে দিতে হবে, যাতে দরিদ্র দেশগুলো স্বাস্থ্য খাতকে অভিযোজনযোগ্য করতে পারে। জলবায়ু সংকট কোনো ভবিষ্যতের ভয় নয়Ñ এটি আজকের বাস্তবতা। এবং এই বাস্তবতা আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছে, জলবায়ু সংকটই আসলে সবচেয়ে বড় স্বাস্থ্য সংকট।
মো. শামীম মিয়া
আমদিরপাড়া, জুমারবাড়ী, সাঘাটা, গাইবান্ধা