× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

ব্যাংকিং খাত

ছেঁড়া-পোড়া নোট নিয়ে জনগণ যাবে কোথায়

নিরঞ্জন রায়

প্রকাশ : ২৮ নভেম্বর ২০২৫ ০৯:৪৪ এএম

ছেঁড়া-পোড়া নোট নিয়ে জনগণ যাবে কোথায়

আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠ্যসূচির অংশ হিসেবে অর্থনীতি বিষয় নিয়ে অধ্যয়নের সময় এবং পরবর্তীতে চাকরির ইন্টারভিউ দিতে যেয়ে প্রায়ই একটি সাধারণ প্রশ্নের সম্মুখীন হয়েছি, তা হচ্ছে বাংলাদেশের এক টাকা এবং দুই টাকা মূল্যমানের নোট ব্যতীত সকল প্রকার মুদ্রার (টাকার) ওপর ‘বাংলাদেশ ব্যাংক চাহিবামাত্র ইহার বাহককে দিতে বাধ্য থাকিবে’ কথাটি লেখা থাকে কেন। বিষয়টি জানার জন্য সে সময় যে কয়জন শিক্ষকের দ্বারস্থ হয়েছিলাম, তাদের অনেকেই বিষয়টি এড়িয়ে গেছেন, আবার অনেকে ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছেন। একজন শিক্ষকের মতে, বিষয়টি এমন যে একটি দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ইচ্ছামতো টাকা ছাপাতে পারে না। টাকা ছাপাতে হলে, তার বিপরীতে নির্দিষ্ট পরিমাণ স্বর্ণ বা অন্য কোনো অনুমোদিত মূল্যবান ধাতু বা নির্দিষ্ট অঙ্কের ডলার অথবা অন্য কোনো গ্রহণযোগ্য বৈদেশিক মুদ্রা জমা রাখতে হয়। আরেকজন শিক্ষক খুবই সাধারণভাবে বলেছিলেন যে, একটি দেশের জনগণ যেহেতু অর্থের মালিক, তাই জনগণকে চাহিবামাত্র সেই অর্থ বা সমপরিমাণ মূল্য প্রদানের প্রতিশ্রুতিস্বরূপ বাংলাদেশ ব্যাংক যে সকল নোট বা মুদ্রার সার্কুলেশন করে, তার ওপর এমন কথা লেখা থাকে। 

এক বা দুই টাকার নোট যেহেতু বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্কুলেশন নয়, তাই এই নোটের ওপর বাংলাদেশ ব্যাংকের অর্থ ফেরত প্রদানের বক্তব্যটি লেখা থাকে না। উল্লেখ্য, বাংলাদেশে প্রচলিত এক বা দুই টাকার নোট মূলত অর্থ মন্ত্রণালয়ের সার্কুলেশন এবং সেখানে অর্থ সচিবের স্বাক্ষর থাকে। অন্যান্য মুদ্রা বা নোট যেহেতু বাংলাদেশ ব্যাংক সার্কুলেশন করে, তাই সেখানে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের স্বাক্ষর থাকে। এখানে আরও একটি বিষয় প্রণিধানযোগ্য, তা হচ্ছে নোট ছাপানো এবং নোট সার্কুলেশনের মধ্যে পার্থক্য আছে। বাংলাদেশ ব্যাংক টাকশাল থেকে যে পরিমাণ নতুন নোট মুদ্রণ বা তৈরি করে, সেটাই নোট ছাপানো। পক্ষান্তরে এই ছাপানো নোটের মধ্য থেকে যে পরিমাণ নোট নির্ধারিত পদ্ধতি অনুসরণ করে বাজারে লেনদেন নিষ্পতির জন্য সরবরাহ করা হয়, সেটাই নোট সার্কুলেশন। এক এবং দুই টাকার নোট হয়তো বাংলাদেশ ব্যাংকই মুদ্রণ এবং সার্কুলেশন করে, কিন্তু সেটি অর্থ মন্ত্রণালয়ের পক্ষে। 

নোটের ওপর অর্থ ফেরত প্রদানের বিষয় নিয়ে যে দুই ধরনের ব্যাখ্যা জেনেছিলাম, তার কোনটি যে সঠিক, তা আজও নিশ্চিত হতে পারিনি। কেননা টাকা সার্কুলেশনের ক্ষেত্রে স্বর্ণমান, অর্থাৎ সোনা বা অন্য কোনো মূল্যবান ধাতু জমা রাখার প্রচলন শেষ হয়েছে অনেক আগেই। বৈদেশিক মুদ্রা জমা রখার বিষয়টিও এখন আর সেভাবে মেনে চলা হয় না। আর আধুনিক মুদ্রানীতি বা এমএমটি অর্থাৎ মডার্ন মনিটারি থিউরি এর প্রবর্তকদের মতে তো টাকা ছাপানোর জন্য কোনোকিছুই জমা রাখার প্রয়োজন নেই। তাদের মতে, সরকার যখন প্রয়োজন মনে করবে, তখন নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ ছাপিয়ে নিতে পারে। এই এমএমটি অনুসরণ করে করোনাকালীন সময় উন্নত এবং উন্নয়নশীল অনেক দেশ এভাবেই টাকা ছাপিয়ে অর্থনীতির চাকা সচল রেখেছিল বলে অনেকেই আলোচনা করেছেন। যাহোক, এমএমটি একটি ভিন্ন প্রসঙ্গ বিধায় এ বিষয় নিয়ে আলোচনা দীর্ঘ করতে চাই না। 

বাংলাদেশে টাকার ওপর অর্থ ফেরত প্রদানের প্রতিশ্রুতি লেখার সঠিক কারণ জানতে না পারলেও, শিক্ষকরা যে দুই ধরনের ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন, তার মধ্যে শেষোক্তটি আমি সঠিক বলে ধরে নিয়েছিলাম। অর্থাৎ দেশের জনগণ টাকার মালিক, তাই জনগণকে টাকা ফেরত দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া আছে। কিন্তু সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক ছেঁড়া-পোড়া নোট বিনিময়ের যে বিধান জারি করেছে, তা দেখে বুঝলাম জনগণ যে টাকার মালিক এবং সে কারণেই জনগণকে টাকা বা টাকার মূল্যমান ফেরত দেওয়ার প্রতিশ্রুতি হিসেবে টাকার ওপর যে কথাগুলো লেখা থাকে, তা মোটেও সঠিক নয়। কেননা জনগণকে টাকার মালিক মনে করলে এবং সে কারণে জনগণের টাকা ফেরত দিতে প্রতিশ্রতিবদ্ধ হলে, ছেঁড়া-পোড়া নোট বিনিময়ের জন্যে জাদব বাবুর পাটিগণিতের দুধের সঙ্গে জল মিশিয়ে অনুপাতের অঙ্কের মতো জটিল হিসাব সংবলিত বিশাল এক বিধিমালা জারি করার প্রয়োজন হতো না। কেননা এই প্রবিধান অনুযায়ী হিসাব করে দেখাতে হবে যে একটি নোটের কত শতাংশ ছেঁড়া-পোড়া হলে, কত শতাংশ মূল্য ফেরত প্রদান করা হবে, তাও আবার এক বিশাল প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার মাধ্যমে। এই প্রবিধানটি পড়ে আমার মনে হয়েছে আসলেই বাংলাদেশ ব্যাংক সামান্য কাজে কি বিশাল এক কর্মযজ্ঞ সম্পন্ন করেছে। অথচ একটি সাধারণ সিদ্ধান্ত এবং নির্দেশনার মাধ্যমে খুব সহজেই ছেঁড়া-পোড়া নোট বিনিময়ের কাজটি করা যেতে পারে। 

সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক ‘নোট প্রত্যর্পণ প্রবিধান-২০২৫’ জারি করেছে, যেখানে বিস্তারিত উল্লেখ আছে যে কীভাবে ছেঁড়া-পোড়া নোট বিনিময় করা যাবে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকে এক প্রেস বিজ্ঞপ্তি দিয়ে জানিয়েছে যে এখন থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান শাখায় ছেঁড়া-পোড়া নোট বিনিময় এবং প্রাইস বন্ড ক্রয়বিক্রয় সেবা প্রদান করা হবে না। সেই প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে তাদের সিদ্ধান্তের সপক্ষে যুক্তি দিয়ে উল্লেখ করা হয়েছে যে, এই ধরনের সেবা বিশ্বের কোনো কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে দেওয়া হয় না। একেবারে বাস্তব কথা। বাংলাদেশ ব্যাংক এমন কিছু কাজ করে, যা বিশ্বের অধিকাংশ কেন্দ্রীয় ব্যাংক করে না। আবার বিশ্বের অধিকাংশ কেন্দ্রীয় ব্যাংক এমন কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজ করে, যা বাংলাদেশ ব্যাংক করে না। সেই বিবেচনায় বাংলাদেশ ব্যাংক সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ছেঁড়া-পোড়া নোট বিনিময় বা প্রাইজ বন্ড ক্রয়বিক্রয়ের মতো সাধারণ সেবা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষে দেওয়া কোনোভাবেই যুক্তিসংগত নয়। এই সিদ্ধান্ত অনেক আগেই নেওয়া উচিত ছিল। 

কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, যেহেতু দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে এই সেবা দিয়ে আসছে, তাই আকস্মিক বন্ধ করার আগে একটা সুন্দর বিকল্প ব্যবস্থা নিশ্চিত করার প্রয়োজন ছিল। আমাদের দেশে একটা বড় সমস্যা হচ্ছে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে জনগণের ভোগান্তি বাড়বে না লাঘব হবে, সে বিষয়টি মোটেই বিবেচনায় নেওয়া হয় না। এটা যে শুধু বাংলাদেশ ব্যাংকের সিদ্ধান্তের বেলায় ঘটে তেমন নয়, বরং সরকারি সব সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে এই একই অবস্থা। যেমন, কিছু অত্যাবশ্যিক সেবা গ্রহণ এবং সঞ্চয়পত্র, এমনকি ব্যাংকের স্থায়ী আমানতে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে আয়কর রিটার্ন জমার প্রমাণ দাখিলের বিষয়টি অত্যাবশ্যক করে দেওয়া হয়েছে। যে দেশে এখনও আয়কর রিটার্ন দাখিলের সংখ্যা দুই কোটি অতিক্রম করেনি, অথচ এসব সেবা নিয়ে থাকে প্রায় দশ কোটির বেশি মানুষ, সে দেশে এরকম সিদ্ধান্ত যে বিশাল জনগোষ্ঠীকে কি ভয়ংকর বিপদের মধ্যে ফেলেছে, তা বলে শেষ করা যাবে না। ঠিক একই রকমের ভোগান্তির সম্মুখীন হবে দেশের সাধারণ মানুষ, যাদের ছেঁড়া-পোড়া নোট আছে। 

জারিকৃত প্রবিধানে বিস্তারিত উল্লেখ করা আছে যে কীভাবে ছেঁড়া-পোড়া নোট বিনিময় করা যাবে। ফলে এই সেবা নেওয়ার ক্ষেত্রে আপাতদৃষ্টিতে কোনো সমস্যা হওয়ার কথা নয়। কিন্তু প্রক্রিয়াটি এতটাই জটিল যে বিষয়টি ভালোভাবে বুঝে যথাযথ অনুসরণ করে লেনদেনের অনুপযুক্ত (মিউটিলেটেড) নোট পরিবর্তন করা এক দুরূহ কাজ। এই প্রবিধান যদি ব্যাংকের জন্য প্রযোজ্য করা হতো, তাহলে কোনো সমস্যা ছিল না। সেরকম সিদ্ধান্ত নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক জনগণকে জানিয়ে দিতে পারে যে যাদের ছেঁড়া-পোড়া নোট আছে, তারা সরাসরি তফসিলি বাণিজ্যিক ব্যাংকের যেকোনো শাখা থেকে তাৎক্ষণিক বিনিময় বা পরিবর্তন করে নিতে পারবে। একই সঙ্গে বাংলাদশ ব্যাংক সকল বাণিজ্যিক ব্যাংকের ওপর নির্দেশনা দিতে পারে যে কেউ ছেঁড়া-পোড়া নোট নিয়ে আসলে, ব্যাংক বিনাবাক্যে সেটি গ্রহণ করে ভালো নোট দিয়ে দিবে। এ ব্যাপারে কোনোরকম গড়িমসি করা বা প্রশ্ন তোলা যাবে না। এভাবে যত নোট জমা পড়বে, সেগুলো ব্যাংক একটা নির্দিষ্ট সময় অন্তর বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা দিয়ে ভালো নোট নিয়ে আসতে পারবে। বাংলাদেশ ব্যাংক চাইলে এসব ছেঁড়া-পোড়া নোট বাজেয়াপ্ত করে এর বিপরীতে নতুন নোট সার্কুলেশনে নিয়ে আসতে পারে, অথবা বিকল্প হিসেবে সার্কুলেশন থেকে উঠিয়ে নিতে পারে। 

ছেঁড়া-পোড়া নোট সংজ্ঞায়িত করার ক্ষেত্রে এত জটিল হিসাবে না গিয়ে, খুব সহজভাবে বলে দেওয়া যেতে পারে যে কেবল নোটের দুটো নম্বরসহ নোটটি চিহ্নিত করার উপযুক্ত হলেই, সেটি ছেঁড়া-পোড়া নোট হিসেবে বিবেচিত হবে এবং এই নোট বিনিময় করে পূর্ণ মূল্য ফেরত দেওয়া হবে। আর যখন এটি সম্ভব হবে না, তখন সেই নোট সর্বশেষ যার কাছে থাকবে, তার ক্ষতি হিসেবে বিবেচিত হবে। এভাবে কাজটা করতে পারলে একদিকে যেমন বাংলাদেশ ব্যাংক খুব সহজেই কোনোরকম সংশয় সৃষ্টি না করে এবং জনগণের ভোগান্তির কারণ না ঘটিয়ে এই সেবা বাণিজ্যিক ব্যাংকের কাছে দিয়ে দিতে পারে। একই সঙ্গে জনগণ খুব সহজে কোনোরকম সমস্যার সম্মুখীন না হয়ে তাদের কাছে থাকা ছেঁড়া-পোড়া নোট পরিবর্তন করে নিতে পারবে। আর এই সেবার কারণে বাণিজ্যিক ব্যাংকের তেমন কোনো সমস্যা বা ক্ষতির সম্ভাবনা নেই। উল্টো কোনো ব্যাংক চাইলে এই সেবা প্রদানকে মার্কেটিং কৌশল হিসেবে ব্যবহার করে তাদের গ্রাহক সংখ্যা বাড়াতে পারবে। ব্যাংলাদেশ ব্যাংক চাইলে বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করতে পারে।


নিরঞ্জন রায়

সার্টিফাইড অ্যান্টি-মানি লন্ডারিং স্পেশালিস্ট ও ব্যাংকার, টরন্টো, কানাডা

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা