× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

পর্যবেক্ষণ

প্রকাশনা শিল্প : সমস্যা ও সম্ভাবনা

সাঈদ বারী

প্রকাশ : ২৮ নভেম্বর ২০২৫ ০৯:৪১ এএম

প্রকাশনা শিল্প : সমস্যা ও সম্ভাবনা

বাংলাদেশে প্রকাশনা, বিশেষ করে সৃজনশীল গ্রন্থ প্রকাশনা শিল্প আজ এক গভীর টানাপড়েনের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে। এ শিল্প কেবল বই প্রকাশ বা বিক্রির ব্যবসা নয়; এটি জাতির মনন, চিন্তাশক্তি, সাংস্কৃতিক দৃষ্টিভঙ্গি ও মানবিকতা গঠনের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ। বইয়ের মাধ্যমে যুগে যুগে সমাজে জাগরণ এসেছে, মানুষ তার অভ্যন্তরীণ জগৎকে শানিত করেছে, নতুন ভাবনা ও অনুভূতির জন্ম দিয়েছে। কিন্তু সময়ের দ্রুত পরিবর্তন, প্রযুক্তির অগ্রগতি ও অর্থনৈতিক বাস্তবতাÑ সব মিলিয়ে এই শিল্প এখন সার্বিক সংকটের মুখোমুখি। তবু সম্ভাবনার দরজাও পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়নি; বরং নতুন বাস্তবতাকে ধারণ করে এগোতে পারলে ভবিষ্যতে আবারও নবচেতনার সঞ্চার ঘটতে পারে।

স্বাধীনতার পর যেভাবে বাংলাদেশের আধুনিক প্রকাশনা শিল্প গড়ে উঠেছিল, সেখানে একদল উদ্যমী প্রকাশক ও লেখকের হাতে সৃষ্টি হয়েছিল এক প্রাণবন্ত সাহিত্য-পরিবেশ। ষাট-সত্তরের দশকে যে সাহিত্যজাগরণ শুরু হয়, তার বৈশিষ্ট্য ছিল পাঠক ও লেখকের মধ্যকার গভীর বিশ্বাস, আলোচনার প্রাণশক্তি ও সাংস্কৃতিক উন্মেষ। কিন্তু সময়ের চাপে সেই সম্পর্ক আজ অনেকটাই শিথিল। প্রকাশনার জগতে প্রযুক্তি নতুন সম্ভাবনা খুলে দিলেও একই সঙ্গে প্রতিযোগিতার নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে। বইয়ের মুদ্রণ ব্যয় বেড়েছে, বিপণনে এসেছে চ্যালেঞ্জ, আর নতুন প্রজন্মের বদলে যাওয়া অভ্যাসও এই সংকটকে আরও তীব্র করেছে।

সবচেয়ে বড় যে সমস্যাটি সামনে এসেছে তা হলো পাঠকের সংখ্যা এবং পাঠাভ্যাসের ক্রমহ্রাস। তরুণ প্রজন্ম আজ স্মার্টফোন ও ডিজিটাল কনটেন্টের দুনিয়ায় বেশি নিমগ্ন। কয়েক সেকেন্ডের ভিডিও কিংবা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ক্ষণস্থায়ী আলোচনার ভিড়ে দীর্ঘ সময় ধরে বই পড়ার অভ্যাস স্বাভাবিকভাবেই কমছে। প্রকাশকরা এখন নতুন বই প্রকাশের ক্ষেত্রে দ্বিধাগ্রস্তÑ বই বিক্রি হবে কি না, সেই অনিশ্চয়তার হিসেব সব সময় মাথায় রাখতে হয়। এতে ঝুঁকি বাড়ে এবং লেখক-প্রকাশক উভয়ই আর্থিক ও মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন। একটি শিল্প যখন অনিশ্চয়তার চক্রে আটকে যায়, তখন সৃজনশীলতার স্বাভাবিক প্রবাহও বাধাগ্রস্ত হয়।

অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটও প্রকাশনা শিল্পকে কঠিন অবস্থায় ঠেলে দিয়েছে। কাগজ, মুদ্রণ, বাঁধাই, প্রচ্ছদÑ সবকিছুর মূল্যবৃদ্ধির ফলে একটি বই তৈরি করতে এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি খরচ হয়। কিন্তু পাঠকের ক্রয়ক্ষমতা সেই অনুপাতে বাড়েনি। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে প্রকাশনা শিল্পের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক কোনো কর-ছাড়, ভর্তুকি বা প্রণোদনা নেই, যা অনেক দেশেই সাংস্কৃতিক খাতের টেকসই বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বাংলাদেশের প্রকাশকদের অধিকাংশই নিজেদের ব্যক্তিগত প্রচেষ্টায় টিকে আছেন; কোনো প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষা না থাকার কারণে শিল্পটি দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকির সম্মুখীন।

এ চ্যালেঞ্জের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দুর্বল বিতরণব্যবস্থা। ঢাকাকেন্দ্রিক বই ব্যবসা দেশের বিপুলসংখ্যক পাঠককে বাদ দিয়ে চলে। বিভাগীয় শহরগুলোতেও বড় আকারের বই বিপণন কেন্দ্র খুবই সীমিত। সারা বছর বই বিক্রির সুযোগ অত্যন্ত কম। ফলে বইমেলাকে কেন্দ্র করেই মূল বিক্রি হয়ে থাকে। এতে ভালো বই অনেক সময় পাঠকের হাতে পৌঁছাতে পারে না, প্রয়োজনীয় আলোচনার পরিধি তৈরি হয় না, আর লেখক-প্রকাশক-পাঠক ত্রিমুখী সম্পর্কের সেতুটি আরও ভঙ্গুর হয়ে পড়ে। অনলাইন বই বিক্রির উদ্যোগ যদিও কিছুটা স্বস্তি দিয়েছে, তবু তা এখনও সার্বিক সমাধান নয়।

এর সঙ্গে যোগ হয়েছে পাইরেসির ভয়াবহ দংশন। জনপ্রিয় লেখকদের বই বাজারে আসার কয়েকদিনের মধ্যেই ফুটপাত বা অনলাইন প্লাটফর্মে পাইরেটেড কপি ছড়িয়ে পড়ে, যা প্রকাশক ও লেখক উভয়ের অর্থনৈতিক ক্ষতি ঘটায় এবং সৃজনশীল শ্রমের প্রতি অশ্রদ্ধা সৃষ্টি করে। কপিরাইট আইন থাকলেও এর প্রয়োগ দুর্বল; সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কার্যকারিতা প্রায় নেই বললেই চলে। এ কারণে লেখকের সৃষ্টিশীল পরিশ্রমের যথাযথ মূল্যায়ন হয় না এবং প্রকাশকরা নতুন বিনিয়োগে নিরুৎসাহিত হন। একটি দেশের সংস্কৃতি বিকাশে যে শ্রম ও চিন্তা জরুরি, পাইরেসি সেটা পঙ্গু করে দেয়।

তবে সবকিছুর মাঝেও আশার আলো অটুট রয়েছে। এখনও বাংলাদেশে সাহিত্যপ্রেমী এক উল্লেখযোগ্য শ্রেণি আছে, যারা বইকে শুধুই বিনোদনের মাধ্যম নয়, বরং নিজের অস্তিত্বের পরিচয় হিসেবে বিবেচনা করে। প্রতিবছর অমর একুশে বইমেলায় মানুষের উচ্ছ্বাসই তার প্রমাণ। হাজার হাজার মানুষ বইমেলায় আসে, নতুন লেখকের নতুন বই খুঁজে বেড়ায়, সাহিত্য নিয়ে আলোচনা করে। এই পাঠকগোষ্ঠীই সৃজনশীল প্রকাশনা শিল্পের ভবিষ্যৎ শক্তি। এই আগ্রহ যদি বছরের অন্যান্য সময়েও ধরে রাখা যায়, তাহলে বইমেলা আর এক মাসের উৎসবে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বই হয়ে উঠবে সারা বছরের পাঠ-সংস্কৃতি।

নতুন বাস্তবতা থেকে বেরিয়ে আসতে হলে প্রযুক্তিকে প্রতিপক্ষ ভাবার কোনো সুযোগ নেই। বরং প্রযুক্তিই হতে পারে ভবিষ্যৎ প্রকাশনা শিল্পের নতুন ভরসা। ই-বুক, অডিওবুক, পডকাস্ট, ডিজিটাল পাঠমাধ্যমের মতো প্লাটফর্মগুলো সৃজনশীল লেখাকে নতুন প্রজন্মের কাছে আরও সহজে পৌঁছে দিতে পারে। স্মার্টফোন এখন তরুণদের অহর্নিশ সঙ্গীÑ সেই পর্দায় বই পৌঁছে দিতে পারলে পাঠাভ্যাস একটি নতুন রূপে ফিরে আসতে পারে। প্রকাশকদেরও তাই ডিজিটাল প্রকাশনা, অনলাইন বিপণন এবং নতুন ধরনের পাঠক-সম্পৃক্ততা তৈরিতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। বইয়ের বাণিজ্যিক স্থায়িত্ব নিশ্চিত করতে হলে পাঠক যেখানে আছে, বইকেও সেখানে পৌঁছাতে হবে।

প্রকাশনা খাতে পেশাদারত্ব বৃদ্ধিও এখন সময়ের দাবি। বাংলাদেশের প্রকাশনার জগতে অনেক ক্ষেত্রেই কাজ চলে ব্যক্তিকেন্দ্রিক ও অভিজ্ঞতা-নির্ভরভাবে। পেশাদার সম্পাদক, প্রুফরিডার, ডিজাইনার ও বিপণনকর্মীর অভাব স্পষ্ট। উচ্চশিক্ষা বা বিশেষ প্রশিক্ষণ ছাড়া অনেকেই এই খাতে যুক্ত হন। ফলে বইয়ের গুণগত মান অনেক সময় প্রত্যাশিত মাত্রায় পৌঁছে না। প্রকাশনা বিষয়ে বিশেষায়িত শিক্ষকতা ও প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা চালু হলে দক্ষ জনবল তৈরি হবে, যা পুরো শিল্পকে পেশাগত ভিত্তির ওপর দাঁড় করাবে।

রাষ্ট্রীয় নীতিসহায়তার গুরুত্বও এখানে অনস্বীকার্য। জাতীয় গ্রন্থনীতি কার্যকর করা, স্কুল-কলেজ পর্যায়ে পাঠাভ্যাস পুনরুজ্জীবনের কর্মসূচি গ্রহণ, সরকারি লাইব্রেরিতে দেশীয় প্রকাশনার বই সংগ্রহে অগ্রাধিকারÑ এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়ন হলে পাঠকের সংখ্যা বাড়বে, বইয়ের বাজারও প্রসারিত হবে। পাঠক তৈরি না হলে কোনো প্রকাশনা শিল্পই টেকসই হতে পারে না। আর পাঠাভ্যাস তৈরির জন্য সাহিত্যচর্চাকে সামগ্রিকভাবে সামাজিক মর্যাদা দিতে হবেÑ পরিবারে, শিক্ষাঙ্গনে, সংস্কৃতি চর্চায়।

সবশেষে বলা যায়, সৃজনশীল গ্রন্থ প্রকাশনা একটি জাতির আত্মপরিচয় নির্মাণের প্রক্রিয়া। চ্যালেঞ্জ অতিক্রম করা কঠিন হলেও অসম্ভব নয়। লেখক, প্রকাশক, পাঠক ও রাষ্ট্র পরস্পরের সহযোগিতায় এগোতে পারলে এই শিল্প আবারও জাগরণ ও নবস্পন্দনের সূচনা করতে পারে। প্রযুক্তির সেতু, সাংস্কৃতিক চর্চা এবং শিক্ষাব্যবস্থার সমন্বয়ে সৃজনশীল প্রকাশনা ২১ শতকের বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নতুন যাত্রা শুরু করতে পারবে। বই তখন আর কেবল একটি পণ্য নয়, বরং মানুষের বিবেক, চিন্তা ও মানবিকতার আলোকবর্তিকা হিসেবে সমাজকে সামনে এগিয়ে নিতে শক্তি জোগাবে।


সাঈদ বারী

প্রকাশক ও কলাম লেখক

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা